ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভের পিছনে এদেশের যে সমস্ত বীর সন্তানদের অবদান অনস্বীকার্য তেমনই এক সাহসী ও নির্ভীক সন্তান ছিলেন বিপ্লবী পূর্ণচন্দ্র দাস (Purnachandra Das)। নিজের পড়াশোনা পরিত্যাগ করে ইংরেজ শাসনের শৃঙ্খল থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার লড়াইয়ে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী ‘মাদারীপুর সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর এই সমিতির নির্ভীক বিপ্লবীরা বাঘাযতীনের সঙ্গে একত্রে ব্রিটিশ সেনার সাথে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে সুভাষচন্দ্রের নবগঠিত ফরোয়ার্ড ব্লকেরও সদস্য হয়েছিলেন পূর্ণচন্দ্র। তিন দফা মিলিয়ে প্রায় ২৭ বছর ব্রিটিশ ভারতে জেলজীবন কাটাতে হয়েছিল তাঁকে। সেখানে প্রায় ৩৩ দিন অনশনও করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে দলীয় রাজনীতি পরিত্যাগ করেন তিনি। স্বাধীনতার মূল্যে দেশভাগের মত যে ভয়ঙ্কর অভিশাপের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তার ফলে দলে দলে উদ্বাস্তুর ভিড় জমতে থাকে কলকতায় এবং পশ্চিমবাংলার চারদিকে। পূর্ণচন্দ্র দাস কলকাতায় উদ্বাস্তু পুনর্বাসন বোর্ডের সদস্য হিসেবে বাস্তুহারা মানুষদের কল্যাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১৮৯৯ সালের ১ জুন ব্রিটিশ শাসনাধীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মাদারীপুর জেলার (বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুরের অন্তর্গত) রাজৈর উপজেলার ইশিবপুরে এক কৃষক পরিবারে পূর্ণচন্দ্র দাসের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন কাশীনাথ দাস (Kashinath Das)। যে সময়ে পূর্ণচন্দ্র বেড়ে ওঠেন, তখন চারদিকে ব্রিটিশ বিরোধিতার ঢেউ উঠতে শুরু করেছে। আন্দোলন, মিছিল, সশস্ত্র অভিযানের আবহে বেড়ে ওঠা একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়নি এই আগুনের আঁচ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে।
পড়াশোনার জন্য পূর্ণচন্দ্র মাদারীপুর হাই স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯১০ সালে সেখান থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা সমাপ্ত করবার পর আরও উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি চলে এসেছিলেন কলকাতায়। এখানকার বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হনপূর্ণচন্দ্র দাস। ইতিমধ্যে বঙ্গভঙ্গের মত ঘটনা ঘটে গিয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য আন্দোলনও চলছিল চারদিকে। এছাড়াও ১৯০৭ সালের সুরাট অধিবেশনে কংগ্রেস ভাগ হয়ে গেছে নরমপন্থী এবং চরমপন্থী দুই দলে। স্বরাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইতে কোমর বেঁধে নেমে পড়ছিল দেশের নানা প্রান্তের দুঃসাহসী তরুণ-তরুণীর দল। পূর্ণচন্দ্রও তখন কেবল পড়াশোনা করে চাকরির নিশ্চিন্ততায় ডুব দিয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে পারেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভের একমাত্র পথ হল সশস্ত্র বিপ্লবের পথ। স্বদেশি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি পড়াশোনা এবং নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন ত্যাগ করে। ১৯১০ সালেই মাদারীপুরের নির্ভীক, সাহসী, দেশপ্রেমে উদ্বেলিত সাতাশ জন তরুণকে নিয়ে পূর্ণচন্দ্র দাস গঠন করেছিলেন ‘মাদারীপুর সমিতি’। এই মাদারীপুর শান্তি-সেনাবাহিনীর প্রধান অধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। তৎকালীন অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর সমিতির মতো ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াইয়ে এই সমিতির ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। এই সমিতির মাধ্যমে সশস্ত্র আন্দোলন পরিচালনা করতেন তাঁরা। মূলত গেরিলা যুদ্ধের সাহায্যে বৈপ্লবিক অভিযান চালাতেন পূর্ণচন্দ্র এবং তাঁর নির্ভীক বাহিনী। পিস্তল, বোমার মতো ভয়ানক মারণাস্ত্র ছিল তাঁদের অভিযানের মূল হাতিয়ার। ১৯১২ সালে পূর্ণচন্দ্রের নেতৃত্বে মাদারীপুর সমিতি পাঁচটি বড় বড় গেরিলাযুদ্ধের অভিযান চালিয়েছিল।
এই মাদারীপুর সমিতির উল্লেখযোগ্য কয়েকজন বিপ্লবী, দুঃসাহসিকতার জন্য ইতিহাসে যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত তাঁরা হলেন চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, যতীশ পাল, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত, নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ অর্থাৎ বিনোদ দাস প্রমুখ। ১৯১৩ সালে ফরিদপুর ষড়যন্ত্র মামলায় পূর্ণচন্দ্র-সহ মাদারীপুর সমিতির সব সদস্যকেই প্রায় ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। পাঁচ মাস জেল খাটার পর তাঁরা মুক্তি পেয়েছিলেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পূর্ণচন্দ্র কলকাতায় চলে যান এবং অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে স্বদেশি আন্দোলনের কাজ করতে শুরু করেন। সেসময়, ১৯১৪ সাল নাগাদ জনপ্রিয় বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় যিনি মূলত বাঘাযতীন নামেই পরিচিত ছিলেন, তাঁর সঙ্গে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা হয় পূর্ণচন্দ্রের। এই বাঘাযতীনের সঙ্গেই পূর্ণচন্দ্রের মাদারীপুর সমিতির চার বীর সদস্য চিত্তপ্রিয়, মনোরঞ্জন, নীরেন্দ্রনাথ এবং যতীশ পাল ইংরেজ চার্লস টেগার্ট, কমান্ডার রাদারফোর্ড, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিলডিসহ অসংখ্য সশস্ত্র ব্রিটিশ পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সমরে বালেশ্বরের ট্রেঞ্চযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। উড়িষ্যার বুড়িবালামের তীরের যুদ্ধে শহীদ হন চিত্তপ্রিয় এবং বাঘাযতীন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। বাঘাযতীনের মৃত্যুতে পূর্ণচন্দ্র হতাশায় এবং শোকে ডুবে যান এবং কলকাতায় সমিতির নেতৃত্ব প্রদান করেন বিপ্লবী অতুলকৃষ্ণ ঘোষের উপর।
১৯১৪ সালে ভারত রক্ষা আইনে গ্রেফতার হন পূর্ণচন্দ্র এবং ১৯২০ সাল নাগাদ কারাগার থেকে মুক্তি পান। পূর্ণচন্দ্রের এই কারামুক্তিকে উপলক্ষ্য করে বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে রচনা করেছিলেন ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতাটি। এই কবিতায় পূর্ণচন্দ্রের জয়ধ্বনি দিয়ে নজরুল লিখেছিলেন, ‘জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র’। এই কবিতাটি নজরুল জেলে বসে রচনা করেছিলেন। এছাড়া উল্লেখ্য সেই বহরমপুর জেলে বসেই পূর্ণচন্দ্রের অনুরোধে শান্তিসেনার জন্য একটি ব্রিটিশ বিরোধী নাটক রচনা করে দিয়েছিলেন নজরুল। যদিও নাটকের পান্ডুলিপি হারিয়ে গিয়েছিল, তবে এটুকু জানা যায়, নজরুলের বিখ্যাত গান ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ ওই নাটকেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদিও সরকার বিরোধী প্রচারের অভিযোগে তাঁকে আবারও গ্রেফতার করা হয়েছিল।
একসময় সশস্ত্র বিপ্লবের পথ পরিত্যাগ করে পূর্ণচন্দ্র গান্ধীজির নেতৃত্বে কংগ্রেসের অহিংসার পথে যোগ দিয়েছিলেন। বাংলার প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি একসময়, বাংলার প্রতি জেলায় ও মহকুমায় কংগ্রেস কর্মী সংসদ বা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের প্রস্তাব পেশ করেছিল। প্রাদেশিক কংগ্রেসের অধীনে সমগ্র স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীটিকে পরিচালনার জন্য গঠন করা হয়েছিল ‘ন্যাশনাল সার্ভিস বোর্ড’। এই বোর্ড গঠন করা হয়েছিল মূলত বিপ্লবীদলের নেতাদের নিয়ে। বিপ্লবীরা সেসময় তাঁদের সশস্ত্র আন্দোলনের পথ থেকে খানিক সরে এসে কংগ্রেসের এই গণ-আন্দোলনেই যোগদান করেছিলেন। সেই বোর্ডের বিপ্লবী সদস্যদের মধ্যে একজন ছিলেন মাদারীপুর সমিতির প্রতিষ্ঠাতা পূর্ণচন্দ্র দাস। বার্মায় কংগ্রেসের অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র ছিলেন জি.ও.সি (G.O.C) অর্থাৎ জেনারেল অফিসার কমান্ডিং এবং পূর্ণচন্দ্র ছিলেন ও.সি (O.C)। ১৯২৮ সালের কলকাতা অধিবেশনে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির প্রধান পরিচালক নিযুক্ত হন এবং ১৯৩০ সালে লবণ সত্যাগ্রহও পরিচালনা করেন। পুণেতে পুনরায় গ্রেফতার হন তিনি এবং ১৯৩৮ সালে মুক্তি পান। একটা সময় পর পূর্ণচন্দ্র অহিংস আন্দোলনে আস্থা রাখতে পারেন না পুলিনবিহারী দাশদের মতই, ফলে পুনরায় তিনি তাঁর সশস্ত্র আন্দোলনের পথে ফিরে গিয়েছিলেন।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কর্তৃক নবপ্রতিষ্ঠিত ফরোয়ার্ড ব্লকে যোগদান করেন পূর্ণচন্দ্র দাস। কিন্তু ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সরকার পুনরায় তাঁকে গ্রেফতার করে। প্রায় ছয় বছর জেলযাপনের পরে ১৯৪৬ সালে মুক্তি পান তিনি। তিন দফায় হিসেব করলে দেখা যায় পূর্ণচন্দ্র প্রায় ২৭ বছর কারাগারে কাটিয়েছিলেন। দুই বছর তিনি পলাতক অবস্থায় আত্মগোপন করে থাকতে সক্ষম হয়েছিলেন। জেলে থাকাকালীন একবার ৩৩ দিন অনশন করেছিলেন পূর্ণচন্দ্র।
এরপর দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, নানারকম আপোষ, চুক্তি ইত্যাদি পেরিয়ে ভারতবর্ষ স্বাধীনতার স্বাদ পেল ১৯৪৭ সালে। কিন্তু এই স্বাধীনতার সঙ্গে অভিশাপস্বরূপ মানুষ দেখল দুঃস্বপ্নের দেশভাগ। উদ্বাস্তু মানুষের হাহাকারে বাংলার আকাশ-বাতাস ধ্বনিত হতে লাগল। কলকাতার রাস্তায়, ফুটপাথে দেশহারা, বাস্তুহারা মানুষের ভিড় উপচে পড়তে শুরু করেছিল তখন। কেবল কলকাতাতেই নয়, গোটা পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে সেই উদ্বাস্তুর দল জমতে শুরু করেছিল। দিকে দিকে উদ্বাস্তু কলোনি গড়ে উঠেছিল। তাঁদের দুরাবস্থা দেখে শিউরে উঠত সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ। নানাবিধ সরকারি ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছিল তাঁদের জন্য। কলকাতায় গড়ে ওঠা উদ্বাস্তু পুনর্বাসন বোর্ডের সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন পূর্ণচন্দ্র দাস। বাস্তুহারা মানুষদের কল্যাণসাধনে তৎপরতার সঙ্গে কাজ করেছিলেন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তী দলীয় রাজনীতি যে পথে বাঁক নিয়েছিল, পূর্ণচন্দ্র তা থেকে দূরেই রেখেছিলেন নিজেকে। কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই নিজের সংস্রব রাখেননি তিনি।
১৯৫৬ সালের ৪ মে বালিগঞ্জে সুবোধ নামের এক প্রাক্তন বিপ্লবীর ছুরিকাঘাতে পূর্ণচন্দ্র দাসের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু (সম্পা.), ‘সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান’, সাহিত্য সংসদ, ১৯৬০, পৃষ্ঠা ২৮৪
- নিতাই বসু, ‘কাজী নজরুল ইসলাম’, বইমেলা, ২০০৪, পৃষ্ঠা ২৪
- প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী, ‘ফিরে চাই’, পৃষ্ঠা ৩১।
- http://radhikaranjan.blogspot.com/


আপনার মতামত জানান