সববাংলায়

কাটরা মসজিদ ভ্রমণ

সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই নানান ঐতিহাসিক স্থাপত্যের ছড়াছড়ি। প্রাচীন মন্দিরের পাশাপাশি মসজিদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়, কারণ সুদীর্ঘকাল সুলতানি শাসনের অধীন ছিল এই দেশ। সেইসব প্রাচীন মসজিদগুলির অধিকাংশই এখন ভগ্নদশায় রয়েছে, তবুও অবশিষ্ট অংশটুকুই ইতিহাসকে বহন করে চলেছে। কাটরা মসজিদ (Katra Masjid) পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। এই মসজিদের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার নবাবী ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন। একদিকে এটি যেমন মুর্শিদাবাদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শন, অন্যদিকে মুর্শিদাবাদের পর্যটন স্থানের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ। মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ করতে একবার অন্তত কাটরা মসজিদ ভ্রমণ আপনার ঘুরে আসা উচিত।

কাটরা মসজিদ কোথায়

মুর্শিদাবাদ জেলায় ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীরে মুর্শিদাবাদ স্টেশন থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে কাটরা মসজিদ অবস্থিত। এটি হাজারদুয়ারী থেকে চার কিলোমিটার দূরে এবং মোতিঝিল থেকে সাড়ে সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

কাটরা মসজিদের ইতিহাস

ইংরেজ শাসনের আগে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার রাজধানী ছিল এই মুর্শিদাবাদ। মুর্শিদকুলি খাঁ, সিরাজুদৌল্লা থেকে শুরু করে জগৎ শেঠ প্রমুখ ঐতিহাসিক চরিত্রের স্মৃতি ধারণ করে আছে এই মুর্শিদাবাদ। সেই সময়ের শিল্প-সংস্কৃতি ধারণ করে আছে এই মুর্শিদাবাদ। অনেকের কাছে মুর্শিদাবাদ মানে সিরাজ-মীরজাফর, তো অনেকের কাছে ভাঙাচোরা প্রাসাদ আর কবরখানা। আবার অনেকের কাছে মুর্শিদাবাদ বললেই তাঁদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজারদুয়ারির ছবি। কিন্তু মুর্শিদাবাদ এটুকুতে আবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক জায়গা, যার মধ্যে অন্যতম হল কাটরা মসজিদ।

মুর্শিদাবাদের পূর্বনাম ছিল মখসুদাবাদ। ১৭০৪ সালে বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ তাঁর রাজধানী, ঢাকা থেকে সরিয়ে মখসুদাবাদে নিয়ে আসেন। তাঁর নামানুসারে মখসুদাবাদের নতুন নাম হয় মুর্শিদাবাদ। এই মুর্শিদাবাদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক স্থান, যার মধ্যে মাত্র দুটো স্থানই তাদের আদিরূপে রয়েছে। একটি হল মুর্শিদ কুলি খাঁর প্রতিষ্ঠিত কাটরা মসজিদ, অন্যটি তাঁর নাতির তৈরি অসম্পূর্ণ ফৌতি মসজিদ।

১৭২৩ সালে মুর্শিদ কুলি খাঁ কাটরা মসজিদের নির্মাণ করেন। একসাথে ২০০০ মানুষ এখানে নামাজ পাঠ করতেন। নামাজের পাশাপাশি এই মসজিদে মাদ্রাসাও চালু ছিল। ছাত্রদের সেখানে আরবী ভাষায় কোরান পাঠ শেখানো হত এবং ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হত। মুর্শিদ কুলি খাঁ এই মসজিদের নিচের অংশে নিজের সমাধি তৈরির ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর এখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। সাধারণত শাসকদের সমাধি আলাদা স্থানে নির্মিত হলেও মুর্শিদ কুলি খাঁর সমাধি ছিল ব্যতিক্রম। কারণ তিনি চেয়েছিলেন যেন মানুষের পদধূলি তাঁর কবরের উপর পড়ে, যাতে তাঁর পাপ ক্ষমা হয় এবং তিনি বেহেস্তে যেতে পারেন।

কাটরা মসজিদ কীভাবে যাবেন

মুর্শিদাবাদ স্টেশনের বাইরে টোটো পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ টোটো রিজার্ভ করে যেতে পারেন, আবার মাথাপিছু ভাড়াতে সহযাত্রীদের সাথেও যেতে পারেন। তবে সম্পূর্ণ টোটো রিজার্ভ না করলে ফেরার পথে সমস্যা হতে পারে। সাধারণত স্থানীয় মানুষেরা নিজের গাড়ি বা বাইকে করে ঘুরতে যায় এখানে।

মুর্শিদাবাদ শহরের বাইরে থেকে গেলে ট্রেন, বাস বা গাড়ি বিভিন্ন উপায়ে যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে হলে মুর্শিদাবাদ স্টেশনে নামতে হবে। হাওড়া বা বর্ধমান স্টেশন থেকে সরাসরি মুর্শিদাবাদ স্টেশনে যাওয়ার কোনও ট্রেন নেই। সরাসরি ট্রেন না থাকলেও আজিমগঞ্জ স্টেশন অবধি ট্রেনে গিয়ে তারপর আজিমগঞ্জ থেকে গাড়ি ভাড়া করে মুর্শিদাবাদ যাওয়া যাবে। তাছাড়া কলকাতা স্টেশন থেকে সরাসরি মুর্শিদাবাদ স্টেশনে যাওয়ার ট্রেন রয়েছে। বাসে করে যেতে হলে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে মুর্শিদাবাদগামী বাস পাওয়া যায়। বাস সাধারণত বহরমপুর অবধি যায়। তারপর বহরমপুর থেকে ১১ কিলোমিটার পথ ভাড়াগাড়ি বা অটোরিকশায় যাওয়া যেতে পারে। গাড়িতে যেতে হলে গ্র্যান্ড ট্যাঙ্ক রোড বা জিটি রোড ধরে যাওয়া যায়। বর্ধমান থেকে গাড়িতে সময় লাগবে প্রায় চারঘন্টা এবং কলকাতা থেকে গাড়িতে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা।

কাটরা মসজিদে কোথায় থাকবেন

স্থানীয়দের কাছে একদিনের মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের জন্য কাটরা মসজিদ জনপ্রিয় একটি ভ্রমণস্থান। তবে বাইরে থেকে ঘুরতে গেলে মুর্শিদাবাদ শহরে, বিশেষ করে হাজারদুয়ারির কাছে থাকবার জন্য অনেক হোটেল রয়েছে। মোতিঝিলের আশেপাশেও অনেক হোটেল রয়েছে। এইসব হোটেলে থেকে একদিনের সাইটসিইং হিসাবে কাটরা মসজিদে ঘুরতে যেতে পারেন।

কাটরা মসজিদে কী দেখবেন

কাটরা মসজিদ তৈরি হয়েছে একটি বিশাল, উঁচু চাতালের ওপর এবং তাকে ঘিরে রয়েছে একাধিক ছোট ছোট ঘর। আসল মসজিদ এর ভেতরে। কাটরা মসজিদের চারদিকে দোতলা ঘরগুলির যে ঘের রয়েছে, তার মাপ পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ৭৪ মিটার, এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ৬০ মিটার। এই ঘেরের ভিতরের এক একটি কক্ষের মাপ আন্দাজ ২০ বর্গফুট।

এই ঘেরের চার কোনে রয়েছে চারটি উঁচু মিনার। এক একটি মিনারের উচ্চতা ৭০ মিটার, এবং ব্যাসে ২৫ মিটার। পূর্বদিকের দুটি মিনারই সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে কেবল কেবল পশ্চিমের দুটি মিনার অবশিষ্ট রয়েছে । পূর্ব থেকে পশ্চিমে আন্দাজ ৫৫ মিটার লম্বা এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ৬০ মিটার চওড়া চাতালটি রয়েছে ঘেরের ভিতরে। চাতালের পশ্চিম দিকে রয়েছে আয়তক্ষেত্রাকার মসজিদটি।

মসজিদের পূর্বদিকের দেওয়ালের বিশাল লোহার আংটা দেওয়াল থেকে বেরিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে, এর থেকে ছোট বেশ কয়েকটা আংটা রয়েছে চাতালের পোড়ামাটির ওপরে। কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্যে শামিয়ানা টাঙানোর জন্যই এই আংটার ব্যবস্থা। পূর্বদিকের দেওয়ালে পাঁচটি দরজা রয়েছে। খিলানের ভতরে দরজাগুলির ‘ফ্রেম’ কালো পাথরের। মাঝখানের দরজার ওপরে রয়েছে একটি পাথরের ফলক। ফলকে ফারসি ভাষায় লেখা রয়েছে, “আরবের মহম্মদ, যিনি দুই জগতের গৌরব, তাঁর পায়ের ধুলো যেন তাঁদের মাথাতেও পড়ে, যাঁরা তাঁর দরজার ধুলো হতে পারলেন না”। দরজার ওপরের ফলকে মসজিদে নির্মানের তারিখ লেখা রয়েছে হিজরি মতে – ১১৩৭, অর্থাৎ ১৭২৪ সাল।

কাটরা মসজিদে কখন যাবেন

সারাবছরই কাটরা মসজিদে যাওয়া যায়। তবে অক্টোবর থেকে মার্চ সবচেয়ে উপযুক্ত এবং আরামদায়ক। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেশি থাকায় ভ্রমণের পক্ষে কষ্টকর।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • এখানে কোন প্রবেশমূল্য নেই।
  • যদি গাইড নিতে চান, তাহলে গাইডের জন্য ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পড়বে।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি
  2. “মুর্শিদাবাদ ভ্রমণগাইড”, লেখিকা – কাকলি মজুমদার
  3. “নবাবী অন্দরমহল”, লেখিকা – কল্পনা ভৌমিক
  4. https://en.wikipedia.org/
  5. https://www.banglarmasjid.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading