অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস (Anders Celsius) ছিলেন আঠেরো শতকের প্রথম দিকের একজন সুইডিশ পদার্থবিদ, গণিতজ্ঞ এবং জ্যোতির্বিদ। জ্যোতির্বিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য তাঁকে সুইডিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তাঁর বানানো তাপমাত্রা পরিমাপের স্কেলকে সংশোধন করে পরবর্তীকালে তাঁর নামে বানানো হয় সেলসিয়াস থার্মোমিটার।
১৭০১ সালের ২৭ নভেম্বর সুইডেনের উপসালা (uppsala) শহরের এক শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে অ্যান্ডার্স সেলসিয়াসের জন্ম হয়। তাঁর ঠাকুরদা ম্যাগনাস সেলসিয়াস ছিলেন একজন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ এবং উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক। তাঁর বাবা নিইল সেলসিয়াস ছিলেন সুইডেনের একজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এবং অধ্যাপক । তাঁর মা মারিয়া স্পোলে ছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ অ্যান্ডার্স স্পোলের কন্যা।
বিজ্ঞানের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ থাকায় অল্প বয়সেই অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস পড়ে ফেলেছিলেন স্যার আইজ্যাক নিউটনের “প্রিন্সিপিয়া” নামের বইটি। এই বইটি ছিল তাঁর প্রথম অনুপ্রেরণা । ছাত্রাবস্থায় শুরুর দিকে গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যায় দুর্বল ছিলেন অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস কিন্ত পরবর্তী সময়ে এই দুটি বিষয়েই অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। মাত্র বারো বছর বয়সেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের গণিতের সমাধান করতে পারতেন। স্কুল জীবন শেষ করে তিনি উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত এবং পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে যান। ১৭২০ সালের শুরুর দিকে মেটিওরোলজি বা আবহাওয়াবিদ্যার ওপর এরিক বার্নম্যানের সঙ্গে তাঁর প্রথম গবেষণামূলক কাজটি করেন। সেই সময় মেটিওরোলজিকে অ্যাস্ট্রোনমির একটি শাখা হিসাবে দেখা হত। ১৭২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে আসেন বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ আন্দ্রে গ্যাব্রিয়েল দুঁরে (Andres Gabriel Duhre)। দুঁরের বক্তৃতা শুনে সেলসিয়াস গণিতের প্রতি উৎসাহ ফিরে পান। ১৭২৪ সালে আবহাওয়াবিদ্যা বিষয়ক তাঁর দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়। ১৭২৮ সালে চাঁদের ঘূর্ণন গতি সংক্রান্ত তাঁর গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় Astronomical lecture on the rotational motion of the moon নামে। এই বছরই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সম্পূর্ণ করে তিনি এবং তাঁর বন্ধু স্যামুয়েল ক্লিংয়েনস্টিয়ের্ণা (Samuel Klingenstierna) উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক পদের জন্যে আবেদন করেন। কিন্ত ক্লিংয়েনস্টিয়ের্ণার কাছে বিশিষ্ট দার্শনিক ক্রিস্টিয়ান উলফ এর সুপারিশ পত্র থাকায় তিনিই অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। অ্যান্ডার্স সেলসিয়াসকে সহ-অধ্যাপক পদে নিয়োগ করা হয়। কিন্ত নিয়োগের কিছুদিন পরেই ক্লিংয়েনস্টিয়ের্ণা ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিতে গবেষণার জন্যে চলে গেলে ১৭৩১ সাল পর্যন্ত সেলসিয়াস অধ্যাপক পদে থাকেন। ১৭২৯ সালে তাঁর অ্যাস্ট্রোনমির অধ্যাপক এরিক বার্নম্যানের মৃত্যু হয়। বার্নম্যানের জায়গায় অ্যাস্ট্রোনমির নতুন অধ্যাপক হিসেবে সেলসিয়াসকেই বেছে নেওয়া হয়। সেলসিয়াস এবং ক্লিংয়েনস্টিয়ের্ণার তত্বাবধানে উপসালা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠতে থাকে।
১৭২৯ সালে তিনি উপসালার রয়েল সোসাইটি অফ সায়েন্স এর সম্পাদক পদে নিয়োজিত হন এবং ১৭৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি সেই পদেই ছিলেন। তাঁর পরবর্তী সমস্ত গবেষণাপত্র এই প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল। ১৭৩০ সালে সেলসিয়াস, সূর্য এবং পৃথিবীর দূরত্ব নির্ণয়ের নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন এবং সেই বিষয়ে একটি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেন।
১৭৩২ সালে অ্যান্ডার্স সেলসিয়াসের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইউরোপের বাকি সমস্ত বিজ্ঞান চর্চার প্রতিষ্ঠান এবং পণ্ডিত ব্যক্তিদের যোগসূত্র স্থাপনের জন্য তাঁকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও শহর ঘুরে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ভ্রমণের সময়ই ১৭৩৩ সালে, জার্মানির নিউরেমবার্গ (Nuremberg ) থেকে তিনি অরোরা বরিওলিস বা মেরুজ্যোতি সম্পর্কিত ৩১৬ টি পর্যবেক্ষণের সংকলন প্রকাশ করেন। এখানে তিনি কম্পাসের কাঁটার বিক্ষেপের সাহায্যে প্রমাণ করেন অরোরা বা মেরুজ্যোতি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের উপর নির্ভর করে। সেই বছরই বিখ্যাত জার্মান গণিতজ্ঞ মাইকেল অ্যাডেলবুলনের (Michael Adelbulner) সাথে মিলে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন। এখানে মূলত আবহাওয়া ও মহাকাশবিদ্যা সম্বন্ধীয় ঘটনার বিশ্লেষণ করা হত। এই পত্রিকাটির মাত্র পঁয়তাল্লিশটি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং তারপর এটি বন্ধ হয়ে যায়।
১৭৩৩ সালে তিনি ইতালির বলোগ্না (Bologna) এসে পৌঁছান। এখানে এসে তাঁর সাক্ষাৎ হয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ম্যানফ্রেদির (Eustachio Manfredi) সঙ্গে। ম্যানফ্রেদির সঙ্গে সেলসিয়াসের কাজ প্রকাশিত হয় ম্যানফ্রেদির বই Books of observation of Bologna তে। ইতালির সৌন্দর্য সেলসিয়াসের মনে গেঁথে গিয়েছিল। ১৭৩৬ সালে রোম থেকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি তাঁর মাকে বলেন যদি তিনি উপসালাকে ইতালির কোনো শহরে পরিবর্তন করতে পারতেন, তবে কখনোই তাঁর জন্মভূমি ছেড়ে থাকার কথা তিনি ভাবতেও পারতেন না।
১৭৩৪ সালে তিনি প্যারিস এসে পৌঁছান। প্যারিসের বৈজ্ঞানিক মন্ডলী তখন গবেষণা করছিলেন পৃথিবীর সঠিক আকার নির্ধারণের ওপর। নিউটন এর আগে তাত্বিক ভাবেই প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন পৃথিবীর আকার অবলেট (oblate) বা কমলা লেবুর মত অর্থাৎ দুদিকে চাপা। কিন্ত ফরাসী বিজ্ঞানীদের একাংশ তা মানতে নারাজ। এদিকে বিখ্যাত গণিতজ্ঞ পিয়ের মাওপারটুই (Pierre de Maupertuis) এবং তাঁর সঙ্গীরা নিউটনের ধারণাকেই সঠিক বলে মানতেন। সেলসিয়াস এই আলোচনায় যোগদান করেন এবং মাওপারটুইকে সমর্থন করেন। অবশেষে প্যারিসের বিখ্যাত বিজ্ঞান একাডেমির (Académie des Sciences) তত্বাবধানে বৈজ্ঞানিকদের দুটি দলকে দুটি ভিন্ন জায়গায় অভিযানে পাঠানো হয়। এদের মধ্যে একটি ছিল নিরক্ষরেখার কাছে পেরুর একটি অঞ্চল এবং অপরটি ছিল আর্কটিক বৃত্তের কাছে ল্যাপল্যান্ড অঞ্চল। এর আগে ১৬৯৪ সালে একই বিষয়ে গবেষণা করার জন্যে তাঁর পিতামহ ম্যাগনাস সেলসিয়াস এই অঞ্চলে অভিযান চালিয়েছিলেন কিন্ত তিনি সাফল্য পাননি। অভিযানে সাহায্যের জন্য সেলসিয়াস যোগাযোগ করেন লন্ডনের বিখ্যাত যন্ত্র নির্মাতা জর্জ গ্রাহামের সঙ্গে। ১৭৩৬ সালের এপ্রিল মাসে ফ্রান্সের ডানকার্ক (Dunkirk) থেকে বিজ্ঞানীদের দুটি দল রওনা দেয়। ১৭৩৭ সালে তারা প্যারিসে ফিরে আসেন। অভিযানের ফলাফল হিসেবে নিউটনের দেওয়া তথ্যই সঠিক প্রমাণিত হয়। এই অভিযান সেলসিয়াসের আন্তর্জাতিক খ্যাতিকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। ফ্রান্সের সরকার মাসিক ১০০০ লিভা (livre) পেনশন ধার্য করেন সেলসিয়াসের সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে। অভিযানের সময় তিনিই প্রথম লক্ষ করেন নর্ডিক দেশগুলি অর্থাৎ ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেনের মতো দেশগুলির জলতল ক্রমশ কমে যাচ্ছে। তাঁর ধারণা ছিল জলের বাষ্পীভবনই এই ঘটনার জন্যে দায়ী।
১৭৩৮ সালে তিনি উপসালা ফিরে আসেন। সেলসিয়াসের সাফল্যের প্রভাব উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিকেও আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দেয়। দেশে ফেরার সময় অর্থের পাশাপাশি তাঁর কাছে ছিল জর্জ গ্রহামের তৈরি করা উন্নত মানের যন্ত্র সামগ্রী যা দিয়ে ১৭৪১ সালে তিনি গড়ে তোলেন সেলসিয়াস অবজারভেটরি (Celsius observatory) । ইউরোপ ভ্রমণের সময়েই তিনি থার্মোমিটারের কার্যপদ্ধতির ওপর বিভিন্ন বই পড়েন। দেশে ফিরে তিনি আবহাওয়া সম্বন্ধীয় গবেষণার জন্য একটি থার্মোমিটার বানান যেটি সেই সময়ের অন্যান্য থার্মোমিটারগুলি থেকে আলাদা ছিল। থার্মোমিটারটিতে ছিল ১০০ টি ঘর, কিন্ত সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার এখানে ০° সেলসিয়াসকে জলের স্ফুটনাঙ্ক এবং ১০০° সেলসিয়াসকে জলের গলনাঙ্ক ধরে হিসেব করা হয়েছিল। ১৮৪২ সালে তিনি Observations of twenty fixed degrees on a thermometer বইটিতে থার্মোমিটারের স্কেল নির্বাচনের পিছনে যুক্তি দেন। তাঁর মতে গলনাঙ্ক কখনোই অক্ষাংশ বা বায়ুর চাপের ওপর নির্ভরশীল না তাই এটিকে একটি স্থির বিন্দু ধরে নেওয়া চলে। কিন্ত ব্যারোমিটারের প্রতি ইঞ্চি পারদ স্তম্ভের উচ্চতার পার্থক্যে স্ফুটনাঙ্ক এক ডিগ্রি করে পরিবর্তিত হয়। সেলসিয়াসের মৃত্যুর পরে তাঁর স্কেলের মাপগুলিকে উল্টো করে অর্থাৎ জলের গলনাঙ্ক ০° এবং স্ফুটনাঙ্ক ১০০° সেলসিয়াস ধরে সেলসিয়াস থার্মোমিটার তৈরি কয়া হয় যেটি আমরা বর্তমানে ব্যবহার করি।
সেলসিয়াস তাঁর নিজেস্ব আলোকমিতি বা ফটোমেট্রিক্স (photometrics) ব্যবহার করে ৩০০ টির বেশি নক্ষত্রের আলোক প্রাবল্যর (brightness intensity) মান নির্ণয় করতে পেরেছিলেন। ১৭৩৯ সালে “রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স” তৈরি হয় যার প্রথম সভাপতি ছিলেন অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস। সেলসিয়াস, সুইডেনে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ব্যবহার করার পক্ষে ছিলেন। মৃত্যুর প্রায় এগারো বছর পর তাঁর এই ইচ্ছা পূর্ণতা পায়।
১৭৪৪ সালের ২৫ এপ্রিল যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে বিজ্ঞানী অ্যান্ডার্স সেলসিয়াসের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান