সববাংলায়

দীনবন্ধু মিত্র

বিভাগঃ , ,

বাংলা নাট্যসাহিত্যের জগতে দীনবন্ধু মিত্র (Dinabandhu Mitra) এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁর লেখা ‘নীলদর্পণ’ নাটক বাংলার নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ও সোচ্চার প্রতিবাদ। বাংলার নীলচাষীদের উপর হয়ে চলা অত্যাচার ও শোষণের প্রতিবাদে তিনি এই নাটক রচনা করেন যা এক যুগান্তকারী রচনায় উন্নীত হয়। শোনা যায়, ‘নীলদর্পণ’ নাটকে ক্ষেত্রমণির উপর রোগ সাহেবের অত্যাচারের দৃশ্য দেখে বহু দর্শক থিয়েটার হলে ঘটনাকে সত্যি মনে করে রোগ সাহেবের চরিত্রাভিনেতার উপর আক্রমণ করে বসতেন। স্বয়ং বিদ্যাসাগর এই নাটক দেখতে এসে রোগ সাহেবের চরিত্রাভিনেতা অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফীর দিকে জুতো ছুঁড়ে মেরেছিলেন বলে কথিত আছে। এই নাটকের অনুবাদকে ঘিরেই রেভারেণ্ড জেমস লঙ গ্রেপ্তার হন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে দীনবন্ধু মিত্রের সাহিত্যজীবনের সূত্রপাত ঘটে। পরে ‘নীলদর্পণ’, ‘নবীন তপস্বিনী’, ‘সধবার একাদশী’, ‘জামাইবারিক’, ‘কমলে কামিনী’ ইত্যাদি বিখ্যাত সব নাটক রচনা করেন তিনি। ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর কলকাতার ন্যাশনাল থিয়েটারের উদ্বোধন হয় দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে।

১৮৩০ সালে নদীয়া জেলার চৌবেড়িয়া গ্রামে দীনবন্ধু মিত্রের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম কালাচাঁদ মিত্র। তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল গন্ধর্বনারায়ণ মিত্র।

গ্রামের পাঠশালাতেই দীনবন্ধু মিত্রের পড়াশোনা শুরু হয়। কিন্তু পাঠশালায় কিছুদিন পড়ার পরে মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁকে স্থানীয় জমিদারের সেরেস্তায় আট টাকা মাসিক বেতনে কাজে যোগ দিতে হয়। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি দীনবন্ধুর প্রবল টান থাকায় পাঁচ বছর সেরেস্তায় কাজ করার পরে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য কলকাতায় চলে আসেন তিনি। তাঁর কাকা নীলমণি মিত্র থাকতেন কলকাতায়। তাঁর কাকার বাড়িতেই বাসন মাজা ও অন্যান্য কাজের বিনিময়ে আশ্রয় ও অন্নসংস্থান হয় দীনবন্ধু মিত্রের। রেভারেণ্ড জেমস লং সাহেব পরিচালিত একটি অবৈতনিক স্কুল থেকে ১৮৫০ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়ে পাশ করেন তিনি। তখনই তিনি পিতৃদত্ত নাম পরিবর্তন করে দীনবন্ধু নাম বেছে নেন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন তিনি। তখন এই কলেজের নাম ছিল হিন্দু কলেজ। কলেজে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন দীনবন্ধু মিত্র। এই সুবাদে তিনি ১৮৫১ সালে উচ্চতর পরীক্ষায় এবং ১৮৫২ সালে সিনিয়র বৃত্তি লাভ করেন।

১৮৫৫ সালে ১৫০ টাকা মাসিক বেতনে পাটনায় পোস্টমাস্টার পদে যোগ দেন দীনবন্ধু মিত্র। ক্রমে তিনি ডাকবিভাগের পরিদর্শকের পদে উন্নীত হন। ডাকবিভাগের কাজে নদিয়া, ঢাকা, ওড়িশা-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করেন। ১৮৭০ সালে লুসাই যুদ্ধের সময় ডাক ব্যবস্থা তদারকির জন্য তাঁকে কাজের সূত্রে কাছাড়ে যেতে হয়। যুদ্ধের মধ্যেও সুষ্ঠুভাবে ডাকব্যবস্থা পরিচালনা করার জন্য ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ১৮৭১ সালে ‘রায়বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। কলকাতায় পোস্টমাস্টার জেনারেলের সহকারী হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেছিলেন দীনবন্ধু মিত্র। কিন্তু ডাকবিভাগের ডিরেক্টর জেনারেলের বিরাগভাজন হওয়ায় চূড়ান্ত অপমানিত হতে হয় তাঁকে। ১৮৭২ সালে ইস্ট ইণ্ডিয়ান রেলওয়ের পরিদর্শক পদে যোগ দেন তিনি।

এই ব্যপ্ত কর্মজীবনের মধ্যেই সাহিত্য সাধনার সূত্রপাত ঘটে দীনবন্ধুর জীবনে। কলেজে পড়াকালীন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় কবিতা লিখতেন তিনি। ঈশ্বর গুপ্তের অনুপ্রেরণাতেই ‘সংবাদ সাধুরঞ্জন’ পত্রিকাতে লেখা শুরু করেন তিনি। তিনি তাঁর সৃষ্টিশীল সাহিত্যের মধ্য দিয়ে কলকাতার বৌদ্ধিক সমাজে খুব দ্রুত পরিচিত হয়ে ওঠেন। সরকারি কাজে গ্রাম-শহর-বন্দর পরিভ্রমণের সুবাদে তাঁর নানাবিধ অভিজ্ঞতা হয় এবং নানাবিধ চরিত্রের মানুষের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে একজন শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হয়ে উঠতে সাহায্য করে। সমকালীন বহু ঘটনা ও তাঁর নিজের জীবনের নানা অসঙ্গতি ধরা পড়েছিল তাঁর নাটকে। নাটক রচনাতেই যথার্থ সিদ্ধি লাভ করেন দীনবন্ধু মিত্র। সমকালীন সমাজজীবনের বাস্তবতা ও অসঙ্গতিকে তিনি তাঁর নাটকে জীবন্তভাবে তুলে ধরেন। তাঁর লেখা কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘সুরধুনী কাব্য’ যার প্রথম খণ্ড প্রকাশ পায় ১৮৭১ সালে আর দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ পায় ১৮৭৬ সালে। এছাড়াও তাঁর লেখা ‘দ্বাদশ কবিতা’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ পায় ১৮৭২ সালে।

তাঁর লেখা প্রথম নাটকটিই সমগ্র বাংলা জুড়ে সাড়া ফেলে দেয়। ১৮৬০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম নাটক ‘নীলদর্পণ’। ঐতিহাসিকভাবে এই নাটক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইউরোপীয় নীলকররা কুঠি স্থাপন করে বাংলার চাষীদের নীল চাষে বাধ্য করতেন এবং এই নীল বিদেশের বাজারে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা করতেন তাঁরা। নীল চাষে জমির উর্বরতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। ফলে খাদ্যশস্যের বদলে নীলচাষে অনিচ্ছুক চাষীদের নীলচাষে বাধ্য করার জন্য শুরু হয় নীলকরদের অত্যাচার। শ্যামচাঁদ’ ও ‘রামকান্ত’ নামে পরিচিত চাবুকগুলি নীলকরদের অত্যাচারের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। অনেক অনিচ্ছুক কৃষককে দূরে কোনও কুঠিতে পাঠিয়ে অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হত আর সেই কৃষকের স্ত্রী-কন্যার উপরে ইংরেজরা বর্বর আচরণ করত। ক্রমে নদীয়া, যশোর ইত্যাদি জেলায় নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দানা বাঁধতে থাকে। শুরু হয় নীলবিদ্রোহ। আর এই বিদ্রোহ দমনের জন্য ইংরেজরা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, নরহত্যা ও নারী ধর্ষণ করে। ১৮৫৯-৬০ সালের নীলবিদ্রোহের সময়কার কৃষকদের দুর্দশা ও নীলকরদের অত্যাচারই ‘নীলদর্পণ’-এর মূল বিষয় হয়ে ওঠে।

নাটকটি প্রকাশকালে দীনবন্ধু মিত্র সরকারী কর্মচারী ছিলেন। তাই নাটক রচয়িতার নামের জায়গায় তিনি লিখেছিলেন ‘কস্যচিৎ পথিকস্য’ যাতে সহজে কেউ বুঝতে না পারে লেখক কে। ‘A Native’ এই ছদ্মনামে নাটকটি এক রাতের মধ্যে অনুবাদ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এই অনূদিত নাটকটি প্রকাশ হওয়া মাত্রই ইংরেজদের টনক নড়ে ওঠে। সেকালে পাঁচশো কপি ছাপা হয় এই অনুবাদ এবং তা বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় প্রকাশক ও মুদ্রকের বিরুদ্ধে। প্রকাশক হিসেবে রেভারেণ্ড জেমস লঙের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা হয়। আরেক বাঙালি কালীপ্রসন্ন সিংহ রেভারেণ্ড জেমস লঙের হয়ে এই জরিমানার অর্থ নিজেই পরিশোধ করেন। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এই নাটকটিই প্রথম কলকাতায় জাতীয় রঙ্গালয়ে বাণিজ্যিকভাবে মঞ্চস্থ হয়। সাধারণ বাঙালি দর্শক এই প্রথম টিকিট কেটে মঞ্চে নাটক দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করেন। শোনা যায়, ‘নীলদর্পণ’ নাটকের অভিনয় দেখতে এসে স্বয়ং বিদ্যাসাগর ক্ষেত্রমণির উপর রোগ সাহেবের অত্যাচারের দৃশ্য দেখে রাগে রোগ সাহেবের চরিত্রাভিনেতা অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফীর উপরে জুতো ছুঁড়ে মেরেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের মতে এই ‘নীলদর্পণ’ নাটকের মধ্যে হ্যারিয়েট বীচার স্টো-র লেখা ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ উপন্যাসের ছায়া রয়েছে।

দীনবন্ধু মিত্রের লেখা অন্যান্য নাটকগুলির মধ্যে ‘নবীন তপস্বিনী’ (১৮৬৩), ‘জামাইবারিক’ (১৮৭২), ‘সধবার একাদশী’ (১৮৬৬), ‘কমলে কামিনী’ (১৮৭৩), ‘বিয়েপাগলা বুড়ো’ (১৮৬৬), ‘লীলাবতী’ (১৮৬৭) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। শেক্সপীয়ারের ‘মেরি ওয়াইভস অফ উইণ্ডসর’ অবলম্বনে লেখা হলেও অত্যন্ত অপরিণত নাটকে পরিণত হয় ‘নবীন তপস্বিনী’ নাটকটি। দীনবন্ধুর লেখা ‘সধবার একাদশী’ তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য নাটক। এই নাটকের মধ্য দিয়ে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে গড়ে ওঠা শিক্ষিত বাঙালি যুবকদের হতাশার ছবি ধরা পড়েছে। ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালির নৈতিক চরিত্রের অধঃপতনের ছবিটি স্পষ্ট তুলে ধরেছিলেন দীনবন্ধু মিত্র। ‘সধবার একাদশী’ নাটকের ‘নিমচাঁদ’ চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। এই নাটক ছাড়া ‘জামাইবারিক’ এবং ‘বিয়েপাগলা বুড়ো’ এই রচনাগুলি আঙ্গিকগতভাবে তাঁর লেখা শ্রেষ্ঠ প্রহসন। নাটক ছাড়াও তিনি দুটি উপন্যাস লিখেছিলেন – ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ এবং ‘পোড়া মহেশ্বর’। দীনবন্ধু মিত্রের লেখা ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ উপন্যাস অবলম্বনে পরবর্তীকালে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় যেখানে মুখ্য চরিত্রে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ অভিনয় আজও বাঙালির স্মরণে রয়েছে।

১৮৭৩ সালের ১ নভেম্বর দীর্ঘদিন অসুস্থতার পর দীনবন্ধু মিত্রের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।