ইতিহাস

ভার্গিস কুরিয়েন

ভার্গিস কুরিয়েন (Verghese Kurien) একজন ভারতীয় সামাজিক উদ্যোগপতি যিনি ভারতীয় ইতিহাসে’শ্বেতবিপ্লব’-এর জনক হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছেন। তাঁর চেষ্টাতেই আজ ভারতবর্ষ বিশ্বের বৃহত্তম দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। সমবায়ের ভিত্তিতে দুধ উৎপাদন যে গ্রামের মানুষের জীনযাত্রার অর্থনীতি পাল্টে দিতে পারে তা অনুভব করেছিলেন ভার্গিস কুরিয়েন। তাঁর হাত ধরেই ভারতে শুরু হয়েছিল ‘অপারেশন ফ্লাড’। দুগ্ধজাত পণ্যসমূহের জন্য বিখ্যাত ‘আমূল’ সংস্থার প্রধান কান্ডারি ছিলেন তিনি। ডেয়ারি শিল্পে অবদানের জন্য তাঁকে ভারতবর্ষের ‘মিল্কম্যান’ আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে।

১৯২১ সালের ২৬ নভেম্বর কেরালার কোঝিকোড়ে এক সিরিয়ান অ্যাংলো খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম হয় ভার্গিস কুরিয়েনের। তাঁর বাবা পুথেনপাড়াক্কল কুরিয়েন ছিলেন সরকারী হাসপাতালের একজন সিভিল সার্জেন। কুরিয়েনের মা ও ছিলেন উচ্চশিক্ষিত একজন মহিলা এবং অসামান্য এক পিয়ানোবাদক। ১৯৫৩ সালের ১৫ জুন তিনি সুসান মলি পিটারকে বিয়ে করেন। তাঁদের কন্যাসন্তানের নাম নির্মলা কুরিয়েন। খ্রিস্টান হিসেবে বেড়ে উঠলেও পরবর্তীকালে নাস্তিক হয়ে গিয়েছিলেন ভার্গিস কুরিয়েন।

ভার্গিস কুরিয়েন প্রথমে গোবীচেট্টিপালায়ামের ডায়মন্ড জুবিলি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে পড়াশুনা শেষ করে ১৪ বছর বয়সে মাদ্রাজের লোয়োলা কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৪০ সালে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হন। ১৯৪৩-এ তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক ডিগ্রি লাভ  করেন গিন্ডির কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে, যেটি তখন মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২২ বছর বয়সে কুরিয়েন তাঁর বাবাকে হারালে তাঁর এক কাকা নিজের বাড়িতে ত্রিচুরে নিয়ে যান তাঁদের। কুরিয়েন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু তাঁর মায়ের ইচ্ছায় তিনি জামশেদপুরের টাটা স্টিল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে চলে যান এবং ১৯৪৬ সালে সেখান থেকে স্নাতক হন। এরপর তিনি সরকারি বৃত্তির জন্য আবেদন জানান এবং পড়াশুনার জন্য বেছে নেন ডেয়ারি ইঞ্জিনিয়ারিং। বিদেশ যাওয়ার আগে তিনি যান ব্যাঙ্গালোরের ইম্পেরিয়াল ইনস্টিটিউট অব অ্যানিম্যাল হাসবেন্ড্রীতে। সেখানে কাটিয়েছিলেন নয় মাস কাটিয়ে তারপর আমেরিকা চলে যান তিনি এবং সেখানকার মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মাস্টার ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন ১৯৪৮ সালে। খেলাধুলাতেও বেশ সক্রিয় ছিলেন ভার্গিস কুরিয়েন । ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, বক্সিং এবং টেনিসে কলেজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি।

বিদেশ থেকে ফিরে এসে ভারত সরকারের বৃত্তির বিনিময়ে দুগ্ধ বিভাগের অফিসার হিসেবে তাঁকে পাঠানো হয় গুজরাটের কাইরা জেলার আনন্দ নামে একটি জায়গায়। আনন্দে গিয়ে কুরিয়েন লক্ষ্য করলেন কীভাবে সেখানে দুধ বিতরণকারীদের দ্বারা কৃষকরা শোষিত হচ্ছেন এবং সমগ্র অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ করছেন ‘পেস্টনজী এদুলজী’ নামে এক চতুর ব্যবসায়ী। সেখানে ত্রিভুবনদাস কিশিভাই প্যাটেলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে যিনি ওই শোষিত কৃষকদেরই নেতৃত্বের দায়িত্বে ছিলেন। কুরিয়েন সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবলে ত্রিভুবনদাস তাঁকে অনুরোধ করেন দুগ্ধ সমবায় গড়ে তুলতে সাহায্যের জন্য। স্বয়ং বল্লভভাই প্যাটেল কুরিয়েনকে একটি দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে অনুরোধ করেন। তখনই গ্রামীন ডেয়ারি শিল্পের প্রভূত বদল ঘটিয়ে তাঁকে সঠিক দিশা দেখানোর কাজে হাত দিলেন তিনি৷ কুরিয়েন এরপর আনন্দতে প্রতিষ্ঠা করলেন কাইরা ডিসট্রিক্ট কোঅপারেটিভ মিল্ক প্রোডিউসারস’ ইউনিয়ন লিমিটেড (Kaira District Cooperative Milk Producers’ Union Limited বা KDCMPUL) যেটি ‘আমূল’ নামেই সর্বজনবিদিত। এই ‘আমূল’-এর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল তা সমস্ত মধ্যস্বত্বভোগীর অবসান ঘটিয়ে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি বাজারের ক্রেতার সংযোগ স্থাপন করেছিল এবং তাঁদের স্থায়ী ও নিয়মিত রোজগারের পথ নিশ্চিত করেছিল। কুরিয়েন গ্রামীণ শিল্পকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে আধুনিক শিল্পের রূপ দিতে চেয়েছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন সরকারি কোনো সাহায্য ছাড়াই কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে। আসলে স্বনির্ভরতার নীতির ওপরই জোর দিয়েছিলেন তিনি। অবশ্য কেবল গরুর দুধেই আটকে থাকেননি তিনি, মোষের দুধ থেকে গুঁড়ো দুধ তৈরির গবেষণা চালিয়েছেন এবং তার ফলেই পরবর্তীকালে দেশে প্রথম মিল্ক পাউডার প্লান্ট গড়ে ওঠে। ১৯৫৫ সালে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘আমূল’।

‘আমূল’-এর এই সমবায় ডেয়ারি উদ্যোগটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর অনবদ্য সাফল্য দেখে  ১৯৬৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী উদ্যোগী হয়ে উঠলেন ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গড়ে তোলার জন্য এবং তার কর্ণধারও হয়েছিলেন ভার্গিস কুরিয়েন । ১৯৭০ সালে এনডিডিবি ‘ফ্লাড অপারেশন’-নামে কুরিয়েনের সাথে সারা রাজ্যের সমস্ত দুগ্ধ সমবায়গুলিকে এক ছাতার নীচে এনে জড়ো করেছিলেন। কুরিয়েন ‘আমূল’-এর ঘন দুধ উৎপাদন ও তার বাজারকে বাড়িয়ে তুলেছিলেন ফলে ঘন দুধের আমদানি নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল ভারত সরকার। ১৯৭৯ সালে সমবায়ের ম্যানেজারদের যথাযথভাবে তৈরি করার জন্য তিনি গড়ে তোলেন ইনস্টিটিউট অব রুরাল ম্যানেজমেন্ট আনন্দ্ ।

গোটা ভারতবর্ষে এবং ভারতের বাইরেও নানা দেশে এই ধরনের সমবায়ের জন্য কুরিয়েন সাহায্য করে গেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিয়েছেন। ১৯৭৯ সালে অ্যালেক্সি কোসিগিন (Alexei Kosygin) তাঁর সমবায়গুলির বিষয়ে পরামর্শের জন্য কুরিয়েনকে সোভিয়েত ইউনিয়নে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে পাকিস্তান থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয় সেখানে দুগ্ধ সমবায় প্রতিষ্ঠা করবার জন্য। নরসিমা রাও প্রতিবেশী রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় একটি দুগ্ধ সমবায় গঠনের জন্য তাঁর সাহায্য চেয়েছিলেন যেটি পরে ১৯৯৭ সালে এনডিডিবির সহযোগিতায় গড়ে ওঠে। ১৯৯৮ সালে ভারতবর্ষ বিশ্বের বৃহত্তম দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। এর প্রধান কৃতিত্ব ভার্গিস কুরিয়েনেরই প্রাপ্য। কুরিয়েন বিভিন্ন জনসংস্থার প্রধান বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার বোর্ডে ছিলেন এবং নানাদেশের বিবিধ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করেছেন ডক্টরেট ডিগ্রি।

হিন্দি ভাষার বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার শ্যাম বেনেগাল ‘আমূল’-এর গড়ে ওঠা এবং কর্মযজ্ঞকে কেন্দ্র করে ‘মন্থন’ নামের এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। পরিচালক অর্থনৈতিক অসুবিধায় পড়লে কুরিয়েনের ৫ লক্ষ কৃষক-সদস্য দুটাকা করে চাঁদা দিয়েছিলেন সিনেমাটি তৈরির জন্য। ১৯৭৬ সালে সিনেমাটি মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্র কুরিয়েনকে নতুন ভাবনার খোরাক জোগাল। তিনি ঠিক করলেন একজন পশু চিকিৎসক, দুগ্ধ প্রযুক্তিবিদ ওই সিনেমাটিকে সঙ্গে করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াবেন এবং সেখানকার মানুষদের সমবায় গঠনের জন্য বোঝাবেন। লাতিন আমেরিকায় একইরকম সমবায় গঠনের জন্য ইউনাইটেড নেশনস ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম এই সিনেমাটিকে ব্যবহার করেছিল। এছাড়াও কুরিয়েন বেশ কিছু বইও রচনা করেছিলেন। সেগুলি হল, ‘টু হ্যাড অ্যা ড্রিম’ (Too Had a Dream), ‘অ্যান আনফিনিশড ড্রিম’ ( An Unfinished Dream) এবং ‘দ্য ম্যান হু মেড দ্য এলিফেন্ট ড্যান্স’ ( The Man Who Made the Elephant Dance)।

জীবনব্যাপী এই যে বিপুল কর্মকাণ্ড তাঁর, সেজন্য দেশ-বিদেশের নানা সম্মানেও ভার্গিস কুরিয়েন ভূষিত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। সেই পুরস্কারগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ‘রামোন ম্যাগসেসে পুরষ্কার’, ‘পদ্মশ্রী’ (১৯৬৫), ‘পদ্মভূষণ’ (১৯৬৬), ‘কৃষি রত্ন’ (১৯৮৬), ‘ওয়াটলার পিস্ পুরষ্কার’, ‘বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার’ , ‘অর্ডার অব এগ্রিকালচারাল মেরিট’, ‘পদ্মবিভূষণ’ (১৯৯৯) ইত্যাদি। কুরিয়েনকে ‘রেড অ্যান্ড হোয়াইট লাফ টাইম অ্যাচিভমেন্টস জাতীয় পুরস্কার’-এও সম্মানিত করা হয়।২৬ নভেম্বর তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে জাতীয় দুগ্ধ দিবস পালন করা হয়ে থাকে।

২০১২ সালের ৯ সেপ্টেম্বরে ৯০ বছর বয়সে আনন্দে নাদিয়াদ হাসপাতালে ভার্গিস কুরিয়েনের মৃত্যু হয়।

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন