সববাংলায়

ব্ল্যাক টাইগার – রবীন্দ্র কৌশিক

পাকিস্তানে চরবৃত্তি করতে গিয়ে সেখানকার করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করে পাকিস্তানেরই সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার মত দুঃসাহসিক কাজ করেছিলেন এক ভারতীয় গুপ্তচর। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে মেজর পদেও উন্নীত হয়েছিলেন তিনি। ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগ ‘র’ (RAW)-এর এজেন্ট হিসেবে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য তিনি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন নিজের সমস্ত ভারতীয় নথি। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। অন্য আরেক দুর্বলচিত্ত ভারতীয় গুপ্তচরের বোকামির ফলে ধরা পড়ে যান তিনি। পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি জেল থেকে পরিবারের উদ্দেশ্যে লেখা শেষ চিঠিতে গভীর যন্ত্রণা থেকে প্রশ্ন রেখেছিলেন তিনি, “দেশের জন্য যাঁরা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁদের জন্য কী এই যন্ত্রণাই প্রাপ্য?” হতভাগ্য এই দুঃসাহসী ভারতীয় গুপ্তচরের নাম রবীন্দ্র কৌশিক (Rabindra Kaushik), ‘ব্ল্যাক টাইগার’ রবীন্দ্র কৌশিক। ভারতের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুপ্তচর হিসেবে তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন অথচ পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি জেলে জীবনের শেষ ষোলো বছর কাটানো সত্ত্বেও জাতীয় স্তরে কোনও স্বীকৃতি মেলেনি তাঁর, কিংবা কোনও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বা পরিষেবাও মেলেনি তাঁর পরিবারের।

মাত্র তেইশ বছর বয়সে ভারতের গুপ্তচর সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং’ (Research and Analysis Wing, RAW)-এর সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেছিলেন রবীন্দ্র কৌশিক। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে মেজর পদেও উন্নীত হয়েছিলেন তিনি। পাকিস্তান থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পাকিস্তান সম্পর্কিত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর তথ্য প্রেরণ করতেন রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংকে। ১৯৭১ সালের ইন্দো-পাক যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে চরবৃত্তির স্বীকৃতি হিসেবে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে ‘ব্ল্যাক টাইগার’ নামে ভূষিত করেন। বলিউডে ‘এক থা টাইগার’ নামে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয় যেখানে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা সলমন খান। রবীন্দ্র কৌশিকের পরিবার দাবি করেছিল যে ছবিটি রবীন্দ্র কৌশিকের জীবনীর আদলেই তৈরি হয়েছে, যদিও ছবিটির পরিচালক এই দাবি মানতে চাননি।

চরবৃত্তির জন্য বহু ছদ্মবেশ ধারণ করতে হয়েছে, নানা সময় মিথ্যা পরিচয়ের আড়ালে থাকতেও হয়েছে রবীন্দ্র কৌশিককে। একসময় কৈশোরকালে অভিনয় করতে ভালবাসতেন তিনি, কে জানত এটাই তাঁর পেশার মূল শর্ত হয়ে দাঁড়াবে? লক্ষ্ণৌতে এক নাট্যোৎসবে একটি নাটকে অভিনয় করে মন জয় করে নিয়েছিলেন কৌশিক আর অভাবিতভাবে সেই অভিনয় দেখেই ‘র’ (RAW)-এর তিন কর্মকর্তা রবীন্দ্র কৌশিককে ভারতের হয়ে চরবৃত্তির প্রস্তাব দেন। আশ্চর্যের বিষয় যে নাটকে তিনি সেদিন অভিনয় করেছিলেন, সেখানেও চিনের গুপ্তচর হওয়ার প্রস্তাবে অস্বীকৃত এক ভারতীয় সেনার চরিত্র ছিল তাঁর। মঞ্চ আর বাস্তবের জীবন যে এভাবে মিলে যাবে তা নিজেও ধারণা করতে পারেননি রবীন্দ্র কৌশিক। চরবৃত্তির মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যোগ দেওয়ার আগে একবারও বুক কাঁপেনি তাঁর। দেশের হয়ে কাজ করার গর্বে গর্বিত ছিল তাঁর মন। পাকিস্তানে যেতে হবে তাঁকে, ভারতের সঙ্গে যে দেশের একেবারে আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক। সেখানে গিয়ে ছদ্মপরিচয়ে থেকে তথ্য প্রেরণ করার মত দুঃসাহসিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সদ্য তারুণ্যে উন্নীত রবীন্দ্র কৌশিক।

১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল রাজস্থানের গঙ্গানগরের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হয় রবীন্দ্র কৌশিকের। কৈশোর থেকেই বিপ্লবীদের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য এক ছুটে বেরিয়ে পড়তেন তিনি। মঞ্চে তাঁর অভিনয় সকলকে তাক লাগিয়ে দিত। বিনোদ খান্নার সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হত সেই সময়। গঙ্গানগরেরই একটি কলেজে বাণিজ্যে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা করছিলেন রবীন্দ্র কৌশিক আর ঠিক সেই সময়েই চরবৃত্তির এই প্রস্তাব আসে যা তাঁর জীবনকে আমূল বদলে দেয়। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বাড়ির কাউকেই সেভাবে কিছু না জানিয়ে দিল্লিতে পাড়ি দেন রবীন্দ্র কৌশিক। নতুন জীবনের রোমাঞ্চকর দিনগুলি হাতছানি দিচ্ছিল তাঁকে। তাঁর বড় হওয়ার সময়ে ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। এদিকে ‘র’-এর প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য টানা দুই বছর দিল্লিতে থাকতে হয় তাঁকে। ১৯৭৩ সালে বি.কম ডিগ্রি পাশ করে দিল্লি পাড়ি দেন রবীন্দ্র কৌশিক। বাড়িতে বলে যান চাকরি করতে যাচ্ছেন, কিন্তু ততদিনে প্রশিক্ষণ নেওয়ার এবং দেশসেবা করার এক অদম্য জেদ চেপে বসেছিল তাঁর মনে। পাঞ্জাবি ভাষায় চোস্ত ছিলেন রবীন্দ্র, কিন্তু পাকিস্তানে কাজ করতে গেলে উর্দু জানা চাই। উর্দু ভাষাও শিখে নিলেন রবীন্দ্র কৌশিক, পড়ে ফেললেন কোরানও, তার সঙ্গে রপ্ত করে নিতে হল তাঁকে বেশ কিছু ইসলামি রীতি-নীতি। এমনকি মুসলমান পুরুষদের মধ্য প্রচলিত ধর্মীয় রীতি হিসেবে ‘খৎনা’ বা ‘মুসলমানি’ও (Circumcision) করতে হয়েছিল রবীন্দ্র কৌশিককে। ১৯৭৫ সাল। পুড়িয়ে দেওয়া হল তাঁর সমস্ত ভারতীয় নথি। তাঁর নতুন পরিচয় নবী আহমেদ শাকির। দুবাই হয়ে পাকিস্তানে চলে এলেন রবীন্দ্র কৌশিক। সঙ্গে ছিল ‘র’-এর বানিয়ে দেওয়া জাল নথি, পাকিস্তানের নাগরিকত্ব পেতেও বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। তাঁর লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া আর তার জন্যেই করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন রবীন্দ্র কৌশিক। এরপর ১৯৭৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কমিশনড অফিসার হিসেবে যোগ দেন রবীন্দ্র কৌশিক। একটার পর একটা সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে যাচ্ছিলেন যত, ঝুঁকিও বাড়ছিল তত। পরিবারের কাউকেই বলা যাবে না তাঁর আসল কাজের ব্যাপারে। অদ্ভুত এক সন্দেহের বাতাবরণ চারদিকে। তবু তার মধ্যেই প্রেম হল আমানতের সঙ্গে। তাঁদের বিবাহের পর এক কন্যাও জন্মায়। কিন্তু সংসারধর্ম পালন রবীন্দ্র কৌশিকের লক্ষ্য ছিল না। পরিবার নিয়ে কিছুদিন ভারতে কাটিয়ে পাকিস্তানে ফিরে আসতেই পদোন্নতির সুসংবাদ পান তিনি। একেবারে মেজর পদে উন্নীত হলেন রবীন্দ্র কৌশিক। চার বছর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন তিনি, ইতিমধ্যে নানা সময় পাকিস্তানি গোয়েন্দাবিভাগ এবং পাকিস্তানি রণকৌশলের নানা গোপন তথ্য ও নথি ভারতে পাঠাতেন রবীন্দ্র কৌশিক, তাও আবার মর্স কোডের মাধ্যমে। অনেকেই বলে থাকেন এই তথ্য পাচারের ফলেই অসংখ্য ভারতীয় সেনার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে ‘ব্ল্যাক টাইগার’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। কিন্তু ঝুঁকির মাত্রা ক্রমেই বাড়ছিল। ১৯৮৩ সালে মাত্র একটি ভুলে সমস্ত গোপনীয়তার পর্দা একটানে খুলে গেল পাকিস্তানি সেনাদের কাছে। ধরা পড়তে হল রবীন্দ্র কৌশিককে।

১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের পক্ষ থেকে ইনায়েত মঁসিহা নামে অপর এক চর দেখা করতে আসেন রবীন্দ্র কৌশিকের সঙ্গে। কিন্তু এই ইনায়েতকে ধরে ফেলে পাকিস্তানি গোয়েন্দা বিভাগ। পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের কাছে রবীন্দ্র কৌশিকের আসল পরিচয় প্রকাশ করে দেন ইনায়েত মঁসিহা। এরপর শিয়ালকোটের এক গুপ্ত ঘাঁটিতে টানা দুই বছর ধরে অকথ্য অত্যাচার চলে তাঁর উপর। এমনকি ১৯৮৫ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের সাজাও দেওয়া হয়। যদিও ভাগ্যক্রমে পাকিস্তানের উচ্চ আদালত এই সাজার পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে রবীন্দ্র কৌশিককে। এরপর কখনও শিয়ালকোট, কখনও কোট লখপত আবার কখনও মিয়ানওয়ালি কারাগারে জীবনের শেষ ১৬ বছর কাটিয়েছেন রবীন্দ্র কৌশিক। জেলে থাকতে থাকতে যক্ষ্মা আর শ্বাসকষ্টও গ্রাস করেছিল তাঁকে। গোপনে পরিবারকে চিঠি লিখতেন তিনি সেই সময়। যন্ত্রণায় ভরা সেই সব চিঠির বয়ানে নিজের ছেলের বেদনাদীর্ণ অবস্থার সংবাদে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে রবীন্দ্রর বাবা জে এন কৌশল মারা যান। পাকিস্তান যখন গণমাধ্যমে ভারতের এই গুপ্তচর ধরা পড়ার ব্যাপারটি প্রকাশ করে, তখন ভারত সরকার তা একবাক্যে খারিজ করে দেয় এবং গোয়েন্দা বিভাগের রীতি অনুযায়ী তাঁদের নথি থেকে রবীন্দ্র কৌশিকের সব তথ্য নষ্ট করে দেওয়া হয়। দেশের সরকারই আর তাঁর নাগরিককে স্বীকার করতে চাইল না। কিন্তু দমে যাননি রবীন্দ্রর মা অমলা দেবী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী, বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণী কিংবা যশোবন্ত সিংকে উদ্দেশ্য করে একের পর এক চিঠি লিখে নিজেদের দুরবস্থা এবং তাঁর ছেলের সুবিচারের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু তাতেও কোনও সুরাহা হয়নি।

২০০১ সালের মুলতানের নিউ সেন্ট্রাল জেলে মৃত্যু হয় রবীন্দ্র কৌশিকের। তাঁর মৃতদেহ কবর দেওয়া হয় সেই জেলের পিছনেই। ভারতেও তাঁর মৃতদেহ নিয়ে আসা হয়নি। যে দেশ তাঁর নাগরিকত্বই স্বীকার করেনি, সেই দেশ কীভাবেই বা তাঁর মৃতদেহ চাইতে পারে!  


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading