ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু আবিষ্কারে বিখ্যাত ইংরেজ বিজ্ঞানী স্যার রোনাল্ড রসের সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (Kishori Mohan Bandyopadhyay)। দুর্ভাগ্যবশত স্যার রোনাল্ড রসের গবেষণার তথা আবিষ্কারের সমান ভাগীদার হলেও নেহাতই একজন ভারতীয় হওয়ার দরুণ শারীরবিদ্যা অথবা ঔষধশাস্ত্রে নোবেল পাননি কিশোরীমোহন। তৎকালীন বাংলার একমাত্র ভ্রাম্যমান চিত্রগ্রাহক লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরীর সাহায্যে বিভিন্ন স্লাইড তৈরি করে গ্রামে গ্রামে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে সতর্কতা ছড়িয়ে দিতেন কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের সময় মাছের ডিম সংগ্রহের সূক্ষ্ম জাল দিয়ে তিনি মশারি বানানোর কাজে উৎসাহিত করেন তাঁতিদের। দেশীয় কামার, কুমোর, জেলে প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষদের সাহায্য করার জন্যে পানিহাটিতে একটি কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক স্থাপন করেন কিশোরীমোহন। পরবর্তীকালে সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্বাক্ষরিত একটি স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি।
১৮৮৩ সালে কলকাতা শহরের এন্টালিতে মামারবাড়িতে কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ননীলাল চট্টোপাধ্যায় পেশাগতভাবে ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষার শিক্ষক ছিলেন এবং তাঁর ঠাকুরদা দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন আয়ুর্বেদশাস্ত্রে একজন সুপণ্ডিত। তাঁর দুই দাদা যথাক্রমে লালমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ও হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। পানিহাটিতে তাঁদের বসবাস ছিল ‘নিলামবাটী’ নামক একটি বাড়িতে। এই বাড়িটির মূল ফলকটি এখনও অক্ষত থাকলেও কিশোরীমোহনের উত্তরাধিকারীরা অন্যত্র চলে গিয়েছেন। যদিও তাঁর পরিবার মূলত বাংলাদেশের যশোর জেলা থেকে কলকাতার পানিহাটিতে চলে এসেছিল। মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই বন্ধু অনাদি চট্টোপাধ্যায়ের বোন ক্ষেত্রপ্রসাদী চট্টোপাধ্যায়কে বিবাহ করেন কিশোরীমোহন। পরবর্তীকালে তাঁর কন্যা অমিতার দুই পুত্র সমীর রায়চৌধুরী এবং মলয় রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের হাংরি আন্দোলনের জনক হয়ে ওঠেন।
পানিহাটির একটি স্থানীয় স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন কিশোরীমোহন। সেই স্কুলে তাঁর বাবা এবং দাদারা শিক্ষকতা করতেন। তারপর মামারবাড়িতে এসে বৌবাজার নিকটস্থ একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক উত্তীর্ণ হন কিশোরীমোহন।
স্নাতক উত্তীর্ণ হয়ে পরিবারের ধারা অনুযায়ী একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষকতা করতে শুরু করেন কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় আর সেভাবেই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৮৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কিশোরীমোহন জানতে পারেন যে বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার রোনাল্ড রস একটি গবেষণার কাজে একজন দক্ষ সহকারীর সন্ধান করছেন। অনেক আবেদনকারীর মধ্য থেকে কিশোরীমোহনের দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে রোনাল্ড রস তাঁকে নিযুক্ত করেন। সে সময় ক্যালকাটা প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতালে গবেষণারত ছিলেন স্যার রোনাল্ড রস। ১৯০২ সালে নোবেল পেলেও নোবেল ভাষণে বা কোন লেখাতেই রোনাল্ড কিশোরীমোহনের নামোল্লেখ করেননি। ম্যালেরিয়ার জীবাণুর সমগ্র জীবনচক্র আবিষ্কারের কারণেই শারীরবিদ্যা অথবা ঔষধশাস্ত্রে নোবেল পেয়েছিলেন স্যার রোনাল্ড রস। তাঁর নোবেল পাওয়ার পরে পরেই কিশোরীমোহনের কৃতিত্বকে স্বীকৃতি জানাতে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, শিবনাথ শাস্ত্রী, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় একযোগে লর্ড কার্জনের কাছে একটি আবেদন করেন। তাঁদের মিলিত আবেদনে সাড়া দিয়ে ১৯০৩ সালে লর্ড কার্জনের উদ্যোগেই দিল্লির দরবারে কনটের ডিউক থাকাকালীন সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্বর্ণপদক প্রদান করা হয় কিশোরীমোহনকে। দিল্লি থেকে ফেরার পর কলকাতার সেনেট হলে বাঙালি ডাক্তার এবং বিজ্ঞানীরা তাঁকে সম্মানিত করেন। চিত্তরঞ্জন দাশ সেই সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন। প্রধান বক্তা ছিলেন উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল প্রমুখ।
ম্যালেরিয়ার সমস্যা থেকে কীভাবে মুক্তি পেলেন স্যার রোনাল্ড রস, কীভাবে আবিষ্কার হল ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক তা নিয়ে একটি স্মৃতিকথা প্রকাশ করলে, রোনাল্ড রস সেখানেও একবারের জন্যও কিশোরীমোহনের নাম উল্লেখ করেননি। এতে অত্যন্ত ব্যথিত হন কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পরে আর কখনোই তিনি রোনাল্ড রসের সঙ্গে দেখা করেননি। একজন সমাজসেবক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন কিশোরীমোহন। ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধকল্পে তিনি গ্রামে গ্রামে সচেতনতা প্রচারে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। ম্যাজিক লণ্ঠনের সাহায্যে স্লাইড দেখিয়ে গ্রামবাসীদের ম্যালেরিয়া সম্পর্কে অবহিত করতেন তিনি আর এই কাজে তাঁকে স্লাইড তৈরি করে দিতেন সেকালের একমাত্র ভ্রাম্যমান চিত্রগ্রাহক লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরী। সে সময় রঙিন ছবি আবিষ্কার হয়নি বলে সেইসব স্লাইডগুলি ছিল সাদা-কালো। যদিও সেই সাদা-কালো প্লেটের উপরেই স্বচ্ছ রঙে রঙিন করে তুলেছিলেন লক্ষ্মীকান্ত যাতে গ্রামবাসীরা সহজে সেগুলি দেখে বুঝতে পারে। এই সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে কিশোরীমোহন বুঝতে পারেন যে সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে দরিদ্র গ্রামবাসীদের বাঁচাতে গেলে অর্থ সাহায্য করার এক বিকল্প ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। আর সেই পরিকল্পনা থেকেই কিশোরীমোহন তাঁর স্ত্রীয়ের সমস্ত গয়না এবং যা কিছু সঞ্চয় বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে সমমনস্ক আরো কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে ১৯২৭ সালে গড়ে তোলেন ‘পানিহাটি কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক’। সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে এই ব্যাঙ্ক খোলার পরে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন। কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন সেই সময়। পানিহাটিতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেই ব্যাঙ্ক এলাকার গরীব-দুঃস্থ প্রজাদের উন্নতিকল্পে প্রভূত সহায়তা করেছিল। বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষী বিধানচন্দ্র রায়ের রাজনৈতিক প্রচারে সহায়তা করেন কিশোরীমোহন। শোনা যায়, বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের সময় মাছের ডিম সংগ্রহের সূক্ষ্ম জাল দিয়ে তিনি মশারি বানানোর কাজে উৎসাহিত করেন তাঁতিদের। ব্রিটিশদের কলে তৈরি কাপড় বাংলার তাঁতিদের অবস্থা ক্রমশ সঙ্গীণ করে তুলছিল। কিশোরীমোহনের এই প্রয়াস আসলে ব্রিটিশদের প্রতি এক নীরব বিরোধিতা প্রদর্শন।
তাঁর স্মরণে পানিহাটি মিউনিসিপ্যালিটির একটি রাস্তার নামকরণ হয় কিশোরীমোহন ব্যানার্জি রোড। বিখ্যাত ভারতীয় লেখক অমিতাভ ঘোষ তাঁর ‘ক্যালকাটা ক্রোমোজোম’ উপন্যাসে কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে যেভাবে রোনাল্ড রস ব্যবহার করেছিলেন তার বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন।
১৯২৯ সালে মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান