ইতিহাস

লুডভিগ ফান বেটোফেন

লুডভিগ ফান বেটোফেন (Ludwig van Beethoven) একজন ক্ষণজন্মা কিংবদন্তি জার্মান সুরকার তথা পিয়ানোবাদক যিনি বিশ্ব সঙ্গীতের মোড় বদলে দিয়েছিলেন তাঁর সুরের মাধ্যমে। পাশ্চাত্য সঙ্গীত জগতে বেটোফেনকে একজন মহীরুহ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর সুরারোপিত ‘সিম্ফনি’ (symphony) আজও মানুষের মনোরঞ্জন করে।

১৭৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর জার্মানির বন শহরে লুডভিগ ফান বেটোফেনের জন্ম হয়। তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে মতান্তর রয়েছে। অনেকে মনে করেন তাঁর জন্ম হয় ১৬ ডিসেম্বর। তাঁর বাবার নাম জন ফান বেটোফেন এবং তাঁর মায়ের নাম মারিয়া ম্যাগডালেনা কেভেরিখ। তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে তাঁর মাকে হারান। তাঁর বাবা একজন কি-বোর্ড (keyboard) এবং বেহালা শিক্ষক ছিলেন। তাঁর ঠাকুরদা একজন সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন যিনি প্রথমে অস্ট্রিয়াতে থাকতেন এবং পরে জার্মানিতে চলে যান। বেটোফেনের আরো ছ’টি ভাইবোন ছিল।  

বেটোফেনের প্রথম সঙ্গীত শিক্ষক ছিলেন তাঁর বাবা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বেটোফেনের সঙ্গীত শিক্ষা শুরু হয়। এরপর তিনি একে একে বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ করেন যার মধ্যে ছিলেন রাজসভার  অর্গানবাদক গিল্‌স ফান, ডেন ইডেন সহ আরো অনেকে। তাঁদের কারো কাছে তিনি পিয়ানো বাজাতে, আবার কারো কাছে তিনি বেহালা বাজাতে শিখেছেন। এই সময়ে তাঁকে কঠোর অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে যেতে হত। অনেক সময় এমন হয়েছে যখন তাঁকে রাত্রে ঘুম থেকে উঠে পিয়ানো অনুশীলন করতে হয়েছে। বেটোফেনের যে বিরল প্রতিভা ছিল তা তাঁর বাবা সেই সময় থেকেই বুঝতে পারেন। ১৭৭৮ সালে মাত্র সাত বছর বয়সেই বেটোফেন তাঁর জীবনের প্রথম সঙ্গীতানুষ্ঠান করেন। ১৭৮০ সাল (মতান্তরে ১৭৮১) থেকে তিনি প্রখ্যাত জার্মান অপেরা শিল্পী ক্রিশ্চিয়ান গটলব্‌ নেফের কাছে সঙ্গীতশিক্ষা শুরু করেন। ১৭৮৩ সালে তাঁর প্রথম সুরারোপিত ‘সিম্ফনি’ জনসমক্ষে বাজানো হয়। এরপর তিনি ক্রিশ্চিয়ান গটলব্‌ নেফের সহকারি অর্গানবাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রথম দিকে শিক্ষার্থী হিসেবে কাজ করলেও ১৭৮৪ সাল থেকে তিনি বেতন পেতে শুরু করেন। সেই সময় তিনি কিছুদিন কোর্ট চ্যাপেলে (Court Chapel) অর্গানবাদক হিসেবে কাজ করেন। সেই সময়কার অনেক পত্র-পত্রিকায় তাঁর সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে বিরল প্রতিভার কথা লেখা হতে থাকে।

বেটোফেন অল্প বয়স থেকেই ছোট ছোট শিশুদের সঙ্গীতশিক্ষা দিতে শুরু করেন। এই সময়ে তাঁর সঙ্গে প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসক ফ্রান্স ওয়েগেলারের এবং শিল্পরসিক কাউন্ট ফার্দিনান্দ ফান ওয়াল্ডস্টেইনের আলাপ হয়। তাঁদের সঙ্গে বেটোফেনের বন্ধুত্ব শেষ দিন অবধি ছিল। কাউন্ট ফার্দিনান্দ ফান ওয়াল্ডস্টেইন অনেক সময় বেটোফেনকে আর্থিকভাবে সাহায্যও করতেন। ১৭৯১ সালে  বেটোফেন ‘মুসিক জু এইনেম রিট্টেরব্যালে’ নাটকে সঙ্গীত পরিচালনা করেন। সেটি ছিল তাঁর প্রথম নাটকে কাজ। ১৭৮৫ সালে থেকে ১৭৯০ সালের মধ্যে তাঁর করা কাজের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ১৭৮৭ সালে তিনি কিছুদিনের জন্য ভিয়েনা যান। সেখানে তাঁর সঙ্গে আরেকজন দিকপাল সঙ্গীতশিল্পী মোৎজার্টের দেখা হয়।

১৮৮৯ সালে তাঁর বাবার কাজ চলে গেলে বেটোফেনকে বাধ্য হয়ে উপার্জনের জন্য নানান জায়গায় অর্গান বাজানোর কাজ করতে হয় এবং সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবেও কাজ করতে হয়। নানান জায়গায় কাজ করার ফলে বিভিন্ন অপেরা (opera) সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞানের পরিধি বাড়তে থাকে। মোৎজার্ট, গ্লাক এবং প্যাসিয়েলোর কাজ তাঁকে খুব প্রভাবিত করতো। ১৭৯০ সাল থেকে ১৭৯২ সালের মধ্যে তিনি প্রচুর সিম্ফনি তৈরি করেন। ১৭৯২ সালে তিনি আবার ভিয়েনায় চলে যান। সেখানে পৌঁছে তিনি তাঁর বাবার মৃত্যুর খবর পান। এরপর তিনি হেডেনের তত্ত্বাবধানে বেশ কিছুদিন কাজ করেন। তার পাশাপাশি তিনি  ইগ্‌নাজ্‌ স্কুপ্পান্‌জিঘের কাছে বেহালা শিখতে থাকেন। এই সময়ে তিনি বেশ কিছু বছরের জন্য ভিয়েনাতে থেকে যান। সেই সময় থেকেই তাঁর খ্যাতি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং অনেকেই তাঁকে আর্থিক ভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। ধীরে ধীরে তাঁর অনেকগুলি কাজ প্রকাশিত হতে থাকে। ১৭৯৩ সালের মধ্যে ভিয়েনা শহরে তিনি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৭৯৫ সালের মার্চ মাসে তিনি প্রথম ভিয়েনাতে সঙ্গীতানুষ্ঠান করেন। ১৭৯৯ সালে তাঁর অষ্টম পিয়ানোর ‘সোনাটা’ (sonata) ‘প্যাথেথিক’ (Pathétheque) প্রকাশ পায়। ১৭৯৮ সালে থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে তিনি তাঁর প্রথম সিক্স স্ট্রিং কোয়ার্টেট্‌স (first six string quartets) তৈরি করেন যেটি তিনি প্রিন্স লবকোউইটজ্‌কে উৎসর্গ করেন। ১৮০১ সালে  এটি প্রথম প্রকাশ পায়। তাঁর সিম্ফনিগুলি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে তাঁকে মোৎজার্ট এবং হাইডেনের পর সেই সময়কার সবথেকে বেশি জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে গণ্য করা হতে থাকে। ১৮০১ সাল থেকে ১৮০৫ সাল পর্যন্ত তিনি ফার্দিনান্দ রিয়েজের  সঙ্গীত শিক্ষক ছিলেন, যিনি পরে একজন খ্যাতনামা সঙ্গীতশিল্পী হন। 

১৮০২ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘মুনলাইট সোনাটা’ (Moonlight Sonata) সৃষ্টি করেন। সেটি তিনি তাঁর তৎকালীন প্রেমিকা জুলিয়ে গুইসিয়ারদিকে উৎসর্গ করেন। জুলিয়ে সেই সময় তাঁর ছাত্রী ছিলেন। সেই সময়কার তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘দ্য ক্রিয়েচারস অফ প্রমেথিয়ুস’ (The Creatures of Prometheus)। এটি একটি ব্যালে যেটি তৎকালীন বহু অনুষ্ঠানে বাজানো হত। তাঁর অনুষ্ঠানের তখন এতটাই চাহিদা ছিল যে অন্যান্য অনুষ্ঠানের থেকে তাঁর  অনুষ্ঠানের টিকিটের দাম তিনগুণ বেশি থাকতো।

১৮০১ সালের পর থেকে তাঁর শ্রবণ সমস্যা হতে থাকে। তিনি ডাক্তারের পরামর্শে অস্ট্রিয়ার একটি ছোট শহর হেইলিঙ্গেনস্টান্ডে কিছুদিনের জন্য চলে যান। শ্রবণের সমস্যা সত্ত্বেও তিনি তাঁর সঙ্গীত সৃষ্টিতে একটুও ব্যাঘাত ঘটতে দেননি যদিও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশনে তাঁর খুবই অসুবিধা হত। তার ফলে তাঁকে বেশ আর্থিক সমস্যায় পড়তে হয়। ১৮১২ সালের মধ্যে তাঁর শ্রবণ ক্ষমতা আরও কমে যায়। কিন্তু তা কোনোদিনই পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। যতই তাঁর শ্রবণ ক্ষমতা কমতে থাকে ততই তাঁর সঙ্গীত সৃষ্টির পরিধি বাড়তে থাকে। এই সময় থেকে তাঁর সৃষ্টি করা সিম্ফনিগুলিতে অনেকটাই বদল ঘটতে থাকে। এই সময়টিকে অনেকে ‘হিরোইক পিরিয়ড’ (Heroic period) বলে থাকেন।

১৮০৭ সালে মুজিও ফ্লেমেন্টির হাত ধরে বেটোফেনের সিম্ফনি ইংল্যান্ডে প্রকাশিত হয়। ১৮০৯ সালে তিনি গ্যেটের নাটক ‘এগমন্থ’-এর জন্য সঙ্গীত পরিচালনা করেন। ১৮১০ সালে তিনি গ্যেটের আরেকটি নাটক ‘দ্য রেজাল্ট’ (The Result)-এর জন্য সঙ্গীত পরিচালনা করেন। তিনি গ্যেটে রচিত তিনটি গানেও সুর দেন। ১৮১৩ থেকে ১৮১৫ সালের মধ্যে তিনি বেশ কিছু পারিবারিক সমস্যার সম্মুখীন হন যার ফলে তাঁর সঙ্গীত জীবনে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটে। ১৮১৩ সালে ভিতোরিয়ার যুদ্ধে ডিউক অফ ওয়েলিংটন নেপোলিয়নকে পরাজিত করেন। বেটোফেন সেই ঘটনাটিকে উৎসর্গ করে ‘ব্যাটেল  সিম্ফনি’ (Battle Symphony) নামক একটি  সিম্ফনি তৈরি করেন যা সেই বছরেই ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধে মৃত সৈনিকদের জন্য একটি চ্যারিটি অনুষ্ঠানে (charity show) প্রথম উপস্থাপন করা হয়। ১৮১৪ সালের  মে মাসে তিনি তাঁর শেষ একক অনুষ্ঠান করেন।

বেটোফেন ক্রমেই ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকেন। বিভিন্ন ধর্মীয় দর্শন তাঁর চর্চার বস্তু হয়ে ওঠে।  তিনি ভারতীয় দর্শন বিশেষ করে ঋক্‌বেদ সম্বন্ধে আগ্রহী হয়ে পড়েন। ১৮২১ সালের পর থেকে তিনি আস্তে আস্তে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর সুর সৃষ্টির কাজ করে যেতে থাকেন। ১৮২৬ সাল থেকে তিনি একেবারেই শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।

১৮২৭ সালের ২৬ মার্চ মাত্র ৫৬ বছর বয়সে লুডভিগ ফান বেটোফেনের মৃত্যু হয়। ভিয়েনাতে প্রায় দশ হাজার মানুষ তাঁর শেষ যাত্রায় শামিল হন। ভিয়েনার উত্তর-পশ্চিমে ওয়াহ্‌রিং সিমেট্রিতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন