ইতিহাস

রাধাগোবিন্দ কর

উনিশ শতকের প্রবাদপ্রতিম চিকিৎসক, সমাজসংস্কারক এবং লোকহিতৈষী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর (Radhagobinda Kar)। তাঁর হাত ধরেই এশিয়ার প্রথম বেসরকারি চিকিৎসা বিদ্যালয়টি গড়ে ওঠে। দেশীয় ভাষায়, মূলত বাংলা ভাষায় চিকিৎসাবিদ্যা চর্চা করার ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃৎ। চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি একাধিক উপযোগী বইপত্র লেখেন যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্রদের পড়ানো হত। এই পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিচয়ও আছে। তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় থিয়েটারকর্মী। থিয়েটারে অভিনয় করা ছাড়াও তিনি একটি নাট্যদলও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব বাংলা তথা গোটা ভারতবর্ষের গর্ব।

১৮৫০ সালের ২৩ আগস্ট হাওড়ার সাঁতরাগাছির বেতড়ের বিখ্যাত কর বাড়িতে রাধাগোবিন্দ করের জন্ম হয়। তাঁর বাবা দুর্গাদাস কর নিজেও ছিলেন একজন সুচিকিৎসক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত হিতৈষী মানুষ। ঢাকায় গড়ে তুলেছিলেন মিডফোর্ড হাসপাতাল । তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ভার্নাকুলার বিভাগে অধ্যাপনা করতেন। বাংলা ভাষায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের কিছু বইও লিখেছিলেন তিনি। সম্ভ্রান্ত বনেদী পরিবারে জন্মালেও বাবার আদর্শচ্যুত হননি রাধাগোবিন্দ।

ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর হিন্দু স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন কিন্তু এক বছরের মধ্যে ছেড়েও দেন। এরপরে ১৮৮০ সালে দ্বিতীয়বার সেখানে ভর্তি হন কিন্তু তিন বছর পড়ার পরে আবার ছেড়ে দেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৮৩ সালে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি তাঁর মেডিকেলের ডিগ্রিটি লাভ করেন।  

ডাক্তারি পড়ার পাশাপাশি তাঁর ছিল থিয়েটারের শখ। বিখ্যাত নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র ছিলেন তাঁর বাবার বিশেষ বন্ধু। সমকালীন প্রচুর নামকরা নাট্যব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর আসেন। ১৮৬৮ সালে গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি ও নগেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটার। ১৮৭২ সালে দীনবন্ধু মিত্রের ‘লীলাবতী’ নাটকে ক্ষীরোদবাসিনীর ভূমিকায় তিনি অভিনয় করেন এবং সুপরিচিত হন। এছাড়াও একাধিক নাটকে তিনি স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

এসবের সঙ্গে সঙ্গে সমসময়ে এবং আজও ডাঃ রাধাগোবিন্দ করের অবদান এবং ভূমিকা প্রশংসার যোগ্য কারণ তাঁর দূরদৃষ্টি। যে সময়ে তিনি চিকিৎসা করতেন বা এই চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তখন সর্বত্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ব্যাপক প্রভাব বর্তমান ছিল। স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের চর্চাও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় নিজের মাতৃভাষায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের চর্চা করা ছিল অসম্ভব, সঙ্গে ভালো বিজ্ঞানের বইও বাংলা ভাষায় লেখা হতো না। আজীবন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর অনুভব করেছিলেন বাঙালি ছাত্রদের জন্য দেশীয় ভাষায় বই লেখা অত্যন্ত দরকারি, কারণ অনেকেরই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভাষা। যাতে তাঁরা নিজের মাতৃভাষায় পড়াশোনা করার সুযোগ পান, তাঁর জন্য তিনি নিজে বই লেখা শুরু করেন।

১৮৭১ সালে প্রকাশিত হয় ডাঃ রাধাগোবিন্দ করের প্রথম বই ‘ভিষগবন্ধু’। এরপর একে একে ‘সংক্ষিপ্ত শরীরতত্ত্ব’, ‘রোগী পরচর্য্যা’, ‘ভিষক সুহৃদ’, ‘প্লেগ’, ‘স্ত্রীরোগের চিত্রাবলী ও সংক্ষিপ্ত তত্ত্ব’, ‘সংক্ষিপ্ত শিশু ও বাল চিকিৎসা’, ‘সংক্ষিপ্ত ভৈষজতত্ত্ব’, ‘কর সংহিতা’, ‘কবিরাজ ডাক্তার সংবাদ’ ইত্যাদি। তাঁর লেখা ‘ভাষ্যজ রত্নাবলী’ বইটি পড়ে গ্রামবাংলার সাধারণ চিকিৎসকেরা গ্রামীণ মানুষজনের চিকিৎসা করতেন।  

কিন্তু, একইসঙ্গে ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর এও বুঝেছিলেন যে শুধুমাত্র দেশীয় ভাষায় বই লিখে কলকাতা বা তৎসংলগ্নবর্তী এলাকার রোগীদের সমস্যার কোনো সমাধান হবেনা। তার জন্য প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা পরিকাঠামো। এমনকি, চিকিৎসা করতে গিয়ে পুরোনো আয়ুর্বেদ চিকিৎসা এবং সবেমাত্র শেখা ইয়োরোপীয় চিকিৎসাপদ্ধতির দ্বন্দ্ব বাঙালি চিকিৎসকদেরও কম বিড়ম্বনায় ফেলত না। সবমিলিয়ে ব্রিটিশ নিয়মনীতি থেকে মুক্ত একটি আলাদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চাহিদা তিনি সম্যক অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এই চিন্তা থেকেই কলকাতার বিখ্যাত কয়েকজন চিকিৎসক যেমন মহেন্দ্রলাল বন্দোপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার দত্ত, বিপিন মিত্র, কুমুদ ভট্টাচার্য প্রমুখদের নিয়ে একটি সমিতি গঠিত হয় যেখানে এশিয়ার প্রথম বেসরকারি চিকিৎসা বিদ্যালয় গড়ে তোলার প্রস্তাব গৃহীত হয়।

১৮৮৬ সালে বৈঠকখানা বাজারে এই বিদ্যলয়টি শুরু হয় যার নাম ছিল ক্যালকাটা স্কুল অফ মেডিসিন। প্রথমে দেশীয় পদ্ধতিতে চিকিৎসা হলেও ১৮৮৭ সালে অ্যালোপ্যাথি বিভাগ চালু হয় এবং প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় ক্যালকাটা মেডিক্যাল স্কুল । ১৮৯০ সাল নাগাদ এখানে  ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক অ্যানাটমি বা শব ব্যবচ্ছেদের অনুমতি দেওয়া হয়। বৈঠকখানা বাজার থেকে এই স্কুলবাড়িটি বউবাজার স্ট্রিটে স্থানান্তরিত হয়। পরে সেটিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ২৯৮, আপার সার্কুলার রোডে। সেই সময়ে স্কুলবাড়ি সংলগ্ন হাসপাতালে শয্যা ছিল মাত্র ১৪টি। এরপরে স্কুল কর্তৃপক্ষ বেলগাছিয়াতে ১২ বিঘা জমি কেনেন। যুবরাজ অ্যালবার্ট ভিক্টরের ভারত ভ্রমণের তহবিল থেকে ১৮,০০০ টাকা সাহায্য হিসেবে দেওয়া হয়। ১৮৯৯ সালে স্কুল সংলগ্ন হাসপাতালও তৈরি হয়ে যায়। হাসপাতালে ডিসপেন্সারি গড়ে তোলার জন্য টাকা দেন বাবু মানিকলাল শীল।

১৮৯৫ সালে গড়ে ওঠা আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কলেজ অফ ফিজিসিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স অফ বেঙ্গল, ১৯০৪ সালে তৈরি রাধাগোবিন্দ করের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই যৌথ প্রতিষ্ঠানটিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব পাশ করা হয় ১৯১৪ সালে। ১৯১৬ সালে এর নাম দেওয়া হয় বেলগাছিয়া মেডিক্যাল কলেজ । ১৯১৮ সালে এই প্রতিষ্ঠানটির উন্নত ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমিতি গড়ে ওঠে যার নাম মেডিক্যাল এডুকেশন সোসাইটি অফ বেঙ্গল । এই সমিতির প্রথম সভাপতি হন সুরেশ প্রাসাদ সর্বাধিকারী এবং প্রথম সম্পাদক হন ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর। ১৯৪৮ সালের ১২ মে, এই প্রতিষ্ঠানটি ডাঃ রাধাগোবিন্দ করের নামে নামাঙ্কিত হয়। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটির নাম আর. জি. কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (R. G. Kar Medical College and Hospital)।

এই কলেজ ও হাসপাতালটি বানাতে ডাঃ রাধাগোবিন্দ করকে কম অপমান ও কষ্ট সহ্য করতে হয়নি। স্বয়ং বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁর এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিলেন। হাসপাতাল তৈরির অর্থ সংগ্রহের জন্য তিনি বন্ধু শৈলেন গুপ্তকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, ধনী পরিবারের বিয়েবাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এক অর্থে ভিক্ষা করে সাধারণ মানুষের হিতার্থে তিনি এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। নিজের যাবতীয় সম্পত্তি তিনি মেডিক্যাল স্কুল ও হাসপাতালে দান করে দেন। এমনকি নিজের উইলে লিখে যান তাঁর স্ত্রীয়ের মৃত্যুর পরে বসত বাড়িটিও তাঁর বাবার নামে একটি আরোগ্য নিকেতন হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ১৮৯৯ সালে কলকাতা প্লেগের সময় তিনি জেলার স্বাস্থ্য আধিকারিক পদে নিয়োজিত ছিলেন। নিজের জীবন বিপন্ন করে উত্তর কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরে রোগী খুঁজে বেড়িয়েছেন। দিয়েছেন রোগ থেকে বাঁচার পরামর্শ। কেউ ওষুধ কিনতে অপারগ হলে নিজেই কিনেদিয়েছেন। এখানেই তাঁর সাথে আলাপ হয় ভগিনী নিবেদিতারকলকাতা প্লেগ ও সেই প্রসঙ্গে নিবেদিতার ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল ডাঃ রাধাগোবিন্দ করের ভূমিকা।

ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর যে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের চর্চার জন্য উপযোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন তাই নয়, দেশীয় পদ্ধতিতে স্বল্প মূল্যের ওষুধ তৈরির দিকেও তিনি মনোযোগ দেন যাতে সাধারণ মানুষকে চড়া দামে বিদেশি ওষুধ কিনে না খেতে হয়। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আত্মজীবনী থেকে জানা যায় যে দেশের প্রথম ফার্মাসিউটিকলস সংস্থা বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিকলসের প্রতিষ্ঠার সময় তিনি অর্থ সাহায্য এবং ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রের উৎপাদনগত পরামর্শ দিয়ে পাশে ছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান তথা সাধারণ মানুষের জন্য এই মানুষটি নিরবচ্ছিন্ন সাধনা করে গিয়েছেন।

চিরকাল নীরবে নিজের কর্তব্য পালন করা এই কর্মযোগীর ৬৮ বছর বয়সে ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে ১৯১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর বয়সে মৃত্যু হয়।

কম খরচে বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সববাংলায় এর শ্রদ্ধার্ঘ্য



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।