ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত তিনটি প্রধান আন্দোলনের মধ্যে অন্যতম হল আইন অমান্য আন্দোলন (Civil Disobedience Movement)। ব্রিটিশ শাসন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ সব আইন প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করে এই আন্দোলন যেন ভারতবাসীর যূথবদ্ধ শক্তি ও লড়াই করবার মানসিকতাকে প্রকট করে তুলেছিল। স্বৈরাচারী ইংরেজ শাসনের অন্যায্য নিয়মনীতি, অরাজকতা ও সন্ত্রাসের হাত থেকে ভারতকে রক্ষা করবার জন্যই আইন অমান্য আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছিলেন গান্ধীজি। তাঁর ডাকে অসংখ্য নারী রাস্তায় নেমে এসেছিল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবার জন্য। প্রসঙ্গত সরোজিনী নাইডু, বাসন্তী দেবী, লীলা নাগদের মতো নারী নেতৃত্বের কথা মনে পড়ে। তবে অহিংস এই আন্দোলনের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ইংরেজ শাসনের নিষ্ঠুর, নগ্ন দমননীতিও সেদিন দেখেছিল গোটা বিশ্ব। একথা অনস্বীকার্য যে, আইন অমান্য আন্দোলনের এই তীব্রতা ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবই ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
১৯৩০ সালে সংঘটিত আইন অমান্য আন্দোলনের নেপথ্যে বেশ কিছু গুরুতর কারণ সক্রিয় ছিল। ততদিনে স্বৈরাচারী ইংরেজ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বপ্ন ভারতবাসী দেখতে শুরু করেছিল মহাত্মা গান্ধীর হাত ধরে৷ এমনকি আইন অমান্য আন্দোলন শুরুর পূর্বে ১৯৩০ সালের ২ জানুয়ারি কংগ্রেসের নবগঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে এও স্থির হয়েছিল যে, যতদিন না পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করা যাচ্ছে ততদিন ২৬ জানুয়ারি তারিখটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপন করা হবে। এমন একটা পদক্ষেপ থেকে সহজেই বুঝতে পারা যায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তখন কতখানি তীব্র হয়ে উঠেছিল।
তবে ঠিক সেই সময়তেই বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছিল তার প্রভাব কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশ এড়াতে পারেনি। সেসময় তুলো, ধান, পাট, কাঁচা পণ্যের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় কৃষকদের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়লে বিভিন্ন স্থানে তারা অসন্তোষ প্রকাশ করতে থাকে। এছাড়াও কারখানায় ছাঁটাই ও মজুরি হ্রাসের ফলে শ্রমিকরাও ধর্মঘটে অবতীর্ণ হয়। তার উপরে সরকার নিষ্ঠুর দমননীতি প্রয়োগ করলে অবস্থা আরও খারাপের দিকে যায়। এরই পাশাপাশি ভারতীয় বিপ্লবী দলগুলিও এসময় ভীষণ সক্রিয়ভাবে কাজ করতে থাকে। স্যান্ডার্স সাহেবের হত্যা, কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে বোমা নিক্ষেপ, যতীন দাসের মৃত্যু ইত্যাদি ঘটনা যুবসমাজকে উত্তেজিত করে তুলেছিল। এছাড়াও ভারতীয় পুঁজিপতিরা ইংরেজ সরকারের অসম বাণিজ্যনীতির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকেন। তাঁরা উপলব্ধি করেন পূর্ণ স্বরাজ ব্যতীত এর থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। কংগ্রেস বুঝতে পারছিল যে প্রবল এক গণআন্দোলন ছাড়া সরকারকে ভারতীয়দের দাবি মানতে বাধ্য করা অসম্ভব।
১৯৩০ সালের ৩০ জানুয়ারি ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় গান্ধীজি এগারো দফা সংস্কারের প্রস্তাব পেশ করেন, যার মধ্যে ছিল মাদক দ্রব্য বর্জন, লবণকর রদ, বন্দীমুক্তি ইত্যাদির কথা। ২ মার্চ গান্ধীজি বড়লাটকে জানান গুজরাটের সমুদ্র উপকূলবর্তী ডান্ডি নামক স্থানে তিনি লবণ আইন ভঙ্গ করবেন, তবে উক্ত এগারো দফা সংস্কার সরকার মেনে নিলে তিনি আন্দোলন স্থগিত করে দেবেন। সরকার গান্ধীর প্রস্তাবে কর্ণপাত করেনি বরং আন্দোলন করা সম্পর্কে গান্ধীকে বড়লাট সতর্ক করে দেন।
এরই ফলস্বরূপ ১৯৩০ সালের ১২ মার্চ সবরমতী আশ্রম থেকে ৭৮জন অনুগামীকে নিয়ে গান্ধীজি গুজরাটের ডান্ডি নামক স্থানের উদ্দেশ্যে পদযাত্রা শুরু করেছিলেন। এই ঘটনাটিই ইতিহাসে ‘ডান্ডি অভিযান’ নামে খ্যাত। ২৪ দিনে ২৪১ মাইল পথ অতিক্রম করেছিলেন তাঁরা। পথে গান্ধীজির এই মহামিছিলে যোগ দিয়েছিলেন অনেক মানুষ। তাঁরা ৫ এপ্রিল গন্তব্যে পৌঁছান এবং পরদিন সকালে অর্থাৎ ৬ এপ্রিল সমুদ্রের জল থেকে নিজে হাতে লবণ তৈরি করে গান্ধীজি লবণ আইন ভঙ্গ করেন এবং ভারতব্যাপী আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেন। সেই সময় সমুদ্রের জল থেকে লবণ তৈরি করা ভারতীয়দের জন্য ছিল নিষিদ্ধ এবং দন্ডনীয় অপরাধ।
গান্ধীজির অহিংসার আদর্শকে মাথায় নিয়ে দিল্লি, বোম্বে, মাদ্রাজ, গুজরাট, কর্ণাটক উত্তরপ্রদেশ ইত্যাদি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। যেসব জায়গা সমুদ্রের নিকটবর্তী সেখানে লবণ আইন ভাঙার কাজ শুরু হয়৷ এছাড়াও মাদক বর্জন, বিলিতি পণ্যের দোকান, সরকারি অফিস-আদালতের সামনে পিকেটিং, রাজনৈতিক পুস্তিকা পাঠ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডও চলতে থাকে। কলকাতার তৎকালীন মেয়র যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত প্রকাশ্য জনসভায় নিষিদ্ধ পুস্তক পাঠ করে রাজদ্রোহ আইন ভেঙেছিলেন। নাগাভূমিতে রানি গুইডালো নামের এক কিশোরী পর্যন্ত এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী, গোপবন্ধু চৌধুরীর মতো নেতারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকেন।
গান্ধীজির আহ্বানে নারীরাও দলে দলে অংশগ্রহণ করেন আন্দোলনে, বিভিন্ন স্থানে পিকেটিং শুরু করেন। কেবলমাত্র দিল্লিতেই প্রায় ১৬০০ মহিলাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সরোজিনী নাইডু, বাসন্তী দেবী, লীলা নাগ, ঊর্মিলা দেবী, কমলা নেহেরুর মতো নারীরা আন্দোলনের নেতৃত্বের দায়িত্ব হাতে তুলে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে খান আবদুল গফফর খানের ঐতিহাসিক লাল কোর্তা বাহিনী সীমান্ত অঞ্চলের সব জায়গায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে এবং সরকারি সব নির্দেশিকা অমান্য করে সভা-সমিতি করতে থাকে।
অন্যদিকে গান্ধীজি স্থির করেন গুজরাটের ধরসানায় সরকারি লবণগোলা অধিকার করবেন। সেই কাজে অগ্রসর হলে ৪ মে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অবশেষে সরোজিনী নাইডু সেই কাজে অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশ নীরব থাকেনি। ধরসানায় সরকার নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচার চালায় অহিংস সত্যাগ্রহীদের উপরে। যেসমস্ত জায়গায় আন্দোলন দানা বেঁধেছিল, প্রায় সর্বত্রই নিষ্ঠুর ও নগ্ন দমননীতি প্রয়োগ করে ব্রিটিশ সরকার। ১ এপ্রিল ‘বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল’ কার্যকরী করা হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়। কংগ্রেসকে বেআইনি ঘোষণা করে তাদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হতে থাকে। সভাসমিতি, মিছিলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। প্রভূত পরিমাণে ধরপাকড় চলতে থাকে, সেইসঙ্গে চলে লাঠি ও গুলি। পেশোয়ারে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রায় ৩০০জন সত্যাগ্রহী প্রাণ হারায়। এমনকি সত্যাগ্রহীদের গৃহে অগ্নিসংযোগ করা হয়, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হয়। মহিলাদের সম্মানে হাত দিতেও কসুর করে না ইংরেজ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পর্যন্ত পুলিশের হাতে নিগৃহীত হয়েছিল। এই নিষ্ঠুর দমননীতির খবর সেসময়ের বিদেশি কাগজের পাতাতেও লিপিবদ্ধ রয়েছে।
যখন এরকম চরম আকার নিয়েছে আইন অমান্য আন্দোলন তখন ১৯৩০ সালের নভেম্বর মাসে সরকার লন্ডনে বিভিন্ন দলের ভারতীয় নেতাদের নিয়ে প্রথম গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেছিল। কংগ্রেস তা বর্জন করলে বৈঠক সফল হয় না। সরকার বোঝে কংগ্রেস ব্যাতীত বৈঠক সম্ভব নয়। তখন কংগ্রেসের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং গান্ধীজিকে মুক্তি দেয়। ১৯৩১ সালের ৫ মার্চ বড়লাট আরউইনের সঙ্গে গান্ধীজির এক চুক্তি হয় যা ‘গান্ধী-আরউইন চুক্তি’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে গান্ধীজি আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়ে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে সম্মত হন। গান্ধীজির এই আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহেরু-সহ আরও অনেকেই তীব্রভাবে নিন্দা করেন। তবে অবশেষে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হলে, গান্ধী-আরউইন চুক্তির শর্তগুলি ভঙ্গ হতে থাকলে কংগ্রেস আর তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেয়নি। ফলস্বরূপ পুনরায় আইন অমান্য আন্দোলন মাথা চাড়া দিতে থাকে। সরকারি দমননীতি তখনও পুরোমাত্রায় চলছে। জওহরলাল, খান আবদুল গফফর খানেরা গ্রেফতার হয়েছেন। সমগ্র বাংলাদেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে তখন। দমননীতি প্রত্যাহার না করলে পুনরায় আন্দোলন শুরু হবে এই মর্মে বড়লাটকে টেলিগ্রাম করেন গান্ধীজি। বড়লাট তাতে কর্ণপাত না করে উল্টে দমননীতি সমর্থন করেন। গান্ধীসহ অনেক কংগ্রেস নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। পুনরায় কংগ্রেসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হতে থাকে। দিকে দিকে লাঠি, গুলি, বিনাবিচারে আটক, দৈহিক নির্যাতন ইত্যাদি চলতে থাকে।
আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি ঘোষণা করলে তার প্রতিবাদে গান্ধীজি আমরণ অনশন শুরু করেন এবং আইন অমান্য আন্দোলন হঠাৎ ঝাপসা হয়ে আসে। আন্দোলনের অভিমুখ অন্যদিকে ঘুরে যায়। পরবর্তীকালে কারামুক্তির পর গান্ধীজি হরিজন আন্দোলনে মন দেন এবং ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহের ডাক দেন। অবশেষে ১৯৩৪ সালে বিহারে ভূমিকম্পের পর সেবছরই ৮ মে পাটনায় নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
আইন অমান্য আন্দোলন কিন্তু ভারতবর্ষের বাইরেও সাড়া জাগিয়েছিল। ভারতবাসী যে স্বাধীনতার জন্য নির্দ্বিধায় সবরকমের ত্যাগের জন্য প্রস্তুত, এই আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়। আইন অমান্য আন্দোলনের প্রভাবের ফলেই পরবর্তীকালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন সফল হয়েছিল। আপাতভাবে আইন অমান্য আন্দোলন অসফল মনে হলেও অনেকেই এই আন্দোলনকে ব্যর্থ বলে মনে করেননি।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘স্বদেশ, সভ্যতা ও বিশ্ব’, জীবন মুখোপাধ্যায়, শ্রীধর পাবলিশার্স, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ, জানুয়ারি, ২০২১।
- https://unacademy.com//
- https://vajiramandravi.com//
- https://www.adda247.com//
- https://chahalacademy.com/
- https://malukaias.com/
- https://en.wikipedia.org/


আপনার মতামত জানান