সববাংলায়

বেলুড় মঠ ভ্রমণ

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান কার্যালয় বেলুড় মঠ। এখানে আছে রামকৃষ্ণ দেব, সারদা দেবী ও স্বামী বিবেকানন্দের দেহাবশেষের ওপর অবস্থিত মন্দির। বেলুড় মঠ ভ্রমণ করার সময় মঠের স্থাপত্যে সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক সুন্দর নিদর্শন দেখতে পাবেন যা আপনার বেলুড় মঠ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সুন্দর করে তুলবে। এই স্থাপত্য যেমন সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, তেমনই এই মঠ পবিত্র তীর্থস্থান। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সেবা করে চলা, বিবেকানন্দের ভাষায় বললে জীবে প্রেমই রামকৃষ্ণ মিশনের মূল লক্ষ্য এবং মিশনের কেন্দ্রবিন্দু বেলুড় মঠে না ঘুরলে বেলুড় মঠ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কত মধুর হতে পারে তা জানতে পারবেন না।

বেলুড় মঠ কোথায়

বেলুড় মঠ পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায় গঙ্গার পশ্চিম তীরে অবস্থিত। দক্ষিণেশ্বর মন্দির থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার এবং হাওড়া স্টেশন থেকে মঠের দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। বেলুড় মঠ, কলকাতা থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বে, বর্ধমান থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরত্বে এবং শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৫৮০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত।

বেলুড় মঠের ইতিহাস

১৮৯৭ সালের শুরুতে স্বামীজি তাঁর পাশ্চাত্যদেশীয় শিষ্যদের নিয়ে কলম্বো থেকে দেশে ফিরে দুটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন, একটি বেলুড়ে এবং অপরটি উত্তরাখণ্ডের চম্পাবত জেলায় হিমালয়ের মায়াবতীতে, যেটি অদ্বৈত আশ্রম নামে পরিচিত। ১৮৯৭ সালের ১ মে স্বামী বিবেকানন্দের নেতৃত্বে উত্তর কলকাতায় বলরাম বসুর বাড়িতে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়। তাই ওই দিনটিকেই রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। স্বামী বিজ্ঞানানন্দ , যিনি তাঁর প্রাক-সন্ন্যাস জীবনে একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, তিনি বিবেকানন্দ এবং শিবানন্দের কাছ থেকে ধারণা নিয়ে বেলুড় মঠের নকশা নির্মাণ করেছিলেন। ১৮৯৮ সালে রামকৃষ্ণদেবের মৃতদেহের ভস্মাবশেষের পাত্রটিকে পূজা করে মঠের মাটিকে পবিত্র করে তুলেছিলেন। ১৯৩৮ সালে বেলুড় মঠ মন্দিরের নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছিল।

বেলুড় মঠ কীভাবে যাবেন

স্থানীয়রা মূলত সড়কপথে এবং জলপথে গিয়ে বেলুড় মঠ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। হাওড়া স্টেশন থেকে বেলুড় বা বালিগামী বাসে চেপে জিটি রোড ধরে সহজেই বেলুড় মঠ যাওয়া যায়। এছাড়াও ট্যাক্সি বা প্রাইভেট ক্যাবেও একই ভাবে জিটি রোড ধরে বেলুড়মঠে পৌঁছনো যায়। তাছাড়া অনেকেই দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে সকালে পূজা দিয়ে সেখান থেকে লঞ্চে করে জলপথে চলে যান বেলুড় মঠ। আবার অনেকে সড়কপথে বেলুড়মঠে এসে  সকাল সকাল ভ্রমণ করে, গঙ্গার উপর দিয়ে লঞ্চে করে চলে যান দক্ষিণেশ্বর মন্দির। দক্ষিণেশ্বর মন্দির থেকে সড়কপথেও বেলুড় মঠে যাওয়া যায়।

ট্রেনে যেতে চাইলে হাওড়া বা আরামবাগ স্টেশন থেকে রেলপথে চলে আসতে পারেন বেলুড় মঠ। তাছাড়া শিয়ালদা স্টেশন থেকে দক্ষিণেশ্বর স্টেশনে নেমে সেখান থেকে যেতে পারেন বেলুড় মঠ।

বেলুড় মঠে কোথায় থাকবেন

বেলুড় মঠ ভ্রমণকালে মঠের ভেতরে থাকার কোনও ব্যবস্থা নেই। তবে কাছাকাছি বেশ কিছু হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে। সাধারণত আশেপাশের অঞ্চল থেকে পর্যটকেরা সকালে বেলুড়ে গিয়ে দিনের দিন ফেরত চলে যান। যারা কলকাতায় ঘুরতে গিয়ে বেলুড় মঠ ঘুরতে যাবার কথা ভাবছেন, তারা কলকাতায় হোটেলে থেকে বেলুড় মঠে সাইট সিইং হিসাবে ঘুরতে যেতে পারেন। তবে বেলুড় মঠের আশেপাশেও কিছু হোটেল, গেস্ট হাউস রয়েছে। তবে যাবার আগে অবশ্যই বুক করে যাবেন।

বেলুড় মঠে কী দেখবেন

বেলুড় মঠ তার অধ্যাত্মিকতা এবং সুন্দর স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। বেলুড় মঠ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ করতে এখানের দর্শনীয় স্থানগুলো আপনাকে ঘুরে দেখতে হবে। বেলুড় মঠ ভ্রমণকালে এখানে কী দেখবেন , সেই স্থানের বর্ণনা নিচে দেওয়া হল:

শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির

বেলুড় মঠ ভ্রমণের প্রধান দর্শনীয় স্থান হল শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির। এখানে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের মার্বেলের মূর্তি স্থাপন করা আছে। মন্দিরটির স্থাপত্য চমৎকার এবং অসাধারণ। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য স্থাপত্য শৈলীর সংমিশ্রণে তৈরি এই মন্দিরের স্থাপত্যের প্রতিটি অংশের কিছু তাৎপর্য রয়েছে। গর্ভগৃহ এবং প্রার্থনা কক্ষটি এমন ভাবে সংযুক্ত, যা দেখলে গির্জার মত মনে হয়। গর্ভগৃহের চারপাশের জানালাগুলো রাজপুত ও মোগল স্থাপত্যরীতিতে তৈরি। স্বামীজির আজীবন ইচ্ছা ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের দেহাবশেষ সংরক্ষিত করে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করবেন। কিন্তু স্বামীজীর জীবদ্দশায় তা করে যেতে পারেনি। বর্তমানে যেটি ‘পুরানো মন্দির’ নামে পরিচিত, সেখানেই তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের দেহাবশেষ স্থাপন করে যান। পরে স্বামী স্বামী বিজ্ঞানানন্দ এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

এখানে বসে শান্তিতে প্রার্থনা করে মানুষজন। জায়গাটি এত নীরব যে আপনি চুপ করে বসে ধ্যান করলে আপনার মনে শান্তি এনে দেবে। এখানে একদম কোলাহল করবেন না, ছবি তুলবেন না। মোবাইল বন্ধ করে রাখবেন বা সাইলেন্ট মোডে রাখবেন।

পুরোনো মন্দির

শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত মন্দিরটিই ছিল মূল মন্দির, যেখানে ১৮৯৯ সালের জানুয়ারী থেকে নতুন মন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন পূজা করা হত। এই মন্দিরেই স্বামী বিবেকানন্দ এবং শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যান্য প্রত্যক্ষ শিষ্যরা পূজা, উপাসনা, ধ্যান করতেন।

শ্রীমা সারদাদেবী মন্দির

বেলুড় মঠ ভ্রমণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হল শ্রীমা সারদাদেবী মন্দির, যেটি মঠের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির। গঙ্গার দিকে মুখ করে এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছে। বেলুড় মঠের সমস্ত মন্দিরের মধ্যে একমাত্র মায়ের মন্দিরটিই গঙ্গামুখী। মন্দিরের ভেতরে একটি বেদীতে মা সারদার ছবি স্থাপন করা রয়েছে। তার ডানদিকে শ্রীরামকৃষ্ণের একটি ছোট ছবি রয়েছে। এই ছবিটি মা সারদাকে শ্রীরামকৃষ্ণের একজন ভক্ত, গোপালের-মা দিয়েছিলেন। মা সারদার মৃত্যুর পর এই স্থানে মায়ের নশ্বর দেহ দাহ করা হয়েছিল। যে বছর মা সারদা মারা গিয়েছিলেন অর্থাৎ ১৯২০ সালে এই মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন স্বামী সারদানন্দ। তাঁর প্রচেষ্টাতেই আগামী বছর ১৯২১ সালের মধ্যে মন্দিরের কাজ সম্পন্ন হয়।

স্বামী বিবেকানন্দের মন্দির

বেলুড় মঠ ভ্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান হল স্বামী বিবেকানন্দের মন্দির। স্বামীজির মৃত্যুর পর যে স্থানে তাঁর নশ্বর দেহ দাহ করা হয়েছিল, সেখানে একটি দোতলা মন্দির নির্মাণ করা হয়। মন্দিরের মেঝেটি বেলুড় মঠের ভূমিস্তরের নীচে অবস্থিত, কারণ মন্দিরটি যখন নির্মিত হয়েছিল তখন জমির অংশটি খুবই নিচু ছিল। মন্দিরের একতলায় স্বামীজির একটি মার্বেলের ফ্রেম করা মূর্তি রয়েছে। ভগিনী নিবেদিতার প্রচেষ্টায় স্বামীজির মার্বেলের ফ্রেম করা মূর্তিটি স্থাপিত হয়েছিল।

স্বামী ব্রহ্মানন্দ মন্দির

শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক পুত্র, রামকৃষ্ণ মঠ এবং মিশনের প্রথম সভাপতি ছিলেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ। তিনি ‘রাজা মহারাজ’, ‘রাখাল মহারাজ’ বা শুধু ‘মহারাজ’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর যে স্থানে তাঁর নশ্বর দেহ দাহ করা হয়েছিল, সেখানে এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়।

সমাধি পীঠ

শ্রীরামকৃষ্ণের ষোলজন প্রত্যক্ষ শিষ্যদের মধ্যে সাতজনের নশ্বর দেহ এখানে দাহ করা হয়েছিল। এই স্থানের মার্বেল ফলকে তাদের নাম খোদাই করা আছে।

রামকৃষ্ণ সংগ্রহ মন্দির

বেলুড় মঠ ভ্রমণের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হল রামকৃষ্ণ সংগ্রহ মন্দির। এটি একটি জাদুঘর, যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দ ব্যবহৃত দ্রব্য সামগ্রী সংরক্ষিত আছে। মঠের ইতিহাস এবং শ্রী রামকৃষ্ণের জীবনযাত্রা সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যায় এখানে। রামকৃষ্ণ সংগ্রহ মন্দিরে প্রবেশের সময়সূচী হল সকাল সাড়ে আট থেকে সকাল সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত এবং এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বিকেল চারটে থেকে বিকেল ছটা পর্যন্ত ও অক্টোবর থেকে মার্চ মাসে দুপুর সাড়ে তিনটে থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত। সোমবার এবং অন্যান্য কিছু ছুটির দিনে রামকৃষ্ণ সংগ্রহ মন্দির বন্ধ থাকে।

স্বামী বিবেকানন্দের আম গাছ

এখানে একটি আম গাছ রয়েছে, যা স্বামী বিবেকানন্দ নিজের হাতে লাগিয়েছিলেন। এটি আজও এখানে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভক্তরা এখানে আসেন।

গঙ্গা নদীর তীর

বেলুড় মঠ গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত, যা জায়গাটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়। এখানে দাঁড়িয়ে গঙ্গার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করে মানুষজন। তবে এখানে পাড়ে বসবেন না বা গঙ্গার জলে নোংরা ফেলবেন না।

পুরোনো মঠ

ফেরী ঘাটের কাছে অবস্থিত নীলাম্বর বাবুর বাগানবাড়িতেই পূর্বে রামকৃষ্ণ মঠের অফিস ছিল। বর্তমানে এই বাড়িটি বেলুড় মঠের একটি অংশ এবং পুরাতন মঠ নামে পরিচিত। সারদা মা বহুবার এখানে বাস করেছেন। মা যে ঘরে থাকতেন সেখানে তাঁর ছবি রাখা আছে।

বেলুড় মঠে কখন যাবেন

সারা বছর ধরেই বেলুড় মঠ ভ্রমণ করা যায়। সর্বসাধারণের বছরের প্রায় সব দিনই খোলা থাকে। মঠে প্রবেশের সময়সূচী হল সকাল সাড়ে ছটা থেকে সকাল সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত এবং এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বিকেল চারটে থেকে বিকেল ছটা পর্যন্ত ও অক্টোবর থেকে মার্চ মাসে দুপুর সাড়ে তিনটে থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত।

বেলুড় মঠে কী খাবেন

বেলুড় মঠের ভোগ বা প্রসাদ না খেলে বেলুড় মঠ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ হয় না। তবে কুপন না থাকলে আপনি ভোগ পাবেন না। সকাল সাড়ে দশটা থেকে ভোগের কুপন দেওয়া শুরু হয়, আপনি অফিস থেকে কুপন সংগ্রহ করুন। কুপনের নির্দিষ্ট কোনও অর্থ মূল্য নেই। আপনি আপনার ইচ্ছে মতো দান করুন।

বেলুড় মঠে কী কিনবেন

শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী, মা সারদার বাণী, তাঁদের জীবনের কথা বা স্বামীজির কথা ইত্যাদি না না বই কিনতে পাওয়া যায়।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • মঠের ভিতরে ছবি তুলবেন না। মোবাইল বন্ধ করে রাখবেন বা সাইলেন্ট মোডে রাখবেন।
  • রামকৃষ্ণ মন্দিরের ভেতরে কোলাহল করবেন না, নীরবতা বজায় রাখবেন।
  • মঠে প্রবেশের সময়সূচী হল সকাল সাড়ে ছটা থেকে সকাল সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত এবং দুপুর সাড়ে তিনটে থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত।
  • সোমবার এবং অন্যান্য কিছু ছুটির দিনে রামকৃষ্ণ সংগ্রহ মন্দির বন্ধ থাকে।
  • বেলুড় মঠের ভোগের কুপন না থাকলে আপনি ভোগ পাবেন না। সকাল সাড়ে দশটা থেকে ভোগের কুপন দেওয়া শুরু হয়।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব অভিজ্ঞতা
  2. https://belurmath.org/
  3. https://www.darshansbooking.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading