সতীপীঠ নাইনাতিভু নাগাপুশোনি আম্মান

সতীপীঠ নাইনাতিভু নাগাপুশোনি আম্মান

সতীপীঠ নাইনাতিভু নাগাপুশোনি আম্মান শ্রীলঙ্কার জাফনা অঞ্চলে নাইনাতিভু দ্বীপে অবস্থিত। সতীপীঠ নাইনাতিভু নাগাপুশোনি আম্মান একান্ন সতীপীঠের একটি পীঠ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে সতীর পায়ের নূপুর পড়েছিল। এখানে অধিষ্ঠিত দেবী হলেন ‘নাগাপুশোনি’ বা ‘ভুবনেশ্বরী’ এবং ভৈরব হলেন ‘নাইনার’ বা ‘রাক্ষসেশ্বর’।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মাতা সতী নিজের বাপের বাড়িতে বাবার কাছে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে সেখানেই দেহত্যাগ করেছিলেন। মাতা সতীর দেহত্যাগের খবর মহাদেবের কাছে পৌঁছতেই মহাদেব সেখানে উপস্থিত হন। সতীর মৃতদেহ দেখে ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব সেই দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য চালু করেন। মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্যে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কায় শ্রীবিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দ্বারা মাতা সতীর দেহ একান্নটি খণ্ডে খণ্ডিত করেন। সেই দেহখন্ডগুলোই যে যে স্থানে পড়েছিল সেখানে একটি করে সতীপীঠ প্রতিষ্ঠা হয়, বলা হয় সতীর পায়ের নূপুর পড়ে নাইনাতিভু সতীপীঠটি গড়ে উঠেছে।

হিন্দুশাস্ত্র ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে এই সতীপীঠ নাইনাতিভু নাগাপুশোনি আম্মান মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে, এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র। মহাভারতে আছে, দেবরাজ ইন্দ্র মহর্ষি গৌতমের স্ত্রী দেবী অহল্যার সৌন্দর্য্য দেখে মোহিত হন এবং মহর্ষি গৌতমের অনুপস্থিতিতে তাঁর রূপ ধরে এসে অহল্যার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করার জন্য প্রস্তাব দেন। অহল্যা সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়ে গৌতমরূপী ইন্দ্রের সঙ্গে সঙ্গম করেন। কিন্তু গৌতম আশ্রমে ফিরে এসে তাঁদের দুজনকে দেখে সব বুঝতে পারেন এবং ভীষণ রেগে গিয়ে ইন্দ্রকে নপুংসক হওয়ার অভিশাপ দেন এবং ইন্দ্রের গায়ে এক হাজারটি ‘যোনি’ চিহ্ন ফুটিয়ে দেন যাতে ইন্দ্রকে দেখে সবাই বুঝতে পারে যে তিনি এক নারীকে ধর্ষণ করেছেন। লজ্জায়, অপমানে ইন্দ্র এই শাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজতে চলে আসেন মণিদ্বীপে (এখনকার নাইনাতিভু দ্বীপ)। এখানে এসে তিনি দেবী ভুবনেশ্বরীর মূর্তি তৈরি করেন এবং তাঁর আরাধনা শুরু করেন। দেবী ভুবনেশ্বরী সন্তুষ্ট হয়ে ইন্দ্রকে দেখা দেন এবং তাঁর গায়ে অঙ্কিত যোনিচিহ্ন গুলিকে এক হাজারটি চোখে বদলে দেন। তখন থেকেই দেবরাজ ইন্দ্রের এক হাজারটি চোখ হয় এবং এই কাজের জন্য দেবী ‘ইন্দ্রাক্ষী’ নামে খ্যাত হন।           

বই  প্রকাশ করতে বা কিনতে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

অন্য একটি কাহিনী অনুসারে, অনেক শতাব্দী আগে, একদিন একটি নাগ সমুদ্র পেরিয়ে দেবী ভুবনেশ্বরীর পুজো করার উদ্দেশ্যে নাইনাতিভু দ্বীপের দিকে যাচ্ছিল। তার মুখে ধরা ছিল একটি পদ্ম ফুল। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর বাহন গরুড় (বা একটি ঈগল) সেই নাগকে দেখতে পেয়ে তাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। গরুড়কে সন্তুষ্ট করার জন্য নাগটি দ্বীপ থেকে আধ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের মধ্যে একটি পাথরে ক্রমাগত নিজের শরীরে আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে। বর্তমানে তামিল ভাষায় এই পাথরটির নাম ‘পাম্বু সুত্রিয়া কাল’ বা ‘যে পাথরে সাপ নিজেকে আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল’। গরুড় অন্য একটি পাথরে দাঁড়িয়ে নাগটিকে দেখছিল। সেই পাথরটির নাম ‘গরুদান কাল’ বা ‘রক অফ দ্য ঈগল’।

সেই সময় কোলা রাজ্যের একজন বণিক, যার নাম ছিল মানিকান, পক প্রণালী পেরিয়ে প্রাচীন নাকা নাড়ু প্রদেশে বাণিজ্য করতে যাচ্ছিল। সে নিজে ছিল দেবী ভুবনেশ্বরীর একজন ভক্ত। নাগটিকে আহত অবস্থায় দেখে তার দয়া হয় এবং তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য সে গরুড়ের কাছে মিনতি করতে থাকে। গরুড় তখন বলে যে, মানিকান যদি নাইনাতিভু দ্বীপে দেবী ভুবনেশ্বরীর একটি মন্দির বানিয়ে দেয় এবং সার্বজনীন শান্তি, সমৃদ্ধি ও মানবতার জন্য দেবীর পূজার কথা প্রচার করে, তবেই সে নাগটিকে ছেড়ে দেবে। মানিকান এই প্রস্তাবে সম্মত হয় এবং একটি সুন্দর মন্দির তৈরি করে। নাগদের উপর করা অত্যাচারের পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য (যা মহাভারতে উল্লেখিত আছে) গরুড় সমুদ্রে তিনবার ডুব দেয় এবং একই সঙ্গে নাগরাজ্যের সঙ্গে গরুড়ের চিরকালের শত্রুতার অবসান হয়। 

এই মন্দিরে দেবীর মূর্তি চতুর্ভুজা, দেবী একটি পদ্মফুলের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পরনে লাল রঙের শাড়ি, মাথায় সাপের ফণাযুক্ত মুকুট। গলায় ফুলের মালা এবং রত্নহার। দেবীকে ঘিরে আছে একটি তোরণ। সাপের অলঙ্কার পরে থাকার জন্য দেবীকে ‘নাগাপুশোনি আম্মা’ বলা হয়। এখানে দেবী ও ভৈরব একসঙ্গে পূজিত হন। জনশ্রুতি অনুসারে, এই দেবী ও ভৈরব ছিলেন লঙ্কার রাজা রাক্ষসরাজ রাবণের আরাধ্য। তাই দেবীর ভৈরবের নাম রাক্ষসেশ্বর।

এই মন্দিরটিতে দ্রাবিড়ীয় স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন দেখা যায়। প্রবেশদ্বারটি বিভিন্ন ছবি, মূর্তি ও প্রদীপ দিয়ে ব্যাপকভাবে সজ্জিত। মন্দিরের গর্ভগৃহে একটি দশ ফুট উঁচু মিনার আছে। গর্ভগৃহের দুটি দরজা—একটি পূর্বমুখী এবং অন্যটি উত্তরমুখী। মন্দিরে আছে চারটি সুবিশাল গোপুরম (তোরণ)। সবথেকে বড় গোপুরমটির নাম ‘রাজা রাজা গোপুরম’। এটি ১০৮ ফুট উঁচু এবং ২০০০টি ভাস্কর্য ও ৯টি সোনার কলস দিয়ে সাজানো। বাকি তিনটি গোপুরমের নাম পূর্ব গোপুরম (৫৪ ফুট উঁচু), দক্ষিণ গোপুরম (৫৪ ফিট উঁচু) ও দক্ষিণ পূর্ব গোপুরম (২০-২২ ফুট উঁচু)। এখানে আছে কয়েকটি মণ্ডপ, যেমন- কল্যাণ মণ্ডপ, বাহন মণ্ডপ, বসন্ত মণ্ডপ, অন্নপূর্ণেশ্বরী অন্নধান মণ্ডপ প্রভৃতি। মূল মন্দিরে ঢোকার আগেই রয়েছে একটি ৮ ফুট উঁচু নন্দীর মূর্তি।

প্রত্যেকটি সতীপীঠ বা শক্তিপীঠে দেবী এবং ভৈরব অধিষ্ঠিত থাকে। দেবী হলেন সতীর রূপ। ভৈরব হলেন সতীর স্বামী। নাইনাতিভু সতীপীঠে দেবীর নাম ‘ভুবনেশ্বরী’। এছাড়াও দেবীকে ‘নাগাপুশোনি’ ও ‘ইন্দ্রাক্ষী’ নামেও সম্বোধন করা হয়। দেবীর ভৈরবের নাম ‘নাইনার’ বা ‘রাক্ষসেশ্বর। এছাড়াও এখানে গণেশ, কার্তিক, নবগ্রহ, সূর্যদেব, চন্দ্রদেব, কালভৈরব প্রভৃতি দেবতাও পূজিত হন।        এই মন্দিরে নিত্যপুজোর ব্যবস্থা আছে। প্রতিদিন এখানে ছয় বার দেবী ও ভৈরবের পুজো হয়। পুজোর পদ্ধতি চারটি ভাগে বিভক্ত, যথা- অভিষেক বা স্নান, অঙ্গরাগ বা সজ্জা, নৈবেদ্য প্রদান ও আরতি।

এখানকার প্রধান উৎসব হল ষোলো দিন ব্যাপী ‘মহোৎসব’, যাকে তামিল ভাষায় বলা হয় ‘থিরুভিজা’। এই উৎসবের বিভিন্ন আচার আছে, যেমন ‘স্বর্ণ রথলসাভম’ (‘মাঞ্জা থিরুভিজা’ বা সোনার রথ উৎসব), ‘রথলসাভম’ (‘থের থিরুভিজা’ বা রথ উৎসব), ‘পুঙ্গবনম’ (‘থেপ্পা থিরুভিজা’ বা নৌকা উৎসব) প্রভৃতি। প্রতিবছর তামিল মাস ‘আনি’ বা ইংরেজি জুন-জুলাই মাসে এই উৎসব হয়। তামিল মাস ‘আদি’ (ইংরেজি জুলাই-আগস্ট) ও ‘থাই’ (ইংরেজি জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) মাসের শুক্রবারগুলি এই মন্দিরে বিশেষভাবে পালিত হয়। মনে করা হয় এই সময় দেবী পার্বতী যুবতী হয়েছিলেন এবং তাঁর মধ্যে মাতৃভাব জাগরিত হয়েছিল। এছাড়াও নবরাত্রি ও মহাশিবরাত্রির মত উৎসবও এখানে পালন করা হয়।

আপনার মতামত জানান