ইতিহাস

অমৃতলাল বসু

অমৃতলাল বসু

বাংলা নাটকের ইতিহাস যেসব নট ও নাট্যকারদের উল্লেখ ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অমৃতলাল বসু (Amrita Lal Basu)। নাটককার, অভিনেতা, পরিচালক নানা ভূমিকায় তাঁর অসামান্য দক্ষতা বাংলা থিয়েটারকে প্রভূত সমৃদ্ধ করেছিল। শখের পেশাদারি নাট্যমঞ্চ গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের প্রথম অভিনয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। গিরিশচন্দ্র ঘোষ, নটী বিনোদিনীদের মতো বাংলা থিয়েটার জগতের কিংবদন্তী সব মানুষদের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি হোমিওপ্যাথির পাঠও গ্রহণ করেছিলেন তিনি এবং বেশ কিছুদিন হোমিওপ্যাথির চর্চাও করেন অমৃতলাল বসু। স্যার সুরেন্দ্রনাথের সঙ্গে স্বদেশি যুগের একজন কর্মী হিসেবেও কাজ করেছিলেন তিনি। মূলত ব্যঙ্গ এবং প্রহসনধর্মী নাটক রচনার জন্য পরিচিত ছিলেন অমৃতলাল বসু। সামাজিক কোনও অনৈতিকতা লক্ষ্য করলেই তা নিয়ে নাটকের মধ্যে বিদ্রুপ করতে ছাড়তেন না অমৃতলাল বসু। এমন ব্যঙ্গের জন্য আদালতেও অভিযুক্ত হিসেবে দাঁড়াতে হয়েছিল তাঁকে। তিনি একসময় ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’র সভ্য ছিলেন। তাঁর রসিকতার জন্য বঙ্গদেশে তিনি ‘রসরাজ’ নামে পরিচিত হন। 

১৮৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্গত কলকাতা শহরের কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীটে মামার বাড়িতে অমৃতলাল বসুর জন্ম হয়। এক বনেদি, শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান ছিলেন তিনি। স্মৃতিকথায় তিনি জানিয়েছেন যে, তাঁরা কলকাতার আদি বাসিন্দা নন, মূলত ধলচিতার বসু হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতেন তাঁরা। অমৃতলালের প্রপিতামহ ধলচিতা থেকে প্রথম কলকাতায় চলে এসেছিলেন। তাঁর বাবা কৈলাশচন্দ্র বসু ছিলেন ওরিয়েন্টাল সেমিনারির ছাত্র এবং পরে সেই স্কুলেরই শিক্ষক হন। শম্ভুনাথ পণ্ডিতের মতো দিগগজ মানুষেরা ছিলেন কৈলাশবাবুর সহপাঠী, আবার তাঁর ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণদাস পাল প্রমুখ খ্যাতনামা সব ব্যক্তিত্ব। অমৃতলালের মায়ের নাম ছিল ভুবনমোহিনী দেবী। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে শেক্সপীয়ারের নাটক শুনতেন অমৃতলাল, ফলে নাটকের প্রতি আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই জন্মে গিয়েছিল তাঁর মনে। কবিতা আবৃত্তির প্রতি অমৃতলালের আজন্মকালের ঝোঁকটাও বাবার জন্যই তৈরি হয়েছিল বলাই বাহুল্য। প্রবেশিকা পরীক্ষার আগে ১৮৬৮ সালেই মাত্র পনের বছর বয়সে জয়নারায়ণ ঘোষের পৌত্রী নয় বছর বয়সী কালীকুমারীকে বিবাহ করেন অমৃতলাল বসু।

কম্বুলিয়াটোলা বঙ্গ বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষালাভ শুরু হয় অমৃতলালের। স্মৃতিরোমন্থনকালে তিনি উল্লেখ করেছিলেন রামগোপাল ভট্টাচার্যের কাছে তিনি সাহিত্য এবং ব্যাকরণের পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। সেখানে সংস্কৃত পাঠেরও ব্যবস্থা ছিল। ওরিয়েন্টাল সেমিনারির কয়েকজন ভাল ভাল শিক্ষক সপ্তাহে দু-এক ঘন্টা পাড়ার এই স্কুলটিতে এসে পড়াতেন। ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত এই বঙ্গ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন তিনি। তারপর হিন্দু স্কুলে প্রবেশ করে সেখানে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেন অমৃতলাল বসু। তাঁর নিজের বয়ান অনুযায়ী, ১৮৬৮ সালে ওরিয়েন্টাল সেমিনারি থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন অমৃতলাল। যদিও তাঁর পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল ১৮৬৬ সালে, কিন্তু তখন বয়স তাঁর মাত্র ১৩ বছর, তাই পরীক্ষার জন্য আরও দুবছর অপেক্ষা করতে হয় তাঁকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছাত্রদের তালিকায় যেখানে অমৃতলালের নাম পাওয়া গেছে, সেখানে স্কুল হিসেবে ওরিয়েন্টাল সেমিনারির কোনও উল্লেখ নেই, বরং জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশনের নাম রয়েছে। সেসময়ে যত বাংলা বই প্রকাশিত হত, সবই গোগ্রাসে পড়ে ফেলতেন অমৃতলাল। বটতলার পুস্তক বিক্রেতা বেণীমাধব দে’র পুত্র লালবিহারী দে ছিলেন তাঁর সহপাঠী। তাঁদের দোকানের যত উপন্যাস, নাটক সব পড়ে ফেলেছিলেন অমৃতলাল। লালবিহারীর সূত্রেই দীনবন্ধু মিত্রের নাটক প্রথম তাঁর হাতে এসেছিল। জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করবার পর অমৃতলাল ভর্তি হন মেডিকেল কলেজে। মোটামুটি দুবছর মেডিকেল কলেজে অধ্যয়ন করেছিলেন তিনি। মাঝে মাঝে কাশীতে ডাক্তার লোকনাথ মৈত্রের বাড়িতে গিয়ে থাকতেন অমৃতলাল। এই লোকনাথ মৈত্র হোমিওপ্যাথির একজন নামজাদা চিকিৎসক ছিলেন। তিনি অমৃতলালকে পুত্রের মতো স্নেহ করতেন। অবশেষে অ্যালোপ্যাথির পথ ছেড়ে হোমিওপ্যাথি চর্চায় মনোনিবেশ করেন তিনি।

ছোটবেলায় গাছ থেকে পড়ে হাত ভেঙে যাওয়ায় লোকনাথ মৈত্র হোমিওপ্যাথির বিখ্যাত ডাক্তার বেরিনিকে নিয়ে আসেন অমৃতলালের চিকিৎসার জন্য। কলকাতায় হোমিওপ্যাথির প্রথম সার্জিকাল কেস ছিল অমৃতলালের হাত ভাঙা। যে ব্যান্ডেজটি তাঁর হাতে বেঁধে দেওয়া হয়, সেই ব্যান্ডেজ খোলা দেখতে হাজির ছিলেন বিদ্যাসাগর এবং ডাক্তার রাজেন দত্ত। কাশীতেই কবি নবীনচন্দ্রের সঙ্গে অমৃতলালের প্রথম আলাপ হয়। ১৮৭২ সালের গোড়ার দিক থেকে স্বাধীনভাবে ডাক্তারি শুরু করেন অমৃতলাল বসু। লোকনাথ মৈত্রের পত্র নিয়ে তিনি চলে আসেন বাঁকিপুর। সেখানে কবি নবীনচন্দ্র সেন, বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্রের অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে আসেন তিনি। হোমিওপ্যাথির জন্য কলকাতা মেডিকেল কলেজের পড়াশোনা একপ্রকার অসম্পূর্ণই রয়ে যায় তাঁর। হোমিওপ্যাথি চর্চার অবকাশে মাঝে মাঝে কলকাতায় আসতেন তিনি। এখানে অবস্থানকালে কম্বুলিটোলা স্কুলে অবৈতনিকভাবে শিক্ষকতাও করতেন তিনি। পরবর্তীতে ১৮৭৭ সালে পুলিশের চাকরি নিয়ে পোর্ট ব্লেয়ারে গিয়েছিলেন অমৃতলাল।

বাংলা থিয়েটারের ক্ষেত্রে উনিশ শতক এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেসময় ধনীদের ব্যক্তিগত প্রাঙ্গনে অস্থায়ী মঞ্চ বেঁধে কেবল নিমন্ত্রিত মান্যগণ্য মানুষদের বিলাস-ব্যসনের চাহিদা মেটানোই ছিল থিয়েটারের কাজ। ১৮৬৭ সাল নাগাদ কিছু উদ্যোগী শিক্ষিত তরুণ থিয়েটারকে শখের প্রাঙ্গন থেকে মুক্ত করে আনতে চাইল জনমানসের মধ্যে এবং গঠন করল বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটার৷ এঁদের উদ্যোগেই ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়। সেইসব তরুণ-তুর্কী অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি, নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখরা একত্রে বাংলা থিয়েটারের এক নবযুগ নির্মাণের কাজ করে চলেছিলেন তখন। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটক দিয়ে ন্যাশনাল থিয়েটারের অভিনয় শুরুর পরিকল্পনা হয়। সেসময় মতবিরোধের কারণে গিরিশচন্দ্র দূরে সরে যান এই দল থেকে। আসলে ন্যাশনাল থিয়েটার নাম দিয়ে ন্যাশনাল থিয়েটারের উপযুক্ত সরঞ্জাম ছাড়া সাধারণ মানুষের জন্য টিকিটের বিনিময়ে অভিনয়ের ব্যবস্থা করার পক্ষে গিরিশ ঘোষ মত দিতে পারেননি। যাই হোক, গিরিশকে বাদ দিয়েই ‘নীলদর্পণ’-এর মহলা শুরু হয়।

ন্যাশনাল থিয়েটারের উদ্বোধনের একমাস আগেই ১৮৭২ সালের নভেম্বর মাসে জগদ্ধাত্রী পুজো উপলক্ষে কলকাতার বাড়িতে চলে আসার পর অমৃতলাল আর বাঁকিপুরে চিকিৎসাচর্চার জন্য ফিরে যাননি। সেসময় ন্যাশনাল থিয়েটারের ধর্মদাস তাঁকে নাটকের মহলা দেখাবার জন্য বাগবাজারের ভুবন নিয়োগীর বাড়ির দোতলায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে মহলা দেখে অভিনয়ের প্রতি ভীষণভাবে একটা আকর্ষণ জন্মে গিয়েছিল অমৃতলালের এবং তিনি অভিনয় করবার জন্যও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলেন। ‘নীলদর্পণ’-এ সৈরিন্ধ্রীর চরিত্রটি পেয়েছিলেন অমৃতলাল যেটি ছিল মূলত এক নারীচরিত্র এবং এটি দিয়েই তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হয়। অনেকে মনে করতেন সৈরিন্ধ্রীর মরাকান্না অর্ধেন্দুশেখর শিখিয়েছিলেন তাঁকে, যদিও অমৃতলাল বলেছিলেন তা তিনি নিজে নিজেই আয়ত্ত করেছিলেন। এখানে উল্লেখ্য, অমৃতলালের স্কুলের সহপাঠী ছিলেন অর্ধেন্দুশেখর। তখন থেকেই তাঁরা কখনও ভিক্ষুক, কখনও রাজবন্দী, ইনস্পেক্টর ইত্যাদি সেজে অভিনয় করে অন্য সকলের মনোরঞ্জন করতেন। ‘নীলদর্পণ’-এর পর একে একে দীনবন্ধু মিত্রেরই ‘নবীন তপস্বিনী’, ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’, ‘লীলাবতী’, রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘যেমন কর্ম তেমনি ফল’, ‘নবনাটক’ শিশিরকুমার ঘোষের ‘নয়শো রুপেয়া’ ইত্যাদি নাটকে অভিনয় করে যান অমৃতলাল।

ন্যাশনাল থিয়েটার নানা মতবিরোধের কারণে দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে গিরিশের দল ‘ন্যাশনাল থিয়েটার’ এবং অন্যদিকে অর্ধেন্দুশেখর, অমৃতলালদের দল ‘হিন্দু ন্যাশনাল থিয়েটার’ নামে পরিচিত হয়। পরবর্তীকালে এই হিন্দু ন্যাশনালের নাম বদলে রাখা হয় ‘গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার’। ১৮৭৫ সালে অমৃতলাল গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের ম্যানেজার পদে নিযুক্ত হন। বরাবরই তাঁর মনোভাব ছিল শ্লেষাত্মক। নাটক রচনাতেও তা অমিল নয়। কুড়ি বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি জন-ক্যাম্বেলের শিক্ষা-পরিকল্পনাকে ব্যঙ্গ করে ‘মডেল স্কুল’ নামে একটি প্রহসন রচনা করেছিলেন। ১৮৭৩ সালে হিন্দু ন্যাশনাল থিয়েটারের উদ্যোগে অপেরা হাউস ভাড়া নিয়ে মধুসূদনের ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের সঙ্গে অমৃতলালের ‘মডেল স্কুল’ নাটকটি অভিনীত হয়েছিল৷ এরপর ১৮৭৫ সালে তিনি সমসাময়িক পত্র-পত্রিকা থেকে কয়েকটি ঘটনা বেছে নিয়ে ‘হীরকচূর্ণ’ নামে একটি নাটক রচনা করেছিলেন। নাটকটি একপ্রকার মুখে মুখেই রচনা করেছিলেন বলা যায়। এমন মুখে মুখে নাটক রচনার অভ্যেস নাকি ছিল গিরিশচন্দ্রেরও। এই গ্রেট ন্যাশনালেই অমৃতলালের লেখা প্রথম প্রহসন ‘চোরের উপর বাটপাড়ি’ অভিনীত হয়েছিল। গ্রেট ন্যাশনালে অমৃতলালের অধ্যক্ষতায় উপেন্দ্রনাথ দাসের লেখা একের পর এক ‘শরৎ-সরোজিনী’, ‘সুরেন্দ্র-বিনোদিনী’র মত ব্রিটিশ বিরোধী নাটক অভিনীত হতে থাকে। এছাড়াও উপেন্দ্রনাথেরই ‘গজদানন্দ ও যুবরাজ’ নাটকের অভিনয়ের জন্য অমৃতলালকে রাজরোষে পড়তে হয়েছিল। আসলে ব্রিটেন থেকে সপ্তম এডওয়ার্ড প্রিন্স অফ ওয়েলস হিসেবে কলকাতায় এলে এখানকার উকিল জগদানন্দ তাঁকে নিজের বাড়িতে অভ্যর্থনা করে এবং বাড়ির মেয়েরা শঙ্খ বাজিয়ে, উলুধ্বনির মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানায়। এই আচরণকে ব্যঙ্গ করেই জগদানন্দ নামটি বিকৃত করে গজদানন্দ করে নিয়ে নাটকটি রচিত হয়। ব্রিটিশরা নাট্যনিয়ন্ত্রণ আইন তৈরি করে এই নাটকটি-সহ আরও এমন ইংরেজ বিরোধী নাটকগুলিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই প্রহসনের দ্বিতীয় অভিনয় পুলিশ বন্ধ করে দিলে অমৃতলাল নাটকের নাম বদলে ‘হনুমান চরিত্র’ করে দিয়ে অভিনয় করেন। এটিও বন্ধ করা হয় এবং পরবর্তীতে তাঁরা ‘পুলিশ অফ পিগ অ্যান্ড শিপ’ নামে এক অভিনয়েও ব্রিটিশ পুলিশ কমিশনার ও সুপারিন্টেন্ডেন্টকে ব্যঙ্গ করেছিলেন। শেষে ‘সুরেন্দ্র-বিনোদিনী’ অশ্লীল এই অভিযোগে অমৃতলালসহ আরও অনেককে গ্রেপ্তার করেছিল কলকাতার পুলিশ। ১৮৮৩-তে তিনি স্টার থিয়েটারে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে এখানকার ম্যানেজার হন তিনি৷ তারও আগে অবশ্য অমৃতলাল বসু বেঙ্গল থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব জায়গাতেও সমানভাবে অভিনয় ও পরিচালনার কাজ চালিয়ে যান তিনি।

অমৃতলাল বসু ‘নবযৌবন’ ‘ব্যাপিকাবিদায়’-এর মতো রোমান্টিক নাটক কিংবা ‘তরুবালা’, ‘হরিশ্চন্দ্র’, ‘যাজ্ঞসেনী’ প্রভৃতি পৌরাণিক নাটক, কখনও বা পারিবারিক নানা স্বাদের নাটক রচনা করলেও তাঁর আসল পরিচয় মূলত ব্যঙ্গ নাটক, রঙ্গ-কৌতুক, প্রহসন রচনায়। বাঙালি সমাজের ত্রুটি, বিচ্যুতি, অসঙ্গতিকে ব্যঙ্গবাণে বিদ্ধ করতে ভীষণ পারদর্শী ছিলেন তিনি। ব্রাহ্মসমাজ, বিলেত-ফেরত ইঙ্গবঙ্গ সম্প্রদায়, রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ, নারী-স্বাধীনতার বাড়াবাড়ি ইত্যাদি কোনও কিছুই তাঁর দৃষ্টি এড়াত না। ‘কালাপানি’, ‘একাকার’, ‘ডিসমিশ’, ‘বাবু’, ‘অবতার’, ‘বাহবা বাতিক’ ইত্যাদি নাটকে সামাজিক নানা অনাচার, অনৈতিকতাকে শাণিত ব্যঙ্গে জর্জরিত করেছিলেন অমৃতলাল। এছাড়াও ‘তিলতর্পণ’, ‘বিবাহবিভ্রাট’, ‘রাজাবাহাদুর’, ‘খাসদখল’ ইত্যাদি তাঁর সামাজিক ব্যঙ্গমূলক রঙ্গনাট্যগুলি এককালে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। ‘ব্রজলীলা’, ‘যাদুকরী’র মতো গীতিনাট্য রচনাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অনবদ্য হাস্যরসের জন্য স্বদেশবাসীর কাছ থেকে তিনি ‘রসরাজ’ উপাধি পেয়েছিলেন। কেবলমাত্র মৌলিক নাটকই নয়, কয়েকটি বিখ্যাত রচনার নাট্যরূপও দিয়েছিলেন তিনি যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রশেখর’, ‘রাজসিংহ’, ‘বিষবৃক্ষ’ এবং তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘স্বর্ণলতা’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘সরলা’। আবার নাট্যানুবাদের কাজও করেছিলেন অমৃতলাল। হর্ষবর্ধনের লেখা ‘রত্নাবলী’ নাটকের অনুবাদ তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। নাটক ছাড়াও কবিতা, উপন্যাস নকশা, গল্প এবং প্রবন্ধ রচনাতেও দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন অমৃতলাল৷ ‘পতিত ডাক্তার’, ‘ষষ্ঠীর প্রভাত’, ‘মাতৃভক্তি’ ইত্যাদি কয়েকটি নকশা ও গল্প তাঁর ‘কৌতুক-যৌতুক’ গ্রন্থে সংকলিত হয়। এছাড়াও ‘বিরাট বৃহস্পতি’, ‘বৈজ্ঞানিক দুর্গোৎসব’, ‘রসের টুকরা’ ইত্যাদি কয়েকটি নকশা ও রম্য রচনার লেখকও ছিলেন তিনি৷ ১৪ বছর বয়সে প্রথম অমৃতলালের কবিতা ছাপা হয় ‘ভাস্কর’-এ। তাঁর কয়েকটি কবিতাগ্রন্থ হল ‘অমৃত-মদিরা’, ‘শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেবের বাল্যলীলা’ ইত্যাদি। চুয়াত্তর বছর বয়সে ‘হামিদের হিম্মৎ’ এবং ‘যুবক-জীবন’ নামে দুটি উপন্যাস রচনা করেন তিনি। যদিও তার মধ্যে একটি ছিল অসম্পূর্ণ। রাজনৈতিক, সমাজচিন্তামূলক, নাটক ও নাট্যশালা বিষয়ক, ইত্যাদি নানা স্বাদের প্রবন্ধও রচনা করেছিলেন অমৃতলাল। রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকের ইংরেজি আলোচনাটি তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। তাঁর স্মৃতিকথাধর্মী লেখাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘পুরাতন প্রসঙ্গ’, ‘পুরাতন পঞ্জিকা’, ‘সপ্তমীর রাত’ ইত্যাদি।

স্যার সুরেন্দ্রনাথের সঙ্গে স্বদেশি যুগের একজন কর্মী হিসেবেও অমৃতলাল বসু কাজ করেছেন। তাছাড়াও শ্যামবাজার অ্যাংলো-ভার্নাকুলার স্কুলের সেক্রেটারি, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহ-সভাপতি এবং এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যপদ অলঙ্কৃত করেছিলেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘জগত্তারিণী পদক’ প্রদান করেছিল।

১৯২৯ সালের ২ জুলাই ৭৭ বছর বয়সে শ্যাম স্কোয়ারের বাড়িতে অমৃতলাল বসুর মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তথ্যসূত্র


  1. ড. অরুণকুমার মিত্র, 'অমৃতলাল বসুর জীবনী ও সাহিত্য', নাভানা, জানুয়ারি ১৯৬০, পৃষ্ঠা ৩-২১, ৪৩-৮০
  2. শ্রী সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, 'সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান', সাহিত্য সংসদ, মে ১৯৬০, পৃষ্ঠা ২৫
  3. https://theatrekolkata.wordpress.com/
  4. https://en.wikipedia.org/
  5. https://www.indianetzone.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়