ইতিহাস

রাধাবিনোদ পাল

রাধাবিনোদ পাল (Radhabinod Pal) একজন ভারতীয় বাঙালি বিচারপতি যিনি ১৯৫২-১৯৬৬ সাল অবধি রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক ল’ কমিশনের সদস্য ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানে অক্ষশক্তির পরাজয়ে মিত্রবাহিনীর এগারো জন বিচারপতির মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র বিচারপতি যিনি জাপানের যুদ্ধকালীন শীর্ষনেতাদের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। সেসময়কার অতি গুরুত্বপূর্ণ মামলা ‘টোকিও ট্রায়াল’-এর সঙ্গে রাধাবিনোদ পালের নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

১৮৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি অধুনা বাংলাদেশের কুষ্ঠিয়া জেলার তারাপুর মৌজা এবং দৌলতপুর উপজেলার অন্তর্গত একটি ছোট্ট গ্রাম সলিমপুরে রাধাবিনোদ পালের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম বিপিন বিহারী পাল। ছোটোবেলা থেকেই খুব দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন কেটেছে। কিন্তু পরিশ্রম ও মেধার সংমিশ্রণে তিনি ভবিষ্যতে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন।

রাধাবিনোদ পাল ১৯০৫ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এফ.এ পরীক্ষায় পাশ করে গণিত বিষয়ে অনার্স নিয়ে ১৯০৭ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। গণিতে স্নাতক উত্তীর্ণ হবার পর একই কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন প্রথম শ্রেণিতে। এরপর কিছুদিন এলাহাবাদে অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের অফিসে কেরানির চাকরি করেন রাধাবিনোদ। ১৯১১ সালে ময়মনসিংহ জেলার আনন্দমোহন কলেজে গণিতশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে প্রথমে চাকরিতে যোগ দিলেও তিনি চেয়েছিলেন আইনবিশারদ হতে। তাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২০ সালে আইন বিষয়ে এল.এল.এম (LLM) পরীক্ষায় বসেন এবং প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। শিক্ষকতার পাশাপাশি ময়মনসিংহ আদালতে তিনি ওকালতির চর্চাও করতেন। এরপর ১৯২১ সালে তিনি কলকাতা উচ্চ-আদালতে আইনজীবি হিসেবে যোগ দেন। ১৯২৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এল.এল.ডি (LLD) অর্থাৎ ডক্টর অফ ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন রাধাবিনোদ। আইন বিষয়ে পিএইচডি করার সময় তাঁর গবেষণাপত্রের বিষয় ছিল ‘মনুসংহিতাপূর্ব বৈদিক ও উত্তর-বৈদিক যুগে হিন্দু আইন দর্শন’। ১৯২৭ সাল থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ভারত সরকারের জাতীয় আয়কর দপ্তরের আইন উপদেষ্টা হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। কলকাতা উচ্চ আদালতের বিচারপতি হিসেবে রাধাবিনোদ পাল নিযুক্ত হন ১৯৪১ সালে। ১৯৪৪-এ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সম্মানীয় পদে আসীন হন। একমাত্র তিনিই ১৯২৮, ১৯৩০ এবং ১৯৪৮ সালে মোট তিনবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টেগোর ল’ প্রফেসর’ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই বিশেষ ঐতিহ্যসম্পন্ন পদটিতে তাঁর আগে বহাল ছিলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মতো বিদ্দ্বজনেরা। এরপরে সুদূর প্রাচ্যের টোকিওতে আন্তর্জাতিক মিলিটারি ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি হিসেবে যোগদান করেন তিনি। এখানেই সেই বিখ্যাত টোকিও-ট্রায়ালে তাঁর দেওয়া রায়ের প্রেক্ষিতে তৈরি হয় বিতর্ক যা ইতিহাসে দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা হয়ে থাকে।  

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে, পশ্চিম রণাঙ্গন স্তব্ধ। কিন্তু জাপান তখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে অক্ষশক্তিকে ধ্বংস করে দেবার পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে আমেরিকার গোপন পরীক্ষাগারে। সেইমতো ১৯৪৫ সালে আমেরিকায় তৈরি হল পরমাণু বোমা। ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’ নামে দুটি পরমাণু বোমার আঘাতে জাপানের হিরোসিমা-নাগাসাকি শহরের উপর আমেরিকার ধ্বংসলীলার সাক্ষী হয়ে থেকেছে সমগ্র পৃথিবী। ইতিহাসের এ এক নৃশংস ভয়াবহ অধ্যায়। এরপরই জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। তৎকালীন জাপান সরকারের ২৮ জন মন্ত্রী ও আধিকারিককে যুদ্ধবন্দি করা হয় এবং তাঁদের বিচারের যে দীর্ঘ রোমাঞ্চকর প্রক্রিয়া শুরু হয় তার নামই ‘দ্য টোকিও ট্রায়াল’। বিশ্বের এগারোটি দেশ থেকে মোট এগারোজন স্বনামধন্য বিচারপতিদের নিয়ে মিলিত বেঞ্চ টানা দু’বছর ধরে এই মামলার বিচার করে। এই ‘ট্রায়াল’-এই একমাত্র ভারতীয় বিচারক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন রাধাবিনোদ পাল।

ট্রায়ালের ঘটনা ও প্রক্রিয়া এখানে একটু বিশদে বলা প্রয়োজন। জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগগুলিকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল – এ, বি ও সি। ‘এ’ হল শান্তিভঙ্গ, ‘বি’ হল যুদ্ধাপরাধ এবং ‘সি’ হল মানবতাবিরোধী অভিযোগ। আদালতে শুধু ‘এ’ চিহ্নিত অপরাধীদের বিচার হয়েছিল। ২৮ জন অপরাধীর মধ্যে তিনজন কোনো কারণে মারা যাওয়ায় বাকি ২৫ জনই শাস্তি পাবার জন্য অভিযুক্ত ছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিদেকো তোজো (Hideko Tojo)। গুরুতর অপরাধের জন্য তোজো সহ আরও সাতজনের ফাঁসির দণ্ডাদেশ হয়। এগারোজন বিচারপতির মধ্যে মাত্র একজনই এই রায়ের বিরোধিতা করেন এবং প্রকৃত যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি রাধাবিনোদ পাল। তাঁর পুত্র ড. প্রশান্তকুমার পালের থেকে জানা যায় যে ওলন্দাজ আইনবিশারদ প্রফেসর বার্ট রেলিং মিত্রশক্তি আমেরিকার জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের নির্দেশে একজন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের খোঁজে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে আবেদন করেন, কিন্তু নেহেরু এ ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য না করায় তিনি নিজেই রাধাবিনোদ পালের সন্ধান পেয়ে তাঁকে নির্বাচন করে ট্রাইব্যুনালে পাঠান। বিচারক পাল সেখানে প্রথম নৈতিক একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন -যুদ্ধাপরাধী আসলে কে? নানকিং গণহত্যার মতো ঘৃণ্য কাজ জাপান করলেও আমেরিকা প্রশাসনও পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের মতো এক নৃশংস অপরাধে অপরাধী। এই মামলার জন্য ১২৩৫ পাতার যে রায় ঘোষণা করেছিলেন বিচারপতি রাধাবিনোদ, তাতে মূলত তিনটি দিক উঠে আসে –

ক. চিনের নানকিং শহরে গণহত্যার জন্য যে মিত্রশক্তি জাপানকে দায়ী এবং অপরাধী সাব্যস্ত করেছিল, সেই একই অপরাধে হিরোসিমা ও নাগাসাকি শহরে পরমাণু বোমা ফেলে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে আমেরিকাও অভিযুক্ত।

খ. যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য কোনো পূর্বনির্ধারিত আন্তর্জাতিক আইন ছিল না। তাই মিত্রশক্তি জাপানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে নিজেরা আইন প্রণয়ন করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বিচার করেছে। এই সুচিন্তিত রায়ের ফলেই জাতিসংঘ পরে যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন তৈরি করে যা আজও ক্রিয়াশীল।

গ. তবে এই রায় যে জাপানকে সম্মতি দিয়েছে তা নয়। জাপানের সাম্রাজ্যবাদের মনোভাবকে কটাক্ষও করেছে। বিচারপতি রাধাবিনোদ জানিয়েছেন যে জাপান যদি পুনরায় যুদ্ধবাদের উত্থান চায় তবে তা হবে হিরোশিমায় শায়িত নিরীহ মানুষদের আত্মার প্রতি চরম অসম্মান।

তাই অভিযুক্ত অপরাধীদের বিষয়ে রাধাবিনোদ পাল জানান যে সমস্ত অভিযোগের নিরিখেই সকলকে খালাস দেওয়া উচিত কারণ প্রদত্ত অভিযোগের ভিত্তিতে সকলকে একইভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। ১৯৫২ সালে ‘টোকিও-ট্রায়াল’-এর রায় মেনে নিয়ে শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে টোকিও। জাপানে মার্কিন আধিপত্যের দিন শেষ হয়। তাঁর এই প্রচেষ্টায় জাপান ও ভারতের সম্পর্কের ভিত আরো মজবুত ও সুদূরপ্রসারী হয়ে ওঠে আর তার ফলশ্রুতি হিসেবেই তৈরি হয় ‘জাপান-ইণ্ডিয়া গুডউইল অ্যাসোসিয়েশন’ যার চেয়ারম্যান ছিলেন হিদাকি কাসে। পরবর্তীকালে ১৯৬৬ সালে জাপানের সম্রাট তাঁকে ‘ফার্স্ট ক্লাস অর্ডার অফ দ্য সেক্রেড ট্রেজার’ (First Class Order of the Sacred Treasure) উপাধিতে ভূষিত করে। এমনকি ১৯৫৮ সালে জাতিসংঘের আইন কমিশনের চেয়্যারম্যান হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন রাধাবিনোদ পাল।

জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসি স্কুলের সহকারী অধ্যাপক তাকাশি নাকাজিমা জাপানের ইতিহাসে রাধাবিনোদ পালের অবদান বিষয়ে একটি বই লেখেন ‘জাজ্‌ পাল’ (Judge Pal) নামে যেখানে লেখক বলেছেন যে পরবর্তীকালে বিশেষ বিশেষ বুদ্ধিজীবি ও সমালোচকগণ বিচারপতি পালের রায় থেকে বিশেষ কিছু কিছু অংশ নিজেদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। রাধাবিনোদের স্মৃতিতে জাপানের টোকিও’র ইয়াসাকুনি সমাধিমন্দিরে একটি স্মৃতিফলক তৈরি হয়েছে। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিন্‌জো আবে ভারত সফরে এসে রাধাবিনোদকে স্মরণ করেন। সম্প্রতি রাধাবিনোদের সঙ্গে জুড়ে গেছে প্রসিদ্ধ অভিনেতা ইরফান খানের নাম। নেটফ্লিক্সে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি ছবি ‘দ্য টোকিও ট্রায়াল’ যেখানে ঐতিসাহিক এই সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত চিত্রনাট্যে প্রকৃত রাধাবিনোদ পালের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইরফান খান। ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির প্রেক্ষাপটে ছিল ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত চলা জাপানের যুদ্ধাপরাধের সেই বিখ্যাত বিচারসভা। ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার রাধাবিনোদকে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে সম্মানিত করে।

১৯৬৭ সালের ১০ জানুয়ারি কলকাতায় বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি


শ্রীকান্ত জিচকর
শ্রীকান্ত জিচকর

এনার সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন