ভূগোল

রাঙ্গামাটি জেলা

বাংলাদেশ ৬৪টি জেলাতে বিভক্ত। বেশিরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল রাঙ্গামাটি জেলা (Rangamati)।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত রাঙ্গামাটি একটি পার্বত্য জেলা। জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আগে এখানকার নাম ছিল কার্পাস মহল। পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা থেকে ১৯৮১ সালে বান্দরবান এবং ১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়ি পৃথক জেলা হিসেবে চিহ্নিত করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার মূল অংশ রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। 

বাংলাদেশের একটি অন্যতম জেলা হল রাঙ্গামাটি। এই জেলার উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশ, দক্ষিণে বান্দরবান জেলা, পূর্ব দিকে মিজোরাম এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা ও খাগড়াছড়ি জেলা ঘিরে রয়েছে সমগ্র জেলাটিকে। অজস্র পর্বত ঘিরে রয়েছে রাঙ্গামাটি জেলাটিকে। কেবল পাহাড় নয় সংকীর্ণ উপত্যকা এবং হালকা বন-জঙ্গলে পরিবেষ্টিত এই জেলা৷ এই জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে কর্ণফুলী নদী। চারটি পর্বতমালা বেষ্টন করে আছে এই জেলাটিকে। উত্তর দিক জুড়ে আছে উত্তর-দক্ষিণমুখী হাজার ফুট উঁচু পাহাড়গুলি, পশ্চিমদিকে ফুরমোন পর্বতমালা যার উচ্চতা সর্বোচ্চ ১৫১৮ ফুট, পূর্বদিকে আছে দোলাঝিরি পর্বত যা বেশ কিছু জলপ্রপাত দ্বারা সমৃদ্ধ আর সবথেকে উত্তরে রয়েছে মাইনী উপত্যকা- ভূয়াছড়ি রেঞ্জ যার উচ্চতা প্রায় ২০০৩ ফুট। আরো উত্তরে বরকল রেঞ্জ পর্যন্ত এই পর্বতমালা বিস্তৃত হয়েছে। বরকল রেঞ্জটি আবার দু’ভাগে বিভক্ত – একটি শাখা কর্ণফুলী নদীতে মিশে গেছে আর অন্য শাখাটি ভারতের মিজোহিলে গিয়ে মিশেছে। এই জেলার প্রধান নদী কর্ণফুলী লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে রাঙ্গামাটির উত্তর-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ঠেগা নদীর মোহনা হয়ে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। ভারতের লুসাই নদী ও বাংলাদেশ অংশের থেগা খাল মিলিত হয়ে এই নদী কর্ণফুলী নদী নামে পরিচিত। এটি বরকল, সুবলং এবং কাপ্তাইয়ের কাছে তিনটি পর্বতশ্রেণিকে ছেদ করে চন্দ্রঘোনার কাছে এই জেলা থেকে বের হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের অদূরে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। কর্ণফুলীর উপনদীগুলি হল কাচালং, সলক, চেঙ্গী, ঠেগা, বড়হরিণা, রাইনখ্যং ও কাপ্তাই। এই উপনদীগুলি বর্ষাকালে যথেষ্ট খরস্রোতা থাকলেও অন্য সময়ে জল প্রায় থাকে না বললেই চলে। এই জেলায় একটি প্রাকৃতিক হ্রদ ‘রেংখিয়ং’ ও একটি কৃত্রিম হ্রদ ‘কাপ্তাই’ রয়েছে।  


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


রাঙ্গামাটি জেলার মোট আয়তন সমগ্র বাংলাদেশের ৬১১৬.১৩ বর্গ কিলোমিটার। এটি আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের বৃহত্তম জেলা।  ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যার বিচারে রাঙ্গামাটি সমগ্র বাংলাদেশের চৌষট্টিতম জনবহুল জেলা। এই জেলার জনসংখ্যা প্রায় ৬,২০,২১৪ জন৷ 

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলাকে ‘জনবৈচিত্র্যের মিলনক্ষেত্র’ বলা যেতে পারে। এখানে মোট এগারোটি জাতি বসবাস করে যাদের মধ্যে মোট দশটি আলাদা আলাদা ভাষা প্রচলিত আছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, পাংখোয়া, বোম, চাক, খিয়াং, খুমী,ও লুসাই এইসব গোষ্ঠীগুলি ভাষা ও সংস্কৃতির বিচারে এক অন্যের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে ‘চাকমা’ হল প্রধান জাতিসত্ত্বা এবং তারপরেই মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের অবস্থান। অন্যান্য সাতটি জাতির অবস্থান রাঙ্গামাটি জেলার মোট জনসংখ্যার ১.২৭% মাত্র।

বিলু কবীরের লেখা ‘বাংলাদেশ জেলা: নামকরণের ইতিহাস’ বইতে এই জেলার নামকরণের ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে টারশিয়ারি যুগে গঠিত হয়েছিল এই অঞ্চলের পর্বতরাজি যে সময় এখানকার মাটির রঙ ছিল লালচে বা রাঙা বলেই এই জনপদের নাম হয়েছে রাঙ্গামাটি৷ অন্য একটি মত অনুসারে, বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলা সদরের পূর্বদিকে একটি ছড়া (জলাশয়) ছিল যার স্বচ্ছ জল যখন লাল বা রাঙা মাটির ওপর দিয়ে ঢাল বেয়ে নেমে যেতো, তখন উপর থেকে জলাশয়টিকে লাল রঙের মনে হতো। এই ছড়ার নাম হয়েছিল রাঙ্গামাটি আর সেখান থেকেই হয়তো এই জেলার নামের উৎপত্তি। বর্তমানে ছড়াটি হ্রদে নিমজ্জিত।

রাঙ্গামাটি জেলা যে আগে কার্পাসমহল ছিল সেখানে আরাকান রাজাদের যুদ্ধক্ষেত্র ছিল আর একই জায়গায় চাকমা আর ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীরও অধিকার ছিল। চাকমাদের রাজা বিজয়গিরি একসময় এই জনপদটি দখল করে রাজত্ব বিস্তার করেন। যদিও ইতিহাসের নথি অনুযায়ী একেবারে প্রথমে ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে রাজা যুজা রূপা এই রাঙ্গামাটিতে রাজধানী স্থাপন করেন। তারপরে ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরার রাজার দখলে চলে যায় এই অঞ্চল। যেহেতু এই অঞ্চল একসময় চট্টগ্রামের অন্তর্ভুক্ত ছিল তাই এই জেলার সেভাবে কোনো পৃথক ইতিহাস পাওয়া যায় না।

 এই জেলায় বসবাসরত প্রত্যেক জাতিসত্ত্বার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। মারমা জাতিগোষ্ঠী বর্মী বর্ণমালায় লেখার কাজ করেন। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষা সমগোত্রের এবং ভাষারীতিতে বেশ মিল পরিলক্ষিত হয়। দু’টো ভাষাই ইন্দো-আর্য শাখার অন্তর্ভূক্ত। মারমারা বর্মী ভাষায় কথা বলে থাকেন। 

এই জেলায় ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর ও অ-উপজাতীয় অধিবাসীগণ বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী হলেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাস করেন এবং কিছু সংখ্যক মানুষ হিন্দু এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। তবে বাঙালিদের মধ্যে এখানে অধিকাংশ মানুষই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। 

এই জেলার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণস্থানগুলির তালিকা অপূর্ণই থেকে যাবে যদি না আসামবস্তি ব্রীজ, উপজাতীয় জাদুঘর, ওয়াজ্ঞা চা এস্টেট, কর্ণফুলি কাগজ কল, কংলাক পাহাড়, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের নাম উল্লেখ না করা হয়। এছাড়া এখানে রয়েছে কাপ্তাই হ্রদ, চিৎমরম বৌদ্ধবিহার, চিং-হ্লা-মং চৌধুরী মারি স্টেডিয়াম, ঝুলন্ত সেতু, টুকটুক ইকো ভিলেজ, ডলুছড়ি জেতবন বিহার, তবলছড়ি আনন্দ বিহার, দুমলং ধুপপানি ঝর্ণা, নৌ-বাহিনীর পিকনিক স্পট, পাবলাখালী বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য, বনশ্রী পর্যটন কমপ্লেক্স, বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্সনায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ স্মৃতি ভাস্কর্য, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র, মুপ্পোছড়া ঝর্ণা, যমচুগ বনবিহার, রাঙ্গামাটি সেনানিবাস, রাজবন বিহার, রাজা জং বসাক খানের দীঘি ও মসজিদ, রাজা হরিশচন্দ্র রায়ের আবাসস্থলের ধ্বংসাবশেষ, শুভলং ঝর্ণা, সাজেক ভ্যালি, হাজাছড়া ঝর্ণা, চাকমা রাজবাড়ি প্রভৃতি অনন্য সব ভ্রমণস্থান।  

রাঙ্গামাটি জেলার রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে যারা অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মন্ত্রী, রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা, সাংসদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, রাজমাতা বিনীতা রায়, স্বেচ্ছাসেবী সমাজকর্মী সুবিমল দেওয়ান, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, সুদীপ্তা দেওয়ান, সুদীপ্তা দেওয়ান, গেংখুলী শিল্পীগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মণি স্বপন দেওয়ান প্রমুখ৷   

জন বৈচিত্র্যের মিলন ক্ষেত্র রাঙ্গামাটি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ৷ এখানে দশ ভাষাভাষীর এগারোটি জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে৷ তাদের বিভিন্ন লোক সাহিত্যে যেমন প্রবাদ-প্রবচন (ডাগকধা), ধাঁধাঁ (বানা), লোককাহিনী, ছড়া ইত্যাদি এখানকার প্রাণ। এগুলোর ব্যবহার  ও রচনাশৈলী অন্যরকম। লোককাহিনী রচনার বুননেও উৎকর্ষতার ছাপ দেখা যায়। চাকমা ও মারমা গোষ্ঠীর মানুষরা আধুনিক সাহিত্যচর্চায়ও অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন। তারা নিজেদের ভাষায় গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা ইত্যাদি রচনা করছেন। চাকমাদের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব ‘বিঝু’ যা কিনা বাংলা মাসের চৈত্র সংক্রান্তি শেষ দুদিন ও ‘পহেলা বৈশাখ’ এই তিনদিন ধরে চলে। বিঝু উৎসব আসলে পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে আর নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রয়াস। এই উৎসব ঘিরে সবুজ পাহাড়ে চলে নানা আয়োজন। বিঝুর প্রথম দিনকে বলা হয় ‘ফুলবিঝু’। এই দিন তারা বাড়ি-ঘর ধুয়ে-মুছে ফুল ও লতাপাতা দিয়ে সাজিয়ে ফেলে, সঙ্গে চলে বিভিন্ন উপাচার। পরদিন মূল বিঝুতে বাড়ির সকলে নতুন জামা-কাপড় পরে দল বেঁধে এ পাড়া থেকে পাশের পাড়া ঘুরে নানান ধরনের পাহাড়ি খাবার, পিঠে আর মদ খেয়ে উৎসব পালন করে। বিঝু উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ‘পাজন’ নামে একধরণের খাবার যাতে ছত্রিশ রকমের পদ থাকে৷ তৃতীয় দিন হল বিশ্রামের দিন আগের দুই দিনের উৎসবের ধকল সামলে বিশ্রাম করেন তারা৷ ‘গিলা’ খেলা, লাটিম খেলা, ঘুড়ি ও ফানুস ওড়ানো, তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওঠার প্রতিযোগিতা, গেংগুলি গীত, যাত্রার পালা এসব ছিল প্রায় ধূসর হওয়া ‘বিঝু’র অন্যতম আকর্ষণ।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মহাশ্বেতা দেবীকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য দেখুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন অজানা এই তথ্য