সববাংলায়

টিপু সুলতান মসজিদ

বিভাগঃ , ,

প্রাচীন শহর কলকাতার বুকে প্রাচীন বহু মন্দির যেমন রয়েছে তেমনই অসংখ্য পুরোনো মসজিদ কত বিচিত্র ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আজও। কলকাতার তেমনই একটি মসজিদ হল টিপু সুলতান মসজিদ (Tipu Sultan Mosque)। ধর্মতলা বা এসপ্লানেড চত্বরে লেনিন সরণীর ওপর এই বিখ্যাত প্রাচীন মসজিদের অবস্থান। মসজিদের নাম থেকেই বুঝতে পারা যায় এরসঙ্গে মহীশূরের শাসক টিপু সুলতানের স্মৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই মসজিদ সেই সময়ের একটি স্মারকস্তম্ভস্বরূপ। মসজিদটির স্থাপত্যশৈলীও কিন্তু প্রাচীন স্থপতিদের উন্নতমানের শৈল্পিক দক্ষতার পরিচয়বাহী। টালিগঞ্জের গোলাম মহম্মদ মসজিদের (টিপু সুলতান শাহী মসজিদ নামেও পরিচিত) সঙ্গে স্থাপত্যের দিক দিয়ে এটির প্রভূত সামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়, কারণ দুটি মসজিদের সঙ্গেই রয়েছে মহীশূরের টিপু সুলতান পরিবারের যোগাযোগ। তবে আমরা ধর্মতলার টিপু সুলতান মসজিদেরই ইতিহাস এবং আরও নানা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে এখানে আলোচনা করব।

টিপু সুলতান মসজিদ কিন্তু মহীশূরের শাসক টিপু সুলতান নিজে নির্মাণ করেননি। টিপু সুলতানের একাদশতম পুত্র প্রিন্স গোলাম মহম্মদ ১৮৪২ সালে কলকাতার এসপ্ল্যানেড বা ধর্মতলা এলাকায় পিতার স্মরণে এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। তিনি ১৮৬০  সালে কলকাতার টালিগঞ্জ এলাকাতে আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করেন যেটি গোলাম মহম্মদ মসজিদ নামে খ্যাত হলেও সেটিও টিপু সুলতানকেই উৎসর্গ করা হয়েছিল।

তবে, সুদূর মহীশূরের টিপু সুলতানের উত্তরাধিকারীরা কলকাতায় কীভাবে এলেন এবং মসজিদ তৈরি করলেন, তার নেপথ্যেও রয়েছে কিছু ঘটনা৷

টিপু সুলতান মহীশূরের শাসক তো ছিলেনই, তার পাশাপাশি পন্ডিত ও কবি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। মহীশূরের দক্ষিণ ভারতীয় ডেক্কানি রাজ্যের শাসক টিপু সুলতান ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে একের পর এক যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আসলে প্রথমে টিপুর কাছে বাণিজ্যিক নানা সুযোগ সুবিধা চেয়েছিল এবং পরে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তাঁর রাজ্য আত্মসাৎ করবার চেষ্টা করেছিল। টিপু সুলতান কোম্পানির সেই শক্তিশালী ও আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন এবং যুদ্ধে প্রাণ হারান টিপু সুলতান।

১৭৯৮ সালে পরাজয় এবং ১৭৯৯ সালে টিপুকে হত্যা করার পরে টিপু সুলতানের পরিবার ব্রিটিশদের হাতে বন্দী হয়। উল্লেখ্য যে টিপুর দুই ছেলে প্রিন্স গোলাম মহম্মদ শাহকে আগেই কলকাতায় নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আবার মহীশূরে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। টিপুর মৃত্যুর পর টিপুর তিন বেগম, বারোজন পুত্র, দুই কন্যা এবং তিন শতাধিক অনুচরকে ভেলোরে নির্বাসিত করা হয়েছিল, যেখানে তাঁরা ছয় বছর ছিলেন। টিপু সুলতানের মৃত্যুর ছয় বছর পরে ১৮০৬ সালে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভেলোর বিদ্রোহের প্রধান কান্ডারি হিসেবে তাঁদের পরিবারকে অভিযুক্ত করা হয় এবং পাঠিয়ে দেওয়া হয় কলকাতায়৷ পরিবারটি কলকাতায় টালিগঞ্জ অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কলকাতায় যখন এসেছিলেন গোলাম মহম্মদ তখন শিশু। তারপর এই শহরের বুকেই তাঁর বেড়ে ওঠা। অবশেষে তিনি ১৮৪২ সালে পিতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি মসজিদ নির্মাণ করলেন শহরের প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলায়। ১৮৩৯ সালে গোলাম মহম্মদের অধিগ্রহণ করা জায়গাতেই মসজিদ নির্মাণ শুরু হয়েছিল। তাঁর পিতার নামেই মসজিদটির নামকরণ করা হল, টিপু সুলতান মসজিদ।

স্থাপত্যের দিক থেকেও টিপু সুলতান মসজিদ খুবই আকর্ষণীয়। এই মসজিদটির সঙ্গে স্থাপত্যের দিক দিয়ে বসিরহাটের শালিক মসজিদটির মিল লক্ষ করা যায়। টিপু সুলতাম মসজিদে সবুজ রঙের দুটি সারিতে বিন্যস্ত দশটি গম্বুজ শীর্ষে দেখতে পাওয়া যায়। মসজিদের চারকোণে অষ্টভুজাকার চারটি প্রধান মিনার বা স্তম্ভ রয়েছে। প্রধান মিনারগুলির মাঝে আরও মোট ছোট ছোট আঠারোটি মিনার দেখা যায়। মিনারের দেওয়াল আবার নানারকম নকশায় ভরপুর। আশ্চর্যজনকভাবে, মিনারের নকশার সঙ্গে গথিক কলামের দারুণ সামঞ্জস্য রয়েছে। মসজিদের দেওয়ালে সূক্ষ্ম ও জটিল খোদাইয়ের কাজ দেখতে পাওয়া যায়। মসজিদের প্রবেশদ্বার দক্ষিণমুখী। মসজিদের অভ্যন্তরীণ হলের বাইরে মেঝেতে কার্পেট পাতা দেখা যায়। মসজিদের মেঝেটি সাদা-কালোয় ছককাটা। মসজিদটি এতটাই প্রশস্ত যে, এর ভিতরে একসঙ্গে প্রায় ১০০০ লোক বসতে পারে। ১৯৮০ সালে এসপ্ল্যানেড মেট্রো নির্মাণের সময় এই মসজিদের স্থাপত্য কিঞ্চিৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে অবশ্য মেট্রো রেলওয়ের সহযোগিতায় এবং টিপু সুলতান শাহী মসজিদ সুরক্ষা ও কল্যাণ কমিটির অধীনে দ্রুত সংস্কারের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল।

বছরের বিভিন্ন সময়ে এই টিপু সুলতান মসজিদে বিশেষ উৎসবগুলি খুব জাঁকজমক-সহকারে পালিত হয়ে থাকে।

প্রথমেই বলতে হয় রমজান এবং ঈদের কথা। রমজান চলাকালীন প্রতিদিন ইফতারের সময় এই মসজিদে অসংখ্য মুসলমানের আগমন ঘটে৷ সারাদিন উপবাসের পর আনন্দ সহকারে একত্রে সকলে ইফতারে অংশ নেয়। উল্লেখ্য যে ২০১৮ সালে প্রথমবার মহিলাদের ইফতারের জন্য টিপু সুলতান মসজিদের দরজা খোলা হয়েছিল। তাঁদের ইফতারের জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়েছিল। সারা মাস রমজানের পরে ঈদের সময় নতুন জামাকাপড় পরে মসজিদে নামাজের জন্য একত্র হন সকলে। শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউই বাদ যান না। শয়ে শয়ে মুসলমান মানুষের সারিবদ্ধভাবে মসজিদ চত্বরে নামাজ পড়ার দৃশ্য সত্যিই আকর্ষণীয়। মসজিদ চত্বর চমৎকারভাবে আলো দিয়ে সজ্জিত করা হয় এইসময়ে। মসজিদের আশেপাশে ঈদ উপলক্ষে হরেক কিসিমের খাবারের পসরাও দেখতে পাওয়া যায়।

ঈদ ছাড়াও মহরমের সময়তেও বেশ জাঁকজমক দেখা যায় মসজিদে। মহরমের মিছিল বেরোয় রাস্তায়। মুসলমান মানুষেরা মহরম পালনের জন্য টিপু সুলতান মসজিদ চত্বরে একত্রিত হন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading