সববাংলায়

উল্লাসকর দত্ত

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অগ্নিগর্ভ বাংলার অন্যতম বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত (Ullaskar Dutta) স্মরণীয় হয়ে আছেন। বারীন্দ্র ঘোষের অন্যতম সঙ্গী এবং ভারতের সশস্ত্র আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিলেন উল্লাসকর দত্ত । বোমা তৈরির কাজে ‘যুগান্তর’ দলের মধ্যে হেমচন্দ্র কানুনগোর পাশাপাশি উল্লাসকর দত্তও ছিলেন অগ্রগণ্য। ‘আলিপুর বোমা মামলা’য় অভিযুক্ত হিসেবে প্রথমে ফাঁসির দণ্ডাদেশ পেলেও পরে ফাঁসির বদলে দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হয় উল্লাসকরকে। দ্বীপান্তরে চরম অত্যাচার ভোগ করে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু স্বাধীনতার নামে দেশভাগকে তিনি কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। সেই জন্য চরম দারিদ্র্যের মধ্যে আজীবন থেকেও স্বাধীন ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোনরকম সাহায্যই গ্রহণ করেননি তিনি। তাঁর কারাবাসের নানা অভিজ্ঞতা একত্রিত করে তিনি লিখেছিলেন ‘আমার কারা-জীবনী’ যা পরে ইংরেজি অনুবাদ করেন ‘Twelve Years of Prison Life’ ।

বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের জীবনী
বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের জীবনী ভিডিও আকারে দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন

১৮৮৫ সালের ১৬ এপ্রিল অধুনা বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কালিকচ্ছ গ্রামের এক বৈদ্য পরিবারে উল্লাসকর দত্তের জন্ম হয়। তাঁর বাবা দ্বিজদাস দত্তগুপ্ত লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে স্বদেশপ্রেমিক, সমাজ সংস্কারক এবং একইসঙ্গে  ব্রাহ্মসমাজের সদস্য। শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন দ্বিজদাস। উল্লাসকর সম্ভ্রান্ত ও সচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়েও দেশের প্রতি ভালোবাসায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

উল্লাসকরের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজের বাড়িতেই। এরপর তিনি কলকাতার একটি স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯০৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করার পরে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য। রসায়ন ছিল তাঁর  অত্যন্ত প্রিয় বিষয়। মেধাবী ছাত্র হওয়ার পাশাপাশি তিনি সঙ্গীতেও দক্ষ ছিলেন। নানা বিষয়ের বই পড়তে ভালোবাসতেন তিনি আর তার সঙ্গে বাঁশি ও সেতার বাজাতেও জানতেন। প্রেসিডেন্সিতে পড়াকালীন একটি ঘটনায় উল্লাসের জীবনে প্রথাগত লেখাপড়ায় ছেদ পড়ে। ব্রিটিশ প্রফেসর রাসেল ভারতীয়দের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করায় উল্লাস তাঁকে জুতো ছুঁড়ে আঘাত করেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কলেজ থেকে তিনি বহিষ্কৃত হন।

বাংলা তখন সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের  জোয়ারে ভাসছে।  ১৯০৪ সালে উল্লাসও বিপ্লবী  কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বিপিনচন্দ্র পালের বক্তৃতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। তাঁর অণুপ্রেরণায়  ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন উল্লাস এবং স্বদেশির ভাবনায় শার্ট-প্যান্ট পরা ছেড়ে ধুতি পরা শুরু করেন তিনি। বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের ভাই বারীন ঘোষের বিপ্লবী দল ‘যুগান্তর’-এ যুক্ত হন উল্লাস। বারীন ঘোষ তখন কলকাতার মানিকতলায় ৩২ নং মুরারি পুকুর লেনের বাগানবাড়িতে সশস্ত্র আন্দোলনের আখড়া গড়েছিলেন। এই বাগান বাড়িতে বিপ্লবীদের কুস্তি খেলা, লাঠি খেলা, ছোরা চালানো, পিস্তল চালানো, বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগো বিদেশ থেকে বোমা তৈরির পদ্ধ‌তি শিখে এসে এই বাড়িতে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিতেন। উল্লাস তাঁর রসায়নের অধীত বিদ্যা কাজে লাগান বোমা তৈরির কাজে। বহু গবেষণার পরে শক্তিশালী বোমা তৈরি করতে সক্ষম হন। সেই সময়ে বারীন ঘোষের নেতৃত্বে ‘যুগান্তর’ দলের ক্রমাগত সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য বোমা ও পিস্তলই ছিল বিপ্লবীদের প্রধান পছন্দ। সেই কারণেই বোমা তৈরির সম্পূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে উল্লাসকরের উপরে। বোমা তৈরির পরে তার শক্তির পরীক্ষা করার জন্য উল্লাসকর, প্রফুল্ল চক্রবর্তী সহ আরও কয়েকজন বিপ্লবী দেওঘরে যান। সেখানে পাহাড়ের উপর থেকে বোমা ছুঁড়ে পরীক্ষা করার সময়ে বিপ্লবী প্রফুল্ল চক্রবর্তীর মৃত্যু হয় এবং উল্লাসকর দত্ত গুরুতরভাবে আহত হন। তাঁকে গোপনে কলকাতায় এনে চিকিৎসা করা হয়।

‘যুগান্তর’ দলের  গেরিলা আক্রমণে ইংরেজ সরকার তখন ভয়ে তটস্থ। বিপ্লবী ক্ষুদিরামপ্রফুল্ল চাকীকে প্রেরণ করা হয় মুজফ্‌ফরপুরে অত্যাচারী কিংসফোর্ডকে হত্যার জন্য। উল্লাসকরের তৈরি বোমা নিয়েই তাঁরা কিংসফোর্ডকে হত্যার  চেষ্টা করেন কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মৃত্যু হয় আইনজীবী কেনেডি সাহেবের। এরপরেই ইংরেজ সরকার সারা বাংলা জুড়ে তল্লাশি শুরু করে। এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন পুলিশ সুপারিনটেণ্ডেন্ট ক্রেগান এবং তাঁর বিখ্যাত গোয়েন্দা বিনোদকুমার গুপ্ত। তাঁরা এক রাতে অভিযান চালিয়ে মানিকতলার মুরারি পুকুর লেনের এই বাড়িটি খুঁজে পান এবং এখান থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জাম, কার্তুজ এবং কতগুলি তাজা বোমাও বাজেয়াপ্ত করেন। ১৯০৮ সালের ২ মে এই ঘটনায় বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ, বারীন ঘোষ এবং উল্লাসকর দত্তসহ আঠারোজন বিপ্লবী গ্রেপ্তার হন।

এই মামলা আলিপুর কোর্টে উঠলে ব্যারিষ্টার ও দেশপ্রেমিক চিত্তরঞ্জন দাশ বিপ্লবীদের পক্ষ নেন। অরবিন্দ ঘোষের সাথে চিত্তরঞ্জন দাশের গভীর বন্ধুত্ব ছিল। দীর্ঘ আটদিন ধরে সওয়াল জবাব করে চিত্তরঞ্জন দাশ অরবিন্দ ঘোষ ও নগেন্দ্রনাথ গুপ্তকে বেকসুর খালাস করতে সমর্থ হন এবং উল্লাসকর ও বারীন ঘোষের ফাঁসির আদেশ হয়। শোনা যায় ফাঁসির রায় শুনে তিনি হেসে উঠেছিলেন এবং আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েই তিনি গেয়ে উঠেছিলেন ‘সার্থক জনম মাগো জন্মেছি এই দেশে’ গানটি। কিন্তু এই রায়ের উপরে আপিল করে ১৯০৯ সালে তাঁর ফাঁসির বদলে দ্বীপান্তর হয়। এই মামলা ইতিহাসে ‘আলিপুর বোমা মামলা‘ নামে পরিচিত যা সেই সময়ে দাঁড়িয়ে সারা ভারতবর্ষে আলোড়ন তৈরি করেছিল।

সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে আন্দামানের এক প্রত্যন্ত দ্বীপে বিপ্লবীদের শাস্তি হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। নিজের মাতৃভূমি থেকে বহুদূরে সমুদ্রের মাঝখানে এই দ্বীপে বিপ্লবীদের এনে তাঁদের উপরে চলত অকথ্য অত্যাচার। সারাদিন প্রখর রোদে ইটভাঁটায় কাজ অথবা কাঠ কুড়িয়ে আনার কাজ করতে হত। দীর্ঘ সময় ধরে ঘানি ঘোরানোর কাজ করানো হত আন্দামানের বন্দিদের দিয়ে, উল্লাসকরও এর থেকে বাদ যাননি। সন্ধ্যে হলেই হাত দুটোকে দড়ি দিয়ে উপরে বেঁধে সারারাত দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হত। এমন অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে কেউ পাগল হয়ে যেতেন আবার কেউ আত্মহত্যা করতেন। উল্লাসকর দত্তও এই অত্যাচারে প্রায় উন্মাদ হয়ে যান। ১৯১৪ সালে তাঁকে মাদ্রাজের এক মানসিক হাসপাতালে নিয়ে এসে তাঁর চিকিৎসা করা হয়। এখানে আনার পরে তাঁকে চিকিৎসার নামে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয় যার ফলে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। সুস্থ হওয়ার পরে আবার তাঁর উপরে অত্যাচার করা হয়। ১৯২০ সালে উল্লাসকর দত্ত এগারো বছর পরে কারাবাস থেকে মুক্তি পান। তারপর শারীরিক দুর্বলতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে আসেন। কিন্তু ইংরেজ সরকার ফের তাঁকে গ্রেপ্তার করে ১৯৩১ সালে। এইবারে বিনা বিচারে তাঁকে ১৮ মাস কারাগারে রেখে দেওয়া হয়। অবশেষে তিনি জেল থেকে মুক্তি পেয়ে নিজের জন্মভূমি কালিকচ্ছ গ্রামে ফিরে আসেন।

১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তিনি নিজের জন্মভূমিতে ফিরে এসে গ্রামের মানুষদের উন্নয়ন ও সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে ভারত সরকার তাঁকে ভাতা দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু উল্লাসকর তা প্রত্যাখ্যান করেন। স্বাধীনতার বদলে দেশভাগকে তিনি সমর্থন করতে পারেননি বলে এই ভাতা প্রত্যাখান করেন। এই সময়ে তিনি নিজের কারাবন্দী জীবনের কাহিনী ‘আমার কারাজীবন’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন।

স্বাধীনতার পরে নিজের জন্মভিটা ছেড়ে কলকাতায় এসে তিনি জানতে পারেন তাঁর বাল্যকালের বান্ধবী এবং তাঁর গুরু স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপিনচন্দ্র পালের কন্যা লীলা বিধবা হয়েছেন এবং তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তখন উল্লাসের বয়স ৬৩ বছর। সারাজীবন নিঃসঙ্গ থাকার পরে প্রৌঢ় বয়সে তিনি ব্রাহ্মমতে লীলা দেবীকে বিবাহ করেন। বিয়ের পরে তাঁরা প্রথমে ওঠেন রামমোহন লাইব্রেরির বারান্দায়, তারপর টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর কাছে একটা ছোট্ট বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। এমনকি এর মধ্যে কিছুদিন বৌবাজারের একটা ভাড়াবাড়িতেও থেকেছেন তাঁরা। ভয়ানক আর্থিক কষ্টের মধ্যে থেকেও পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রীর চিকিৎসায় কোন ত্রুটি রাখেননি উল্লাস। এরপরে তাঁর সহৃদয় বন্ধুদের সহযোগিতায়  তিনি সস্ত্রীক শিলচরে চলে আসেন। এখানে আসার পরে শিলচরের বাসিন্দারাই তাঁদের দেখাশোনা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। ১৯৬২ সালে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে। এর পরে তিনি বছর তিনেক নিঃসঙ্গ জীবন কাটান।

১৯৬৫ সালের ১৭ মে শিলচরে উল্লাসকর দত্তের মৃত্যু হয়। কলকাতা এবং শিলচরে তাঁর স্মৃতিতে দুটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading