সববাংলায়

আবু সাঈদ চৌধুরী

বিভাগঃ ,

বাংলাদেশের রাজনীতি যে বিচিত্র ঘটনাবহুল উত্থান-পতনময় সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে, আবু সাঈদ চৌধুরী (Abu Sayeed Chowdhury) সেই রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। প্রথিতযশা আইনজীবী আবু সাঈদ হাইকোর্টের বিচারপতি পদেও অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এমনকি পাকিস্তানের সংবিধান কমিশনেরও সদস্য ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে বৃহত্তর রাজনীতির ক্ষেত্রে পদার্পণ করেছিলেন আবু সাঈদ। বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লণ্ডনে বিশ্ব জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের পরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবু সাঈদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। তাছাড়া সংখ্যালঘুদের বৈষম্য প্রতিরোধের জন্য রাষ্ট্রসংঘের উপ-কমিটির সদস্যপদও অলঙ্কৃত করেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর মৃত্যুর ষড়যন্ত্রকারী খোন্দকারের সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন আবু সাঈদ চৌধুরী আর তাতেই রাজনৈতিক জীবনে এক বিতর্কের জন্ম দেন তিনি।  

১৯২১ সালের ৩১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার কালিহাটি উপজেলার অন্তর্গত নাগবাড়ী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে আবু সাঈদ চৌধুরীর জন্ম হয়। তাঁর বাবা আব্দুল হামিদ চৌধুরী কেবল একজন জমিদারই ছিলেন না, রাজনীতির সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ব্রিটিশদের থেকে আব্দুল হামিদ ‘খান বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেছিলেন। অবশ্য পরবর্তীকালে ব্রিটিশদের অমানুষিক নিপীড়ন এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে যখন ব্রিটিশ বিরোধিতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল, সেই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন আব্দুল হামিদ এবং ব্রিটিশদের প্রদত্ত উপাধি প্রতিবাদস্বরূপ ত্যাগ করেছিলেন।

বিদ্যালয় স্তরের পড়াশোনা সমাপ্ত করে আরও উচ্চস্তরের শিক্ষালাভের জন্য কলকাতায় চলে আসেন আবু সাঈদ এবং কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন অধ্যয়নের জন্য। ১৯৪০ সালে উক্ত কলেজ থেকেই স্নাতক ডিগ্রি অর্জনে সফল হন তিনি। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী এই মানুষটি চেয়েছিলেন আরও উচ্চস্তরের শিক্ষা গ্রহণ করতে। সুবিখ্যাত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি। ১৯৪২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভে সাফল্য অর্জন করেন আবু সাঈদ চৌধুরী। ১৯৪০ সালে তিনি ‘রূপায়ন’ নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেছিলেন। ঐ বছরই কলকতায় নেতাজী সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে হলওয়েল স্মৃতিস্তম্ভ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন তিনি। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ চৌধুরী আইনবিদ্যার প্রতি প্রচণ্ড উৎসাহী ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আইনের ডিগ্রি অর্জনের পর আইনজীবী হওয়ার জন্য বিদেশে চলে যান তিনি পড়াশোনা করতে। ১৯৪৬ সালে ‘অল ইণ্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশন’-এর ব্রিটেন শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন আবু সাঈদ। লণ্ডনের বিখ্যাত আইন অধ্যয়নের প্রতিষ্ঠান ‘লিঙ্কনস্‌ ইন’ থেকে ১৯৪৭ সালে ‘বার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন তিনি।

১৯৪৭ সালেই ভারতবর্ষে ফিরে আসেন তিনি এবং কলকাতা হাইকোর্টের বারে যোগদান করেন। ভারত বিভাগের পরে আবু সাঈদ চৌধুরী চলে এসেছিলেন বাংলাদেশের ঢাকায় এবং ১৯৪৮ সালে তিনি যোগ দেন ঢাকা হাইকোর্ট বারে। সেই ঢাকা হাইকোর্টেই তিনি নিয়মিত আইন অনুশীলন করতেন এবং একজন ক্রমেই আইনজীবী হিসেবে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন আবু সাঈদ। ১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেলের দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৬১ সালের ৭ জুলাই পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফিল্ড মার্শাল মহম্মদ আইয়ুব খান কর্তৃক ঢাকা হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি এবং আরও দু’বছর পর ঢাকা হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে তাঁর পদ সুনিশ্চিত হয়। ১৯৬০ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে সংবিধান কমিশনের সদস্যপদ যেমন অলঙ্কৃত করেছিলেন আবু সাঈদ, তেমনি পরবর্তীকালে ১৯৬৩ সালে বাংলা উন্ময়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদের দায়িত্বও গ্রহণ করেছিলেন তিনি। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত এই পদেই আসীন ছিলেন তিনি। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

এরপর বাংলাদেশ জুড়ে মুক্তিযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে সংগঠিত হতে থাকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশে ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু স্বাধীনতার লড়াই তিনিও লড়ছিলেন বিদেশে থেকে। ১৯৭১ সালে জেনেভায় থাকাকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানে দুই ছাত্রের হত্যার প্রতিবাদে তিনি উপাচার্যের পদে ইস্তফা দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে গড়ে ওঠে মুজিবনগর সরকার। জেনেভা থেকে যুক্তরাজ্যে চলে যান আবু সাঈদ এবং এই মুজিবনগর সরকারের দূত বা কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন করার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি এবং এই কাজে সফলও হয়েছিলেন। যুক্তরাজ্যের কনভেন্ট্রিতে প্রবাসী বাঙালিরা ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল গড়ে তুলেছিল ‘দ্য কাউন্সিল ফর দ্য পিপলস রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ ইন ইউ কে’ নামক সংগঠন এবং কাউন্সিলের পাঁচ সদস্যের একটি স্টিয়ারিং কমিটি (কেন্দ্রীয় কমিটি) তাদের দ্বারা নির্বাচিত হয়েছিল৷ আবু সাঈদ ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট থেকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত লণ্ডনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম হাই কমিশনার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। 

স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশের ঢাকায় ফিরে আসেন আবু সাঈদ চৌধুরী। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৩ সালের ১০ এপ্রিল পুনরায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন আবু সাঈদ। যদিও সেবছরই মুজিবুরের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়াতে ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি এবং মন্ত্রীর পদমর্যাদাসহ বৈদেশিক সম্পর্কের বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন আবু সাঈদ চৌধুরী। মুজিবর রহমানের খুবই কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ৮ আগস্ট তিনি বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভায় বন্দর এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে আবু সাঈদ মুজিবর রহমানের মন্ত্রীসভা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। এই সময়টাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কিত একটি অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভা ছেড়ে তিনি রহমান হত্যার একজন অন্যতম প্রধান ষড়যন্ত্রকারী খোন্দকার মোশতাক আহমেদের মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছিলেন। এছাড়াও খোন্দকার সম্পর্কে বলেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমেদ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে চান। তাঁর এই সিদ্ধান্ত এবং বক্তব্য বিস্তর বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল সেই সময়। মোশতাক আহমেদের মন্ত্রীসভায় তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাস থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত। 

১৯৭৮ সালে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে ঘটা বৈষম্য প্রতিরোধ এবং সুরক্ষা সম্পর্কিত রাষ্ট্রসংঘের যে উপ-কমিটি রয়েছে, তাঁর সদস্যপদও অলঙ্কৃত করেছিলেন আবু সাঈদ চৌধুরী। ১৯৮৫ সালে তিনি রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনের ৪১তম চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি৷  

তিনি যে কেবলমাত্র রাজনীতিই করেছেন আজীবন তা নয়, অবসরে লেখালেখির চর্চাও করতেন তিনি। তাঁর রচিত চারটি গ্রন্থেই বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক জীবন্ত ছবি ফুটে উঠেছে। অতএব এইসব গ্রন্থের একটা ঐতিহাসিক মূল্য আছে অবশ্যই। তাঁর লেখা গ্রন্থগুলির নাম যথাক্রমে ‘প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’, ‘মানবাধিকার’, ‘হিউম্যান রাইটস ইন দ্য টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি’ এবং ‘মুসলিম ফ্যামিলি ল ইন দ্য ইংলিশ কোর্টস’। 

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে আবু সাঈদ চৌধুরীকে তাঁর অবদানের জন্য ‘দেশিকোত্তম চিহ্ন’ দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও তাঁকে ‘ডক্টর অব ল’-এর সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করে। 

১৯৮৭ সালের ২ আগস্ট লণ্ডনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬৬ বছর বয়সে আবু সাঈদ চৌধুরীর মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading