ইতিহাস

বিনায়ক দামোদর সাভারকর

ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম সারির একজন বিপ্লবী ও রাজনীতিবিদ, ছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর( (Vinayak Damodar Savarkar)। তিনি ‘বীর সভারকার’ নামেই বেশী পরিচিত ছিলেন৷ মারাঠি ভাষায় তিনি ‘সত্যেন্দ্রবীর সাভারকর’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। 

১৮৮৩ সালের ২৮ মে মহারাষ্ট্রের নাসিকের ভাগুরে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার নাম দামোদরপন্থ সাভারকর এবং মায়ের নাম রাধাবাঈ। তিনি খুব অল্প বয়েসে মা- বাবা কে হারান৷ তাঁর মা কলেরায় এবং বাবা ১৮৯৯ সালে প্লেগ রোগে মারা যান। 

দামোদর সাভারকরের প্রাথমিক পড়াশোনা গ্রামের স্থানীয় বিদ্যালয়ে শুরু হয়৷ এরপর তিনি হাই স্কুলে পড়ার জন্য নাসিক যান৷ সাভারকর বি.এ পড়ার জন্য পুণের ফার্গুসন কলেজে ভর্তি হন ৷ পরবর্তীকালে শ্যামজি কৃষ্ণভর্মার থেকে স্কলারশিপ পেয়ে আইন নিয়ে পড়ার জন্য লন্ডনে  যান। সেখানে  ‘Gray’s Inn Law College’ এ তিনি ভর্তি হন। 

দামোদর সাভারকরের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব বলতে স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদানের কথা বলতে হয়৷ তাঁর বিখ্যাত স্লোগান ছিল ” Hinduize all Politics and Militarize Hindu Dom”। হিন্দু- মুসলিম দাঙ্গার পর গ্রামের একটি মসজিদ ভাঙচুরের জন্য সাভারকর মাত্র বারো বছর বয়েসে তাঁর সহপাঠীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন৷ পুণের ফার্গুসন কলেজে পড়াকালীন তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ড  অব্যাহত ছিল৷ ১৯০৫ সালের ৭ অক্টোবর বিদেশী বস্ত্র জ্বালাতে তাঁর সহপাঠীদের প্ররোচিত করেছিলেন তিনি ৷  তিনি এবং তাঁর ভাই গণেশ দামোদর সাভারকর ‘অভিনব ভারত সোসাইটি’ নামে একটি গোপন সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি লালা লাজপতরায়, বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিন চন্দ্র পাল প্রমুখ নেতাদের দ্বারা ভীষণ  প্রভাবিত হয়েছিলেন৷ তিনি লন্ডনে থাকা কালীন,  তাঁর ভাই গণেশ সভারকার ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯০৯’যা মর্লে-মিন্টো- সংস্কার ‘ নামে পরিচিত তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। ব্রিটিশ পুলিশ এই বিক্ষোভের নেপথ্যে সাভারকরের চক্রান্ত আছে অনুমান করে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করে৷ গ্রেপ্তারের হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি প্যারিসে পালিয়ে যান এবং ভিকাজি কামা’র বাড়িতে গিয়ে ওঠেন৷ ১৯১০ সালের ১৩ মার্চ ব্রিটিশ পুলিশের হাতে তিনি ধরা পড়েন৷গ্রেপ্তারী বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার সঠিক আইনি ব্যবস্থা না নিলে ফরাসী সরকার বিরক্ত হয়৷ সম্পূর্ণ বিষয়টি আন্তর্জাতিক আরবিট্রেশন এর স্থায়ী আদালতের (The Permanent Court of International Arbitration) সামনে আসে। বিচারে তাঁর পঞ্চাশ বছরের জেল হয় এবং তাঁকে বোম্বে ( মুম্বাই)  ফেরত পাঠানো হয় ৷

১৯১১ সালের ৪ জুলাই তাঁকে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সেলুলার জেলে পাঠানো হয় যেটি সে সময় ‘কালাপানি’ নামে পরিচিত ছিল৷ জেলে বন্দী থেকেও তাঁর জাতীয় চেতনা অব্যাহত ছিল। সেখানে বন্দী সহযোদ্ধাদের তিনি লেখা পড়া শেখাতে শুরু করেন৷ জেলে একটি গ্রন্থাগার শুরু করার জন্য সরকারের কাছ থেকে অনুমতিও নেন সাভারকর৷  ১৯১১ সালের ৪ এপ্রিল সাভারকর সরকারের কাছে তাঁর বিচার সংক্রান্ত ছাড়ের জন্য আবেদন জানান৷ যদিও সেটি নাকচ হয়ে যায়৷ সেই বছরই ৩০ আগস্ট মুক্তির জন্য তিনি সরকারের কাছে তাঁর প্রথম আবেদনপত্র (Mercy petition) লেখেন যা ৩ সেপ্টেম্বর ১৯১১ সালে তা বাতিল হয়ে ফিরে আসে৷ ১৯১৩ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি পরবর্তী আবেদন পত্রটি পাঠান৷ এই পত্রে গভর্নর জেনারেল কাউন্সিলের হোম মেম্বার স্যার রেজিনাল্ড ক্র্যাডককে ব্যক্তিগতভাবে তিনি সম্বোধন করেন৷ সেই চিঠিতে তিনি নিজেকে “prodigal son” বলে উল্লেখ করেছেন এবং সরকারের কৃপা প্রার্থনা করে জানান “parental doors of the government”। এছাড়া তিনি লেখেন “Moreover, my conversion to the constitutional line would bring back all those misled young men in India and abroad who were once looking up to me as their guide. I am ready to serve the government in any capacity they like, for as my conversion is conscientious so I hope my future conduct would be. By keeping me in jail, nothing can be got in comparison to what would be otherwise.”৷

১৯১৭ সালে তিনি আরেকটি আবেদন জানান এবং এবারের আবেদনটি ছিল সকল রাজনৈতিক বন্দীদের সাধারণ ক্ষমার জন্য। ১৯২০ সালের ৩০ মার্চ তিনি আবার একটি আবেদনপত্র রাখেন কিন্তু ১২ জুলাই ১৯২০ সালে ব্রিটিশ সরকার সেটিকে নাকচ করে দেয়৷ ১৯২০ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতারা যথা মহাত্মা গান্ধী, বিঠলভাই প্যাটেল, বালগঙ্গাধর তিলকের মতন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সাভারকরের শর্তবিহীন মুক্তির দাবী করেন৷ সাভারকর আর কোন ব্রিটিশ বিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকবেন না এই সূত্রে তিনি মুক্তির জন্য একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন৷ ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত থাকবেন এই পক্ষে নিজের মত দিয়ে তিনি ১৯২৪ সালের ৬ জানুয়ারি জেল থেকে মুক্তি পান৷ 

১৯৩৭ সালে তিনি’ হিন্দু মহাসভা’র সভাপতি হন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের সমর্থন করার জন্য হিন্দুদের উৎসাহিত করেন। বিনায়ক দামোদর সাভারকর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আইএনসি) এবং মহাত্মা গান্ধীর তীব্র সমালোচক ছিলেন।  তিনি ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর বিরোধিতা করেছিলেন এবং পরে জাতীয় কংগ্রেসের ভারতীয় বিভাজনকে মেনে নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেছিলেন এক দেশে দুটি জাতির সহাবস্থান করাটাই স্বাভাবিক। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধীজীর হত্যার পর পুলিশ নাথুরাম গডসে এবং তাঁর সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীদের গ্রেপ্তার করে। পুলিশি তদন্তে গান্ধীজী হত্যা সংক্রান্ত অভিযোগে সাভারকরকে ১৯৪৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শিবাজি পার্কে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বোম্বের আর্থার রোড কারাগারে আটকে রাখা হয়৷  তাঁর বিরুদ্ধে খুন, হত্যার ষড়যন্ত্র এবং খুনের অভিযোগ দায়ের করা হয় । কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোন প্রমান পাওয়া যায় নি৷ প্রতিরোধ মূলক আইনে (Preventive Detention Act) তাঁকে আটক করা হয়েছিল৷ যদিও শেষপর্যন্ত কোন সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নি৷ বলা হয়, “All these facts taken together were destructive of any theory other than the conspiracy to murder by Savarkar and his group.”

বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনায় আগ্রহ ছিল। মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখেন যেটি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল৷ তিনি বেশ কিছু বইও লিখেছেন৷ ১৯০৯ সালে তিনি ” The Indian War of Independence, 1857″ নামে একটি বই লেখেন৷ এই বইয়ে তিনি লেখেন ১৮৫৭ র বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকের বিরুদ্ধে প্রথম ভারতীয় গণঅভ্যুত্থান। 

কারাগারে বন্দী থাকাকালীন বিনায়ক সাভারকারের দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে হিন্দু সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক জাতীয়তার দিকে ঝুঁকতে শুরু করে এবং তাঁর জীবনের পরবর্তী পর্বে তার প্রভাব দেখা যায়। আন্দামানের জেলে থাকাকালীন  তিনি একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন (ideological treatise) ‘Hindutva: Who is a Hindu?’ নামে।   তাঁর সমর্থকেরা ‘ মহরত ছন্দ’ নামে এই গ্রন্থ ছাপায়। হিন্দু ধর্মের প্রতি রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার প্রকাশ তাঁর এই বইতে ধরা পড়ে৷ কেবল ধর্ম হিসেবে নয় তার থেকে বড় অর্থে সমস্ত ধর্ম মিলে দেশপ্রেম হিসেবে হিন্দুত্বকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন৷ হিন্দু ধর্ম কেবল  আর্য বা দ্রাবিড়দের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি জাতি নয় তাঁর ভাষায় এটি আসলে “People who live as children of a common motherland, adoring a common holy land”.

তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ হিন্দুত্বের ভিত্তিভূমিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তিনি হিন্দি ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে মনোনীত করার বিপক্ষে ছিলেন৷ এছাড়া অস্পৃশ্যতা এবং বর্ণবৈষম্যের ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি৷ তিনি ইংরাজি এবং মারাঠি ভাষায় ৩৮ টি বই লিখেছিলেন।  তাঁর প্রথম জীবনের বিপ্লব, গ্রেপ্তার, বিচার ও কারাগারের বিবরণ দিয়ে তথ্যবিবরণী মূলক দুটি বই লিখেছিলেন ‘মারাঠা এম্পায়ার’ এবং ‘মাই ট্রান্সপোর্টেসন ফর লাইফ’৷ তাঁর আন্দামান জেলে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বইটির নাম হল ‘মাজি জাণ্মাথেপ’ (‘My Life-term’)। এছাড়াও তিনি বেশ কিছু কবিতা ও নাটকও লিখেছিলেন।  

আন্দামান নিকোবরের পোর্টব্লেয়ার এয়ারপোর্টটি ২০০২ সালে বীর সাভারকারে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট নামে নামাঙ্কিত করা হয়৷ তাঁর জীবনী নিয়ে ১৯৯৬ সালে ‘কালাপানি’ নামে একটি মালায়লাম সিনেমা তৈরী করা হয়েছে৷ ‘Veer Savarkar’ নামে তাঁর আত্মজীবনী মূলক একটি চিত্রনাট্যও  তৈরী হয়েছে। 

১৯৬৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সাভারকারের মৃত্যু হয়৷ অনশন ছিল তাঁর মৃত্যুর কারণ৷ সাভারকর ওষুধ, খাদ্য ও জল পরিত্যাগ করেছিলেন। তাঁর মতে এটি আত্মহত্যা নয় ‘আত্মারপন’ ( Atmaarpan (fast until death))। মৃত্যুর আগে তিনি একটি প্রতিবেদন লেখেন যার শিরোনাম ছিল  “Atmahatya Nahi Atmaarpan”  যেখানে তিনি জানান  যে যখন  জীবনের লক্ষ্য  শেষ হয়ে যায় এবং সমাজের সেবা করার ক্ষমতা আর থাকে না তখন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা না করে ইচ্ছেমতো জীবন শেষ করা ভাল।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।