প্রাচীন ভারত যেমন বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিত ইত্যাদিতে প্রভূত উন্নতি লাভ করেছিল, তেমনই জ্যোতির্বিদ্যাতেও পিছিয়ে ছিল না। সে যুগের বরাহমিহিরের মতো জ্যোতির্বিদ এবং তাঁর কীর্তিকলাপ একথাই প্রমাণ করে। ‘পঞ্চসিদ্ধান্তিকা’ ও ‘বৃহৎসংহিতা’ নামক দুটি গ্রন্থ রচনা করে বরাহমিহির (Varahamihira) জ্যোতির্বিদ্যাকে একটি নতুন দিশা দেখিয়েছিলেন। তবে কেবল জ্যোতির্শাস্ত্রেই নয়, গণিতে এমনকি পদার্থবিদ্যাতেও ছিল তাঁর পারদর্শিতা। তিনিই কিন্তু পাস্কাল ত্রিভুজের (Pascal’s Triangle) প্রথম আবিষ্কারক ছিলেন। বরাহমিহির কিংবদন্তি শাসক বিক্রমাদিত্যের সভার নবরত্নের একজন বলে বহুদিন থেকেই বিবেচিত হয়ে আসছেন। কিন্তু একাধিক পন্ডিত এই তথ্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন না। এমন অনেক কিংবদন্তিই এই বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহমিহিরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
বরাহমিহিরের জীবনকাল সম্পর্কে নানা পন্ডিতের নানারকম মতামত। তবে প্রথমে বরাহমিহিরের জন্মস্থানের কথা বলে নেওয়া যাক। অনেকে মনে করেন যে তিনি ‘কপিত্থক’ নামক কোন স্থানে জন্মেছিলেন। বিভিন্ন পান্ডুলিপিতে এই জায়গাটির নামের আরও কয়েকটি রূপ পাওয়া গেছে, যথা, কাম্পিল্যাক, কপিলাক, কপিষ্ঠলা এবং কপিষ্কলা। একটি তত্ত্ব অনুসারে এই কপিত্থক হল আসলে আধুনিক কায়থা, যা উজ্জয়িনীর কাছে অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। ৬০০-৯০০ খ্রিস্টাব্দের একটি সূর্যদেবতার মূর্তি সেখানে পাওয়া গেছে। মনে রাখতে হবে বরাহমিহির ছিলেন সূর্য উপাসক। আবার অন্য একটি তত্ত্ব অনুসারে, এই কপিত্থক এবং বর্তমানের উত্তরপ্রদেশের সানকিশা হল একই স্থান।
বরহমিহিরের ভাষ্যকার উৎপল তাঁকে মগধ-দ্বিজ বলে উল্লেখ করেছিলেন বলে, সুধাকর দ্বিবেদী তাঁর জন্মস্থান মগধ বলে মনে করেন। আবার বরাহমিহিরের নিজের রচিত বিখ্যাত বই ‘ব্রজ-জাতক’ বা ‘বৃহৎজাতক’-এর একটি স্তবক থেকে জানা যায় যে, তিনি অবন্তীর বাসিন্দা ছিলেন। তবে বাসিন্দা হওয়া মানেই অবন্তী তাঁর জন্মস্থান নাও হতে পারে। তাই অধিকাংশ পন্ডিত কায়থাকেই তাঁর জন্মস্থান বলে মনে করে থাকেন।
জন্মস্থান নিয়ে যেমন, তেমনি বরাহমিহিরের জন্ম তারিখ, কতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন, সেই সময়কাল নিয়েও বিস্তর গোলযোগ এবং মতভেদ রয়েছে। তাঁর কাজগুলিকে সামনে রেখে অনুমান করা হয় তিনি খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মানুষ, তবে সম্ভবত পঞ্চম শতাব্দীর শেষদিকটিও তাঁর জীবনকালের মধ্যে পড়তে পারে। বরাহমিহির নিজে তাঁর ‘পঞ্চসিদ্ধান্তিকা’ গ্রন্থে ৪২৭ শক-কালের উল্লেখ করেছেন। এখন এই বর্ষপঞ্জি যুগের হিসাবে ৪২৭ শক বলতে বোঝায় ৫০৫ খ্রিস্টাব্দ। অনেকে অবশ্য তাঁকে পঞ্চম শতাব্দীরও আগে স্থাপন করতে চেয়েছেন, কিন্তু সেসব হিসেব ভুল বলেই মনে হয়, কারণ তিনি আর্যভট্টের (জন্ম ৪৭৬ খ্রি:) পরেও বেঁচেছিলেন এবং আর্যভট্টের কাজের উল্লেখও তাঁর রচনায় পাওয়া যায়। বরাহমিহির বিশেষভাবে ৪২৭ শকের চৈত্র মাসের শুক্ল প্রতিপদের উল্লেখ করেছিলেন, অর্থাৎ ইংরেজি তারিখে হিসেব করলে দাঁড়ায় ২০-২১ মার্চ। এখন এই ৫০৫ খ্রিস্টাব্দ হয়তো-বা ‘পঞ্চসিদ্ধান্তিকা’ গ্রন্থ রচনার বছর ছিল, বা সেই বছর এই গ্রন্থ রচনার পরিকল্পনা হয়তো করেছিলেন তিনি। তবে অনেক পন্ডিত এই ৫০৫ খ্রিস্টাব্দকেই বরাহমিহিরের জন্মসাল বলে ধরেন, কারণ ব্রহ্মগুপ্তের ‘,খন্ডখাদ্যক’-এর ভাষ্যকার অমরাজার মতে বরাহমিহির ৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে মারা গিয়েছিলেন। অতএব বরাহমিহির যদি ৫০৫ সালে ২৫ বছর বয়সে তাঁর ‘পঞ্চসিদ্ধান্তিকা’ লিখে থাকেন তবে অমরাজার হিসেব অনুযায়ী তিনি ১০৫ বছরেরও বেশি জীবিত ছিলেন, পন্ডিতদের কাছে যেটি ঠিক বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। সেই কারণেই অধিকাংশ পন্ডিত আনুমানিক ৫০৫ খ্রিস্টাব্দেই বরাহমিহিরের জন্ম হয়েছিল বলে মনে করেন।
অনেকে বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় নবরত্নের একজন বরাহমিহির ছিলেন বলে মনে করেন। তবে বরাহমিহির কালিদাস বা বিক্রমাদিত্যের সময়কার মানুষ যে ছিলেন না তা অধিকাংশ পন্ডিতই মনে করেন।
বরাহমিহিরের ‘ব্রজ-জাতক’ থেকে যেমন জানা যায় তিনি অবন্তীর বাসিন্দা, তেমনি সেখান থেকে এও জানতে পারা যায় যে, তাঁর পিতা ছিলেন আদিত্যদাস। ব্রজ-জাতকের সেই স্তবক থেকেই জানা যায় যে, বরাহমিহির সূর্যদেবের বর পেয়ে কপিত্থকে অধ্যয়ন করেছিলেন। ব্রজ-জাতক এবং পঞ্চসিদ্ধান্তিকা থেকে মনে হয় আদিত্যদাস বরাহমিহিরকে জ্যোতিষশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিদ্যার প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। উৎপল বরাহমিহিরকে মগধ-দ্বিজ বলেছিলেন বলে অনেকে বলেন বরাহমিহিরের পূর্বপুরুষরা এই মগধ অঞ্চলের মানুষ ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর এক কিংবদন্তি অনুযায়ী, যা গুজরাটি এক পাঠ্যের অন্তর্গত, আদিত্যদাসের স্ত্রী এবং বরাহমিহিরের মায়ের নাম ছিল সত্যবতী ওরফে ইন্দুমতী। অবশ্য এটিকে নিছক কিংবদন্তি হিসেবেই ধরা হয়, এর সত্যতার সপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। অন্য একটি কিংবদন্তি অনুযায়ী, বরাহমিহির আসলে জৈমিনির পূর্ব মীমাংসা সূত্রের ভাষ্যকার শবরার ব্রাহ্মণ পত্নীর সন্তান। কেউ কেউ বলেন, এই শবরার অন্য নাম ছিল আদিত্যদাস। অবশ্য কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ এই তথ্যকে সমর্থন করে না। বরাহমিহিরের পুত্র হিসেবে উঠে আসে পৃথুয়াস-এর নাম, যিনি হিন্দু জ্যোতিষশাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। আবার মধ্যযুগীয় কবি ও জ্যোতিষী খনাকে বরাহমিহিরের পুত্রবধূ বলে মনে করেন অনেকে।
বরাহমিহির নামটির সঙ্গে আরও কিছু নামের মিল থেকে বরাহমিহিরের বংশের নানারকম অনুমান করেছিলেন পন্ডিতেরা। ইতিহাসবিদ অজয় মিত্র শাস্ত্রী বলেন, বরাহমিহির হয়তো-বা ইরানী নাম ‘ভারজা-মিহর’-এর সংস্কৃত রূপ হতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, ৫ম শতাব্দীর সাসানীয় রাজা পঞ্চম বাহরাম মিহরভারাজা নামটি ধারণ করেছিলেন যার সঙ্গে বরাহমিহির নামটির সাদৃশ্য রয়েছে।
বরাহমিহির নামটির উৎস নিয়ে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। বিক্রমাদিত্যের সন্তান ১৮ বছর বয়সে মারা যাবে, গ্রহের অবস্থান দেখে এমনই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন মিহির। রাজা শত চেষ্টা সত্ত্বেও যখন ১৮তম জন্মদিনের দিন একটি শুকর রাজপুত্রকে হত্যা করে, তখন থেকেই সেই মিহির জ্যোতিষী বরাহমিহির নামে খ্যাত হয়েছিলেন। তবে এ-কেবল কিংবদন্তি, এর ঐতিহাসিক ভিত্তি বা তথ্যগত সমর্থন নেই।
বরাহমিহির সম্ভবত আউলিকার রাজ্যে বাস করতেন, কারণ আউলিকাররা ষষ্ঠ শতাব্দীতে অবন্তীকে শাসন করেছিল। ‘বৃহৎ-সংহিতা’য় বরাহমিহির তাঁর একটি কাজের জন্য অবন্তীর রাজা দ্রব্যবর্ধনের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। ইতিহাসবিদ অজয় মিত্র শাস্ত্রী বলেছেন যে, একমাত্র এই দ্রব্যবর্ধনের প্রসঙ্গে বলতে গিয়েই সম্মানসূচক ‘শ্রী’ ব্যবহার করেছেন বরাহমিহির। যদিও আরও উল্লেখযোগ্য কিছু ব্যক্তিরও উল্লেখ করেছেন তিনি। সপ্তর্ষি এবং গর্গের মতো স্বনামধন্য মানুষদের কথা উল্লেখ করার আগে দ্রব্যবর্ধনের কাজের উল্লেখ করেছেন তিনি। শাস্ত্রীর মতে, এই দ্রব্যবর্ধন ছিলেন যশোধর্মণ ওরফে বিষ্ণুবর্ধনের একজন উত্তরসূরি এবং ইনিই হয়ত বরাহমিহিরের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অবশ্য কিছু ঐতিহাসিকের মতে এই দ্রব্যবর্ধন আসলে পূর্ববর্তী আউলিকার শাসক দ্রপবর্ধন। কিন্তু এই তত্ত্ব শাস্ত্রী মানতে নারাজ ছিলেন। তিনি বলেছেন, বরাহমিহির দ্রব্যবর্ধনকে মহারাজাধিরাজ বলে বর্ণনা করেছেন এবং অন্যদিকে রিস্থল শিলালিপিতে দ্রপবর্ধন একজন সেনাপতি হিসেবে বর্ণিত। বালোগ অবশ্য শাস্ত্রীর এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেন। বালোগের মতে, বরাহমিহির হয়ত আউলিকার রাজা প্রকাশবর্মনের রাজত্বকালে বসবাস করতেন। এছাড়াও বালোগ বিশ্বাস করেন যে, বরাহমিহিরের কোন রাজকীয় পৃষ্ঠপোষক ছিলই না।
এবারে বরাহমিহিরের জ্যোতির্বিদ্যা, গণিতবিদ্যা এবং আরও নানান বিষয়ের ওপর কৃত গবেষণা ও রচিত গ্রন্থগুলির দিকে তাকানো যাক।
এখানে উল্লেখ করে নেওয়া প্রয়োজন যে, কথিত আছে বরাহমিহির আর্যভট্টের সঙ্গে দেখা করে গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।
বরাহমিহিরের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হল ‘পঞ্চসিদ্ধান্তিকা’। গ্রন্থটি সম্ভবত ৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ রচিত হয়ে থাকবে। এই কাজটি গাণিতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি অমূল্য সম্পদ। এই গ্রন্থের মধ্যে মূলত পূর্ববর্তী পাঁচটি বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত গ্রন্থের আলোচনা করেছিলেন বরাহমিহির। পূর্ববর্তী সেই পাঁচটি গ্রন্থ হল – সূর্য সিদ্ধান্ত, রোমক সিদ্ধান্ত, পৌলিসা সিদ্ধান্ত, বশিষ্ঠ সিদ্ধান্ত এবং পৈতমহ সিদ্ধান্ত। এই গ্রন্থটি বেদাঙ্গ জ্যোতিষের পাশাপাশি হেলেনিস্টিক জ্যোতির্বিদ্যারও (গ্রীক, মিশরীয় ও রোমান উপাদানসহ) একটি সংকলন। উপরিউক্ত রোমক সিদ্ধান্ত এবং পৌলিসা সিদ্ধান্ত নামের পাশ্চাত্য এই দুটি গ্রন্থ বিশেষভাবে বরাহমিহিরকে প্রভাবিত করেছিল।
বরাহমিহিরের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য গ্রন্থটির নাম ‘বৃহৎ-সংহিতা’। এই গ্রন্থটিকে একটি বিশ্বকোষও বলা যেতে পারে। এই গ্রন্থটি মোট ১০৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত। এই গ্রন্থের মধ্যে জ্যোতির্বিদ্যা, গ্রহের গতিবিধি, গ্রহণ, বৃষ্টিপাত, মেঘ, সময় নির্ধারণ, গণিত, স্থাপত্য, ফসলের বৃদ্ধি, সুগন্ধি তৈরি, বিবাহ, গার্হস্থ্য সম্পর্ক, রত্নবিদ্যা, মুক্তা, আচার-অনুষ্ঠানসহ আরও নানান বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এই বইটি থেকে বরাহমিহিরের ভবিষ্যৎবাণী সম্পর্কে জানা যায় বিশদে।
বরাহমিহিরের রচিত উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকটি গ্রন্থ হল, ‘সমাসসংহিতা’, ‘ব্রজজাতক’ বা ‘বৃহৎ জাতক’, ‘লঘুজাতক’, ‘যোগযাত্রা’ ইত্যাদি। তিনি গ্রীক পন্ডিতদের এবং তাঁদের কাজকে খুবই সম্মান করতেন। এমনকি তাঁর নিজের জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত অনেক কাজের মধ্যে প্রাচীন গ্রীসের জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়।
গণিত এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও বরাহমিহিরের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ত্রিকোণমিতিতে আর্যভট্ট প্রদত্ত সাইন টেবিলের আরও উন্নতিসাধন ঘটিয়েছিলেন। এছাড়াও বর্তমানে যা পাস্কাল ত্রিভুজ নামে পরিচিত তার একটি সংস্করণ আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। তিনিই প্রথম ৪×৪ ম্যাজিক স্কোয়ার তৈরি করেন। দ্বিপদ সহগ গণনা করতে এটি ব্যবহার করেছিলেন বরাহমিহির। এমনকি শূন্যের পাশাপাশি ঋণাত্মক সংখ্যার বীজগাণিতিক বৈশিষ্ট্যও সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম অয়নাংশ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন তিনি। আলোর প্রতিসরণ নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছিলেন।
অমরাজার মতকে প্রাধান্য দিয়েই পন্ডিতেরা মনে করেন আনুমানিক ৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে এই মহান জ্যোতির্বিদ বরাহমিহিরের মৃত্যু হয়েছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান