বিবিধ

পেট্রোগ্লিফ

পেট্রোগ্লিফ

গুহার দেওয়ালে আঁকা ছবির কথা মনে আছে? কিংবা পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে আঁকা বিভিন্ন শিল্পগুণান্বিত ছবি? পেট্রোগ্লিফ (Petroglyph) হল সেই ধরনেরই এক বিশেষ চিত্রাঙ্কন রীতি। পাথরের উপরিতলকে খোদাই করে, ফুটো করে যখন বিশেষ ধরনের শিল্প সৃষ্টি করা হয় ঐ পাথরের গায়ে তখন তাকে পেট্রোগ্লিফ বলা হয়। সারা বিশ্বের নানা জায়গায় এই পেট্রোগ্লিফগুলি পাওয়া যায়। উত্তর আমেরিকা ছাড়া অন্যত্র এগুলিকে কোথাও কোথাও খোদাই-চিত্রও বলা হয়ে থাকে। প্রাগৈতিহাসিক মানুষের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গেই মূলত এই পেট্রোগ্লিফগুলির সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু কোথাও কোথাও শিক্ষিত সমাজে প্রচলিত প্রস্তর-চিত্রও এই ধরনের পেট্রোগ্লিফের অধীনেই স্বীকৃত হয়। পাথরের গায়ে খোদাই করে আঁকা ছবিকে বলা হয় পেট্রোগ্লিফ আর একইভাবে পাথরের গায়ে রঙ দিয়ে আঁকা কোনও ছবিকে বলা হয়ে থাকে পেট্রোগ্রাফ। এই দুই শব্দবন্ধ একই রকম শুনতে হলেও দুয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। কখনও হরিণ, কখনও অন্য পশু, কখনও আবার বিভিন্ন প্রতীকী চিত্র দেখা যায় এই পেট্রোগ্লিফগুলিতে।

উজবেকিস্তানে পাওয়া পেট্রোগ্লিফের নিদর্শন

বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই এই পেট্রোগ্লিফগুলি দেখা যায়, কেবলমাত্র অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া। আফ্রিকা, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, অস্ট্রেলিয়া, উত্তর আমেরিকা ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় নব্য-প্রস্তর বা মধ্য প্রস্তর যুগের পেট্রোগ্লিফ পাওয়া গিয়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়ায় প্রাপ্ত কিছু পেট্রোগ্লিফ মনে করা হয় ২০ থেকে প্রায় ৪০ হাজার বছর প্রাচীন। আনুমানিক ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার বছর আগে লিপির বিবর্তনের সময়কালে এই পেট্রোগ্লিফ রীতির শিল্পের উৎপত্তি হয়েছে বলে তাত্ত্বিকেরা মনে করেন। তবে এর আগে পিক্টোগ্রাম (Pictogram) বা ইডিওগ্রাম (Ideogram)-এর অস্তিত্ব ছিল বলে ঐতিহাসিকেরা জানিয়েছেন। বহু বহু সময় ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এই পেট্রোগ্লিফগুলি আঁকার রীতি বজায় থেকেছে। তবে উনিশ ও বিশ শতকে এসে পশ্চিমা সংস্কৃতির সঙ্গে এর পরিচয় হয়। আফ্রিকার আলজিরিয়া, ক্যামেরুন, চাদ, ইজিপ্ট, ইথিওপিয়া, লিবিয়া, নামিবিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলে নানা সময় এই প্রস্তর চিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপের ইংল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, পর্তুগাল, স্পেন ইত্যাদি দেশ, এশিয়ার মধ্যে ভারত, আর্মেনিয়া, চিন, হংকং, জাপান, জর্ডন, লাওস, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি অঞ্চলে পেট্রোগ্লিফ আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে এই পেট্রোগ্লিফগুলি আঁকা হত কেন, এ প্রশ্নের উত্তরে ঐতিহাসিকেরা বলেছেন যে প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা নিজেদের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অন্য মানুষদের বা পরবর্তী প্রজন্মকে জানাতেই এই ধরনের প্রতীকী ছবি আঁকা হয়েছিল।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

আফ্রিকার নামিবিয়ায় প্রাপ্ত পেট্রোগ্লিফটির নাম দেওয়া হয়েছে লায়ন প্লেট (Lion Plate)। এশিয়ার মধ্যে আর্মেনিয়ায় উঘাতাসারের সাদা পাথরের উপর সুদৃশ্য পেট্রোগ্লিফটি আজও চর্চিত হয় শিল্পবোদ্ধা মহলে। চিনের ইয়েনচুয়ানের হেলেন পর্বত, জুহাই, হংকং-এর তুং লুং দ্বীপ, কাও সাই চু, চেয়াং চাও ইত্যাদি আটটি অঞ্চলে এমন পেট্রোগ্লিফের নিদর্শন পেয়েছেন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। তবে এশিয়ার মধ্যেই সবথেকে বেশি পাওয়া গেছে এই ধরনের প্রস্তর চিত্র। আর এই আলোচনায় ভারতের বহু অঞ্চলে পাওয়া অসাধারণ সব প্রস্তরচিত্রের নিদর্শন নিয়ে কথা না বললেই নয়। মহারাষ্ট্রের কোঙ্কন উপকূলে প্রায় ১ হাজারটির কাছাকাছি পেট্রোগ্লিফ পাওয়া গিয়েছে। সেখানকার উত্তর রত্নগিরির উক্‌শি গ্রামে এক বিশাল জায়গা জুড়ে পাথর দিয়ে ঘেরা একটি বৃত্তাকার জমির উপর আঁকা আছে একটি হাতির প্রতিরূপ। খোদাই করে আঁকা এই ছবি দেখে অনুমান করা হয় তা প্রায় ১০ হাজার বছরের পুরনো। শুধু এটাই একমাত্র নয়, রত্নগিরি জেলার এমন প্রায় ৭০টি অঞ্চলে পাওয়া গেছে এই ধরনের বহু পেট্রোগ্লিফের নিদর্শন যার কোনও কোনওটি আবার ২০ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। উক্‌শি, জাম্ভারুন, কাশেলি, রুন্ধে তালি, দেবীশোল, বারসাউ, দেভাচে গোথানে ইত্যাদি গ্রামগুলিতে আজও গেলে এই নিদর্শনগুলির শিল্পকর্ম উপভোগ করা যায়। হাতির মত পশু-পাখি, কোথাও মানুষের ছবি খোদাই করে রেখেছেন এর শিল্পীরা। ঐতিহাসিকরা বিশ্লেষণ করে বুঝতে চাইছেন ঠিক কেন এই সময়কার এই নিদর্শনগুলিতে কোনও কৃষিকাজের অনুষঙ্গ নেই। এগুলি দেখে মনে হচ্ছে পশু শিকারের রীতিই প্রাচীন সমাজে প্রচলিত ছিল। তবে একটি বিষয়ে সকলেই একমত যে, বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে পাওয়া এই পেট্রোগ্লিফগুলির অঙ্কনরীতির সঙ্গে ভারতের প্রস্তরচিত্রের অনেক মিল আছে, ফলে তা নিশ্চিতভাবে প্রাগৈতিহাসিক যুগের শিল্পকর্ম।

মহারাষ্ট্রের কোঙ্কন উপকূলে পাওয়া পেট্রোগ্লিফ

এক মেষপালকের কাছ থেকেই প্রথম মহারাষ্ট্রের এই অঞ্চলে এই নিদর্শনের ব্যাপারে জানতে পেরেছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। তারপর থেকে প্রথমে তিনটে, তারপর ৫২টি আর বর্তমানে প্রায় হাজার দেড়েক পেট্রোগ্লিফ একে একে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে কোঙ্কন উপকূলের রাজাপুর ও রত্নগিরি পার্বত্য প্রদেশে। তবে ভারতের এই অঞ্চলে আবিষ্কৃত পেট্রোগ্লিফগুলির বেশিরভাগই ল্যাটেরাইট শিলার উপর খোদাই করে আঁকা, ভারতের আশেপাশে অন্যান্য প্রদেশে যে সব পেট্রোগ্লিফ পাওয়া গিয়েছে তা অধিকাংশই গ্রানাইট শিলা কিংবা বেলেপাথরে খোদিত। রত্নগিরির দক্ষিণে গোয়ার কুশাবতী জেলায় এবং সিন্ধুদূর্গ জেলাতেও এই ধরনের প্রস্তর চিত্র পাওয়া গিয়েছে। রত্নগিরির বেশ কিছু সাইটে জলহস্তী কিংবা হাতির প্রতিরূপ পাওয়া গেছে পেট্রোগ্লিফের ছবিতে যা থেকে অনুমান করা যায় এই অঞ্চলে একসময় এই ধরনের প্রাণীর দেখা মিলত। তবে অনেকেরই মত যে, এই প্রাণীদের ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে শিল্পীরা তাঁদের নিজস্ব কোনও ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিচয় দিতে চান।        

অন্যদিকে সিন্ধু নদের তীরে লে (Leh) থেকে ১৬০ কিমি. দূরে ডোমখরে বেশ কিছু বড়ো আকারের বোল্ডার দেখা যাবে। ঘন কালো উজ্জ্বল বোল্ডারগুলির গায়ে এমনই সুদৃশ্য সব শিল্পকর্ম খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা, এগুলিও একই ধাঁচের পেট্রোগ্লিফ। কোথাও দেখা যায় মানুষের ছবি, কোথাও আবার পশুর ছবি। জানা যায় ঐ অঞ্চলে এমন আরও ৫০০টি পেট্রোগ্লিফ পাওয়া গিয়েছে। বহু বহু বছর ধরে সেগুলি এভাবেই অযত্নে, অবহেলায় পড়েছিল। পরে থাংজুক (Thangjuk) নামের এক সচেতন বাসিন্দা এবং তার পরিবার এই শিল্পকর্মগুলিকে সংরক্ষণ করার ভাবেন। ডোমখর এবং খালস্তে গ্রামের মধ্যে দীর্ঘ ৩৫ কিমি. অঞ্চল জুড়েও এমন বহু প্রস্তর চিত্র পাওয়া গিয়েছে যার বেশিরভাগই মানুষের ক্রিয়াকলাপের জন্য ধ্বংস হতে বসেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বুঝতে পেরেছেন যে এই প্রস্তর চিত্রগুলি ২০০০ বছর আগের এশিয়ার স্টেপ অঞ্চলের যাযাবর উপজাতিদের মধ্যে পাওয়া প্রস্তর চিত্রগুলির অনুরূপ। তবে লাদাখের আরও কিছু জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আজও এই পেট্রোগ্লিফ আবিষ্কৃত হয়ে চলেছে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন