সববাংলায়

কালনার ১০৮ শিবমন্দির

বিভাগঃ ,

বলা হয়ে থাকে সারা ভারতবর্ষে মাত্র দুটি জায়গাতেই ১০৮টি শিবমন্দির রয়েছে এবং সেই দুটি জায়গাই পূর্ব বর্ধমানে অবস্থিত। সেই দুটি জায়গার মধ্যে পূর্ব বর্ধমানের অম্বিকা কালনায় অবস্থিত কালনার ১০৮ শিবমন্দির সবচেয়ে জনপ্রিয়। পূর্ব বর্ধমানের ভাগীরথী নদী তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত এই ১০৮টি শিবমন্দিরের ঐতিহাসিক মূল্য অনস্বীকার্য। কালনা রাজবাড়ি মাঠের কাছকাছি ঠাকুরপাড়া অঞ্চলে মন্দিরটি অবস্থিত। ভারতে যত শিবমন্দির আছে তার অধিকাংশ জায়গাতেই সাধারণত কালো শিবলিঙ্গ দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু অম্বিকা কালনার এই মন্দিরে কালো শিবলিঙ্গের পাশাপাশি সাদা শিবলিঙ্গও দেখতে পাওয়া যায়। কালনার ১০৮ শিবমন্দির নবকৈলাশ নামেও পরিচিত। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তের দল সারাবছর ধরেই এই মন্দিরে এসে ভিড় জমায়।

কালনার শিবমন্দিরকে ঘিরে বহু বিশ্বাস বা ধারণা প্রচলিত রয়েছে। প্রায় দুশো বছর অতিক্রম করে ফেলা এই প্রাচীন মন্দিরের ভিতরের প্রাঙ্গনে একটি বিরাট কূপ রয়েছে। মন্দিরটির গঠন যেহেতু বৃত্তাকার, এবং ভিতরের মন্দির-বৃত্তের মাঝখানে যেহেতু কূপটি অবস্থিত, তাই অনেকে মনে করেন কূপটিকে কেন্দ্রে খনন করা হয়েছিল বড় কম্পাস বসিয়ে যাতে জ্যামিতিকভাবে সঠিক বৃত্তাকারে মন্দিরগুলি নির্মান করা যায়। আবার কারও মতে, কেবলমাত্র মন্দিরে জলের ব্যবহারের জন্যই এই কূপ খনন করা হয়েছিল। তবে এর মধ্যে আসল কারণ কোনটি তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। মন্দিরের সংখ্যাকে কেন্দ্র করেও একটি কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। মন্দিরের শিলালিপিতে ‘নবাধিকশত’ শব্দটি খোদিত রয়েছে। এই শব্দ থেকে অনেকেই মনে করেন আসলে ১০৮টি নয়, এখানে ১০৯টি শিবমন্দির রয়েছে। ১০৮টি শিবমন্দিরের বৃত্তের বাইরে পশ্চিম দিকে রাস্তার ধারে যে জলেশ্বর নামের পঞ্চরত্ন শিবমন্দিরটি রয়েছে, তাঁদের ধারণা অনুসারে সেটিকে ১০৯তম মন্দির ধরা হয়। এর একটি ব্যাখাও দিয়েছিলেন গবেষক যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী। তাঁর মতে, রূদ্রাক্ষের জপমালায় ১০৮টি বীজ থাকলেও তার কেন্দ্রে মেরুস্বরূপ একটি বড় আকারের বীজ থাকে। সেই কারণেই এখানে ১০৯টি মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে বলে তাঁর অভিমত। তবে এই জল্পনা এখানেই শেষ হয়ে যায় না। মূল মন্দিরের পূর্বদিকে রাস্তার পাশে রত্নেশ্বর নামে আরও একটি পঞ্চরত্ন শিবমন্দির রয়েছে। ফলে হিসেবমতো মন্দিরের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১০। এই ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, নবশতাধিক-এর অর্থ তো ১০৯টির বেশি, তাই মন্দিরের সংখ্যা যে ১১০ হবে সেটিই স্বাভাবিক।

কালনার ১০৮ শিবমন্দির বা নবকৈলাশ মন্দিরের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে ১৮০৯ সালে বর্ধমানের মহারাজা তেজ বাহাদুর এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। কথিত রয়েছে যে, বিষ্ণুপুরের রাজকীয় সম্পত্তির হস্তান্তর এবং মালিকানা লাভের আনন্দ উদযাপনের জন্য এই রাজা এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। আবার কোন কোন মতে, ১০৮টি জপমালা নিয়ে শিবের ধ্যান করবার সময়ে নাকি ১০৮টি শিবমন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা রাজার মাথায় এসেছিল। একটা সময় বারো জন পুরোহিত এই গোটা মন্দিরের পূজার দায়িত্বে ছিলেন। প্রত্যেক পুরোহিত নয়টি করে মন্দিরের পূজা করতেন। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব রয়েছে বলে বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া এই মন্দিরটির তত্ত্বাবধান করে।

এই শিবমন্দিরের স্থাপত্যশৈলীটি বিস্ময়কর এবং একই সঙ্গে খুবই নান্দনিক ও আকর্ষণীয়। কালনার ১০৮ শিবমন্দির মোট দুটি বৃত্তের নির্মিত। বাইরের দিকের মন্দির-বৃত্তে রয়েছে মোট ৭৪টি মন্দির এবং ভিতরের মন্দির-বৃত্তে রয়েছে ৩৪টি মন্দির৷ বলা হয়ে থাকে যে একেকটি মন্দির একেকটি পুঁতির অক্ষমালার প্রতিনিধিত্ব করে। বাইরের বৃত্তটির পরিধি ৭১০ ফুট এবং ভিতরের বৃত্তের পরিধি প্রায় ৩৩৬ ফুট। প্রতিটি বৃত্তে দুটি করে দরজা রয়েছে। বাইরের অর্থাৎ প্রথম বৃত্তে উত্তর ও দক্ষিণদিকে একটি করে দরজা রয়েছে এবং ভিতরের বৃত্তে একটি দরজা পূর্বে এবং অন্যটি রয়েছে পশ্চিমদিকে। বাংলার আটচালা শিল্পরীতি মেনে একেকটি মন্দির নির্মিত হয়েছে। মন্দিরগুলি অল্প উঁচু ভিত্তির উপর অবস্থিত। একেকটি মন্দির পরস্পরের সঙ্গে একেবারে সংলগ্ন অবস্থায় রয়েছে। মন্দিরগুলির উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ৯.৫ ফুট। মন্দিরগাত্রে রামায়ণ-মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনা, শিকারের বিভিন্ন দৃশ্য ও কাহিনী নিখুঁতভাবে খোদিত রয়েছে। ভিতরের মন্দির বৃত্তের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে একটি জলের কূপ। অনেকেই বলেন এই কূপের জল মন্দিরের কাজে ব্যবহার করার জন্য এটি খনন করা হয়েছিল, কেউ বলেন সঠিক বৃত্ত নির্মাণের জন্য এই কূপটিকে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল।

সাধারণত দেশের বেশিরভাগ শিবমন্দিরেই কালো রঙের শিবলিঙ্গ দেখা যায়। কিন্তু কালনার এই ১০৮ শিবমন্দিরে কালো এবং সাদা উভয় রঙের লিঙ্গের সমাহার লক্ষ করা যায়। মোট ৭১টি সাদা এবং ৩৭টি কালো শিবলিঙ্গ রয়েছে এখানে। বাইরের বৃত্তের মন্দিরগুলিতে পর্যায়ক্রমে একটি সাদা এবং একটি কালো শিবলিঙ্গ রয়েছে এবং ভিতরের বৃত্তের সমস্ত মন্দিরেরই রয়েছে সাদা শিবলিঙ্গ। গবেষকেরা এই ধরনের সজ্জার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখা দিয়েছেন। তাঁদের মতে বহির্জগত, অর্থাৎ যে-জগতে আমরা বসবাস করি সেখানে পাপ-পূণ্য দুয়েরই একত্রে অবস্থান, সেই কারণে সাদা এবং কালো উভয়প্রকার শিবলিঙ্গই বাইরের বৃত্তে রয়েছে। কালোকে এখানে ভোগের, পাপের, অপরাধের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আবার অন্যমতে কালোকে রূদ্ররূপের প্রতীক বলেও মনে করা হয়। অন্যদিকে সাদা রঙ শান্তি, পবিত্রতার প্রতীক, তাই ভিতরের সবকটি সাদা শিবলিঙ্গই আসলে ভগবান শিবের কাছে প্রার্থনার পর আমাদের অর্জিত অভ্যন্তরীণ বিশুদ্ধতাকেই বোঝায়।এখানে উল্লেখ্য যে, বাইরের বৃত্তের শিবলিঙ্গগুলির তুলনায় ভিতরের বৃত্তের শিবলিঙ্গগুলি আকারে ছোট। সবকটি শিবলিঙ্গের ওপরেই যে গৌরীপট্টগুলি রয়েছে তা উত্তরমুখী, কারণ পুরাণ মতে শিবের পত্নী গৌরীর পিতৃগহ উত্তরদিকে অবস্থিত। বিবাহের পর মেয়েদের মন বাপের বাড়ির জন্য উতলা থাকে বলেই  গৌরীপট্টগুলি উত্তরমুখী।

কালনার ১০৮ শিবমন্দিরে বিশেষ বিশেষ উৎসব খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়ে থাকে। এখানকার যে-উৎসবটির কথা মূলত বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় তা হল মহাশিবরাত্রি। সাধারণত ফাল্গুন মাসে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের দিকে এই উৎসব উদযাপিত হয়। প্রতিবছর শিবরাত্রি উপলক্ষে দারুণ মনোমুগ্ধকর সাজে সেজে ওঠে এই মন্দির। সারা পশ্চিমবঙ্গ এমনকি ভারতেরও বিভিন্ন জায়গা থেকে এসময় ভক্তের দল এসে ভিড় জমায়। বাবা মহাদেবের মাথায় জল ঢেলে ভক্তেরা ব্রত পালন করে থাকেন। শিবরাত্রি উপলক্ষে সাতদিনব্যাপী বিরাট মেলা হয় মন্দির এবং তার পাশ্ববর্তী এলাকায়। এছাড়াও অন্যান্য পূজার দিনেও এখানে অনেক ভিড় হয়। ভক্তেরা বিশ্বাস করে এই মন্দিরে মানত করলে সকলেরই সেই মানত পূরণ হয়। সেই কারণেই প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ নানারকম মনস্কামনা নিয়ে এখানে ভিড় জমান। সারা বছর ধরেই প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বেলা ১২টা অবধি এবং বিকাল ৪টে থেকে রাত ৯টা অবধি খোলা থাকে এই মন্দির।

শুধুমাত্র ধর্মীয় স্থান হিসেবেই নয়, পর্যটন স্থান হিসেবেও কালনার ১০৮ শিবমন্দির খুবই জনপ্রিয়। কালনার ১০৮ শিবমন্দির মন্দির ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে। পাশাপাশি বর্ধমানের ১০৮ শিব মন্দির ভ্রমণের তথ্য জানতে পড়ুন এখানে


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading