বাদল সরকার

বাদল সরকার

বাংলায় ‘তৃতীয় ধারা’র নাটক বা থার্ড থিয়েটারের জনক হিসেবে বাংলা নাট্য জগতে বিখ্যাত এক নাম বাদল সরকার (Badal Sircar)। পাঁচের দশকের শুরুর দিক থেকেই তাঁর নাট্যজীবন শুরু হয়। প্রথম জীবনে শৌখিন থিয়েটারে অভিনয়ের পর ‘শতাব্দী’ নামে নতুন একটি নাট্যগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। কলকাতার কার্জন পার্কে নিয়মিত এই গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বাদল সরকার থার্ড থিয়েটারে অভিনয় করেছেন। নাটক রচনার ক্ষেত্রে তিনি মূলত অ্যাবসার্ড নাট্যদর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ তাঁর লেখা সর্বাধিক জনপ্রিয় নাটক। শুধু নাটক নয়, অনেক বিদেশি গল্প অনুসরণে তিনি বহু বাংলা গল্পও লিখেছেন। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে অন্যধারার শিল্পী হিসেবে তিনি আজও স্মরণীয়।

১৯২৫ সালের ১৫ জুলাই উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটে এক বাঙালি খ্রিস্টান পরিবারে বাদল সরকারের জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম সুধীন্দ্র সরকার। তাঁর বাবা মহেন্দ্রলাল সরকার স্কটিশ চার্চ কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক এবং টমোরী হস্টেলের সুপারিনটেন্ডেন্ট ছিলেন, পরে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজেই অধ্যক্ষ পদে উন্নীত হন। প্যারী রো-তে তাঁদের নিজেদের বাড়ি ছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁরা সপরিবারে ঐ টমোরী হোস্টেলের দোতলায় বাস করতেন। ছোটবেলা থেকেই প্রচুর বই পড়ার নেশা ছিল তাঁর। বাড়িতে বইয়ের সম্ভারও ছিল অনেক, তাছাড়া বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। বাংলা, ইংরেজি দুই ভাষারই বহু গল্প, উপন্যাস, নাটক পড়তে ভালোবাসতেন তিনি। বেতারে নাটক শোনার জন্য তাঁর উৎসাহ ছিল প্রবল। পরবর্তীকালে কলকাতায় বোমা পড়ার আশঙ্কায় কলকাতা ছেড়ে তমলুকেও কিছুদিন কাটিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল তাঁর পরিবার।

বাদল সরকারের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়েছিল ক্যালকাটা আ্যকাডেমিতে। প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে তিনি ভর্তি হন স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলে এবং সেখান থেকেই তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করেন৷ এরপর তিনি শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন এবং এখান থেকেই ১৯৪৭ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। তবে ছাত্রাবস্থা থেকেই নাটকের প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ ছিল৷ সাহিত্য ও নাটকের প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে ষাটোর্ধ্ব বয়সেও তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন বিদেশি নাটক পড়তে পারবেন বলে। যাদবপুরের ক্লাসে তাঁর শিক্ষক ছিলেন আরেক বিখ্যাত বাঙালি তাত্ত্বিক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯২ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন তিনি। স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীনই ইতিহাস বইয়ের পিণ্ডারী যুদ্ধের কাহিনী অবলম্বনে প্রথম নাটক লেখেন বাদল সরকার। তারপর দশম শ্রেণিতে উঠে আরেকটি নাটক লেখেন তিনি ‘স্লিপার্স অফ সিণ্ডারেলা’ নামে। সেই নাটকটি আবার বাড়িতেই বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে অভিনীত হয়েছিল। এর পাশাপাশি বিদেশি গল্প অবলম্বনে বাংলায় গল্প লিখতে শুরু করেছিলেন বাদল সরকার। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার সময় থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির কাজ-কর্মে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। চট্টগ্রামে প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কারণে কলেজ থেকে বিতাড়িত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল তাঁর।

বাদল সরকারের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৪৭ সালে নাগপুরের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে৷ টাউন প্ল্যানার হিসেবে তিনি কলকাতা, লন্ডন ও নাইজেরিয়ায় কাটিয়েছেন এবং ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে টাউন প্ল্যান ট্রেনিংয়ের জন্য ফ্রান্সেও বেশ কিছুদিন বাস করেছেন৷ ১৯৫৩ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। এই সময় বেসরকারি একটি কলেজে অধ্যাপনার পাশাপশি মানিকতলা অঞ্চলে ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টে কাজ করতেন তিনি। ১৯৫৩ সালে তিনি যখন মাইথনে কর্মরত তখন অবসর সময় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন নাটক রচনায়। মাইথন থেকে কলকাতায় ফিরে এসে বাদল সরকার তাঁর রচিত নাটকগুলি মঞ্চায়িত করার ব্যবস্থা করেন। এই সময়কালেই তিনি বিদেশি ছবি ‘মাঙ্কি বিজনেস’ অবলম্বনে ‘সলিউশন এক্স’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন যেটি ১৯৫৮ সালে ‘খাপছাড়া’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৫৭ সালে বাদল সরকার ইংল্যান্ড যান এবং মূলত চাকরি সূত্রেই লন্ডনের ফিল্ম সোসাইটির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৫৯ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং তারপরই তৈরি করেন ‘চক্র’ নামে একটি নাট্যদল৷ এই দলের জন্য তিনি বেশ কিছু নাটক লিখেছিলেন। ১৯৬১ সালে তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য কৌতুক নাটক ‘বড় পিসিমা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি নাটক ‘রাম শ্যাম যদু’। এই তিনটি চরিত্র যথাক্রমে জুয়াচোর খুনি, ও চোর ছিল।কিন্তু সমাজবিরোধী হয়েও একটি পরিবারের দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে এরা কিভাবে মনুষ্যত্বে উদ্দীপ্ত হল সেই কাহিনী এই নাটকে বর্ণনা করা হয়েছে৷

বাদল সরকারের নাট্যজীবন শুরু হয়েছিল পাঁচের দশকের গোড়ার দিকে। প্রথম জীবনে তিনি শৌখিন থিয়েটারে ‘চিরকুমার সভা’, ‘বন্ধু’, ‘ডিটেকটিভ’, ‘লালপাঞ্জা’ প্রভৃতি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। বাদল সরকারকে সর্বভারতীয় খ্যাতি এনে দিয়েছিল ছয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে লেখা ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকটি। এই নাটকটি ‘বহুরূপী’ পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল৷ এরপর তাঁর রচিত ‘বাকি ইতিহাস’, ‘প্রলাপ’, ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘শেষ নাই’ সবকটি নাটকই শম্ভু মিত্রের পরিচালনায় ‘বহুরূপী’ গোষ্ঠীর প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয়েছিল৷ ১৯৬৭ সালে তিনি ‘শতাব্দী’ নাট্যগোষ্ঠী স্থাপন করেন যার প্রথম প্রযোজনা ছিল ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকটি। তাঁর রচিত ‘পরে কোনোদিন’, ‘যদি আর একবার’, ‘প্রলাপ’ ও ‘ ত্রিংশ শতাব্দী ‘ উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে বাংলা সাহিত্যে ও থিয়েটারের ইতিহাসে।

‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ বাদল সরকারের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ নাটক। এটি একটি অ্যাবসার্ড নাটক। ‘অ্যাবসার্ড’ কথাটির অর্থ – উদ্ভট, হাস্যকর, অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অযৌক্তিক। অ্যাবসার্ড নাটকের কাহিনীর মধ্যে থাকে শূন্যতা ও অবক্ষয়। তাছাড়া এই শ্রেণির নাটকগুলির পাত্র-পাত্রীদের মনে হয় মৃত্যুই একমাত্র মুক্তির পথ। তাঁর রচিত অন্য আরেকটি অ্যাবসার্ডধর্মী নাটক ‘যদি আর একবার’ বহুরূপীর প্রযোজনায় অ্যাকাডেমিতে ১৯৬৭ সালের ২৭ফেব্রুয়ারি অভিনীত হয়েছিল। এটি ছিল একটি লঘু রসের কমেডি নাটক। এর সংলাপও ছিল ছন্দে বাঁধা। নাটকটি দুই দম্পতি ও এক অবিবাহিত মেয়ের গল্প। বর্তমান জীবনের ক্লান্তি ও অবসাদ এই নাটকে চিত্রিত হয়েছে। তাঁর ‘প্রলাপ’ নাটকটি বহুরূপী কর্তৃক নিউ এম্পায়ারে ১৯৬৭ সালের ৩ অক্টোবর অভিনীত হয়েছিল এবং বাদল সরকার নিজেই এর নির্দেশক ছিলেন৷ এই নাটকটিতে মূলত অস্তিত্ববাদী দর্শন প্রাধান্য পেয়েছে। বাদল সরকারের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে ‘বীজ’ এবং একাঙ্ক নাটক ‘মণিকাঞ্চন’ একটি উল্লেখযোগ্য। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এই নাটকে প্রবল প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে। তাঁর অন্যান্য একাঙ্ক নাটকগুলি হল ‘সমাবিত্ত’, ‘সারারাত্তির’, ‘বল্লভপুরের রূপকথা’, ‘সাদাকালো’, ‘চূর্ণপৃথিবী’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘ভুল রাস্তা’, ‘ক-চ-ট-ত-প’, ‘ওরে বিহঙ্গ’ প্রভৃতি।

থিয়েটার মানেই যে শুধু মঞ্চ, বাংলা থিয়েটার জগতের এই প্রচলিত ধারণাকে তিনি ভেঙে দিয়েছিলেন। লাতিন আমেরিকার ‘তৃতীয় চলচ্চিত্র’-এর আদলে ‘থার্ড থিয়েটার’ বা ‘তৃতীয় থিয়েটার’এর ধারণা নিয়ে আসেন বাদল সরকার। এই মাধ্যমে দর্শক এবং অভিনেতার মধ্যে ব্যবধান ঘুচে যায়। আলো, রূপসজ্জা ও অন্য সরঞ্জাম না লাগায় প্রযোজনার খরচও অনেক কম হয় এই ধরনের নাট্য উপস্থাপনে। এই ধারার নাটকে দর্শকদের টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হয় না। থার্ড থিয়েটার তৈরির ব্যাপারে তিনি বিদেশি নাট্যবিদদের সাহায্য নিয়েছিলেন৷ বিশেষ করে পোল্যান্ডের গ্রোটোস্কির নাট্য ভাবনার দ্বারা তিনি বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন। পথ নাটিকার আঙ্গিকেই এই ধরনের নাটকের অভিনয় হয়ে থাকে। যেহেতু কোনও সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয় না, তাই শরীরী ভঙ্গিমাই এখানে প্রাধান্য পায় বেশি। থিয়েটারের নিজস্ব ভাষাকে নিজের মত করে ভেঙে গড়ে মজবুত করে তুলেছিলেন তিনি। নাটকের যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনীতিক এবং সামাজিক দায়দায়িত্ব রয়েছে তা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। যার ফলে নিজের কাজের প্রতি কখনও আপোষ করেননি তিনি । তাঁর নাটকগুলি মঞ্চের ঘেরা গন্ডি ভেঙে একেবারে প্রকাশ্য জনপথে বেরিয়ে এসেছিল৷ নিজের নাট্যদল ‘শতাব্দী’ গঠনের পর তিনি কলকাতার কার্জন পার্কে খোলা আকাশের নীচে নাটক করা শুরু করেন৷

বাদল সরকারকে নিয়ে দুটি তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছিল। একটি তথ্যচিত্রের পরিচালক ছিলেন আমশন কুমার এবং অপরটির পরিচালক ছিলেন সুদেব সিনহা।

সারাজীবনে অজস্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ১৯৬৮ সালে তিনি সঙ্গীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ লাভ করেন এবং পারফর্মিং আর্টসে সর্বোচ্চ সম্মান সংগীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ- ‘রত্ন সদস্য’ পেয়েছিলেন তিনি৷ ১৯৭১ সালে তিনি জওহরলাল নেহরু ফেলোশিপ পান৷ ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মাননায় ভূষিত করে৷
২০০৫ সালের অক্টোবর মাসে পুনেতে জাতীয় চলচ্চিত্র সংরক্ষণাগার (National Film Archive of India),অনুষ্ঠিত ‘তেন্ডুলকার মহোৎসব’-এ বাদল সরকারের জীবন নিয়ে একটি ডিভিডি এবং একটি বই প্রকাশ করা হয়।

২০১১ সালের ১৩ মে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বাদল সরকারের মৃত্যু হয়। তাঁকে নিয়ে তথ্যমূলক ভিডিও দেখুন এখানে

তথ্যসূত্র


  1. অমিতাভ ভট্টাচার্য, 'বাদল সরকার : বহমান জীবনের স্মৃতি', পরিচয় পত্রিকা, মে-জুলাই ২০১০, পৃষ্ঠা ৫৩-৫৭
  2. অভিজিৎ করগুপ্ত, 'তৃতীয় থিয়েটার এবং বাদল সরকার', চতুরঙ্গ এপ্রিল ১৯৮৭, পৃষ্ঠা ৯৯৫-১০০৪ 
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Badal_Sarkar
  4. https://www.bongodorshon.com/
  5. https://www.kolkata24x7.com/
  6. http://shodhganga.inflibnet.ac.in/

One comment

আপনার মতামত জানান