সববাংলায়

লাঠি নাচ || লাঠি খেলা

বাংলার লোকসংস্কৃতির যে প্রাচীন ধারা তা যেমন বিভিন্ন ঘরানার লোকসঙ্গীতে সমৃদ্ধ, তেমনই বেশ কিছু লোকনৃত্য ও লোকক্রীড়া সংস্কৃতির ভান্ডারকে পূর্ণ করে রেখেছে। রায়বেঁশে বা ঢালি নাচের মতোই বাংলার একটি লোকনৃত্য হল লাঠি নাচ (Lathi Dance)। এই নাচের সঙ্গে  মিশে থাকে যুদ্ধের আঙ্গিকে এক খেলাও, যাকে লাঠি খেলাও বলা হয়ে থাকে। আসলে লাঠি নাচ ও লাঠি খেলাকে অভিন্ন একটি শিল্পই বলা যায়। মূলত মুসলিমদের মধ্যে এই নাচ তথা খেলা দেখা গেলেও অন্য সম্প্রদায়ের মানুষেরাও এই শিল্পটিকে আত্তীকরণ করেছেন। ঢালি নৃত্যের মতোই এই লাঠি নাচ আসলে যুদ্ধভঙ্গিমাকেই প্রতিবিম্বিত করে৷ বাজনার তালে তালে লাঠি নর্তকীরা ক্রোধ, অভিমান এমনকি ভালবাসার মতো মানবিক অনুভূতিগুলি প্রকাশ করে থাকেন এবং যুদ্ধের নানাবিধ কৌশল প্রদর্শন করেন। লাঠিয়াল তথা লাঠি নর্তকীদের আবার বিশেষ রকমের পোশাকও পরতে দেখা যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আজও এই লাঠি নাচ পরিলক্ষিত হয়।

লাঠি খেলা তথা লাঠি নাচের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা আত্মরক্ষার ইতিহাস। মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার জমিদাররা তাঁদের নিজেদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য লাঠিয়ালদের নিযুক্ত করতেন। ব্রিটিশ পুলিশি ব্যবস্থা প্রচলিত হওয়ার পর থেকে লাঠিয়ালদের প্রতিপত্তি হ্রাস পেতে থাকলেও তা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। এমনকি বাঙালি লাঠিয়ালদের বীরবিক্রম ইংরেজদেরও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র এবং সেই সময়ের অনেক সাহিত্যিকেরই রচনায় এই লাঠিয়ালদের উল্লেখ পাওয়া যায়। লাঠিয়ালদের লাঠি চালানোর এমনই কৌশল ও জোর ছিল যে, লাঠির আঘাতে বন্দুকের নল পর্যন্ত ভেঙে গেছে, এমন ঘটনাও জানতে পারা যায়। স্বদেশী আন্দোলনের সময়পর্বে গড়ে ওঠা অনুশীলন সমিতির মতো বিপ্লবীদের প্রতিষ্ঠানগুলিতেও লাঠিখেলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হত। কখনও কখনও গ্রাম-গঞ্জে দু’পক্ষে জমিবাড়ি সংক্রান্ত নানা বিবাদ দেখা দিলে আজও লাঠির লড়াই দেখা যায়।

অতএব লাঠিয়ালদের এই লাঠি চালনা থেকেই মূলত লাঠি নাচের উদ্ভব। লাঠি খেলা বা লাঠি নাচে যে ধরণের যুদ্ধ-কৌশল প্রদর্শন করা হয় তা থেকে বাঙালির বীরত্বের গৌরবময় অতীত ইতিহাসই যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই লাঠিখেলার আসরে বাদ্যযন্ত্র হিসাবে ঢোলক, কর্ণেট, ঝুমঝুমি, কাড়া ইত্যাদি বাজানো হয় এবং সেই সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। লাঠি খেলার প্রদর্শনীতে নানারকম ধরণ রয়েছে, যেমন বাওই ঝাক অর্থাৎ যেখানে দুই দলে লড়াইয়ের মতো একরকম প্রদর্শনী হবে, নড়ি বাড়ি অর্থাৎ লাঠি দিয়ে নকল লড়াই, আবার ফালা খেলা বা দাও খেলার মতো প্রদর্শনীও রয়েছে। লাঠি ঘোরানোর কৌশলকে বলা হয় বেনেঠি এবং যুদ্ধের কৌশলকে বলা হয় হালওয়া। লাঠি খেলা বা নাচ শুরুর আগে লাঠিয়ালরা বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে একধরনের শব্দ করে ডাক পাড়েন। সেই ডাক শুনেই সংশ্লিষ্ট গ্রামের লোকজনই শুধু নয়, আশেপাশের গ্রামের লোকজনও এই নৃত্য প্রদর্শনী দেখতে জড়ো হয়ে যান।

সাধারণত লাঠি খেলার যে লাঠি অর্থাৎ বাঁশের লাঠি, সেটিই এই নাচের মূল উপাদান। নাচে ব্যবহৃত লাঠিটি সাধারণত ৬ থেকে ৮ ফুট মতো লম্বা হয়ে থাকে। কখনও কখনও সেই লাঠিতে আবার ভোঁতা ধাতব পাত সংযোজন করা হয়। লাঠি ছাড়াও অন্যান্য বেশ কিছু উপকরণ নৃত্যশিল্পীরা ব্যবহার করে থাকেন। লাঠিটিকেই তলোয়ারের মতো সামনে-পিছনে ঘুরিয়ে বীর যোদ্ধার অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলেন নৃত্যশিল্পীরা। বাজনার সঙ্গে সঙ্গে লাঠি কখনও পায়ের নীচে, কখনও মাথার ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে, নানারকমভাবে লাঠিয়ালরা তাঁদের দক্ষতা, আশ্চর্য কৌশল প্রদর্শন করেন।

নাচের তাল ও গতি বজায় রাখার জন্য ঢোল ও পিতলের করতাল ব্যবহার করা হয়। যিনি তালবাদ্য বাজান অর্থাৎ ঢুলি, এই নৃত্যশিল্পে তাঁর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনিই নৃত্যশিল্পীদের চাল, গতি এবং তাল নির্দেশ করে সেইমতো পারফরম্যান্সটিকে একপ্রকার গড়ে তুলতে সহায়তা করেন। বাজনার তালে তালে হাতের নির্দিষ্ট রকমের মুদ্রায়, বিশেষরকমভাবে পা ফেলে, বিশিষ্ট দেহভঙ্গিমায় এই নাচটি প্রদর্শিত হয়।

নৃত্যটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত থাকে, যথা ভূমিকা, যুদ্ধের বিবিধ অবস্থান, পাঁয়তারা, লড়াই, বিরতি ইত্যাদি কয়েকটি অংশে বিভক্ত থাকে। উপরে লাঠি খেলার যে নানারকম (বাওই ঝাক, নড়ি বাড়ি ইত্যাদি) প্রদর্শনীর কথা বলা হল সেগুলি এইসব বিভাগেরই অন্তর্ভুক্ত বলা যায়।

প্রধানত ধীরগতিতে, ধীর লয়ে শুরু হয়ে এই নাচ বা খেলা দ্রুত গতির দিকে ক্রমশ এগিয়ে চলে। বিশেষ একরকমের আঁটোসাটো পোশাক পরে এই লাঠি নাচ বা খেলার প্রদর্শনী করে থাকেন শিল্পীরা। কখনও কখনও তাঁরা পায়ে ঘুঙুরও বেঁধে থাকেন। প্রধানত, অল্পবয়সী যুবক এবং কিছু কিছু মাঝবয়সী লোকে দল বেঁধে এই নৃত্য পরিবেশন করে থাকেন। এই নাচের মাধ্যমে মূলত অনুশোচনা, ক্রোধ, দুঃখ, ব্যথা-বেদনা, এমনকি ভালবাসা, সুখ ইত্যাদি মানবিক অনুভূতিগুলি প্রকাশ করে থাকেন নৃত্যশিল্পীরা।

সাধারণত মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে এই লাঠি নৃত্যের প্রচলন ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যায়। প্রধানত মহরম বা ঈদের সময়তে এই লাঠি খেলার প্রদর্শনীর আয়োজন হয় দিকে দিকে। মহরমের চাঁদের দশদিন ধরে এই লাঠি খেলা তথা লাঠি নাচের প্রদর্শনী চলতে থাকে। মহরমের সময়ে এই যে লাঠি খেলা বা নাচ তা অনুষ্ঠিত হওয়ারও একটি বিশেষরকম ধরণ রয়েছে। গৃহস্থের বাড়ির উঠোনে প্রথমে এই নাচ (খেলা) অনুষ্ঠিত হবে, সেখান থেকে তা চলে আসবে রাস্তার মোড়ে এবং অবশেষে শেষদিনে কৃত্রিম বা কল্পিত কারবালায় লাঠিখেলা এবং লাঠিনাচের প্রদর্শন দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হবে। বোঝাই যাচ্ছে, এই খেলা বা নাচটি যেভাবে অনুষ্ঠিত হয় তা আসলে অতীতের আখ্যানেরই যেন অভিনয়। তবে কেবল মহরমের সময়তেই নয়, বাংলা নববর্ষ, বিবাহ এমনকি অন্নপ্রাশন উপলক্ষেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই লাঠি নৃত্যের আয়োজন করে থাকেন কেউ কেউ৷

ব্রতচারী সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা গুরুসদয় দত্ত এককালে বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়ে অনেকগুলি লোক-ঐতিহ্যের বিশেষত বেশ কিছু অবলুপ্তপ্রায় লোকনৃত্যের পুনরুদ্ধার করেছিলেন। তারমধ্যে যেমন ছিল রায়বেঁশে বা ঢালি নৃত্য তেমনি ছিল লাঠি নাচও। বর্তমানেও বাংলাদেশের বেশ কিছু গ্রামাঞ্চলেও এই লাঠি খেলা তথা লাঠি নাচের প্রদর্শনী দেখা গেলেও লোকসংস্কৃতির এই সমৃদ্ধশালী ধারাটি, বাঙালির বীরত্বের ইতিহাসের এই স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ নৃত্যশিল্পটির বিস্তৃতি খুব বেশি হয়নি এবং বাউল গানের মতো জনপ্রিয়তাও লাভ করতে পারেনি। তবে ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায়ের মতো দেশীয় সংস্কৃতি বিষয়ে আগ্রহী কিছু মানুষ লাঠি খেলা বা লাঠি নাচের মতো ঐতিহ্যবাহী এক শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading