নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা

নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের ইতিহাসে মহারাষ্ট্রের বিপ্লবী আন্দোলনের এক বিরাট ভূমিকা ছিল। বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কে, মদনলাল ধিংড়া, চাপেকর ভ্রাতৃদ্বয়, বাল গঙ্গাধর তিলক প্রমুখ বিপ্লবী ব্যক্তিত্বের আন্দোলনে দেশ তখন অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার লক্ষ্যে ব্রিটিশ হত্যা কিংবা বোমা নিক্ষেপ এই ছিল বিপ্লবীদের অন্যতম বিদ্রোহ। মহারাষ্ট্রের বিপ্লবী আন্দোলনের এই ধারারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা (Nasik Conspiracy Case) । ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট হত্যার কারণে শুরু হওয়া এই মামলার সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে বিখ্যাত এক ভারতীয় বিপ্লবীর বীরত্বের কাহিনিও।

১৯১০ সালের মার্চ মাসে শুরু হয় নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা। মামলা চলেছিল দুটি পর্যায়ে। প্রথম পর্যায়ে মামলার অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন সাতজন বিপ্লবী – অনন্ত লক্ষ্মণ কানহেরে, কৃষ্ণগোপাল কার্ভে, বিনায়ক নারায়ণ দেশপাণ্ডে, শঙ্কর রামচন্দ্র সোমান, দাজি নারায়ণ যোশী, গণেশ বি. বৈদ্য এবং দত্তাত্রেয় পাণ্ডুরঙ্গ যোশী। এই মামলার পরের পর্যায় শুরু হয় ১৯১১ সালের ২৩ জানুয়ারি এবং এই পর্যায়ে অভিযুক্ত ছিলেন ৩৮ জন বিপ্লবী যাদের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর। ব্রিটিশ সরকারের স্পেশাল ট্রাইবুন্যালের পক্ষে মামলা লড়েছিলেন স্যার বেসিল স্কট, মুখ্য বিচারপতি মি. চন্দ্রভারকর এবং বিচারপতি মি. হিটন। অন্যদিকে বিপ্লবী সাভারকরের পক্ষে সওয়াল-জবাব করেন মি. যোসেফ বাপ্তিস্তা। দুটি পর্যায় মিলিয়ে মোট ২৭ জন বিপ্লবী দণ্ডিত হন যাদের সকলেই ছিলেন ‘অভিনব ভারত’ নামে একটি মহারাষ্ট্রীয় বিপ্লবী সংগঠনের সদস্য।

নাসিক ষড়যন্ত্র মামলার প্রথম পর্যায়টি মূলত জ্যাকসন হত্যা মামলা নামে পরিচিত। বিশ শতকের শুরুর দিক থেকেই সমগ্র ভারতে বিশেষত মহারাষ্ট্রে বিপ্লবী আন্দোলনের প্রস্তুতি চরমে ওঠে। ১৯০৬ সালে বিনায়ক দামোদর সাভারকর এবং গণেশ সাভারকর নাসিকে চালু করেছেন ‘মিত্র মেলা’ নামে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি। তার কিছুদিন পরেই বিনায়ক দামোদর সাভারকর লণ্ডনে চলে গেলে তাঁরই দাদা গণেশ সাভারকর ইতালির বিখ্যাত বিপ্লবী ম্যাৎসিনির কার্বোনারি দলের অনুকরণে ‘মিত্র মেলা’র নাম পরিবর্তন করে গড়ে তোলেন ‘অভিনব ভারত’। এই বিপ্লবী সমিতি তখন ধীরে ধীরে মহারাষ্ট্র, ঔরঙ্গাবাদ, হায়দ্রাবাদ, সাতারায় শাখা তৈরি করেছে। আর এই ‘অভিনব ভারত’ গুপ্ত বিপ্লবী সমিতিরই সদস্য ছিলেন নাসিকের কয়েকজন তরুণ প্রতিবাদী। কৃষ্ণগোপাল কার্ভে, বিনায়ক নারায়ণ দেশপাণ্ডে এবং সোমান প্রমুখরা ছিলেন এই সমিতির প্রকৃত সদস্য আর প্রাথমিকভাবে গণেশ বি. বৈদ্য এই সমিতির সব অস্ত্রশস্ত্র সামলে রাখতেন। এই গণেশ বৈদ্যের সঙ্গেই ঔরঙ্গাবাদে দেখা হয় অনন্ত লক্ষ্মণ কানহেরের। অনন্ত এই গুপ্ত সমিতির কথা জানতে পারে গণেশ বৈদ্যের মাধ্যমেই। পরবর্তীকালে নাসিকে গণেশ বৈদ্যের বাড়িতে একটি গোপন সভা বসে যেখানে দেশপাণ্ডে, অনন্ত এবং গণেশ বৈদ্যের সামনে তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট মি. জ্যাকসনকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এবং অনন্ত লক্ষ্মণ কানহেরে নিজেই জ্যাকসনকে হত্যা করার ব্যাপারে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ঠিক এই কারণেই কালেক্টরের কাছারিখানায় দুবার করে তাঁকে নিয়ে গিয়ে জ্যাকসনকে চেনানো হয়। এরপর থেকে প্রতিদিন ভোরে গণেশ বৈদ্যের আনা পিস্তল দিয়ে অনন্তকে বন্দুক চালানো অভ্যাস করানো হতো। ইতিমধ্যে শোনা যায় যে ডিসেম্বর মাস নাগাদ নাসিক ছেড়ে মি. আর্থার ম্যাসন টিপেটস জ্যাকসন যাবেন বিজয়ানন্দ থিয়েটারে আয়োজিত একটি সম্বর্ধনা সভা তথা নাট্য-উপস্থাপনে। সেই সময় একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় মারাঠি নাটক ‘শারদা’ অভিনীত হওয়ার কথা। অনন্ত কানহেরে একাই জ্যাকসনকে হত্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তাঁর সঙ্গে আরো কয়েকজন বিপ্লবী যুক্ত থাকেন এই পরিকল্পনায়। আদপে মি. জ্যাকসন কখনোই অত্যাচারী বা দমন-পীড়নকারী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন না, বরং ভারতীয়দের কাছে তাঁর ব্যবহারের বেশ সুনাম ছিল। তবু বিপ্লবীরা তাঁর মৃত্যুকেই বিপ্লবের এক দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলেন। ২১ ডিসেম্বর জ্যাকসনকে হত্যা করা হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়। কার্ভে, দেশপাণ্ডে সকলেই অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টায় ছিলেন। অবশেষে ২টি ব্রাউনিং পিস্তল পাওয়া যায়। দান্ডেকরের থেকে গণেশ বৈদ্য এই পিস্তল হাতে পায়। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সোমান অনন্তর হাতে পিস্তল তুলে দেওয়ার পাশাপাশি একটি বিষের শিশিও দেন। তার সঙ্গে আরেকটি কাগজ দেওয়া হয় যাতে লেখা ছিল ‘খুনের বদলে খুন’। সোমান এবং অনন্ত দুটি ব্রাউনিং পিস্তল নিয়ে ঐ থিয়েটার হলের দিকে এগিয়ে যান। অন্ধকারের মধ্যে মি. জ্যাকসনের আসার পথেই অনন্ত অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকে এবং মি. জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে অব্যর্থ গুলি ছোঁড়েন। জ্যাকসন মারা যান। মাত্র ১৮ বছর বয়সী অনন্ত কানহেরের এই দুঃসাহসিক কাজ বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে যায়। ঐ রাতেই গ্রেপ্তার হন অনন্ত কানহেরে। তারপর ১৯০৯ সালের ২৩ ডিসেম্বরে বিনায়ক নারায়ণ দেশপাণ্ডে, শঙ্কর রামচন্দ্র সোমান গ্রেপ্তার হন। ২৪ ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার হন কৃষ্ণা গোপাল কার্ভে। সবশেষে ৩০ ডিসেম্বর ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করে দাজি নারায়ণ যোশীকে। ১৯১০ সালের ২ জানুয়ারি থেকে ৬ জানুয়ারির মধ্যেই এই বন্দিরা সকলে পুলিশের কাছে জবানবন্দি দেয়।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চান ? 

ছবিতে ক্লিক করে বিস্তারিত জানুন।

 

অন্যদিকে যে পিস্তল দিয়ে অনন্ত হত্যা করেন মি. জ্যাকসনকে তদন্তে জানা যায় সেই পিস্তল সরবরাহ করেছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর। নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা র প্রথম পর্ব চলাকালীনই তাঁকে গ্রেপ্তার করার প্রস্তুতি নেয় পুলিশ। লণ্ডনে থাকার সময় বিনায়ক দামোদর সাভারকর ‘ইণ্ডিয়া হাউস’-এ তাঁর রাঁধুনি চতুর্ভুজের সাহায্যে কুড়িটি ব্রাউনিং পিস্তল প্যাকেটবন্দী করে বম্বেতে পাঠান। এর আগে ম্যাজিস্ট্রেট মি. জ্যাকসন বিনায়কের দাদা বাবারাও সাভারকরকে রাষ্ট্রবিরোধী কবিতা লেখার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা দিয়েছিলেন। এই ক্ষোভ সঞ্চিত ছিল বিনায়ক সাভারকরের মনে। ব্রিটিশ পুলিশের তদন্তে ইণ্ডিয়া হাউসের সেই রাঁধুনি চতুর্ভুজ ধরা পড়েন এবং রাজসাক্ষী দিতে সম্মত হন। ফলে অপরাধীর তালিকায় উঠে আসে সাভারকরের নাম। সেই সময় ব্রিটিশদের থেকে বাঁচতে লণ্ডন ছেড়ে প্যারিসে মাদাম কামার আশ্রয়ে কিছুদিন ছিলেন বিনায়ক সাভারকর। পরে আবার একবার সকলের অজ্ঞাতে লণ্ডনে ফিরে গিয়ে ১৯৯০ সালের ১৩ মার্চ নিজে থেকেই পুলিশের হাতে ধরা দেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর। ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর বিরুদ্ধে ‘ফিউজিটিভ অফেণ্ডার্স অ্যাক্ট, ১৮৮১’ অনুযায়ী ভারতে বিচার শুরু করতে নির্দেশ দেন। বিনায়ককে বন্দি করে ১৯১০ সালে বম্বেগামী একটি জাহাজে করে ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের ইন্সপেক্টর এডওয়ার্ড পার্কার, বম্বে পুলিশের দুজন কনস্টেবল ও ডিএসপি সবসময় ছিলেন বন্দি সাভারকরের সঙ্গে। ১০ জুলাই তারিখে ফ্রান্সের বন্দরে নোঙর করলে জাহাজে শৌচকর্ম সারতে অনুমতি নিয়ে ক্লোজেটে যান সাভারকর। দুজন হেড কনস্টেবল ছিলেন তাঁর পাহারায় আর তার আগে এডওয়ার্ড নিজে সমস্ত জায়গাটা পরীক্ষা করে দেখে গিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে পোর্ট হোলের মধ্য দিয়ে গলে সমুদ্রের জলে ঝাঁপিয়ে পড়েন সাভারকর। তাঁকে পালিয়ে যেতে দেখা মাত্র জলে গুলি ছোঁড়া হয়, কিন্তু অক্ষত থাকেন সাভারকর। অপর পাড়ে অর্থাৎ মার্সাই বন্দরে উঠে ফরাসি নৌ-নিরাপত্তা বাহিনীর পুলিশকে সাভারকর অনুরোধ করেন যেন তাঁকে গ্রেপ্তার করে ফরাসি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু বাংলা বা হিন্দি কোনোটাই না জানায় পুলিশ কিছুই বুঝতে পারেনি। ফলে তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। এই ঘটনায় সমগ্র দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে এই মর্মে ফ্রান্সের মাটিতে দাঁড়িয়ে কীভাবে ব্রিটিশরা সাভারকরকে গ্রেপ্তার করতে পারেন! ফরাসি সরকার এর মধ্যস্থতা চেয়ে ট্রাইবুন্যালে যায় এবং বুদ্ধি করে ব্রিটিশ সরকার আপত্তি না করে বম্বে আদালতে সাভারকরের মামলা জারি রাখে।

বম্বে আদালতে তিন বিচারপতির ট্রাইবুন্যালে নাসিক ষড়যন্ত্র মামলার প্রথম পর্যায়ে ১৯১০ সালের ২৯ মার্চ রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অনন্ত লক্ষ্মণ কানহেরে, কৃষ্ণাজি গোপাল কার্ভে, বিনায়ক নারায়ণ দেশপাণ্ডেকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। শঙ্কর রামচন্দ্র সোমান, দাজি নারায়ণ যোশী এবং গণেশ বালাজি বৈদ্যকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে পাঠানো হয়। সবশেষে দত্তাত্রেয় পাণ্ডুরঙ্গ যোশীর দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ঘোষিত হয়। মামলার দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯১১ সালের ৩০ জানুয়ারি সাভারকরের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হয় ২৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের। সেন্ট্রাল বম্বের ডোঙ্গরি জেলে বন্দি ছিলেন সাভারকর। এর আগেও শুধুমাত্র বিনায়ক দামোদর সাভারকরের বিরুদ্ধে একটি মামলায় তাঁর যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়েছিল। সেই সময় যাবজ্জীবন মানে বোঝাতো ২৫ বছরের সশ্রম কারাবাস। ফলে বিনায়ক সাভারকরকে দুটি সাজা মিলিয়ে মোট ৫০ বছর আন্দামানের কারাগারে কাটাতে হয়।

আপনার মতামত জানান