বিজ্ঞান

আমরা খুব ছোটবেলার স্মৃতি মনে রাখতে পারি না কেন

অতীতের কোন বিষয়কে নতুন করে মনে করার নামই স্মৃতি। সেটি কোন ঘটনা হতে পারে, দৃশ্য হতে পারে, শব্দ, ঘ্রাণ, স্বাদ, স্পর্শ সবই হতে পারে। তবে খেয়াল করে দেখবেন আমরা খুব ছোটবেলার স্মৃতি মনে রাখতে পারি না । ব্যতিক্রমী ঘটনা ছাড়া আমরা আমাদের প্রথম স্মৃতি যা মনে রাখতে পারি তা সাড়ে তিন বা চার বছর বয়সের পর। অনেকে আবার বড়দের মুখে একই ঘটনা বারবার শুনে কোন ঘটনা ঘটনার দৃশ্য মনে মনে কল্পনা করে নেয় এবং এগুলোকে নিজস্ব স্মৃতি ভাবে কিন্তু এগুলি আসলে পরোক্ষ স্মৃতি। আমরা এখানে ব্যখ্যা করব, আমরা খুব ছোটবেলার স্মৃতি মনে রাখতে পারি না কেন।

আমাদের স্মৃতি দুই রকমের, স্বল্পস্থায়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী। ধরুন কোন ব্যক্তির ফোন নাম্বার আপনি খাতা থেকে দেখে মোবাইলে টাইপ করছেন। টাইপ করার একটু পরেই দেখবেন সেই নাম্বারটা আপনার আর মনে নেই। এটি একটি স্বল্পস্থায়ী স্মৃতি। বারবার যদি সেই একই নাম্বার আপনি মোবাইলে বহুদিন ধরে টাইপ করতে থাকেন, তাহলে একটা সময় পরে নাম্বারটা আপনার মুখস্থ হয়ে যাবে, হয়তো সারা জীবন সেটা আপনার মনে থাকবে। এরকম স্মৃতিকে বলা হয় দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি।

আমরা প্রায়ই খুব ছোটবেলার স্মৃতি মনে করতে পারিনা। মনোবিজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ সিগমুন্ড ফ্রয়েড সর্বপ্রথম শিশুকালীন স্মৃতিভ্রম (childhood amnesia/ infantile amnesia) কথাটির প্রচলন করেন।

কম্পিউটারের স্মৃতি যেমন থাকে তার হার্ডডিস্কে, তেমনি মানুষের স্মৃতি সঞ্চিত থাকে তার মস্তিষ্কে। সেখানে হিপোক্যাম্পাস (hippocampus), অ্যামিগডেলা (amygdela) এবং গুরুমস্তিষ্ক নামে তিন জায়গায় দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি সংরক্ষিত হয়। সমগ্র মস্তিষ্ক কোটি কোটি স্নায়ুকোষ দিয়ে গঠিত, এবং তাদের সুষ্ঠুভাবে কাজ করার জন্য স্নায়ুকোষগুলি একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। সেই সংযোগস্থলগুলিকে বলা হয় স্নায়ুসন্নিধি (synapse)। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, অসংখ্য স্নায়ুকোষ এবং স্নায়ুসন্নিধি একত্রে স্মৃতি সংরক্ষণ করে। 1960 সালে স্নায়ুকোষের দীর্ঘকালীন সক্রিয়তা (longterm potentiation) আবিষ্কারের পর প্রমাণিত হয় যে দুটি স্নায়ুকোষ বারবার একসাথে উদ্দীপ্ত হলে তাদের মধ্যে খুব ভালো সংযোগস্থাপন হয়। অর্থাৎ, ধরুন আপনি বারবার কোন ফোন নাম্বার টাইপ করছেন, তাতে বারবার একই ধরনের স্নায়ুকোষ উদ্দীপ্ত হচ্ছে, এবং তাদের মধ্যে ভালো সংযোগস্থাপন হয়ে সেটি দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি হিসাবে আমাদের মস্তিষ্কে থেকে যাচ্ছে। প্রসঙ্গত সাইকেল বা সাঁতার চালাতে শিখলে আর ভুলি না কেন বিষয়ে জানতে এই লিঙ্কে দেখতে পারেন।

ফ্রয়েডীয় মতবাদ অনুযায়ী আমাদের শিশুকালীন স্মৃতিভ্রমের কারণ হল মনে করতে না পারা। অর্থাৎ আপনার মস্তিষ্কে সেই স্মৃতিটি আছে, অথচ আপনি সেটা মনে করতে পারছেন না। এ যেন খানিকটা এরকম যে আপনি আপনার ঘরে কোথাও একটা চাবি রেখেছেন কিন্তু সেটা খুঁজে পাচ্ছেন না। কিন্তু আধুনিক মতে বলা হয় যে সেই স্মৃতি আপনার মস্তিষ্কে তৈরিই হয়নি। অর্থাৎ বিভিন্ন স্নায়ুকোষের মধ্যে সংযোগস্থাপন সম্পন্নই হয়নি। ছোটবেলায় আমাদের মস্তিষ্কের গঠন সম্পূর্ণ হয় না। জন্মের বেশ কয়েক বছর পর অবধি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলি একে অপরের সাথে স্নায়ুসন্নিধি দ্বারা সংযুক্ত হতে থাকে। হিপোক্যাম্পাস, অ্যামিগডেলা এবং গুরুমস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলিও এই সময় বিকশিত এবং সংযুক্ত হয়। একটি স্মৃতির পিছনে বহু বহু স্নায়ুকোষ এবং তাদের সংযোগকারী স্নায়ুসন্নিধির প্রয়োজন। ছোটবেলার মস্তিষ্কে সেটি অনুপস্থিত বলে আমরা সেই স্মৃতি মনে রাখতে পারিনা।

গবেষণায় দেখা গেছে যে বড় হওয়ার সময় অন্য কেউ যদি বারবার একটা শিশুকে তার ছোটবেলার গল্প করতে থাকে, তবে সেটি পরোক্ষ স্মৃতি হিসাবে সেই শিশুর মস্তিষ্কে থেকে যায়। তখন বড় হয়ে সে ভাবে যে এগুলো তার নিজস্ব স্মৃতি, এবং সেই অন্যজনের বর্ণনা অনুযায়ী সে সেই ঘটনাকে কল্পনা করে নেয়।

  • telegram sobbanglay

তথ্যসূত্র


  1. https://www.bbc.com/
  2. https://www.sciencedirect.com/
  3. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/
  4. Almaraz-Espinoza A, Grider MH. In: Physiology, Long Term Memory. StatPearls Publications, 2020.

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন