ইতিহাস

আশা ভোঁসলে

আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle) একজন বিখ্যাত ভারতীয় মারাঠি গায়িকা যিনি মূলত বিখ্যাত হয়ে আছেন হিন্দি চলচ্চিত্রে নেপথ্য সঙ্গীত গাওয়ার জন্য। সম্পর্কে আরেক প্রবাদ প্রতিম গায়িকা লতা মঙ্গেশকরের বোন হন তিনি। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের বিচারে তিনি সঙ্গীতের ইতিহাসে সর্বাধিক গান (প্রায় বারো হাজারেরও বেশি) গাওয়ার রেকর্ড করেছেন।

১৯৩৩ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর, অধুনা মহারাষ্ট্রের সাংলি জেলার ছোট্ট গ্রাম গোয়ারে আশা মঙ্গেশকরের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম দীননাথ মঙ্গেশকর এবং মায়ের নাম সেবন্তি। দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন সেই সময়ের একজন বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী এবং মঞ্চাভিনেতা। তাঁর বড় মেয়ে লতা তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ পেলেও বাকি সন্তানেরা সেই সুযোগ বিশেষ পাননি। আশা নয় বছর বয়সে পিতৃহারা হন।

প্রথাগত শিক্ষার সময় বা সুযোগ পাওয়ার আগেই অন্নসংস্থানের জন্য সংগ্রাম শুরু হয় তাঁদের। দিদি লতার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিভিন্ন মারাঠি ছবিতে ছোটোখাটো চরিত্রে অভিনয় এবং গান গাইতে থাকলেন আশা। পরিস্থিতি তাঁদের হাতে ধরে আরও বড় এক শিক্ষাক্ষেত্রের অঙ্গনে এনে দাঁড় করিয়ে দিলো।

পুনে থেকে প্রথমে কোলাপুর এবং অবশেষে সপরিবারে বোম্বাইতে পা রাখেন আশা। ১৯৪৩ সালে ‘মাঝা বাল’ নামের একটি ছবিতে প্রথমবার গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি। এরপর ১৯৪৮ সালে ‘সাওয়ান আয়া’ ছবিতে প্রথম হিন্দিতে গান গাওয়ার সুযোগ আসে ১৫ বছরের আশার ভাগ্যে। এরপরই ঘটে ছন্দপতন। ১৯৪৯ সালে, যে বছর ‘রাত কি রানী’ ছবিতে প্রথমবার একক কণ্ঠে গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি সেই বছরেই বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে নিজের থেকে প্রায় দ্বিগুণ বয়সী গনপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন আশা। রক্ষণশীল গোঁড়া ব্রাহ্মণ মঙ্গেশকর পরিবার কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি এই ঘটনাটি, রাতারাতি পিতৃগৃহের দরজা বন্ধ হয়ে যায় আশার কাছে।

গোটা পঞ্চাশের দশক ধরেই চলতে থাকে রক্ষণশীল সমাজের সাথে, নিজের স্বামী-সংসারের সাথে, সঙ্গীত জগতের প্রতিষ্ঠিত শিল্পী, সুরকার, কলাকুশলীদের সাথে সদ্য কৈশোর পেরনো একরোখা আশার লড়াই। গীতা দত্ত, শমশাদ বেগম এবং সর্বোপরি নিজের দিদি লতা মঙ্গেশকরের সাথে পাল্লা দিয়ে গান গাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও, সুযোগ জুটছিলোনা আশার ভাগ্যে। যে সব গান গাওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন তিনি সেগুলো বেশিরভাগই এইসব শিল্পীদের ছেড়ে দেওয়া গান, পার্শ্বনায়িকা বা খলনায়িকার কণ্ঠে গাওয়ার গান। এমন সব ছবি যা কোনোদিন হলে রিলিজ হবে কিনা তারও নিশ্চয়তা নেই। এইসব সুযোগের কোনটাই ছেড়ে দেননি আশা ভোঁসলে। এভাবেই শান দেওয়া চলছিল তাঁর ভিতরে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত সম্ভাবনার। ছোটবেলায় ইংরেজি ছবি দেখে এসে, মানে না বুঝলেও যেসব বিদেশী গান গেয়ে উঠতেন তিনি, যার জন্য অবধারিতভাবে মাযের কাছে মার জুটত, সেই লুকিয়ে থাকা ক্ষমতাই এই অসম লড়াইয়ে তাঁর বড় অস্ত্র হয়ে উঠলো। যে সব হাল্কাচালের গান গাইতে চাইতেন না তখনকার মার্গসঙ্গীত ঘেঁষা প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা, নির্দ্বিধায় সেইসব গাইতে রাজি হয়ে গেলেন আশা ভোঁসলে । এর মাঝেই একদিন চোখে পড়ে গেলেন বিমল রায়ের। ১৯৫৩ সালে তাঁর ‘পরিনীতা’ ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ পান আশা। পরের বছরই রাজ কাপুরের ‘বুট পলিশ’ ছবিতে মহম্মদ রফির সাথে গাইলেন ‘নানহে মুনহে বচ্চে তেরে মুঠি মে কেয়া হায়”। ক্রমে তাঁর আলাপ হয় বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক ও পি নায়ারের সাথে। অবশেষে, বি আর চোপড়ার ‘নয়া দৌড়’ ছবিতে ও পি নায়ারের সুরে নায়িকার কণ্ঠের সবকটি গানই গাইলেন আশা ভোঁসলে । ‘মাঙ্গ কে সাথ তুমহারা’, ‘উডে জব জব জুলফে তেরি’র মতো গান তাঁর গলায় শুনে এতদিনে দেশবাসী বুঝতে পারলো, দীননাথ মঙ্গেশকরের আরেক কন্যাও এসে গেছেন, তিনিও অন্যদের থেকে কোনও অংশে কম যাননা।

এর পরের বেশ কয়েকটি বছর ধরে মহিলা কণ্ঠে গানের জন্য তাঁরই মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলেন বি আর চোপড়া এবং ও পি নায়ার। ‘হাওড়া ব্রিজ’, ‘তুমসা নহি দেখা’, ‘এক মুসাফির এক হসিনা’, ‘কাশ্মীর কি কলি’, একের পর এক ছবিতে ইতিহাস সৃষ্টিকারী সব গান উপহার দিয়েছেন ও পি নায়ার ও আশার জুটি।

এই সময়টা আশা ভোঁসলের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই ক’বছরেই নিজের পরিচয় তৈরি করছিলেন তিনি এবং একের পর এক প্রথম সারির নায়িকাদের মুখে উঠে আসছিল তাঁর গান। আর এই সবের মাঝেই স্বামীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের পর ১৯৬০ সালে তিন ছেলেমেয়ের হাত ধরে পিতৃগৃহে ফিরে আসতে হল তাঁকে। যে পরিবার এতদিন অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে ছিল তাঁরাই হয়ে উঠলেন তাঁর নতুন আশ্রয়। ৬০এর দশকে এই সমস্যার রেশ কাটিয়ে আবার তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন মাইকের সামনে। ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে কোনও রকম গানের অনুরোধ ফিরিয়ে দেননি তিনি এই সময়ে। ‘হমরাজ’, ‘ওয়াক্ত’, ‘গুমরাহ’, ‘আদমি অউর ইনসান’, খুব দ্রুত তাঁকে দিদির ছত্রছায়া থেকে বেড়িয়ে আলাদা পরিচয় তৈরি করতে সাহায্য করছিল।

১৯৫৭ সাল নাগাদ লতার সাথে মনোমালিন্য হওয়ায় শচীন দেববর্মন আশা ভোঁসলে -র সাথে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। ‘কালা পানি’, ‘সুজাতা’, ‘তিন দেভিয়া’র মতো কালজয়ী ছবিতে শচীন দেববর্মনের সুরে কিছু অসাধারণ গানে কণ্ঠ দেন আশা। ১৯৬৩ সালে ‘বন্দিনী’ ছবিতে ”অব কে বরস” গানটি ছায়াছবির ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এই একই জুটি ১৯৬৭ সালে আবার খ্যাতির শিখরে পৌঁছন, এবারে ছবির নাম ‘জুয়েল থিফ’, গান ‘রাত অকেলি হ্যায়’। সুরের নানান অলিগলিতে অবাধ বিচরণ আশার, অনেক বছর পরে এই কথা লতা স্বীকার করলেও সাধারণ শ্রোতা তা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল।

১৯৬৬ সালে ‘তিসরি মঞ্জিল’ ছবিতে ‘আজা আজা’ গানে কণ্ঠ দিলেন আশা ভোঁসলে আর ডি বর্মণের সুরে। সেই থেকে শুরু হল আরও একটি জুটি’র জয়যাত্রা। প্রায় দু’দশক ধরে একের পর গানের সাফল্যের প্রভাব পড়ল তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনেও। ১৯৮০ সালে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন দুজনে, যা অটুট থাকে ১৯৯৪ সালে আর ডি বর্মণের জীবনের শেষ দিন অবধি।

তাঁর যা কিছু প্রাপ্তি, সবই তাঁর জীবন থেকে অর্জন করে নেওয়া। তাই যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি উদীয়মান শিল্পীদের উঠতে বাধা দেন কিনা, সাবলীলভাবেই উত্তর দেন, “যে কোনও গান, যে কোনও সুর বা তাঁর আবেদন যদি সুরকাররা আমার কাছেই পেয়ে যান, তাহলে তাঁরা অন্য কোথাও যাবেন কেন?” তিনি একজন পেশাদার শিল্পী, নিজের কাজটা যত্ন নিয়ে করাই তাঁর কাজ, অন্যদের জায়গা করে দেওয়া তাঁর কাজ নয়। আর সেই উৎকর্ষতার টানেই ১৯৮১ সালে খৈয়ামের সুরে ‘উমরাও জান’ ছবির গান গাওয়াকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নেন তিনি। বেশ কিছুদিন ধরে রেওয়াজের পর তৈরি হয় ”ইন আঁখো কি মস্তি’ বা ”দিল চিজ কেয়া হ্যায়” এর মতো অসাধারণ গানগুলি যা তাঁকে এনে জাতীয় পুরস্কার।

রবি থেকে জয়দেব, শঙ্কর–জয়কিশেন থেকে ইলাইয়ারাজা, অনু মালিক থেকে এ আর রহমান। এতগুলো দশক ধরে এত রকম সুরকারের সাথে অসামান্য কাজ করার নিরিখেই তিনি অমর হয়ে থাকতে পারতেন। কিন্তু এরপরও তিনি থেমে থাকেননি। ১৯৯৫ সালে তিনি উস্তাদ আলি আকবর খানের কাছে প্রশিক্ষণ নেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জন্য। পরবর্তীকালে এগারোটি বন্দিশ নিয়ে আশা এবং উস্তাদ আলি আকবর খানের ‘লেগাসি’ নামে একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয় যার জন্য প্রথমবার তিনি গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। আর ডি বর্মণের সুরে তাঁর বিখ্যাত গানগুলি অন্য কারোর আগে তিনি নিজেই রিমিক্স করে প্রকাশ করেন। সনাতনপন্থিরা আপত্তি করলেও, তিনি বলেন, আজকের প্রজন্মের মুখে তাঁর এই গানগুলি আজও শুনতে পান তাঁর করা এই রিমিক্সের জোরেই। ১৯৯৭ সালে লেসলি লুইসের সাথে করা তাঁর ‘রাহুল অ্যান্ড আই’ অ্যালবাম তাঁকে এনে দেয় এমটিভি পুরস্কার। তাঁর দেখানো পথেই উঠে এসেছেন আদনান সামির মতো প্রতিভা, তিনি গলাও মেলান আদনানের প্রথম সফল অ্যালবাম ‘কভি তো নজর মিলাও’ তে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রবাদপ্রতিম গজল শিল্পীদের নিয়ে ২০০৫ সালে অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন আশা, যাতে গুলাম আলি, মেহদি হাসান ছাড়াও ফরিদা খানুম ও জগজিৎ সিংয়ের সাথে গান গেয়েছেন তিনি।

পাশ্চাত্য সঙ্গীতের দুনিয়াও ছুঁয়ে গেছেন আশা যখন ৯০এর দশকে বয় জর্জ এবং মাইকেল স্টাইপের সাথে কাজ করেন তিনি। ২০০৫ সালে আমেরিকান ক্রোনোস কোয়ার্টেট এর সাথে তাঁরই কয়েকটি কালজয়ী গান নিয়ে একটি সংকলন তৈরি করেন যার নাম ‘ইউ হ্যাভ স্টোলেন মাই হার্ট সংস অফ আর ডি বর্মনস বলিউড’। ২০০৬ সালের গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয় এই অ্যালবামটি।

সারাজীবনে তিনি প্রায় ১২০০০ এর বেশী গান রেকর্ড করে গিনেস বুকে নাম তুলেছেন সর্বাধিক গান গাওয়া শিল্পী হিসেবে। এখনো পর্যন্ত তিনি ৯টি ফিল্মফেয়ার, ২টি জাতীয় পুরস্কার, দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মবিভূষন সহ অজস্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। বিভিন্ন দেশে শতাধিক কনসার্টের পরেও মনে করেন এখনও কাজ বাকি আছে। বিখ্যাত সুরকার নৌশাদ আলি বলেছিলেন, সময় আশাজির কণ্ঠে ছাপ ফেলতে পারেনি, তিনি আক্ষরিক অর্থেই কালজয়ী।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।