সববাংলায়

কাদম্বিনী বসু গাঙ্গুলী

কাদম্বিনী বসু গাঙ্গুলী ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক যিনি ডাক্তারি শাস্ত্রের একাধিক বিদেশি ডিগ্রি (LRCP (Edinburgh), LRCS (Glasgow), and GFPS (Dublin) অর্জন করেছিলেন। তিনি এবং চন্দ্রমুখী বসু একই সাথে ভারত তথা সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট ছিলেন। যুগ্ম ভাবে কাদম্বিনী এবং  আনন্দীবাই গোপালরাও জোশি ছিলেন প্রথম ভারতীয় মহিলা চিকিৎসক, যাঁরা পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে প্র্যাকটিস করার যোগ্যতা অর্জন করেন।

কাদম্বিনী বসুর জন্ম হয় ১৮৬১ সালের ১৮ জুলাই বিহারের ভাগলপুরে। তাঁর বাবা ব্রজকিশোর বসু ছিলেন ভাগলপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম এবং নারীশিক্ষায় অত্যন্ত উৎসাহী।  উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি মেয়েকে ভাগলপুর থেকে কলকাতায় নিয়ে আসেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য কাদম্বিনী ভর্তি হন কলকাতার হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে। সেই বছরই স্কুলটি স্থাপিত হয়েছিল (পরবর্তী কালে স্কুলটির নাম হয় বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়)। এরপর কাদম্বিনী  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষা  জন্য মনস্থির করলেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথা মেনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও নারীদের প্রবেশাধিকার ছিল না।  দ্বারকানাথ অসম্ভব লড়াই করে অবশেষে নারীদের  প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসার অনুমতি জোগাড় করেন। ১৮৭৭ সালে  কাদম্বিনীর সাথে দেরাদুন থেকে আগত খ্রীস্টান বাঙালি চন্দ্রমুখী বসুও এই পরীক্ষায় বসেন। ১৮৭৮ সালে কাদম্বিনী প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন। এই পরীক্ষায় মাত্র এক নম্বরের জন্য তিনি প্রথম শ্রেণীতে পাস করার সুযোগ হারান।

১৮৭৮ সালে এখান থেকে এন্ট্রান্স পাশ করার পর তিনি ভর্তি হন বেথুন কলেজে। ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন-এ ডব্লিউ ক্রফট শিক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী কাদম্বিনীর জন্যই বেথুন স্কুলকে কলেজে রূপান্তরিত করার কথা সরকার ভাবে এবং শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়। সমগ্র বাংলায় এ নিয়ে বাংলায় সাড়া পড়ে গেছিল। এক জন ছাত্রী ও এক জন লেকচারার নিয়ে শুরু হয়েছিল বেথুন কলেজ। এখান থেকে বিজ্ঞান শাখায় তিনি  ১৮৮২ সালে গ্র্যাজুয়েট হন। চন্দ্রমুখী হন ফ্রি চার্চ অব স্কটল্যান্ড কলেজ থেকে। তাঁরাই ছিলেন প্রথম ভারতীয় নারী যাঁরা সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে প্রথম মহিলা হিসেবে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার দুর্লভ সম্মান অর্জন করেছিলেন।  বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে এই দুই মহিলার ডিগ্রি নেওয়া দেখতে এত ভিড় হয়েছিল যে ভিড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে ট্রামলাইন পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। কবি হেমচন্দ্র এই দুই নারীকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন।

স্নাতক হওয়ার পর ডাক্তারি পড়ার জন্য মনস্থির করেন কাদম্বিনী। অনেক লড়াইয়ের পর অবশেষে তিনি ১৮৮৪ সালে মেডিক্যাল কলেজের ইতিহাসে প্রথম ছাত্রী হিসেবে এখানে ভর্তি হন। মেডিক্যাল কলেজে ঢোকার পরেই তিনি তাঁর শিক্ষক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে বিয়ে করেন। দ্বারকানাথ বিখ্যাত সমাজসংস্কারক ও মানবদরদী সাংবাদিক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। যখন তিনি বিয়ে করেন তখন ৩৯ বছর বয়সের বিপত্নীক তিনি। কাদম্বিনীর বয়স তখন ছিল একুশ।

তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ মহিলা হিসেবে তাঁর ডাক্তারি পড়া নিয়ে এতই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে বঙ্গবাসী কাগজে তাঁকে হেয় করে একটি কার্টুন প্রকাশিত হয়েছিল যাতে দেখানো হয়েছিল, কাদম্বিনী তাঁর স্বামী দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর নাকে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। তার নীচে লেখা ছিল কাদম্বিনীকে নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিকর নানা মন্তব্য। বঙ্গবাসী কাগজের সম্পাদক মহেশ চন্দ্র পালের এই অসভ্যতাকে মোটেই প্রশ্রয় দেননি কাদম্বিনী বা তাঁর স্বামী দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। আদালতে অভিযোগ জানান তাঁরা। তাঁদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন ডাঃ নীলরতন সরকার, শিবনাথ শাস্ত্রীর মত মানুষরা। বিচারে মহেশবাবুর ছ’মাসের জেল এবং একশো টাকা জরিমানা হয়

তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজই কেবল নয়, তাঁর ডাক্তারি পড়া নিয়ে মেডিক্যাল কলেজের গোঁড়া শিক্ষকরাও বিরোধিতা করতে থাকেন। এক বাঙালি শিক্ষক যিনি নারীশিক্ষার প্রবল বিরোধী ছিলেন তিনি কাদম্বিনীর ওপর এতই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে মেটেরিয়া মেডিকা এবং তুলনামুলক শারীরবিদ্যা এই দুটি পত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে ফেল করিয়ে দেন। ফলস্বরূপ তাঁর আর এমবি (M.B) পরীক্ষা পাস করা হলনা। পরিবর্তে ‘গ্র্যাজুয়েট অফ দ্য মেডিক্যাল কলেজ অব বেঙ্গল’ বা জিএমসিবি সার্টিফিকেট দেওয়া হয় তাঁকে। এরপর ইডেন হাসপাতালে কাজের সুযোগ এলেও যেহেতু ডাক্তারির এমবি বা এলএমএসের ডিগ্রি তাঁর ছিল না, তাই সেখানে তাঁকে নার্সের মর্যাদা দেওয়া হত। চিকিৎসক হিসেবে কোন মর্যাদা তিনি পেতেন না সেখানে। এরপরই কাদম্বিনী ঠিক করেন ইংল্যান্ড গিয়ে ডাক্তারির বিদেশী ডিগ্রি তাঁকে অর্জন করতেই হবে। মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন তিনি সরকারের স্কলারশিপ পান যা ছিল মাসে ২০ টাকা। তিনি পাঁচ বছর মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করার পর ইংল্যান্ড যাবার আগে ১৮৮৮ সালে কিছুদিন লেডি ডাফরিন মহিলা হাসপাতালে মাসিক ৩০০ টাকা বেতনে কাজ করেছিলেন। কাদম্বিনীর নাম এত দূর অবধি ছড়িয়ে গেছিল যে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল পর্যন্ত তাঁর  এক বন্ধুকে চিঠিতে কাদম্বিনীর বিষয়ে জানতে চেয়ে লিখেছিলেন – “ভারতের মতো গোঁড়া দেশের একটি মেয়ে বিয়ের পর ডাক্তারি পড়ছে এবং একটি বা দু’টি সন্তানের জন্মের সময়েও মাত্র তেরো দিন কলেজ কামাই করেছে এবং সম্ভবত একটি লেকচারও মিস করেনি!”

কাদম্বিনী ডাক্তারি পাশ করেন ১৮৮৬ সালে। তিনি এবং আনন্দী গোপাল জোশি প্রথম ভারতীয় মহিলা ডাক্তার, যাঁরা পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে প্র্যাকটিস করার যোগ্যতা অর্জন করেন। ১৮৯৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মিস প্যাশ নামে মহিলার সঙ্গিনী হয়ে জাহাজে একাই বিদেশযাত্রা করেছিলেন কাদম্বিনী। মাত্র তিন মাসেই তিনিই ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক হিসেবে LRCP (Edinburgh), LRCS (Glasgow), and GFPS (Dublin) ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।

তাঁকে ফিটনে চেপে রোগী দেখতে যেতে হয়েছে কখনও কখনও বেশ রাতে। এছাড়া নিয়মিত অস্ত্রোপচারও করতেন তিনি। সেই যুগে দাঁড়িয়ে প্রাইভেট চেম্বার খুলে কাগজে নিজের বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলেন তিনি।

১৮৮৯ সালে বোম্বেতে কংগ্রেসের পঞ্চম অধিবেশনে প্রথম  ছয় নারী প্রতিনিধির মধ্যে কাদম্বিনী ছিলেন অন্যতম।  পরের বছর ১৮৯০ সালে তিনি কলকাতায় কংগ্রেসের ষষ্ঠ অধিবেশনে বক্তব্য রেখেছিলেন। কাদম্বিনী ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম মহিলা বক্তা। তিনি  হেনরি পোলক প্রতিষ্ঠিত ট্রানসভাল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি এবং ১৯০৭ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত মহিলা সম্মেলনের সদস্যও ছিলেন । ১৯১৪ সালে তিনি মহাত্মা গান্ধীর সম্মানে কলকাতায় আয়োজিত সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের অধিবেশনে সভাপতি ছিলেন। কাদম্বিনী চা বাগানের শ্রমিকদের শোষণের বিষয়ে তাঁর স্বামীর মতই প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন। কবি কামিনী রায়ের সাথে কাদম্বিনী  ১৯২২ সালে বিহার এবং ওড়িশার নারীশ্রমিকদের অবস্থা তদন্তের জন্য সরকারী প্রতিনিধি হিসেবে পর্যবেক্ষণে গিয়েছিলেন।

সম্পর্কে কাদম্বিনীর সৎ মেয়ে বিধুমুখী ছিলেন বিখ্যাত লেখিকা লীলা মজুমদারের জেঠিমা।  লীলা মজুমদার তাঁর ‘পাকদণ্ডী’ গ্রন্থে কাদম্বিনী সম্পর্কে লিখেছেন ‘‘….তাঁর জীবনটাই এক আশ্চর্যের ব্যাপার। আমি যে সময়ের কথা বলছি, তার অনেক আগেই তিনি বিধবা হয়েছিলেন। বয়সে জ্যাঠাইমার চাইতে সামান্য বড় ছিলেন, দেখে মনে হত অনেক ছোট। মস্ত দশাশই চেহারা, ফুটফুট করত গায়ের রঙ, থান পরে এবং এত বয়সেও রূপ চাপা পড়ত না, তবে কেমন একটু কড়া ধরনের ভাব। আমরা দূর থেকে দেখতাম।’’

১৯২৩ সালের ৩ অক্টোবর কাদম্বিনী বসু গাঙ্গুলীর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরে তাঁর ব্যাগ থেকে ৫০ টাকা পাওয়া গেছিল এবং সেই টাকা তাঁর শেষকৃত্যে ব্যবহার হয় তাঁর সম্মানেই।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading