সববাংলায়

জ্যোতির্লিঙ্গ ঘৃষ্ণেশ্বর

ঘৃষ্ণেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ (Grishneshwar Jyotirlinga) মন্দিরটি মহারাষ্ট্রের সম্বাজিনগর জেলার ভেরুল গ্রামে অবস্থিত। ঔরঙ্গাবাদ শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার এবং ভারতের একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান ইলোরা গুহা থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে এই ঘৃষ্ণেশ্বর মন্দিরটি অবস্থিত।  এই মন্দিরটির উল্লেখ শিবপুরাণ, স্কন্দপুরাণ এমনকি রামায়ণ ও মহাভারতেও পাওয়া যায়। ঘৃষ্ণেশ্বরের অর্থ করুণার প্রভু। শিব এখানে করুণাসিন্ধু রূপেই পূজিত হয়ে থাকেন। মুঘল আমলে বারংবার ধ্বংস ও পুনির্মিত হয়েছিল এই মন্দির। লাল পাথরের তৈরি এই মন্দিরটি মহারাষ্ট্রের দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম।

শিবপুরাণ অনুযায়ী একদা ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে দুজনের তুমুল বিবাদ উপস্থিত হয়। সেই বিবাদ সন্তোষজনক পরিণতিতে না পৌঁছে চলতেই থাকলে মহাদেব তখন একটি আলোকরশ্মির স্তম্ভ রূপে তাঁদের দুজনের মাঝখানে প্রকট হন। ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু কেউই সেই আলোকস্তম্ভের আদি ও অন্ত খুঁজে পাননি। শেষমেশ তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই দিব্য জ্যোতিই শ্রেষ্ঠতম। এভাবেই জ্যোতির্লিঙ্গের ধারণাটির উদ্ভব হয়।

বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে অন্যতম হল ঘৃষ্ণেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ। এই জ্যোতির্লিঙ্গকে ঘিরে নানারকম কিংবদন্তী প্রচলিত রয়েছে। একটি কিংবদন্তী অনুসারে সুধর্মার স্ত্রী সুদেহা কোনো সন্তানের জন্ম দিতে না পেরে ভীষণই মনোকষ্টে ভুগছিলেন। সুধর্মা তাঁকে শত বোঝানোর চেষ্টা করলেও সুদেহা কিছুতেই বুঝতে চান না, পুত্রসন্তান ছাড়া জীবনই বৃথা বলে মনে করেন তিনি। সুধর্মা ধ্যান বা পূজাঅর্চনায় নিবিষ্ট হলেও সুদেহা একা একা সন্তান না-থাকার বেদনা বয়ে বেড়াতে লাগলেন। এমনকি সন্তানহীনা হওয়ার কারণে প্রতিবেশীদের নানারকম খোঁটা, কটু মন্তব্য সহ্য করতে হত তাঁকে। অবশেষে স্বামী সুধর্মাকে পুনরায় বিবাহ করতে বলেন এবং পাত্রী হিসেবে সুদেহা নিজের বোন ঘুশ্মাকে ঠিক করেন। এই বিবাহ সুদেহাকে যে পরবর্তীকালে  সুখ দেবে না সুধর্মা সেকথাও বলেছিলেন, কিন্তু সন্তানহীনা, নাছোড়বান্দা সুদেহা সেই কথায় কর্ণপাত করেননি। অবশেষে সুদেহার উদ্যোগেই ঘুশ্মা এবং সুধর্মার বিবাহ হয়। স্বামীর কথামতো ঘুশ্মা প্রতিদিন একটি শিবলিঙ্গ গড়ে তাঁর পূজা করে নিকটবর্তী পুকুরে তা বিসর্জন দিয়ে দিতেন। ঘুশ্মার একনিষ্ঠ শিবভক্তির কারণেই শিবের কৃপায় যথাসময়ে ঘুশ্মার একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। আনন্দে ভরে যায় ঘুশ্মা ও সুধর্মার জীবন, কিন্তু অন্যদিকে সুদেহার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হতে শুরু করে। কিছুদিন পর এক ব্রাহ্মণ সুধর্মা ও ঘুশ্মার ছেলের জন্য এক পাত্রীর সম্বন্ধ নিয়ে আসেন। ঘুশ্মার পুত্রের বিয়ে হয়ে যায়। পুত্র ও পুত্রবধূকে নিয়ে আহ্লাদে মেতে ওঠেন ঘুশ্মা, কিন্তু সুদেহার ঈর্ষায ক্রমশ বাড়তে থাকে। একদিন রাত্রে ঘুশ্মার নিদ্রামগ্ন পুত্রকে সুদেহা হত্যা করেন এবং নিকটবর্তী সেই পুকুরে মৃতদেহ নিক্ষেপ করেন। পরদিন সকালে ঘুশ্মার পুত্রবধূ এবং সুধর্মা এই বিভৎস খবর জানতে পেরে শিবের ধ্যানে রত ঘুশ্মাকে খবরটি দেন। ঘুশ্মা খবর শুনে এতটুকু বিচলিত হন না, বরং ভাবেন পরমেশ্বর যা সঠিক মনে ভেবেছেন তাই করেছেন। একমনে শিবের উপাসনা করে ঘুশ্মা যখন শিবলিঙ্গটি পুকুরে বিসর্জন করে ফিরে আসছেন তখন পিছন থেকে তাঁর পুত্র ডেকে ওঠে এবং বলে সে পুনর্জন্ম লাভ করেছে। ছেলের পুনর্জন্মেও এতটুকু উচ্ছ্বাস বা বিচলিত ভাব ছিল না ঘুশ্মার মধ্যে। শিব ঘুশ্মার স্থিরতায় মুগ্ধ হয়ে জ্যোতির্ময় রূপে তাঁকে দেখা দেন এবং সুদেহার কৃত অপরাধের কথা বলেন। তবে শাস্তির পরিবর্তে ঘুশ্মা সুদেহাকে ক্ষমা করে দিতে বলেন এবং তিনি শিবকে সেইস্থানেই অবস্থান করার জন্য অনুরোধ করেন।

অন্য একটি কিংবদন্তী অনুসারে ভেরুলের রাজা একদিন মৃগয়াতে গিয়ে ঋষিদের আশ্রমে বসবাসকারী প্রাণীদের হত্যা করছিলেন। এতে ঋষিরা ক্ষুব্ধ হন এবং রাজাকে অভিশাপ দেন যে রাজার শরীরে পোকামাকড়ের ঝাঁক এসে বাসা বাঁধবে। তারপর পোকামাকড়ের ঝাঁক এসে রাজার শরীরে বাসা বাঁধে এবং রাজা প্রচণ্ড কষ্ট পেতে থাকেন। তারপর বনে ঘুরতে ঘুরতে তিনি একটা জলাশয় দেখতে পেলেন। যখন তিনি সেই জলাশয় থেকে জলপান করতে শুরু করলেন, অলৌকিকভাবে তার শরীর থেকে পোকাগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল। অভিভূত রাজা সেই স্থানে বসে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। তপস্যায় খুশি হয়ে ভগবান ব্রহ্মা রাজাকে আশীর্বাদ করেন এবং একটি হ্রদ তৈরি করেন যা শিবালয় নামে পরিচিত হয়। কিংবদন্তী অনুসারে ভগবান শিব এবং দেবী পার্বতী শিবালয়ের কাছেই বাস করছিলেন। একদিন দেবী সিঁদুর লাগাতে গিয়ে ভুল করে শিবালয়ের জলে সিঁদুর মিশিয়ে ফেলেন। জলে মেশা সিঁদুর থেকে একটি শিবলিঙ্গ তৈরি হয় এবং সেই লিঙ্গ থেকে আলো বেরোতে থাকে। সিঁদুর বা কুমকুম থেকে লিঙ্গের উদ্ভব হওয়ায় এই জ্যোতির্লিঙ্গকে প্রথমে কুমকুমেশ্বর বলা হত। কিন্তু ঘর্ষণক্রিয়ার ফলে শিবলিঙ্গটির নির্মাণ হওয়ায় দেবী এটির নাম রাখেন ঘৃষ্ণেশ্বর।

কবে প্রথম ঘৃষ্ণেশ্বর মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল সেই নিয়ে বিশেষ তথ্য পাওয়া না গেলেও ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৩ এবং ১৪ শতকে দিল্লি সালতানাত এই মন্দিরের কাঠামোটি ধ্বংস করে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে মুঘল-মারাঠা সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েকবার মন্দিরটির পুনর্নির্মাণ হয় এবং পুনর্বার ধ্বংসও হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের পিতামহ মালোজি ভোসলে মন্দিরটির পুননির্মাণ করেন। মন্দিরের বর্তমান কাঠামোটি ১৭৩০ সালে মালহার রাও হোলকারের পত্নী গৌতমী বাই হোলকার দ্বারা নির্মিত হয়। পরবর্তীকালে ইন্দোরের রাণী অহল্যাবাই হোলকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পুনরায় মন্দিরের সংস্কারসাধন করা হয়।

ঘৃষ্ণেশ্বর মন্দিরের স্থাপত্যকর্ম অসাধারণ। এই ঘৃষ্ণেশ্বর মন্দিরটি ৪৪,০০০ বর্গফুট জায়গার ওপরে কালো এবং লাল আগ্নেয় পাথর দ্বারা নির্মিত। মন্দিরটির চূড়া পাঁচটি স্তরবিশিষ্ট। চূড়ায় রয়েছে একটি স্বর্ণকলস। মন্দিরের ভিতরের এবং বাইরের দেওয়ালে প্রচুর ভাস্কর্য ও সূক্ষ্ম নকশা লক্ষ করা যায়। এগুলি সবই প্রায় দ্রাবিড় স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। মন্দির শিখরে খোদাই করা বিষ্ণুর দশাবতারের ভাস্কর্যও দেখা যায়। বিভিন্ন দেবদেবীর ভাস্কর্যও মন্দিরগাত্রে লক্ষ করা যায়। মন্দির চত্বরে একটি কুন্ডও রয়েছে, যার জলকে পবিত্র বলে মনে করা হয়। এই মন্দিরে ২৪টি স্তম্ভ-বিশিষ্ট একটি দরবার হল রয়েছে, যেখানে ভগবান শিবকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বিভিন্ন কিংবদন্তি এবং পৌরাণিক কাহিনী দেয়ালগাত্রে খোদিত রয়েছে। এই দরবার হলে শিবের বাহন নন্দীর একটি বিশাল মূর্তি বিরাজ করছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে জ্যোতির্লিঙ্গটি পূর্বমুখী। ঐতিহ্য অনুসারে এই মন্দিরের গর্ভগৃহে পুরুষদের খালি বুকে প্রবেশ করতে হয়।

বছরের বিভিন্ন সময়ে এই ঘৃষ্ণেশ্বর মন্দিরে বিশেষ কিছু উৎসব পালিত হয়ে থাকে। প্রথমেই বলতে হয় মহাশিবরাত্রির কথা। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের দিকে এই উৎসবটি খুব ধুমধাম করে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ভক্তেরা উপবাস করে জ্যোতির্লিঙ্গের দর্শন এবং পূজার জন্য এই বিশেষ দিনটিতে ভিড় করেন ঘৃষ্ণেশ্বর মন্দিরে। অনেকদিন ধরে এই উৎসব চলে। ভজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত হয়ে থাকে মন্দির প্রাঙ্গণ। দ্বিতীয়ত শ্রাবণ মাসের উৎসবের উল্লেখ করতে হয়। মূলত জুলাই-আগস্ট মাসে এই উৎসব পালিত হয়। শ্রাবণ মাসকে বিশেষত ভগবান শিবের মাস বলেই গণ্য করা হয়। শ্রাবণ মাসের সোমবারগুলিতে ভক্তেরা উপবাস করে জ্যোতির্লিঙ্গের পূজা করেন। ঘৃষ্ণেশ্বর মন্দিরে অনুষ্ঠিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হল অন্নকূট উৎসব। মূলত কার্তিক মাসে অর্থাৎ অক্টোবর-নভেম্বর মাস নাগাদ এই উৎসব অনুষ্ঠিত। ভক্তদের মতে এই কার্তিক মাসটিও ভগবান শিবকে উৎসর্গীকৃত আরও একটি শুভ মাস। এরপর বলতে হয় গণেশ চতুর্থী উৎসবের কথা। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে মূলত এই উৎসব পালিত হয়ে থাকে। ভগবান গণেশের জন্মদিন উপলক্ষে এই দিন বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান-সহ মন্দিরে ধুমধাম করে উৎসবটি পালন করা হয়। নবরাত্রি হল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব যা এই ঘৃষ্ণেশ্বর মন্দিরে উদযাপিত হয়। মূলত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে দূর্গাপুজোর সময়তেই এই নবরাত্রি উৎসবটি চলে। নয়টি রাত্রির পর দেবী দূর্গার পূজা এবং অবশেষে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। এরপরেই অক্টোবর-নভেম্বর মাসে আসে দীপাবলি উৎসব, যা এই মন্দিরের আরও এক প্রধান আকর্ষণ। গোটা মন্দির চত্বর দীপমালায় সজ্জিত করে তোলা হয় এবং বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়।

জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি লাভের আশায় ঘৃষ্ণেশ্বর প্রভুর কাছে সারাবছরই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ তাঁদের দুঃখ-দুর্দ্দশা নিয়ে ছুটে আসেন। ভক্তেরা বিশ্বাস করেন যে, এই ঘৃষ্ণেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের পূজা করা অন্য সমস্ত জ্যোতির্লিঙ্গের পূজার সমান।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. পৌরাণিক গল্পসমগ্র :- শিবপুরাণ, শতদ্রুশোভন চক্রবর্তী, পুস্তক বিপণি, মহালয়া আশ্বিন ১৩৬৪, পৃষ্ঠা :- ৯৩-৯৮
  2. https://en.m.wikipedia.org/
  3. https://myoksha.com/
  4. https://www.artofliving.org/
  5. https://historyofindia1.com/
  6. https://pravase.co.in/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading