বোদলেয়ার

শার্ল বোদলেয়ার

বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে ফরাসি কবি হিসেবে বিখ্যাত শার্ল বোদলেয়ার (Charles Baudelaire)। রোমান্টিকতার বদলে তাঁর কবিতায় বস্তুনিষ্ঠতাই ধরা পড়ে বেশিমাত্রায়। বোদলেয়ারের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘লা ফ্লর দ্যু মাল’(Les Fleurs du mal ) বা ‘দ্য ফ্লাওয়ারস অফ এভিল’ একইসঙ্গে নন্দিত ও নিন্দিত হয়েছিল। গীতিকবিতার ধাঁচে লেখা এই বইয়ের কবিতাগুলি তথাকথিত সৌন্দর্যের ধারণা বা নন্দনতত্ত্বকে প্রশ্ন করে এবং নন্দনতত্ত্বের এক নতুন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে। আর্তুর র‍্যাঁবো, স্টিফেন মালার্মে কিংবা পল ভ্যালেরির মতো বহু কবি বোদলেয়ারের কাব্যচিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। কাব্যচর্চা ছাড়াও অনুবাদ এবং সাহিত্য ও শিল্প সমালোচনার কাজেও নিয়োজিত ছিলেন তিনি। প্যারিসের এক বিখ্যাত চিত্রকর কোরবের প্রভাবে তাঁর কবিতায় রিয়েলিজমের সূচনা হয়। ফরাসি বিপ্লবের ফলে আধুনিক ফ্রান্সের গড়ে ওঠা, ফ্রান্সের সৌন্দর্য এবং ফ্রান্সের এক অবক্ষয়িত রূপ সবই ধরা পড়েছে তাঁর কবিতায়। আজীবন হতাশা, ব্যর্থতা নিয়েই তাঁর জীবন কেটেছে।

১৮২১ সালের ৯ এপ্রিল ফ্রান্সের প্যারিসে শার্ল বোদলেয়ারের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জোসেফ ফ্রান্সিস বোদলেয়ার একজন প্রবীণ সিভিল সার্ভেন্ট এবং অপেশাদার চিত্রশিল্পী ছিলেন। বোদলেয়ারের মা ক্যারোলিনের থেকে বয়সে ৩৪ বছরের বড় ছিলেন জোসেফ। বোদলেয়ারের শৈশবেই ১৮২৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তাঁর বাবা মারা যান। এরপরে তাঁর মা ক্যারোলিন দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জ্যাকুইস অউপিককে। এর পর থেকেই বোদলেয়ারের প্রতি তাঁর মা ক্যারোলিনার ভালোবাসা কমে যায় এবং তাঁকে আগলে রাখতেও উদাসীন হয়ে পড়েন ক্যারোলিনা যা বোদলেয়ারের মনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। অনেক বড় বয়স পর্যন্ত বোদলেয়ার তাঁর মায়ের কাছে চেয়েচিন্তে পয়সা জোগাড় করেছেন এবং সেই সময় তাঁর মাকে বোদলেয়ার প্রায়ই একটা বড়ো প্রকাশনার চুক্তি হয়েছে কিংবা বড় সংবাদপত্রে চাকরি হয়েছে এই জাতীয় মিথ্যা বলতেন। তাঁর মায়ের এই দ্বিতীয় বিবাহ পরবর্তীকালে বোদলেয়ারের মানসিক ভারসাম্যহীনতারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

লিওন শহরে তাঁর পড়াশোনা শুরু হয়। ১৪ বছর বয়সী বোদলেয়ার সম্পর্কে তাঁর সহপাঠীদের মত ছিল তিনি অনেকের থেকে তুলনায় বেশি পরিশীলিত এবং অভিজ্ঞ। সাহিত্য ও শিল্প সম্পর্কে সর্বদা তাঁর একটি বিশেষ মত থাকত। অধ্যবসায় একেবারেই না থাকার কারণে, পড়াশোনায় প্রায়ই অনিয়মিত হয়ে পড়েন বোদলেয়ার। পরবর্তীকালে ফ্রান্সের লিসি লুইস লি গ্রাণ্ডে আইন অধ্যয়ন করতে শুরু করেন। এই সময় থেকেই নিয়মিত পতিতালয়ে যেতে শুরু করেন বোদলেয়ার এবং এর ফলে অচিরেই গনোরিয়া এবং সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হন তিনি। এমনকি এর অর্থ সংস্থানের জন্য জামা কাপড় কেনার টাকাও তাঁর ছিল না। ধার করা টাকায় জামা-কাপড় পড়তে হত তাঁকে। ১৯৩৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পরে বোদলেয়ারের সৎ বাবা চেয়েছিলেন আইন অথবা দেশের প্রশাসনিক কোনো পদে কাজ করুক বোদলেয়ার। কিন্তু বোদলেয়ারের ইচ্ছা ছিল একেবারে আলাদা। বোদলেয়ার সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়েই জীবন অতিবাহিত করতে চেয়েছিলেন। এতে তাঁর মা-বাবা উভয়েই মনঃক্ষুণ্ন হয়েছিলেন।

১৮৪১ সালে তাঁর সৎ বাবা তাঁকে ভারতের কলকাতা শহরের উদ্দেশ্যে পাঠান এবং এই সমুদ্রযাত্রায় তাঁর সঙ্গী ছিলেন তাঁর বাবার এক বন্ধু। ১২ থেকে ১৫ মাসের দীর্ঘ এই যাত্রায় এক সমুদ্র ঝড়ে তাঁদের জাহাজ খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই জাহাজ মেরামতির জন্য মরিশাসে নোঙর করেন তাঁরা। উপরন্তু সেই জাহাজের লোকদের একেবারেই পছন্দ ছিল না বোদলেয়ারের, তাই তিনি ফ্রান্সে ফিরে আসেন। এই সময় মরিশাসে এক সাহিত্য সভায় কয়েকজন সাহিত্যপ্রেমী তরুণের সঙ্গে আলাপ হয় বোদলেয়ারের। ভারতের উদ্দেশ্যে তাঁর সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতা তাঁকে যারপরনাই প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তীকালে তাঁর লেখা ‘লা ভি অ্যান্টেরিওয়ার’, ‘ এ উনে দেম ক্রেওল’ ইত্যাদি কবিতায় এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ধরা পড়েছে। ফ্রান্সের প্যারিসে একটি সরাইখানায় বসে বোদলেয়ার তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘লা ফ্লর দ্যু মাল’-এর অনেকগুলি কবিতা লিখেছিলেন। ২১ বছর বয়সে বোদলেয়ার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রভূত সম্পত্তি লাভ করলেও কয়েক বছরের মধ্যেই সেই সব নিঃশেষ করে ফেলেন তিনি। তাঁর পরিবার তাঁকে সেই সম্পত্তি একটি ট্রাস্টে রাখতে পরামর্শ দিলেও সেই কথা বোদলেয়ার শোনেননি। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই লেখক ও সাহিত্যিকমহলে উদাসীন এবং বাউণ্ডুলে, খামখেয়ালি একজন লেখক হিসেবে পরিচিতি পান বোদলেয়ার। ভোগ-বিলাসে মত্ত শার্ল বোদলেয়ারের এই সময়কার কবিতায় ঘৃণা, অমরত্ব এবং প্রহসনের রূপ ফুটে উঠেছিল। তাছাড়া শয়তানের মনোভাবই তাঁর এই সময়কার সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছিল। জাঁ ডুভাল নামে এক মহিলা এই সময় তাঁর উপপত্নী হন যাঁকে তাঁর মা খুবই অত্যাচার করতেন। এত মানসিক কষ্টের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন শার্ল বোদলেয়ার।

১৮৪৮ সালের ফরাসি বিপ্লবে বোদলেয়ার অংশ নিয়েছিলেন। এই সময় একটি বৈপ্লবিক সংবাদপত্রের জন্য কাজ করছিলেন তিনি। রাজনীতি থেকে ক্রমেই তাঁর আগ্রহ চলে গিয়েছিল। ১৮৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্বাস্থ্যের দুর্বলতা, আর্থিক দুরবস্থা এবং অনিয়মিত সাহিত্য সৃষ্টির মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়তে হচ্ছিল তাঁকে। তার উপরে ঋণের বোঝাও চেপেছিল তাঁর মাথায়। প্রায়ই পাওনাদারদের থেকে পালাতে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পালিয়ে বেড়াতে হত তাঁকে। শেষমেশ অর্থ সংস্থানের জন্য এডগার অ্যালান পো-র গল্পের অনুবাদ করেছিলেন শার্ল বোদলেয়ার। তাঁর বিখ্যাত কবিতার বই ‘লা ফ্লর দ্যু মাল’ কিংবা ‘ফ্লাওয়ারস অফ এভিল’-এর কবিতাগুলি তিনি এই সময়েই লিখেছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উন্নাসিক ও প্রথাবিরোধী কবি হিসেবে পরিচিত হন তিনি। তাঁর কবিতায় ধরা পড়ে তীব্র ঈশ্বর নিন্দা। ফলে হতাশার কবিতা লিখতে দেখা যায় তাঁকে। সাহিত্যচর্চাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। তবে এডগার অ্যালান পো-র অনুবাদক হিসেবে ফরাসি সাহিত্যে এক বিশেষ স্থান অর্জন করেছিলেন শার্ল বোদলেয়ার।

তাঁর প্রথম প্রকাশিত লেখা একটি শিল্পসমালোচনা ‘সালোন’ যা প্রথমে ১৮৪৫ সালে এবং পরে ১৮৪৬ সালে প্রকাশ মাত্রেই সাহিত্যিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এই বইতে তিনি বোদলেয়ার ডুফ্যে এই ছদ্মনাম গ্রহণ করেছিলেন। দেলাক্রোয়েক্স এবং এই রকম আরো অন্যান্য ছবির সমালোচনা করতে গিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা পরবর্তীকালে ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পীদের প্রভূত প্রভাবিত করেছিল। ১৮৪৬ সালে তাঁর লেখা আরেকটি উপন্যাস ‘লা ফাঁফারলো’ প্রকাশিত হয়। ১৮৫৭ সালে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘ফ্লাওয়ারস অফ এভিল’ –এর প্রথম সংস্করণটি প্রকাশ পায়। প্রকাশ পাওয়া মাত্র ফ্রান্সে আলোড়ন ওঠে। এই বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বোদলেয়ারের বিরুদ্ধে অশ্লীলতা আর ঈশ্বর নিন্দার অভিযোগ ওঠে এবং আদালতে এ নিয়ে মামলাও হয় তাঁর বিরুদ্ধে। বোদলেয়ার ভেবেছিলেন এই বই তাঁকে সাহিত্য জগতে সফলতা এনে দেবে, কিন্তু হল তার উলটো। অশ্লীলতার অভিযোগ বহাল রেখে আদালত এই বইয়ের বেশ কিছু কবিতা বাদ দিয়ে নতুন সংস্করণ প্রকাশ করতে বলেন বোদলেয়ারকে। বোদলেয়ার ভেবেছিলেন বাতিল করা কবিতার জায়গায় নতুন কবিতা জুড়ে দেবেন, কিন্তু তাতেও এই বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। যদিও বাতিল হওয়া সব কবিতাই বোদলেয়ারের মৃত্যুর পরে তাঁর বইয়ের তৃতীয় সংস্করণে স্থান পেয়েছিল। ‘লা ফ্লর দ্যু মাল’ এই কাব্যগ্রন্থের ব্যর্থতায় অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়েন বোদলেয়ার এবং নৈরাশ্য গ্রাস করে তাঁকে। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে তাঁর, এদিকে আর্থিক অনটন তো ছিলই। ১৮৬২ সালে দেউলিয়া হয়ে পড়েন তিনি। পাওনাদারদের ভয়ে ঋণগ্রস্ত বোদলেয়ার পালিয়ে যান বেলজিয়ামে। ১৮৬৪ সালে বেলজিয়ামে বক্তৃতা দিয়ে অর্থ উপার্জন করবেন ভেবেছিলেন তিনি, কিন্তু বক্তৃতা দিয়েও সুরাহা হয়নি। বেলজিয়ামে কেউই বিশেষ তাঁর লেখার কদর করেনি। ফলে বাধ্য হয়েই প্যারিসে ফিরে আসেন তিনি। জীবৎকালে তাঁর অধিকাংশ লেখাই প্রকাশকেরা প্রকাশ করতে চাননি। তাঁর মৃত্যুর পরে বোদলেয়ারের সমস্ত লেখাপত্র ৭০ পাউণ্ডে নিলাম হয়ে যায় এবং তাঁর মৃত্যুর পরেই তাঁর সব লেখা প্রকাশিত হতে থাকে।

১৮৬৭ সালের ৩১ আগস্ট মাত্র ৪৬ বছর বয়সে প্যারিসে শার্ল বোদলেয়ারের মৃত্যু হয়।            

আপনার মতামত জানান