সববাংলায়

ধূমকেতু

বিভাগঃ ,

প্রাচীনকালে মানুষেরা রাতের আকাশে প্রায়ই একটি দীর্ঘ পুচ্ছবিশিষ্ট তারাকে ছুটে আসতে দেখে চমকে উঠত, আকাশের এক দিক থেকে অন্য দিকে ধেয়ে যেত এই লেজওয়ালা তারা। কখনও বা হাজার হাজার তারা খসে পড়া দেখে মোহিত হত মানুষ। পরে আমরা জেনেছি যে এই তারা খসা আসলে উল্কাপাত আর ঐ বিশাল লেজওয়ালা তারা আসলে তারা নয়, বরং ধূমকেতু। বিশ্বে সবথেকে জনপ্রিয় ধূমকেতুটি হল হ্যালির ধূমকেতু (halley’s comet) যা ৭৫-৭৬ বছর অন্তর আকাশে দৃশ্যমান হয়। তবে অন্যান্য ধূমকেতু আরও অনেক বেশি বছর পর পর দেখা যায়। কিন্তু এই ধূমকেতু আসলে কোথা থেকে আসে? কোথায়ই বা মিলিয়ে যায়? এ প্রশ্ন যুগ যুগ ধরে মানুষ ভেবে এসেছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এই মহাবিশ্বে সৌরজগতের মধ্যেকার অসংখ্য অজানা তথ্য উদ্‌ঘাটিত হচ্ছে এবং সেই সঙ্গে গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণু, নক্ষত্র, নীহারিকার পাশাপাশি এই ধূমকেতু সম্পর্কেও অনেক গবেষণা হয়েছে। ধূমকেতু আসলে কী, এর সংগঠন কীভাবে তৈরি, প্রকারভেদই বা কী এই সমস্ত তথ্য বিশদে জেনে নেওয়া যাক।

ধূমকেতুগুলি (Comets) আসলে শিলা, ধূলিকণা আর বরফ দিয়ে নির্মিত এক মহাজাগতিক বস্তু। সর্বোচ্চ দশ মাইল পর্যন্ত চওড়া হতে পারে এই ধূমকেতু যারা সূর্যের অনেক কাছাকাছি থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। যতই তারা সূর্যের কাছে যেতে থাকে, তাদের উত্তাপ বাড়তে থাকে এবং গ্যাস ও ধূলিকণা একত্রিত হয়ে জ্বলতে থাকে এর সামনের দিকে। এই অংশকে ধূমকেতুর মাথা বলা হয় যা কিনা আয়তনের দিক থেকে একটি গ্রহের তুলনায় বড়ও হতে পারে। এই ধূমকেতুর একটি দীর্ঘ পুচ্ছ (Tail) থাকে যা কিনা দৈর্ঘ্যে কয়েক লক্ষ মাইল পর্যন্ত হতে পারে। ধূমকেতুর লেজ থাকে কেন জানতে এই লিঙ্কে দেখতে পারেন। সৌরজগতের একেবারে শেষ সীমানা কুইপার বেল্ট কিংবা উর্ট ক্লাউডে সম্ভবত আরও কোটি কোটি ধূমকেতু এভাবেই সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান। সূর্যের কাছাকাছি যাওয়া মাত্র এই ধূমকেতুগুলি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং গ্যাস নির্গত করতে শুরু করে, এই প্রক্রিয়াকে ‘আউটগ্যাসিং’ (Outgasing) বলা হয়। কোনওরকম টেলিস্কোপের সাহায্য ছাড়াই পৃথিবী থেকে আকাশে ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

গ্রিক শব্দ ‘কমেট’-এর অর্থ হল লম্বা চুল বিশিষ্ট মাথা। সম্ভবত এই শব্দ থেকেই ইংরেজিতে Comet শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। একটি ধূমকেতুর গঠনগত দিক থেকে অনেকগুলি অংশ রয়েছে, যেমন – নিউক্লিয়াস (Nucleus), কোমা (Coma), বো-শক (Bow-Shock), টেইলস (Tails) ও জেটস (Jets)।

  • নিউক্লিয়াস (Nucleus): ধূমকেতুর প্রধান ও ঘনীভূত অংশটি ‘নিউক্লিয়াস’ নামে পরিচিত। এই নিউক্লিয়াস গঠিত হয়েছে শিলা, ধূলিকণা, হিমায়িত কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, মিথেন এবং অ্যামোনিয়ার সংমিশ্রণে। সাধারণভাবে অনেকেই এই ধূমকেতুকে নোংরা বরফপিণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, অন্যদিকে যে ধূমকেতুতে ধূলিকণার পরিমাণ তুলনায় বেশি তাকে বলা হয় ‘হিমায়িত ময়লাপিণ্ড’ (Icy Dirtball)। এই নিউক্লিয়াসের পৃষ্ঠতল সাধারণত শুষ্ক, ধূলিময়, পাথুরে ও এবড়ো-খেবড়ো হয়ে থাকে। উপরিউক্ত গ্যাসগুলি ছাড়াও এই অংশে মিথানল, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, ইথানল, ফরম্যালডিহাইড ইত্যাদি জৈব যৌগও উপস্থিত থাকে। এখনও পর্যন্ত দেখা গেছে ধূমকেতুর এই নিউক্লিয়াস অংশের ব্যাসার্ধ হয় সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার।
  • কোমা (Coma) : ধূলিকণা ও গ্যাসের প্রবাহ ধূমকেতুর চারপাশে একটি বিশাল ও অত্যন্ত ক্ষীণ বায়ুমণ্ডল তৈরি করে যাকে বিজ্ঞানীরা ‘কোমা’ বলে চিহ্নিত করেছেন। সূর্যের বিকিরণ চাপ ও সৌর বায়ুর প্রভাবে এই কোমা থেকেই দীর্ঘ পুচ্ছ তৈরি হয় যা সূর্যের বিপরীতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। সাধারণভাবে জল ও ধূলিকণা দিয়ে তৈরি হয় এই কোমা অংশটি। নিউক্লিয়াসের ৯০ শতাংশ উদ্বায়ী পদার্থ মিশে এখানে জল তৈরি করে। জলের যে উৎসমূলক H2O অণু তা আলোক-ধ্বংসের (Photo-Disociation) মাধ্যমে বিনষ্ট হয়। ধূমকেতুর কোমা এবং পুচ্ছ দুটি অংশই সূর্যালোকে দৃশ্যমান হয়। মূলত এর মধ্যে থাকা ধূলিকণা সূর্যালোককে প্রতিফলিত করে এবং সেই সময় গ্যাসগুলি আয়নিত হয়ে আলোক উৎপন্ন করে।
  • বো-শক (Bow-Shock) : সৌরবায়ু আর ধূমকেতুর আয়নোস্ফিয়ারের সংস্পর্শে ও মিথস্ক্রিয়ায় এই ‘বো-শক’ অংশটি তৈরি হয়। কোমা অংশে গ্যাসের আয়নীভবনের ফলেই এই ঘটনা ঘটে থাকে। ধূমকেতুগুলি যত সূর্যের কাছাকাছি আসতে থাকে, ততই আউটগ্যাসিং হার বাড়তে থাকে এবং তার ফলে কোমা বিস্তৃত হতে থাকে। সেই সঙ্গে সূর্যালোকের প্রভাবে কোমার মধ্যস্থ গ্যাসের আয়নীভবন ঘটে এবং এই আয়নিত কোমার মধ্য দিয়ে সৌরবায়ু প্রবাহিত হওয়ার সময়েই বো-শক উৎপন্ন হয়।
  • পুচ্ছ (Tails): সৌরজগতের মধ্যে সূর্যের কাছাকাছি আসার সময় সৌর বিকিরণের প্রভাবে ধূমকেতুর মধ্যস্থ উদ্বায়ী পদার্থগুলি বাষ্পীভূত হয় এবং নিউক্লিয়াস থেকে একটি ধূলিকণার প্রবাহ শুরু হয়। ধূলিকণার স্রোত এবং গ্যাসের স্রোত উভয়েই একটি করে পৃথক পুচ্ছ গঠন করে। এই পুচ্ছও আবার দুই ধরনের হয়ে থাকে – টাইপ ১ ও টাইপ ২। একটি হল ধূলিকণার পুচ্ছ আর অন্যটি গ্যাসীয় পুচ্ছ। সাধারণভাবে ধূমকেতুর কক্ষপথের সঙ্গে এই পুচ্ছগুলি সামান্য কৌণিক অবস্থানে বেঁকে থাকে। এই গ্যাসীয় পুচ্ছগুলি সবসময় সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে।
  • জেটস (Jets):  ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসে অসম তাপের কারণে উৎপন্ন নতুন গ্যাসগুলি নিউক্লিয়াসের কোনও একটি দূর্বল অংশকে বিদীর্ণ করে নির্গত হতে থাকে এবং গ্যাস ও ধূলিকণার এই প্রবাহের ফলে নিউক্লিয়াসের ঘূর্ণন হয় কিংবা সেটি বিভাজিতও হতে পারে। এই প্রবাহকেই ‘জেটস’ বলা হয়।

১৯৮৬ সালে পৃথিবীর আকাশে দেখা মিলেছিল হ্যালির ধূমকেতুর যা আবার দেখা যাবে ২০৬১ সালে। ২০০১ সালে নাসার ‘ডিপ স্পেস ১’ নামক মহাকাশযান বরেলি (Borrelley) ধূমকেতুর প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নিউক্লিয়াসের ছবি তুলতে সক্ষম হয়। ২০০৬ সালে নাসার স্টারডাস্ট অভিযানের ফলে ওয়াইল্ড ২ নামক ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসের কাছ থেকে কিছু পদার্থ আর মহাজাগতিক ধূলিকণা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরে আসে। এই নমুনাগুলি থেকেই সূর্যের কাছাকাছি অঞ্চলে কী ধরনের পদার্থ উৎপন্ন হতে পারে, তার একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এর পরেও আরও বহু মহাকাশযান ধূমকেতুর ছবি তুলেছে এবং বিভিন্ন ধূমকেতুর থেকে প্রাপ্ত নমুনা নিয়ে গবেষণা চালিয়েছে যা থেকে ধূমকেতু সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। পৃথিবী সৃষ্টির প্রারম্ভলগ্নে বহু ধূমকেতু পৃথিবীতে এসে আছড়ে পড়েছিল বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান। বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে প্রায় ৪০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে প্রথম ধূমকেতু এসে আছড়ে পড়ে এবং এর ফলেই হয়ত পৃথিবীতে জলের উৎস তৈরি হয়। ধূমকেতুর মধ্যেকার পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক জৈব যৌগের উপস্থিতি থেকে বিজ্ঞানীরা একে প্রাণের পূর্বসূরি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এই ধূমকেতুগুলি আসলে সৌরজগতের একেবারে প্রারম্ভকালীন অবশিষ্টাংশ যা ৪৬০ কোটি বছর আগে প্রথম তৈরি হয়েছিল। ১৯৫১ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেরার্ড কুইপারের তত্ত্ব অনুসারে নেপচুনের বাইরে বরফের একটি চাকতি রয়েছে যেখানে অসংখ্য ধূমকেতু সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে প্রতিনিয়ত। এই হিমায়িত বস্তুপিণ্ডগুলি মাঝেমধ্যে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে সূর্যের দিকে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে আসে। এই ধূমকেতুর কক্ষপথের পরিধির উপর ভিত্তি করে একে দুভাগে ভাগ করা হয়েছে –

  • স্বল্প পর্যায়ের ধূমকেতু (Short Period)
  • দীর্ঘ পর্যায়ের ধূমকেতু (Long Period)

সাধারণভাবে যে সকল ধূমকেতুর সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় লাগে ২০০ বছরের কম, তাদের স্বল্প পর্যায়ের ধূমকেতু বলা হয়। অনেক সময়ই এই ধূমকেতু দৃশ্যমান হওয়ার সময়কাল নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু অন্যদিকে দীর্ঘকালীন ধূমকেতু কখন দৃশ্যমান হবে তা একেবারেই অনুধাবন করা যায় না। বিজ্ঞানীরা বলছেন এই ধরনের ধূমকেতুগুলি আসে সূর্য থেকে প্রায় ১০ হাজার অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল একক দূরবর্তী উর্ট ক্লাউড থেকে। দূরত্বের হিসেবে এটি আসলে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্বের ১০ হাজার গুণ। এই ধরনের ধূমকেতুগুলি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ৩ কোটি বছর সময় নেয়। বেশিরভাগ ধূমকেতুই সূর্য থেকে একটি নিরাপদ দূরত্বে প্রদক্ষিণ করে। হ্যালির ধূমকেতু থেকে সূর্যের দূরত্ব ৮ কোটি ৯০ লক্ষ কিলোমিটার। আবার কিছু কিছু ধূমকেতুকে বিজ্ঞানীরা ‘সানগ্রাজার’ (Sungrazers) বলছেন যেগুলি সোজা সূর্যে এসে ধ্বংস হয় কিংবা সূর্যের এত কাছে চলে আসে যার ফলে তা বিচ্ছিন্ন হয় ও বাষ্পীভূত হয়ে যায়।

এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা সমগ্র সৌরজগতে প্রায় ৩৭৪৩টি ধূমকেতুর সন্ধান পেয়েছেন। কিন্তু এটাই শেষ নয়, কুপার বেল্ট পেরিয়ে আরও আরও দূরে অসংখ্য ধূমকেতুর অবস্থান নিয়ে নিরন্তর গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। এদের মধ্যে কেবলমাত্র হ্যালির ধূমকেতুর কথাই আমরা বেশি জানি। ১৯৮৬ সালের পর আবার তার দেখা মিলবে ২০৬১ সালে। তার মধ্যে পৃথিবী হয়ত আমূল বদলে যাবে, মানব জাতি আদৌ টিকে থাকবে কিনা তাও আমরা জানি না। কিন্তু মহাবিশ্বের এই অমোঘ নিয়ম বদলাবে না। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কখনও থেমে থাকে না।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading