সববাংলায়

দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি

বিভাগঃ ,

এমন কিছু পণ্য আছে যেগুলির ঐতিহাসিক মূল্যের পাশাপাশি সেগুলির সঙ্গে মানুষের আবেগ ও ভরসাও জড়িয়ে আছে। এই তালিকায় যেমন আসে বোরোলিনের নাম তেমনই “দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি”-ও আসে অনিবার্যভাবেই। এক্ষেত্রে পণ্যের নামের তুলনায় সেই পণ্যটির নির্মাতার নামই যেন মানুষের সেই ভরসার জায়গা। তালমিছরি আজ অনেকরকম পাওয়া গেলেও দুলাল চন্দ্র ভড় (Dulal Chandra Bhar) নামটির একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সবচেয়ে প্রাচীন এবং বিশ্বস্ত এই দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি আজও একমেবাদ্বিতীয়ম। তার ঔষধি গুণ যেমন রয়েছে তেমনই তা স্বাদেও মুখরোচক। তার উপরে দুলাল চন্দ্র ভড়ের এই ব্র্যান্ডটির সঙ্গে স্বদেশী আন্দোলনেরও যোগসূত্র রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির ব্যবসায় সফলতার ইতিহাসও। সবমিলিয়ে দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি ইতিহাস এবং উচ্চগুণমান একই সঙ্গে ধারণ করে রয়েছে।

ব্যবসার ব্যপারে বাঙালির তেমন একটা সুনাম নেই। কিন্তু উনিশ শতকের শেষদিক থেকে বেশ কিছু তরুণ বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ব্যবসার কাজে। তাদের প্রেরণা ছিল বিদেশি প্রভাবমুক্ত হয়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়া। সম্পূর্ণ স্বদেশী পদ্ধতিতে দেশীয় পণ্যের ব্যবসা আরম্ভ করে তারা দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে বাঙালি চাইলে ব্যবসাতেও চুড়ান্তভাবে সফল হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, সেই স্বদেশী আন্দোলনের যুগে বাঙালির হাতে গড়ে ওঠা বহু পণ্য আজও কেবল ভারতই নয়, ভারতের বাইরেও আগের মতোই তাদের জনপ্রিয়তাকে বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। পুরোনো সফল কোন ব্র্যান্ডের প্রতি আসলে মানুষের ভরসা ও বিশ্বাস জন্মে যায় সহজেই। বোরোলিন বা ডাবর কোম্পানির উদাহরণ দেওয়া যায় এইসব ক্ষেত্রে। দুলালচন্দ্র ভড়ের তালমিছরিও কিন্তু এই গোত্রেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আজও তার রমরমা এবং জনপ্রিয়তা এতটুকু হ্রাস পায়নি। তালমিছরি বললে মানুষ তার সঙ্গে দুলালচন্দ্র ভড়ের নামটি আপনিই জুড়ে দেন। কীভাবে একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ তাঁদের বংশগত বস্ত্রের ব্যবসা থেকে বেরিয়ে এসে তালমিছরির উদ্ভব ঘটালেন সে এক বিস্ময়কর ঘটনা।

বিশ্বযুদ্ধের বাজারে কাপড়ের ব্যবসায় চলছিল রমরমা। হাওড়ার হাটে বহু বস্ত্র ব্যবসায়ী লাইন দিয়ে তাদের পসরা সাজিয়ে ব্যবসায় লক্ষ্মীলাভ করছিলেন। দুলালচন্দ্রদের পারিবারিক কাপড়ের ব্যবসাও এই সময় ফুলেফেঁপে ওঠে। হাওড়ার হাটে তাঁদের ছিল একাধিক দোকান। সেই বস্ত্র-ব্যবসার সঙ্গে সদ্য কৈশোর অতিক্রান্ত দুলালও জড়িয়ে ছিলেন। বাবা-কাকাদের সঙ্গে তিনিও দোকানে যেতেন ভিড়ের সময় তাঁদেরকে কাজে সাহায্য করবার জন্য। কিন্তু মাত্র উনিশ বছর বয়সী সেই তরুণের মনে নতুন কিছু করবার আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছিল। নিছক কাপড়ের দোকানে বসে ভিড় সামলানো তার পক্ষে একঘেঁয়ে হয়ে গিয়েছিল। ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে বলেই এবং ব্যবসার সঙ্গে হাতে কলমে পরিচয় ঘটেছিল বলেই নতুন ব্যবসাই শুরু করলেন তিনি। তাছাড়া আরেকটি ব্যাপারও এখানে মনে রাখতে হবে। তখন স্বাধীনতা আন্দোলনেরও যুগ। বিদেশি পণ্যের পরিবর্তে দেশী পণ্য ব্যবহার করে স্বনির্ভর হওয়ার মন্ত্রে ভারতবাসীকে দীক্ষিত করে তুলেছেন জাতীয় নেতারা। সেই সময় এবং তার অনেক আগে থেকেই একের পর এক বাঙালি স্বতন্ত্র ব্যবসা শুরু করে যেমন ব্যবসায় বাঙালির বদনাম ঘুচিয়েছিলেন তেমনই ভারতকে অর্থনীতির দিক থেকেও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন। উনিশ বছরের এক তরুণের মধ্যে হয়তো সেই প্রেরণাও কাজ করেছিল তবে নতুন কিছু করবার আকাঙ্ক্ষাই ছিল তাঁর প্রবল।

তখন বাংলার ঘরে ঘরে মিছরির খুব চল। শরবতে কিংবা মুখশুদ্ধি হিসেবে বাঙালি তখন মিছরির খেতেই পছন্দ করত। দুলালচন্দ্র চিনির সাদা মিছরির ব্যবসা শুরু করেছিলেন প্রথমে। এই ব্যবসায়ে তাঁকে সাহস দিয়েছিলেন তাঁর ঠাকুরদা জওহরলাল ভড়। যেহেতু শহরে মিছরির প্রচুর চাহিদা ছিল তাই দুলালের ব্যবসা অল্পদিনের মধ্যেই দারুণ সফলতা পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যার সবসময় নতুন কিছু করবার তাগিদ সে খ্যাতি ও সফলতা পাওয়ার পরেও হাত গুটিয়ে বসে থাকে না কখনও। দুলালচন্দ্রও থাকেননি। সাদা মিছরির কারিগর তো বাজারে অনেক, তাই আরও নতুন কিছু করার চিন্তা করতে শুরু করেন তিনি।

ভড়েরা ছিলেন হুগলির রাজবলহাটের বাসিন্দা। সেখানে তাঁদের প্রচুর জমিজমা ছিল। চার বিঘা জমি জুড়ে ছিল তাঁদের বিশাল বাসস্থান। তাঁদের সীমানার মধ্যেই ছিল অনেক তালগাছ। তা দেখেই দুলালচন্দ্রের মাথায় খেলে গিয়েছিল নতুন ‘আইডিয়া’। তাল মিছরি তার আগেও অবশ্য কেউ কেউ তৈরি করেছিলেন কিন্তু তার বাজার অত ভাল ছিল না। দুলালচন্দ্র তালমিছরিকেই করলেন পাখির চোখ। খাঁটি জিনিস দিয়ে তালমিছরি তৈরি করতে চাইলেন তিনি। তালগুড় জ্বাল দিয়ে তা সাত-আটদিন নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে রেখে দিলে সেই গুড়ের উপরে ও নীচে স্ফটিকের মতো মিছরি জমাট বাঁধে। বিশেষ পদ্ধতিতে মাঝের জলীয় অংশ বাদ দিয়ে সেই স্ফটিক অংশটি আলাদা করে ছোট ছোট মাপে কেটে নিয়ে তালমিছরি তৈরি করা হয়। চৈত্র মাসের মাঝামাঝি থেকে শ্রাবণ মাসের প্রথম অবধিই মূলত মিছরি তৈরির সময়, কারণ তালও এই সময়তেই পাওয়া যায়।

অনেক পরিশ্রমের পর ১৯৩৪ সালে বাজারে প্রথম দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি নামক একটি পণ্যের প্রবেশ ঘটে। বাজারে সে-পণ্য আসতেই অভাবনীয় সাড়া ফেলে দেয়। তবে সমস্যা ছিল যে, ব্যবসায় তখন ব্র্যান্ড বা ট্রেডমার্কের কোন ব্যবস্থা ছিল না। ফলত, এই ব্যবসা দুলালচন্দ্রের একান্তই নিজস্ব হওয়ার পথে অন্তরায় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দুলালচন্দ্র তাতে দমে যাননি। ব্রিটিশ সাহেবদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে তাদের আস্থা তিনি অর্জন করেছিলেন এবং অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পরে ১৯৪৪ সালে দুলালচন্দ্রের ব্র্যান্ডটি নিবন্ধিত হয়েছিল। পণ্যটির রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ছিল ৩৯৬৫। আজ অবশ্য এই রেজিষ্ট্রেশন নম্বরের কোনো প্রয়োজন পড়ে না, তবুও তালমিছরির শিশির গায়ে আঁটা লেবেলে এই নম্বরটি দেখা যায়। এর একটা ঐতিহাসিক মূল্যও তো আছে।

রমরমিয়ে চললেও মাঝেমধ্যেই নানারকম মামলা-মোকদ্দমার সম্মুখীন হয়েছে তাঁদের ব্যবসা। দুলালচন্দ্রের জীবিতাবস্থাতেই তাঁর ভাই সনাতনের সঙ্গে দুলালের একটি  মামলা হয়েছিল। সেই মামলায় দুলালচন্দ্রের পক্ষে লড়াই করেছিলেন ধুরন্ধর আইনজীবী সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। মামলার মূল বিষয় ছিল ব্র্যান্ডটির নাম আদতে কী হবে, ‘দুলালের তালমিছরি’ নাকি ‘দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি’। বিচারপতি মঞ্জুলা বসু অবশ্য বলেছিলেন যে, বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়া হোক, যাতে ব্যবসার কোন ক্ষতি না হয়। সনাতন এবং দুলালচন্দ্র ভড় এরপর আলাদা হয়ে যান। সনাতন আসল যে ব্র্যান্ড নাম অর্থাৎ ‘দুলালের তালমিছরি’, সেটিই ব্যবহার করতে থাকেন কিন্তু ঠিক হয় তিনি নির্মাতা হিসেবে আর দুলালচন্দ্র ভড়ের নামটি ব্যবহার করতে পারবেন না। অন্যদিকে দুলালচন্দ্র তাঁর ব্র্যান্ডটিকে নতুন করে সাজিয়ে ‘দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি’ নামেই বাজারে ছাড়েন এবং লেবেলে নিজের সই ও ছবিটি জুড়ে দেন। ২০০০ সালের ২৭ জুন দুলালচন্দ্রের মৃত্যুর পরেও এই ব্র্যান্ডনেমের অধিকার কার থাকবে তা নিয়েও উত্তরাধিকারীদের মধ্যে মামলা চলেছে এবং চলছে। কিন্তু দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি বিক্রিতে তার কোন প্রভাব পড়েনি। শিশিতে দুলালচন্দ্রের স্মিতহাস্য মুখের ছবি দেখে বাঙলি আজও একইরকম ভরসা পায় এই পণ্যটির বিশুদ্ধতা বিষয়ে।

এমন বিশুদ্ধতা কীভাবে তাঁরা বজায় রেখে আসছেন সেও তো একটা প্রশ্ন। জানা যায় যে, এই তালমিছরি তৈরির জন্য একমাত্র তমলুকের বিশুদ্ধ তালগুড়ই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাছাড়া যে কারিগরেরা আগে এই তালমিছরি বানাত, তারাই বংশানুক্রমে আজও এই ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত। ফলত, দুলালচন্দ্র ভড়ের তালমিছরির মান কখনও পড়েনি। কোনরকম ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডার, সেলসম্যান বা বড়সড় একাধিক আউটলেট কিছুই তেমন নেই, তবুও দুলালচন্দ্র ভড়ের তালমিছরির বাজার ঈর্ষনীয়। বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে বিহার, উড়িষ্যা, আসাম এবং গুজরাটের মতো প্রতিবেশী রাজ্যেও চলে গেছে এই তালমিছরি। বড়োবাজারে তাদের একটি অফিস রয়েছে। মিছরির অর্ডার দেওয়ার জন্য অনেকেই সেখানে আসেন। ক্রেতারা অগ্রিম অর্থ প্রদান করে এবং তালমিছরি সময়মতো পৌঁছে যায় তাদের কাছে। দুলালচন্দ্র যতদিন বেঁচেছিলেন, প্রতিদিন তিন ট্রাক ভর্তি মিছরি পাঠাতে হত ক্রেতাদের। আধুনিক এই পণ্যসর্বস্ব বিশ্বে দাঁড়িয়ে কোনরকম ঝাঁ-চকচকে বিজ্ঞাপন, সেলিব্রিটির মুখ, ঘনঘন প্রচার এসব ছাড়াই দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরির যে বিশাল বাজার তার পিছনে এর ঔষধি গুণ, এর বিশুদ্ধতা তো বটেই, সেইসঙ্গে হয়ত জড়িয়ে আছে নস্টালজিয়ার প্রতি মানুষের আবেগ, পুরাতন জিনিসের ওপর বিশ্বাস এবং এর ঐতিহাসিক মূল্য।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading