ইতিহাস

টি ভি রাজেশ্বর

টি ভি রাজেশ্বর

ভারতীয় রাজনীতিকে নিজের ব্যক্তিত্বে ও দক্ষতায় অলঙ্কৃত করেছেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে অন্যতম স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব টি.ভি রাজেশ্বর (T.V. Rajeswar)। জনপ্রিয়তার নিরিখে তিনি পিছিয়ে থাকলেও তাঁর প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপকে কোনওভাবেই অস্বীকার করা চলে না। সিকিম, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন রাজ্যপাল ছিলেন তিনি। টি ভি রাজেশ্বর অবশ্য কেবল রাজনীতিবিদই নন, তিনি পুলিশ প্রশাসন এবং গোয়েন্দা বিভাগের হয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন দীর্ঘদিন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনকাল ভারতবর্ষের রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। টি ভি রাজেশ্বর জরুরি অবস্থার সাক্ষী ছিলেন। তিনি দেখেছেন অ-কংগ্রেসি সরকারের শাসন, পাঞ্জাবে জঙ্গীবাদের উত্থানেরও সাক্ষী থেকেছেন তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনকালে। আজীবন প্রশাসনিক স্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিষ্ঠা এবং দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন তিনি। ২০১২ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে টি ভি রাজেশ্বর পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত হন।

১৯২৬ সালের ২৮ আগস্ট তামিলনাড়ুর পুরাতন সালেম জেলার অন্তর্ভুক্ত রাসিপুরম তালুকের গুরুসামিপালায়ামে টি ভি রাজেশ্বরের জন্ম হয়। তাঁর বাবা টি.মারিমুথু মুদালিয়ার পেশায় ছিলেন একজন বয়নশিল্পী বা তাঁতি। টি ভি রাজেশ্বরের স্ত্রী ছিলেন শ্রীমতী মহালক্ষ্মী রাজেশ্বর । এই রাজেশ্বর দম্পতির এক পুত্র এবং একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। কন্যা সুজাতা সিং একজন আইএফএস (IFS) অফিসারের পদে বহাল ছিলেন ২০১৩ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত। এছাড়াও জার্মানিতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি ২০১২-১৩ সালে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের ভূমিকাও পালন করেছিলেন সুজাতা।

টি ভি রাজেশ্বর তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন গুরুসামিপালায়াম সেঙ্গুনথার মহাজন বিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীকালে অর্থনীতিতে অনার্স সহ তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে।

১৯৪৯ সালে টি ভি রাজেশ্বর ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের (Indian Police Service বা IPS) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে হায়দ্রাবাদের নিজামাবাদ, রায়চুর, এবং গুন্টুর জেলায় পুলিশের সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি হায়দ্রাবাদ এবং সেকেন্দ্রাবাদে ডেপুটি কমিশনার হিসেবেও কাজ করেছিলেন। ১৯৬২ সালে টি ভি রাজেশ্বর ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। এই ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর অফিসার হিসেবে তিনি সিকিম এবং ভুটানে ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত যথাক্রমে একজন ওএসডি অর্থাৎ অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি এবং একজন উপদেষ্টা হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছিলেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর হেড কোয়ার্টারে ডেপুটি ডিরেক্টর এবং যুগ্ম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালেই ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর পদোন্নতি হয় এবং তিনি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর ডিরেক্টর অর্থাৎ পরিচালকের দায়িত্ব পান। ১৯৮৩ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। এরপর তিনি অরুণাচল প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন। সেই প্রথমবার ভারতে একজন আইপিএস অফিসার একটি সাংবিধানিক পদের জন্য বহাল হয়েছিলেন। ১৯৮৩ সালের আগস্ট মাস থেকে ১৯৮৫ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদের দায়িত্ব সামলেছিলেন। তারপর এই পুলিশ বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণের পর ১৯৮৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে ১৯৮৯ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত এই চার বছর টি ভি রাজেশ্বর প্রথমে সিকিমের রাজ্যপাল পদে আসীন হন এবং এর ঠিক কিছুদিন পরেই, ১৯৮৯ সালের ২০ মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র কয়েকদিনের জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবেও কর্তব্য পালন করেন। আরও পরে ২০০৪ সালের ৮ জুলাই থেকে ২০০৯ সালের ২৮ জুলাই, এই পাঁচ বছর উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল হিসেবেও কাজ করেছিলেন টি ভি রাজেশ্বর। রাজেশ্বর একসময় রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর কর্মচারীদের মধ্যেও সেতুর মত কাজ করতেন।

সাতের দশকের জরুরি অবস্থার সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন টি ভি রাজেশ্বর। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো থেকে ইন্দিরা গান্ধীকে সতর্ক করা হয়েছিল যে, তাঁর পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর অত্যাচারের কারণে জনগণের মনে ক্ষোভ দিন দিন মাথা চাড়া দিচ্ছে। এই যে জনগণের প্রতিক্রিয়া তা সংগ্রহ করে একটি রিপোর্ট তৈরির কাজে টি ভি রাজেশ্বর খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর সরকার সেই সতর্কবার্তাকে অবহেলা করার ফলে তাদের ক্ষমতা হারাতে হয়েছিল এবং ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টি সেই ক্ষমতা দখল করেছিল৷ আবার ১৯৮০ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর সর্বপ্রথম ইন্দিরা গান্ধী দেখা করেছিলেন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর তৎকালীন প্রধান অর্থাৎ টি ভি রাজেশ্বরের সঙ্গেই।

টি ভি রাজেশ্বর তাঁর লেখা একমাত্র বই ‘ইন্ডিয়া : দ্য ক্রুশিয়াল ইয়ারস’ (India : The Crucial Years) বইতে এই জরুরি অবস্থার ভিতরকার অনেক কথা প্রকাশ করেছেন যেসব তথ্য পরবর্তীকালে একটু বিতর্ক উসকে দিয়েছিল ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে। তিনি এই বইতে উল্লেখ করেছিলেন যে ১৯৭৫ সালের ২৫ ও ২৬ জুন ইন্দিরা গান্ধী যে জরুরি অবস্থা জারি করেন, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS) তাকে সমর্থন করেছিল। তিনি এক সাক্ষাৎকারে এও দাবি করেছিলেন যে, আরএসএস কেবলমাত্র সমর্থন জানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা ইন্দিরা গান্ধী এবং সঞ্জয় গান্ধীর সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছিল। তিনি বইতে লিখেছেন, কেবল ইন্দিরা গান্ধীই নয়, ইন্দিরার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসকেও সমর্থন করেছিল আরএসএস। এছাড়াও এই বইটিতে রাজেশ্বর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক এবং আভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কিত সতর্কতামূলক কিছু নোট লিখেছিলেন। চিনের সঙ্গে ভারতের বিবাদ সম্পর্কিত কথাবার্তা সেগুলির মধ্যে অন্যতম। এছাড়াও ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদের সমস্যার কথা লিখেছেন তিনি এবং প্রশ্নও তুলেছেন অকপটে। স্বাধীনতার পরের প্রায় ছয় দশক তিনি ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে জড়িয়ে ছিলেন। সেই সমস্ত অভিজ্ঞতা তাঁর এই বইটির মধ্যে লিখেছেন টি ভি রাজেশ্বর। অতএব ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিক থেকে ‘ইন্ডিয়া : দ্য ক্রুশিয়াল ইয়ারস’ বইটির গুরুত্ব অপরিসীম। 

এমন দক্ষ এবং প্রতিভাশালী একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং একইসঙ্গে সাংবিধানিক উচ্চপদের অধিকারী সুপরিচালক টি ভি রাজেশ্বরকে সম্মান জানানোয় কোনওরকম কার্পণ্য করেনি ভারত সরকার। ২০১২ সালে প্রজাতন্ত্র দিবসের সন্ধ্যাবেলায় ঘোষণা করা হয়েছিল টি ভি রাজেশ্বরকে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করা হবে এবং ঐ বছরই তাঁকে এই সম্মান জ্ঞাপন করে ভারত সরকার। রাজেশ্বরের সঙ্গে সে বছরই বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী এবং গীতিকার স্বর্গীয় ভূপেন হাজারিকাকেও এই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানে ভূষিত করার কথা ঘোষণা করা হয়। 

২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি এক রবিবারে দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৯১ বছর বয়সে নিউ দিল্লির খেলগাঁওয়ের বাড়িতে টি ভি রাজেশ্বরের মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়