সববাংলায়

সলাবত মাহাতো

বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি প্রাচীন ধারা ঝুমুর গান ও নাচের জনপ্রিয়তা আজও পরিলক্ষিত হয়। হাতেগোনা কয়েকজন ব্যতীত এইসব লোকগান ও নাচের শিল্পীরা তুলনায় সেই জনপ্রিয়তা বা পরিচিতি পান না। তবে খ্যাতি পাওয়া অল্প কয়েকজনের মধ্যেই রয়েছেন বিখ্যাত ঝুমুর শিল্পী সলাবত মাহাতো (Salabat Mahato)। তিনি ছিলেন একাধারে ঝুমুর গান রচয়িতা, সুরকার এবং গায়ক। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ডের মতো জায়গাগুলিতে এই ক্ষয়িষ্ণু ঝুমুর গান পুনরুজ্জীবন লাভ করেছিল এই সলাবত মাহাতোরই হাত ধরে। শুধু তাই নয়, ঝুমুর গানকে যতটা সম্ভব অবিকৃতরূপে, তার মৌলিকতা বজায় রেখেই পরিবেশন করবার চেষ্টা করতেন তিনি। মূলত দরবারি ঝুমুর গানের জন্যই বিখ্যাত ছিলেন তিনি। ঝুমুর ছাড়াও অবশ্য আরও কিছু কিছু ধারার লোকগানের চর্চা তিনি করেছিলেন। ঝুমুরের মতো লোকশিল্পকে এই আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে এক নতুন সম্ভাবনাময় দিগন্তের দিকে চালিত করবার ক্ষেত্রে সলাবত মাহাতোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁকে ‘লালন’ সম্মান ছাড়াও নানা খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে।

১৯৪২ সালে অবিভক্ত ভারতবর্ষের বর্তমান পুরুলিয়ার অন্তর্গত বরাবাজার থানার লটপদা গ্রামে এক চাষি পরিবারে সলাবত মাহাতোর জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ঢোল বাদক।

মাত্র নয় বছর বয়স থেকে গানবাজনার তালিম নিতে শুরু করেছিলেন তিনি। ছোটবেলায় তাঁর চাচা তাঁকে নাচনিদের অনুষ্ঠান দেখতে নিয়ে যেতেন। সেখান থেকেই সলাবত ঝুমুর গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর চাচা নিজেও একজন ঝুমুর গায়ক ছিলেন। সলাবত ছোট বয়সেই বাঁশি বাজাতে শিখেছিলেন এবং মাত্র আট বছর বয়স থেকেই ঝুমুর গাইতে শুরু করেছিলেন। বাবা এবং চাচা দুজনেই সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও লোকনাট্যদলের বাঁশিবাদক হওয়ার যে পরিকল্পনা সলাবত করেছিলেন ছোটবেলায়, তা তাঁরা মানতে নারাজ ছিলেন এবং কঠোর বিরোধিতাও করেন, কারণ অমন দলের সঙ্গে ঘুরে বাঁশি বাজিয়ে অভাবী সংসারে খুব বেশি আয় হবে না। নিরুৎসাহিত হয়ে সলাবত অষ্টম শ্রেণির পর স্কুল ছেড়ে দেন। অবশ্য পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পিছনে আর্থিক অনটনও কারণ হতে পারে। এরপর ভাল করে বাঁশি বাজানো শিখে ১১ বছর ধরে তিনি লোকনাট্যেই অভিনয় করেছিলেন।

পরবর্তীকালে ঝুমুর শিল্পে মনোনিবেশ করেন সলাবত মাহাতো এবং ক্রমে বিপুল জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন। গান পাগল এই মানুষ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যেতেন গান শোনাতে, রাত জেগে ঝুমুর পরিবেশন করতেন। মূলত দরবারি ঝুমুর গানের জন্যই জনপ্রিয় ছিলেন সলাবত। এমনকি এও জানা যায়, যে, ঝুমুর গানের সাধনার জন্য গ্রামের একেবারে প্রান্তে নদীর ধারে চালা ঘর বেঁধে পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকতে শুরু করেছিলেন। তখন প্রায় আশ্রমিকের মতো জীবন কাটাতেন তিনি। তাঁর স্ত্রী আতুবালা দেবী আমৃত্যু তাঁর সঙ্গী থেকেছেন। অর্থের প্রতি মনোযোগ তেমন ছিল না তাঁর, কেবল মনপ্রাণ দিয়ে ঝুমুর গাইতেন। অনেক সময় অনেক অনুষ্ঠানে চুক্তির থেকে কম টাকা নিয়েও  একইরকম আনন্দের সঙ্গে গান গেয়ে এসেছেন তিনি। এখানে উল্লেখ্য যে, ঝুমুর ছাড়াও তিনি নিয়মিত বাউল গানের চর্চাও করতেন এবং অনেক জায়গায় বাউল সঙ্গীতও পরিবেশন করতেন তিনি। স্থায়ী আয় তেমন কিছু ছিল না, ঝুমুর গেয়ে উপার্জিত অর্থে অভাব-অনটনের মধ্যেই সংসার চলত তাঁর। পরে অবশ্য শিল্পী ভাতা হিসেবে মাসে হাজার টাকা করে পেতেন।

ঝুমুর গানে সলাবত মাহাতোর জনপ্রিয়তার একটি অন্যতম কারণ সম্ভবত তাঁর উপস্থাপনের মধ্যে নিহিত সততা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঝুমুর স্বতঃস্ফূর্তভাবে হৃদয় থেকে উৎসারিত গান, এবং আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে যে-কেউই এই গান গাইতে পারে। সলাবত মাহাতো নিজে অনেক ঝুমুর গান রচনা করেছিলেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঝুমুর গানের মধ্যে রয়েছে, “চান্দর গায়েতে কলঙ্ক রোচে”, ‘আসা যাওয়া ভবের খেলা” ইত্যাদি। কেবল নিজের রচনা করা গান নয়, তিনি ভাবপ্রীতানন্দ ওঝা-সহ আরও বিভিন্ন ঝুমুর রচয়িতাদের গান গেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন।

সমস্ত কিছুর পাশাপাশি পুরাতন বিভিন্ন ঘরানার গানের এই বিকৃত আধুনিকায়নের যুগে, ঝুমুর গানের মৌলিকতাকে বাঁচিয়ে রাখার একজন পথপ্রদর্শক স্বরূপ ছিলেন সলাবত মাহাতো। বিহার, ঝাড়খন্ড, বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষয়িষ্ণু ঝুমুর শিল্পটির একরকম পুনরুজ্জীবন প্রাপ্তি হয়েছিল সলাবত মাহাতোরই হাত ধরে। তাঁর কন্ঠস্বর এবং রচিত গীত দ্বারা অনেক তরুণ শিল্পীও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাঁর কাছে শিক্ষার্থীরা গান শিখতেও আসতেন।

কেবল গাইতেনই না তিনি, গানের সঙ্গে সঙ্গে ঝুমুর নৃত্যও পরিবেশন করতেন কখনও কখনও। আবার ঝুমুর পরিবেশনকালে কখনও কখনও তাঁকে মাদল বাজাতেও দেখা গিয়েছিল। ঝুমুর নাচের জন্য খ্যাত নাচনি শিল্পী সিন্ধুবালা দেবীর সঙ্গেও তিনি পারফর্ম করেছিলেন।

ঝুমুর গানের দীর্ঘদিন অস্তিত্ব টিকে থাকা এবং এর জনপ্রিয়তার জন্য সলাবত বিশেষভাবে কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন নাচনিদের। তিনি মনে করেন, ঝুমুর গানের সঙ্গে সঙ্গে ঝুমুর নর্তকী নাচনিদের মনোমুগ্ধকর ও আবেগময় নৃত্য না থাকলে বহুদিন আগেই ঝুমুর বিস্মৃত হয়ে পড়ত।

২০১০ সালে সলাবত মাহাতো, মিহিরলাল সিং দেও এবং অমূল্য কুমার দরবারি ঝুমুর নামে একটি অ্যালবাম রেকর্ড করেছিলেন। তিনি দুঃখহরণ যোগসাধন আশ্রমও চালাতেন। লোকসঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে ১৯৯৬ সালে তাঁকে আব্বাসউদ্দীন আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার ও চামু কর্মকার স্মরণ স্মৃতি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছিল এবং পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে ‘লালন’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তাঁকে। সলাবত মাহাতোর জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছিল।

খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম এবং দীর্ঘদিন রাত জেগে অনুষ্ঠান করার ফলে নানারকম অসুখে আক্রান্ত হন তিনি। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কঠিন এক রোগে আক্রান্ত হয়ে টাটার এক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। ফের ২০১৫ সাল নাগাদ আবার অসুস্থ হলে রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি অধিকর্তার নির্দেশে তাঁকে পুরুলিয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবেই তাঁর শরীর ক্ষয়ে যেতে থাকে এবং আর কখনও মঞ্চে গাইতে উঠতে পারেননি তিনি। অবশেষে ২০১৬ সালের ৮ জানুয়ারি এই বিখ্যাত ঝুমুর শিল্পী সলাবত মাহাতোর মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading