পশ্চিমবঙ্গের প্রসিদ্ধ তীর্থস্থানগুলির মধ্যে অন্যতম হল শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের সাধন ক্ষেত্র দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির। আর দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণীর কথা বললেই যাঁর কথা মনে পড়ে তিনি হলেন দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়া। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের অদূরেই উত্তর কলকাতায় গড়ে উঠেছে মা আদ্যার পীঠস্থান আদ্যাপীঠ মন্দির (Adyapeath Mandir)। এখানে দেবী কালীই মা আদ্যা রূপে পূজিতা হন। যদিও আদ্যাপীঠ মন্দির কোনও শক্তিপীঠ নয় তবুও শাক্ত ধর্মাবলম্বীদের জন্য এই মন্দির বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই মন্দিরের নির্মল ও শান্ত পরিবেশ ভক্তদের আধ্যাত্মিক ভাবনায় নিমজ্জিত করে। আদ্যাপীঠ মন্দিরে রয়েছে রাধাকৃষ্ণ, আদ্যা মা ও রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ধ্যানরত মূর্তি।
আদ্যাপীঠ মন্দির গড়ে ওঠার কাহিনি অলৌকিকতায় ভরা। শ্রী রামকৃষ্ণদেবকে গুরু হিসেবে মানতেন অন্নদা ঠাকুর। তাঁর পৈত্রিক নাম ছিল অন্নদাচরণ ভট্টাচার্য। বর্তমান বাংলাদেশে ছিল তাঁদের আদি নিবাস। তিনি কবিরাজি পড়ার জন্য কলকাতায় আসেন, ১৩২১ বঙ্গাব্দে কবিরাজি পাশ করেন এবং কবিরাজির একটি দোকান খোলেন। অন্নদা ঠাকুর মাঝে মাঝেই স্বপ্ন ও বিভিন্ন অলীক জিনিস দেখতে পেতেন। রামকৃষ্ণদেবের আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও অনুভব তাঁকে মন্ত্রমুগ্ধ করে। এরপর অন্নদাচরণ ভট্টাচার্য সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেন। কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দে তাঁকে স্বপ্নেই দীক্ষা দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মৃত্যু হয় ১২৯৩ বঙ্গাব্দে।
১৩২১ সালে এই রকমই একদিন স্বপ্নে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে ইডেন গার্ডেনের কাছে নারকেল ও পাকুড় গাছের পাশের এক ঝিলের মধ্যে থেকে কালী মূর্তি নিয়ে আসার আদেশ দেন। অন্নদা ঠাকুর ও তাঁর তিন সঙ্গী সেই নির্দেশ মতো ওই স্থানে গেলে সত্যি সেখানে একটি ১৮ ইঞ্চির কষ্টি পাথরের অক্ষত কালী মূর্তি খুঁজে পান। দিনটি ছিল চৈত্র মাসের রামনবমীর শুভ তিথি। ওই মূর্তি নিয়ে এসে অন্নদা ঠাকুর নিজের বংশের প্রথাগত নিয়ম অনুসারে পূজা শুরু করেন। সেদিন রাতে স্বপ্নে ওই কালী মূর্তিটি আদেশ দেন যে মূর্তিটিকে দশমী তিথিতে মাঝ গঙ্গায় বিসর্জন দিতে হবে। প্রথমে তিনি আতঙ্কিত হলেও দেবী তাঁকে আশ্বস্ত করেন—বিসর্জন একান্ত কর্তব্য, তবে পরবর্তীতে প্রতিমূর্তি তৈরি করে পূজা চালিয়ে যেতে হবে।
এমনকি দেবী এও বলেন যে শুধু শাস্ত্রানুযায়ী পূজা নয় ‘মা খাও, মা পড়ো’ এমন সহজ, সরল ভাষাতেও তাঁর আরাধনা করা যাবে। এছাড়া নিজের ভোগ্যবস্তুও ভক্তরা ভালবেসে মাকে অর্পণ করতে পারবে বলে দেবী জানান। শুধু একটি স্থানে নয় বিভিন্ন স্থানে পূজা পাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন মা আদ্যা। এছাড়া দেবী নিজে অন্নদা ঠাকুরকে সংস্কৃত আদ্যাস্তোত্রও প্রদান করেন। এখনও পর্যন্ত আদ্যাপীঠ মন্দিরে দেবী আদ্যা মায়ের পূজার সময় এই মন্ত্র পাঠ করা হয়। এছাড়া অনেকে বিশ্বাস করে যে, ভক্তরা যদি এই মন্ত্র পাঠ করে তাতে মা অত্যন্ত খুশি হন এবং ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। দেবী আদ্যার সেই আদেশ পাওয়ার পর অন্নদা ঠাকুর মাঝ গঙ্গায় ওই মূর্তি বিসর্জন দেন। জনশ্রুতি আছে যে জলের নীচে এখনও ওই স্থানেই আদ্যা মায়ের আসল মূর্তিটি রয়েছে। বিসর্জন দেওয়ার আগে ওই মূর্তিটির ছবি তুলে রাখা হয়েছিল। এরপরে ওই মূর্তিটির ছবির অনুকরণেই নতুন মূর্তি তৈরি করে আদ্যাপীঠ মন্দিরে পূজার বন্দোবস্ত করা হয়। আর দেবীর ছবি বিক্রি করে অন্নদা ঠাকুর মা আদ্যার পূজা নানা জায়গায় প্রচলন করার ব্যবস্থাও করেন।
মন্দির চত্বরের লিপি থেকে জানা যায় যে, রামকৃষ্ণদেবের স্বপ্নাদেশে ১৩২১ বঙ্গাব্দে বাসন্তী নবমীর দিন শ্রী শ্রী আদ্যামূর্তি পাওয়ার পর ১৩২৫ বঙ্গাব্দের ঝুলন পূর্ণিমায় আদ্যাপীঠ মন্দির প্রতিষ্ঠার স্বপ্নাদেশ পেয়ে অন্নদা ঠাকুর ১৩২৮ বঙ্গাব্দে আদ্যাপীঠ নির্মাণ করেন। অন্নদা ঠাকুরের মৃত্যুর পর তাঁর ভক্তবৃন্দ নতুন মন্দিরটি স্থাপন করে ১৩৭৩ বঙ্গাব্দের মকরসংক্রান্তি তিথিতে।
প্রায় দশ লক্ষ টাকা খরচ করে আদ্যাপীঠের নতুন মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছিল। আদ্যাপীঠের এই প্রধান মন্দিরের স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও প্রতীকের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রমী ভাবনা লক্ষ করা যায়। সুন্দর, শুভ্র, কারুকার্যখচিত শ্বেতপাথরের এই মন্দিরটিতে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর অসাধারণ নিদর্শন রয়েছে। আদ্যাপীঠ মন্দির কোনও একক মন্দির নয় বরং তা আসলে তিনটি মন্দিরের সম্বিলিত রূপ। বাইরে থেকে মনে হয় তিনটি আলাদা মন্দির। কিন্তু ভিতরে তা এক ও অভিন্ন। এছাড়া সামনে থেকে মন্দিরের চূড়ার তিনটি ধাপও দেখতে পাওয়া যায়। মন্দিরের চূড়ায় শিবের ত্রিশূল, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের চাঁদ ও তারা, খ্রিষ্টধর্মের ক্রুশ, বৌদ্ধধর্মের পাখার প্রতীক একত্রে রয়েছে। মূল মন্দিরটি ১০ কাঠা জমির উপর তৈরি করা হয়েছে। মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ৯৬ ফুট।
অন্নদা ঠাকুর যে মূর্তিটি ইডেন গার্ডেনের কাছ থেকে পেয়েছিলেন তা ছিল ১৮ ইঞ্চির কষ্টি পাথরের কালো আদ্যামায়ের মূর্তি, চোখ দুটি ঝলমলে রত্নখচিত। কলকাতার জাদুঘরের তিনজন গবেষক পরীক্ষা করে জানান যে ওই মূর্তিটি বৌদ্ধযুগে নির্মাণ করা হয়েছিল। তারা এই মূর্তি অন্নদা ঠাকুরের থেকে কিনে নিতে চেয়েছিল, কিন্ত তিনি রাজি হননি। এছাড়া এক সাধু অন্নদা ঠাকুরকে বলেন যে প্রাচীনকালের গয়া জেলায় এই মূর্তিটির উৎপত্তি হয়েছে। আদ্যাপীঠ মন্দিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল যে, এই মন্দিরে রাধাকৃষ্ণ ও মা কালীর জন্য আলাদা কোনও মন্দির নেই বরং রাধাকৃষ্ণ, মা আদ্যা ও রামকৃষ্ণদেব একই মন্দিরে একইসাথে পূজিত হন। মূল মন্দিরের ভিতরে রয়েছে মোট তিনটি বেদী। একেবারে নীচের বেদীতে রয়েছে শ্রী রামকৃষ্ণদেবের মূর্তি, যার নীচে ‘গুরু’ শব্দটি লেখা আছে। তার উপরের বেদীতে রয়েছে মূল আদ্যামায়ের মূর্তির প্রতিমূর্তি। তাঁর কাছে ‘জ্ঞান’ ও ‘কর্ম’ লেখা রয়েছে। আদ্যা মায়ের মূর্তিটি অষ্টধাতু দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। আর তাঁর উপরের বেদীতে আছে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি। এই মূর্তি ‘ওঁ’ দ্বারা বেষ্টন করা আছে এবং এই মূর্তির নীচের দিকে লেখা আছে ‘প্রেম’। এই মন্দিরে রাধাকৃষ্ণ ও মা কালীর পুজোর মধ্যে দিয়ে হিন্দুধর্মের বৈষ্ণব ও শাক্ত ধর্মকে মিলে যেতে দেখা যায়।
এই মন্দিরে এসে কোনও দর্শনার্থীই মূল মন্দিরে (গর্ভগৃহে) প্রবেশ করতে পায় না। নাটমন্দির থেকেই তাদের দেবীর দিব্যমূর্তি দর্শন করতে হয়। কথিত আছে যে বারো বছরের মধ্যে আদ্যাপীঠ মন্দির নির্মাণ করার নির্দেশ পান অন্নদা ঠাকুর কিন্তু মন্দিরের কাজ শেষ হতে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর সময় লেগে যায়। এই মন্দিরের বিশাল দরজা এমনভাবেই নির্মাণ করা হয় যে মন্দিরের দরজা খুললেই নাটমন্দির থেকে ভক্তরা সরাসরি মায়ের দর্শন পায়। এছাড়া এখানে রয়েছে মহাকালের মন্দির, যুগল মন্দির, জগন্নাথদেবের মন্দির, দুর্গা মন্দির, রামকৃষ্ণ সংঘ মন্দির, অন্নদা ঠাকুরের বাড়ি ও একটি গোশালা। এগুলি ছাড়াও রয়েছে প্রার্থনা কক্ষ, ভোগ মন্দির ইত্যাদি। তাছাড়া মন্দির প্রাঙ্গণেই রয়েছে অনাথ, গৃহহীন মানুষদের জন্য আশ্রম ও দাতব্য চিকিৎসালয়।
আদ্যাপীঠ মন্দির সারা বছর খোলা থাকে। তবে মূল মন্দিরটি দিনে তিনবার বন্ধ হয়। আদ্যাপীঠ মন্দিরে সারা বছর নির্দিষ্ট সময়ে পূজা হলেও বাসন্তী নবমী, পৌষসংক্রান্তি, রামনবমী, ঝুলন পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা, দুর্গাপূজা, দীপাবলি, কালীপূজায় বিশেষ পূজার ব্যবস্থা করা হয়। কুমারী পূজা সাধারণত দুর্গাপূজার সময় হলেও এই মন্দিরে রামনবমীতে কুমারী পূজার ব্যবস্থা করা হয় ও বহু কুমারকে ভোজন করানো হয়। এছাড়া বছরের বাহান্ন দিন নানা শুভ তিথি উপলক্ষে প্রচুর লোকের সমাগম হয় এই মন্দিরে। বিভিন্ন আলোয় সেজে ওঠে আদ্যাপীঠ মন্দির। এছাড়া এইদিনে বিশেষ ভোগের ব্যবস্থাও করা হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান