সববাংলায়

বাঙালি উদ্যোগপতি ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত ও ঝর্ণা কলম

বিভাগঃ ,

ব্যবসায় বাঙালির আজ খুব একটা সুনাম নেই বরং এক্ষেত্রে তাকে হেয়ই করা হয়। অথচ স্বাধীনতার আগে বেশ অনেকখানি পিছিয়ে গেলে ইতিহাসে যে বাঙালিকে পাওয়া যাবে, তারা রীতিমতো ব্যবসাক্ষেত্রে ব্রিটিশদের টক্কর দিয়েছিলেন এবং এমন সব পণ্য বাজারে এনেছিলেন যা আজও সমান লোকপ্রিয়তার সঙ্গে বিরাজমান। বাঙালির এই ব্যবসায় নামার নেপথ্যে অনেকাংশেই কাজ করেছিল জাতীয়তাবোধ এবং ব্রিটিশ অধ্যুষিত দেশকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার ভাবনা। প্রফুল্লচন্দ্রের বেঙ্গল কেমিক্যাল এক্ষেত্রে বাঙালিকে পথ দেখিয়েছিল বলা যায়। সেই প্রেরণা থেকেই আরও অনেকের পাশাপাশি ফণীন্দ্রনাথ গুপ্তও (Fanindra Nath Gooptu) নেমে পড়েছিলেন কোমর বেঁধে। বিখ্যাত ঝর্ণা কলম নির্মাণ করে বাজারে ছেড়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী তাঁর এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছিলেন। সেই ঝর্ণা কলম আজ বাঙালির আভিজাত্যের এক নিদর্শনস্বরূপ। দেশকে স্বাবলম্বী করে তোলবার মহৎ কর্মকান্ডে ফণীন্দ্রনাথ গুপ্তের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ বিস্মৃতির অতলে এই বাঙালি উদ্যোগপতির নাম আজ প্রায় তলিয়ে গিয়েছে বলা যায়।

ব্রিটিশদের সঙ্গে টক্কর দিতে গেলে যে কেবল বাহুবলে এবং অস্ত্রশস্ত্রে শক্তিশালী হলেই চলবে না, বরং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে পরমুখাপেক্ষিতা ত্যাগ করতে হবে, কিছু চিন্তাশীল ব্যক্তি তা অনুভব করতে পেরেছিলেন এবং তার বাস্তবায়নেও সফলতা অর্জন করেছিলেন। এমন ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথমেই রসায়নের অধ্যাপক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের নাম করতে হয়, যিনি বাঙালিকে ব্যবসা গড়ে তুলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলেন। নির্মাণ করেছিলেন বেঙ্গল কেমিক্যালস এবং তাতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে বাঙালির মনোবল বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই একেরপর এক বাঙালি এসে নানারকম পণ্যের ব্যবসা শুরু করেন। বিদেশী পণ্যের সঙ্গে বাঙালির সেইসব স্বদেশী পণ্য সমানতালে পাল্লা দিয়েছিল। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্বদেশী আন্দোলনে বিদেশী দ্রব্য বর্জনের আহ্বান যখন ওঠে বাঙালি তখন আরও বেশি স্বদেশী দ্রব্য উৎপাদনের প্রতি মনোযোগী হয় এবং নিজেদের ব্যবসা দাঁড় করিয়ে রীতিমতো সফলতা অর্জন করতে থাকে। আমাদের আলোচ্য ফণীন্দ্রনাথ গুপ্তও ঠিক এমনই এক প্রেক্ষাপটে ব্যবসাক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং তাঁর ঝর্ণা কলম (Fountain Pen) রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

কলকাতার বিখ্যাত গুপ্ত পরিবারে এই ফণীন্দ্রনাথ গুপ্তের জন্ম হয়। তাঁর পিতা গোপালচন্দ্র গুপ্ত নিজেও ছিলেন একজন শিল্পপতি, অতএব মোটামুটি আর্থিক স্বচ্ছলতার মধ্যেই তিনি বড় হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর দাদু দ্বারকানাথ গুপ্ত ছিলেন একজন ডাক্তার। দ্বারকানাথ যখন মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন তখন, সেই ১৮৩৬ সালে ভারতের প্রথম মানব ব্যবচ্ছেদে মধুসূদন গুপ্তের সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই মানব ব্যবচ্ছেদের ঘটনাটি তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এমনই প্রগতিশীল সব মানুষের পরিবারে বড় হয়ে উঠেছিলেন ফণীন্দ্রনাথ।

কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক (বি.এ) ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। ঠিক সেই সময়তেই সারা বাংলা জুড়ে স্বদেশী আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। দিকে দিকে ছাত্ররা স্বদেশী প্রচার করছে তখন। বিদেশী দ্রব্য বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছে, বিদেশী পণ্য বিক্রির দোকানের সামনে পিকেটিং-এর আয়োজনে নেতৃত্বও দিচ্ছে তখন ছাত্ররা। তবে ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত সরাসরি এই স্বদেশী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি, কিন্তু তাঁর ভিতরে জাতীয়তাবোধের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। এমন এক গণজাগরণের দিনে দেশের জন্য ভাবনা তাঁর ভিতরেও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। সেই কারণেই দেশকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলায় শিল্পের গুরুত্বকে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ১৯০৮ সালে তিনি বাংলার শিল্পী, সরকারি আমলা, শিক্ষাবিদ এবং চিন্তাবিদদের নিয়ে বাংলার উন্নয়নের জন্য বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ নামে একটি মঞ্চ গঠন করেছিলেন।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের উত্তাল বছরেই মাত্র ২০ বছর বয়সে তরুণ ফণীন্দ্রনাথ তাঁর নিজস্ব কোম্পানি এফএন গুপ্ত অ্যান্ড কোং (F. N. GOOPTU & CO.) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঔপনিবেশিক এই ভারতবর্ষে দেশীয় ফাউন্টেন পেন তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল তাঁর সেই কোম্পানি। পরে দাদাভাই নওরোজির মতো বন্ধুদের দ্বারা অণুপ্রাণিত হয়ে তিনি পেন্সিল তৈরিও শুরু করেছিলেন। প্রথমদিকে তাঁর কোম্পানির অফিসের ঠিকানা ছিল, ৫ নম্বর, মিডলটন স্ট্রীট। তখন তৎকালীন আইসিএস অফিসার এবং চট্টগ্রামের কমিশনার কেসি দে এবং ভারত সরকারের মুদ্রণ ও স্ট্যাম্প নিয়ন্ত্রক এমজে কগসওয়েল তাঁর সততা এবং কাজের নীতি দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিলেন। এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে ফণীন্দ্রনাথের পণ্যটিকে তাঁরা ব্রিটিশ সরকারের কাছে রেফার করেছিল। তারপর সমস্ত প্রমাণপত্র যাচাই করবার পর ব্রিটিশ সরকার গুপ্তর এই কোম্পানির সঙ্গে একটি বার্ষিক চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিল। সেই চুক্তির পর থেকে ফণীন্দ্রনাথের কোম্পানি ব্রিটিশদের সমস্ত ঝর্না কলম-সহ সব স্টেশনারী দ্রব্য সরবরাহ করত। এরপর আর ফণীন্দ্রনাথকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। রমরমিয়ে উঠেছিল তাঁর বাজার। চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছিল ফলে উৎপাদনও সেইসঙ্গে বাড়ছিল পাল্লা দিয়ে। ফণীন্দ্রনাথ বুঝতে পারছিলেন মিডলটন স্ট্রীটের অল্প জায়গায় আর কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং উৎপাদন ইউনিট স্থাপনের জন্য প্রয়োজন আরও জায়গা। সেই কারণে ১৯১০ সালে পূর্ব কলকাতায় ১২ নম্বর বেলেঘাটা রোডে অবস্থিত ছয় বিঘা জমিতে একটি বিরাট কারখানা স্থাপন করেন তিনি। এই জমিটির জন্য তাঁর প্রায় আড়াই লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়েছিল।

ফণীন্দ্রনাথ তাঁর পণ্যের গুণগত মানের উন্নতির জন্য গ্রেট ব্রিটেন থেকে পণ্য তৈরির অত্যাধুনিক নানা যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম আমদানি করতেন। এরমধ্যে আবার ব্রিটিশ সরকার তার প্রতিনিধি জ্যাল সোয়ানকে ফণীন্দ্রনাথের নতুন কারখানা পরিদর্শনের জন্য পাঠিয়েছিল। সমস্ত কারখানাটিকে খু্ঁটিয়ে ভাল করে দেখেছিলেন তিনি এবং যন্ত্রপাতি, উৎপাদন ইউনিট, পণ্যের গুণমান, ব্যবস্থাপনা সবকিছু দেখেই অত্যন্ত আনন্দিত এবং সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। ফলে একটি সদর্থক প্রতিবেদন তিনি জমা দিয়েছিলেন ব্রিটিশ সরকারের কাছে। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা স্টেশনারী জিনিসপত্র হাতের নাগালে পাওয়া ছিল একপ্রকার দুঃসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু এক্ষেত্রে ফণীন্দ্রনাথের একচেটিয়া আধিপত্য তাঁর ব্যবসার ভিতকে মজবুত করে তাঁকে আকাশছোঁয়া সাফল্য এনে দিয়েছিল। তাঁর উৎপাদিত স্টেশনারী আইটেমগুলির ধারেকাছেও আসতে পারত না কোন বিদেশী কোম্পানি।

ফণীন্দ্রনাথ নিজের ব্যবসায় কিন্তু বৈচিত্র্যও এনেছিলেন। ধনী অভিজাত গ্রাহকদের জন্য বিশেষ ধরনের স্টেশনারী আইটেম প্রস্তুত করতে শুরু করেন তিনি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘দ্য পারফেকশন ফাউন্টেন পেন সিরিজ’। এই ঝর্ণা কলমগুলির নিব ১৪ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি হতো এবং এই কলমের বডিটি ছিল মাদার অব পার্লের তৈরি। এছাড়াও একজন আমেরিকান ধাতুবিদ নিয়োগ করার পরে তিনি কলম এবং ইন-ফিলিং মেকানিজমের জন্য নিব তৈরি করেছিলেন।

ঝর্ণা কলমের ঐতিহ্য বহু পুরোনো। বিদেশে বহুদিন থেকেই এই শৌখিন কলমের ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে। তবে ফণীন্দ্রনাথের হাত ধরে এই বঙ্গদেশে দেশীয় ঝর্ণা কলমের একটি বাজার গড়ে ওঠা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই। স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী ১৯২৫ সালের ২৮ আগস্ট ফণীন্দ্রনাথের বেলেঘাটার কারখানা পরিদর্শনে এসে এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে ফণীন্দ্রনাথের ব্যবসায়িক যোগাযোগ থাকলেও আদতে তাঁর অন্তরে তীব্র জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেম জাগ্রত ছিল। তাঁর দেশীয় ঝর্ণা কলম কিন্তু এখানে বিদেশী কোম্পানির ঝর্ণা কলমের বাজারের প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠতে পেরেছিল। তাঁর কলম যেমন ব্রিটিশরা ব্যবহার করত, তেমনই জাতীয়তাবাদী, স্বদেশী আন্দোলনকারীদের কাছেও সেই কলম থাকত। দেশকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার কাজে ফণীন্দ্রনাথের এই অবদানকে খাটো করে দেখলে চলবে না। তাঁর নাম ইতিহাসের বিস্মৃত পাতাতে ধূলিমলিন হয়ে পড়ে রয়েছে ঠিকই, তবে সফল বাঙালি উদ্যোগপতি যাঁরা বাঙালিকে ব্যবসা করবার অদম্য সাহস জুগিয়েছিলেন, ফণীন্দ্রনাথ গুপ্তের নাম নিঃসন্দেহে সেই তালিকার উপরের দিকেই স্থান পাওয়ার যোগ্য।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading