ইতিহাস

বাদল সরকার

বাংলা নাট্য জগতের এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হলেন বাদল সরকার (Badal Sarkar)। তিনি মূলত বিখ্যাত তাঁর অ্যাবসার্ড নাটকের জন্য। বাংলায় ‘থার্ড থিয়েটার’ বা ‘অঙ্গনমঞ্চ’ নাটক তাঁর হাতেই প্রথম শুরু হয়।

১৯২৫ সালের ১৫ জুলাই উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটে বাদল সরকারের জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল সুধীন্দ্র সরকার। তাঁর বাবা মহেন্দ্রলাল সরকার স্কটিশ চার্চ কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন পরে ওই কলেজে অধ্যক্ষ হন।

বাদল সরকারের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়েছিল ক্যালকাটা আ্যকাডেমিতে। প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে তিনি ভর্তি হন স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলে এবং সেখান থেকেই তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করেন৷ এরপর তিনি শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন তিনি। তবে ছাত্রাবস্থা থেকেই তাঁর আকর্ষণ ছিল নাটকের প্রতি৷ সাহিত্য নাটকের প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে বয়সকালে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৯২ সালে সেখান থেকে এমএ পাশ করেন তিনি।

বাদল সরকারের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৪৭ সালে নাগপুরের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে৷ টাউন প্ল্যানার হিসেবে তিনি কলকাতা,লন্ডন ও নাইজেরিয়ায় এবং ফরাসি সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে টাউন প্ল্যান ট্রেনিংয়ের জন্য ফ্রান্সেও থেকেছেন কিছুকাল৷ এরপর ১৯৫৩ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৫৩ সালে যখন তিনি মাইথনে কর্মরত তখন অবসর সময় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন নাটকের কাজে। মাইথন থেকে কলকাতায় ফিরে এসে বাদল সরকার নাটক প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। এই সময় তিনি একটি বিদেশী সিনেমা ‘মাঙ্কি বিজনেস’ অবলম্বনে ‘সলিউশন এক্স’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং চাকরি সূত্রে লন্ডনের ফিল্ম সোসাইটির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৫৯ সালে তিনি প্রবল নাট্য উৎসাহ নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন এবং তারপরই তিনি তৈরি করেন ‘চক্র’ নামে একটি নাট্যদল৷ এই দলের জন্য তিনি বেশ কিছু নাটক লিখেছিলেন। ১৯৫৮ সালে ‘খাপছাড়া’ পত্রিকায় ‘সলিউশন এক্স’ নাটকটি প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য কৌতুক নাটক ‘বড় পিসিমা’ প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি নাটক ‘রাম শ্যাম যদু’। এই তিনটি চরিত্র যথাক্রমে জুয়াচোর খুনি, ও চোর ছিল। কিন্তু সমাজবিরোধী হয়েও একটি পরিবারের দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে এরা কিভাবে মনুষ্যত্বে উদ্দীপ্ত হল সেই কাহিনী এই নাটকে বর্ণনা করা হয়েছে৷

বাদল সরকারকে সর্বভারতীয় খ্যাতি এনে দিয়েছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে লেখা ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকটি। এই নাটকটি বহুরূপী পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল৷ এরপর তাঁর রচিত ‘বাকী ইতিহাস’ ‘প্রলাপ’, ‘পাগলা ঘোড়া’ ‘শেষ নাই’ সবকটিই শম্ভু মিত্রের নেতৃত্বে বহুরূপী গোষ্ঠীর প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয়েছিল৷

বাদল সরকারের নাট্য জীবন শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে। প্রথম জীবনে তিনি শৌখিন থিয়েটারে ‘চিরকুমার সভা’, ‘বন্ধু’, ‘ ডিটেকটিভ ‘ ‘লালপাঞ্জা’ প্রভৃতি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে তিনি শতাব্দী নাট্যগোষ্ঠী স্থাপন করেন যার প্রথম প্রযোজনা ছিল ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকটি। তাঁর রচিত ‘পরে কোনদিন’, ‘ যদি আর একবার’ এছাড়া ‘প্রলাপ’ ও ‘ ত্রিংশ শতাব্দী ‘ উল্লেখযোগ্য নাটক বাংলা সাহিত্যে।

‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ বাদল সরকারের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ নাটক। এটি একটি অ্যাবসার্ড নাটক। অ্যাবসার্ড কথাটির অর্থ – উদ্ভট হাস্যকর অসামঞ্জস্যপূর্ণ অযৌক্তিক। অ্যাবসার্ড নাটকের কাহিনীর মধ্যে থাকে শূন্যতা ও অবক্ষয়। তাই এই নাটকের কাহিনী উদ্দেশ্যহীন হয়। তাছাড়া এই শ্রেণীর নাটকগুলির পাত্র-পাত্রীদের মনে হয় মৃত্যুই একমাত্র মুক্তির পথ।

তাঁর আরো একটি অ্যাবসার্ডধর্মী নাটক ‘যদি আর একবার বহুরূপীর প্রযোজনায় অ্যাকাডেমিতে ১৯৬৭ সালের ২৭ফেব্রুয়ারী অভিনীত হয়েছিল। এটি ছিল একটি হালকা রসের কমেডি। এর সংলাপও ছিল ছন্দে বাঁধা। নাটকটি দুই দম্পতি ও এক অবিবাহিত মেয়ের গল্প। বর্তমান জীবনের ক্লান্তি ও অবসাদ এই নাটকে চিত্রিত হয়েছে। তাঁর ‘প্রলাপ’ নাটকটি বহুরূপী কর্তৃক নিউ এম্পায়ারে ১৯৬৭ সালের ৩ অক্টোবর অভিনীত হয়েছিল। বাদল সরকারে নিজেই এই নাটকের নির্দেশক ছিলেন৷ এই নাটকটিতে অস্তিত্ববাদী দর্শন প্রাধান্য পেয়েছে। বাদল সরকারের আরো একটি উল্লেখযোগ্য নাটক ‘বীজ’। তাঁর সৃষ্ট একাঙ্ক নাটক ‘মনিকাঞ্চন’ একটি উল্লেখযোগ্য নাটক। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এই নাটকে প্রবল প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে। তাঁর অন্যান্য একাঙ্ক নাটকগুলি হল ‘সমাবিত্ত’, ‘সারারাত্তির’, ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ ‘সাদাকালো’,’চূর্ণপৃথিবী’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘ভুল রাস্তা’, ‘ক-চ-ট-ত-প’, ‘ওরে বিহঙ্গ’ প্রভৃতি।

থিয়েটার মানেই যে শুধু মঞ্চ, বাংলা থিয়েটার জগতের এই প্রচলিত ধারণাকে তিনি ভেঙ্গে দিয়েছিলেন লাতিন আমেরিকার ‘তৃতীয় চলচ্চিত্র’-এর আদলে ‘থার্ড থিয়েটার’ বা ‘তৃতীয় থিয়েটার’এর ধারণা এনে। এই মাধ্যমে দর্শক এবং অভিনেতার মধ্যে দূরত্ব থাকে সামান্যই। পথ নাটিকার মাধ্যমে দর্শকদের মতই পোশাকে অভিনয় এই রীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লাইট, মেকআপ ও অন্য সরঞ্জাম না লাগায় প্রযোজনার খরচও অনেক কম হয়। এই ধারার নাটকে দর্শকদের টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হয় না। থার্ড থিয়েটার তৈরীর ব্যাপারে তিনি বিদেশি নাট্যবিদদের সাহায্য নিয়েছিলেন৷ বিশেষ করে পোল্যান্ডের গ্রোটোস্কির নাট্য ভাবনার দ্বারা তিনি বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন। এই মুক্তমঞ্চের অভিনয় খরচ কম।

থিয়েটারের নিজস্ব ভাষাকে নিজের মতো করে ভেঙে গড়ে মজবুত করে তুলেছিলেন তিনি। নাটকের যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনীতিক এবং সামাজিক দায়দায়িত্ব রয়েছে তা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। যার ফলে নিজের কাজের প্রতি কখনও আপোষ করেননি তিনি । তাঁর নাটকগুলি মঞ্চের ঘেরা গন্ডি ভেঙে একেবারে প্রকাশ্য জনপথে বেরিয়ে এসেছিল৷ নিজের নাট্যদল ‘শতাব্দী’ গঠনের পর তিনি একবার কলকাতার কার্জন পার্কে খোলা আকাশের নীচে নাটক করা শুরু করেছিলেন৷

বাদল সরকারকে নিয়ে দুটি তথ্যচিত্র তৈরী হয়েছিল। একটি তথ্যচিত্রের পরিচালক ছিলেন আমশন কুমার এবং অপরটির পরিচালক ছিলেন সুদেব সিনহা।

সারাজীবনে অজস্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ১৯৬৮ সালে তিনি সংগীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ লাভ করেন এবং সরকার কর্তৃক পারফর্মিং আর্টসে সর্বোচ্চ সম্মান সংগীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ- রত্ন সদস্য পেয়েছিলেন৷ ১৯৭১ সালে তিনি জওহরলাল নেহেরু ফেলোশিপ পান৷ ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মাননায় ভূষিত করেন৷
২০০৫ সালের অক্টোবর মাসে পুনেতে জাতীয় চলচ্চিত্র সংরক্ষণাগার (National Film Archive of India),অনুষ্ঠিত ‘তেন্ডুলকার মহোৎসব’-এ বাদল সরকারের জীবন নিয়ে একটি ডিভিডি এবং একটি বই প্রকাশ করা হয়।

২০১১ সালের ১৩ মে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে এই নাট্যকারের মৃত্যু হয়।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


তথ্যসূত্র


  1. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস - ডঃ দেবেশ কুমার আচার্য (পৃঃ ৬০৩)
  2. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Badal_Sarkar
  3. https://www.bongodorshon.com/
  4. https://www.kolkata24x7.com/
  5. http://shodhganga.inflibnet.ac.in/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।