সববাংলায়

গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় | গোপাল পাঁঠা

ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস একটি রক্তাক্ত ইতিহাস। স্বাধীনতার অভিশাপস্বরূপ আমাদের দেখতে হয়েছে দেশভাগ, তবে তারও আগে, ঠিক স্বাধীনতার প্রাক্কালেই কলকাতা শহরের বুকে যে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ভয়াবহ আবহ তৈরি হয়েছিল তা দুঃস্বপ্নের মতো। এই দাঙ্গার প্রেক্ষাপটেই এক বাঙালি হিন্দু খুবই আলোচিত হন, যাঁর নাম গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (Gopal Chandra Mukhopadhyay), যিনি মূলত গোপাল পাঁঠা (Gopal Patha) নামেই পরিচিত ছিলেন। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গাবাজদের নির্বিচার হিংস্রতার বিরুদ্ধে তিনি কয়েকজনের সঙ্গে হিন্দুদের রক্ষার্থে গঠন করেছিলেন ভারতীয় জাতীয় বাহিনী। এই গোপাল পাঁঠা এবং তাঁর গড়ে তোলা সশস্ত্র হিন্দু বাহিনী অচিরেই তাদের প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করতে শুরু করেছিল। সেই দুর্দিনে হিন্দুদের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে মনে করা হলেও এই গোপাল পাঁঠাকে নিয়ে কিন্তু নানা মহলে বিতর্কেরও শেষ নেই। তাঁকে ‘গুন্ডা’ বলেও অভিহিত করেছেন অনেকে। অন্ধকার অপরাধ জগতের একজন মানুষ হিসেবে তাঁর কুখ্যাতি রয়েছে।

১৯১৩ সালের ১৩ মে কলকাতার বউবাজার অঞ্চলের গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ-এর বিপরীতে মলঙ্গা লেনে এক বাঙালি হিন্দু পরিবারে গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। যদিও তাঁর পরিবার আসলে পূর্ববঙ্গের চুয়াডাঙা জেলার (বর্তমান বাংলাদেশ)। ১৮৯০-এর দশকে সেখান থেকে তাঁর পরিবার চলে এসেছিল কলকাতা শহরে। কলকাতায় এসে তাঁরা কলেজস্ট্রীটে একটি মাংসের দোকানের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পারিবারিক মাংসের ব্যবসার কারণে তিনি গোপাল পাঁঠা নামে পরিচিত হয়েছিলেন। এই মাংসের দোকানের দায়িত্ব পরবর্তীকালে গোপালচন্দ্র নিজের হাতেই তুলে নিয়েছিলেন৷

গোপালচন্দ্রের পরিবারের মানুষ, তাঁর নিজের কাকা অনুকুলচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনুকুলচন্দ্র ছিলেন রডা কোম্পানি লুঠের নেপথ্যে থাকা প্রধান মুখ। বুড়িবালামের তীরে যে মাউজার পিস্তল নিয়ে বাঘা যতীন ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, সেই পিস্তল লুঠ করেছিলেন এবং বিপ্লবী-গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন এই অনুকুলচন্দ্র। এহেন পারিবারিক এক আবহে গোপাল পাঁঠার বেড়ে ওঠা। তিনি প্রথম জীবনে আবার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্নও দেখতেন। স্থানীয় সব জোয়ান, ডাকাবুকো ছেলেছোকরাদের জড়ো করে ১৯৪২ সালে তিনি ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও যোগদান করেছিলেন। এছাড়াও তাঁর পৌত্র শান্তনু মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন যে, গোপালচন্দ্র নিজে অনুশীলন সমিতির মতো ফিটনেস ক্লাবগুলির অংশ ছিলেন, যারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবীদের গোপন সমিতিগুলিকে সমর্থন করত।

মাংসের দোকানের ভার নিজের হাতে তুলে নিয়ে ১৯৩৫ সালে গোপালচন্দ্র দোকানে মা কালীর মূর্তি স্থাপন করেন এবং ১৯৩৭ সালে গোপাল পাঁঠা কালীপূজা শুরু করেছিলেন। সেই বছরই অনুকুলচন্দ্র মুখোপাধ্যায় মারা গিয়েছিলেন। গোপালচন্দ্র নাকি স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এই পূজা শুরু করেছিলেন। গোপালচন্দ্রের  দোকানের সেই মন্দিরের জনপ্রিয়তা ক্রমে বিস্তার লাভ করতে থাকে। পাঁচটি তীর্থের মাটি এনে তা দিয়ে মা কালীর বেদীটি তৈরি করেছিলেন তিনি। এমনকি প্রতি অমাবস্যাতে বেদীর সামনে বলিও হত। এখানে উল্লেখ্য যে, ভবানীপুরেও গোপালচন্দ্রের একটি দোকান ছিল। গোপাল পাঁঠার কালীপুজোর একটা প্রধান আকর্ষণ ছিল অস্ত্রপূজা এবং ভাসানের সময় তরবারি মিছিল। শয়ে শয়ে তরবারি উঁচিয়ে যুবকদের সেই ভাসানের মিছিল ছিল দেখার মতো। বিপ্লবী অনুকুলচন্দ্রের স্মৃতিতেই অস্ত্রপূজা শুরু করেছিলেন গোপালচন্দ্র। তাঁর দোকানের কালীপূজায় অন্নকূটও ছিল দেখার মতন।

গোপাল পাঁঠার এই পুজো নিয়ে বেশ কিংবদন্তিও প্রচলিত রয়েছে।  একবার অন্নকূটের সময় ভোগ খাওয়ানো হয়ে যাওয়ার পর নিজে যখন খেতে বসবেন, সেই সময়ে এক কাঙালি এসে হাজির হয় এবং ভোগ প্রার্থনা করে। তখন অন্ন অবশিষ্ট নেই একটুও, তবুও কাঙালিকে খালি মুখে ফেরাবেন না বলেই তিনি স্ত্রীয়ের কাছে গিয়েছিলেন অন্নভোগ আনতে। ফিরে এসে আর সেই কাঙালিকে নাকি দেখতে পাননি। সেদিন রাতেই স্বয়ং দেবী মা তাঁর স্বপ্নে এসে নাকি তাঁকে বলেছিলেন যে প্রসাদ খুব ভালো হয়েছে। গোপাল পাঁঠার এই পুজোতে বিধানচন্দ্র রায়ও আসতেন।

১৯৪২ সালের আন্দোলনের সময়তেও অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নামলেও গোপাল পাঁঠার নাম চারদিকে ছড়িয়ে গিয়েছিল ১৯৪৬ সালের সেই ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময়ে, যাকে ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামেও আমরা জানি। তবে গোপাল পাঁঠার প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এই দাঙ্গার পটভূমিটুকু জেনে নেওয়া দরকার।

১৯২৪ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুর পর থেকে বাংলায় মুসলিম ও হিন্দু পরিচয়বাদী রাজনীতি মাথা চাড়া দিতে থাকে। শিক্ষিত মুসলমান সমাজ হিন্দুদের আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তি চাইছিল। সোহরাবর্দি, খাজা নাজিমউদ্দিন আকরম খাঁ-এর মতো নেতাদের উত্থান হতে লাগল এবং ফজলুল হকের মতো নেতার পতন হতে শুরু হয়। ১৯৩০-এর দশক থেকেই মুসলিমরা ১৯৪০ সালে মহম্মদ আলি জিন্নাহের দ্বিজাতিতত্ত্বের যে ধারণা তা মানসিকভাবে মেনে নিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে বঙ্গবিভাজনের জন্য প্রস্তুত ছিল। মুসলিম লীগ স্পষ্টতই ঘোষণা করেছিল যে, একজন পাঞ্জাবি ও উত্তরপ্রদেশের মুসলিম নিজের পাশের অন্য ধর্মের (মূলত হিন্দুধর্ম) প্রতিবেশীর থেকেও পারস্পরিকভাবে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ। বাংলার মুসলমানরা মুসলিম লীগের এই প্রোপাগান্ডাকে মেনে নিয়েছিল। দেশভাগ এবং ধর্মের ভিত্তিতে দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রগঠনের প্রেক্ষাপট এভাবেই তৈরি হয়ে উঠেছিল। মুসলিম লীগ কর্তৃক মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবি দেশভাগেরও আগে রক্তাক্ত ৪৬-এর দাঙ্গার জন্ম দিয়েছিল।

১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে সোহরাবর্দি বাংলার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সেবছরই মে মাসে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলি ঘোষণা করেন যে ভারতবর্ষের শাসনভার ভারতীয়দের হাতেই তুলে দেওয়া হবে। ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজটিকে সম্পন্ন করবার জন্য ১৯৪৬ সালে ক্যাবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া তৈরি হয়। সেই ক্যাবিনেটে ভারতের নতুন ডোমিনিয়ন গঠনের প্রস্তাব করা হলেও তাতে মুসলিম লীগের যে প্রস্তাব অর্থাৎ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য পাকিস্তান নামক আরেকটি দেশ গঠন, তার উল্লেখ করা হয়নি। আসলে দেশভাগ করে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের প্রস্তাব মানতে নারাজ ছিল জাতীয় কংগ্রেস। ফলত, আগুনে ঘি পড়ে যায়। ক্যাবিনেটের উক্ত প্রস্তাব বর্জন করে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট হরতালের সিদ্ধান্ত নেয় মুসলিম লীগ, যেটি ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে নামে পরিচিত। তার আগে ২৭ থেকে ২৯ জুলাই মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সভায় মহম্মদ আলি জিন্নাহ স্পষ্টতই হিংস্র মনোভাব ব্যক্ত করেন। তাঁর উচ্চারণের মধ্যেই আভাস ছিল, হয় ভারত ভাগ হবে নতুবা ভারত পুড়িয়ে ফেলা হবে। অন্যদিকে আবার কলকাতার তৎকালীন মেয়র সৈয়দ মহম্মদ উসমানের লেখা একটি প্যামফ্লেটে অস্ত্র তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত মুসলমানদের সহিংসতার পথে চালিত করেছিল। সবচেয়ে বড় ব্যাপার যে, এই সমস্ত কিছুকেই তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাবর্দি সমর্থন করে তাতে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় পরোক্ষে ঘোষণা করেছিলেন যে, মুসলমানরা শহরে অস্ত্র নিয়ে নামলে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না। ইয়াসমিন খান এমনও দাবি করেছিলেন যে, সেসময় সোহরাবর্দি জোর করে অনেক হিন্দু পুলিশকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দিয়েছিলেন। অবশেষে সরকারী মদতে কলকাতা শহরের বুকে মুসলমান দাঙ্গাবাজদের নির্বিচারে হিন্দু হত্যা শুরু হয়ে যায়।

১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট অর্থাৎ শুক্রবার বেলেঘাটায় মুসলমান দাঙ্গাবাজ কর্তৃক দুজন হিন্দু গোয়ালাকে হত্যার মাধ্যমে এই দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর রক্তাক্ত ইতিহাসের সূত্রপাত হয়। হিন্দুদেরকে নিরবচ্ছিন্ন হত্যা, ধর্ষণের তান্ডবলীলা চলতে থাকে প্রায় ৪৮ ঘন্টা ধরে। দেশভাগ নিয়ে লেখালেখি করা নিষাদ হাজারী জানিয়েছেন, তখন মৃতের সংখ্যা ঠিক কত ছিল কেউ জানে না। হুগলিতে অনেক মৃতদেহ ভেসে গেছে, অনেক মৃতদেহ গেছে পুড়ে। সাধারণভাবে অনুমান করা হয় কলকাতায় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যদিও তারও চেয়ে বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন। হিন্দুদের মালিকানাধীন সিনেমাহল, হোটেল এবং দোকানে মুসলমান গুন্ডারা চড়াও হয়, আগুন লাগিয়ে দেয় এমনকি হিন্দুদের বাড়িতেও আগুন লাগিয়ে দেয় তারা। একজন পুলিশ অফিসার গোলোক বিহারী মজুমদারের রিপোর্ট অনুযায়ী, মধ্য কলকাতার একটি কসাইখানায় নগ্ন হিন্দু মেয়েদের লাশ ঝুলতে দেখা গিয়েছে তখন। হিন্দুরাও অবশ্য চুপ করে থাকতে পারেনি, মুসলিম মিছিলের ওপর বাড়ির ছাদ থেকে গরম জল ফেলে দেওয়ার ঘটনার কথাও জানতে পারা যায়। হিন্দুদের এমনই দুর্দিনে গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ওরফে গোপাল পাঁঠার মতো মানুষ চুপ করে থাকতে পারেননি৷ বিপ্লবী অনুকুলচন্দ্রের বংশের মানুষ হয়ে হিংসার বদলে অস্ত্র তুলে ধরার পথই বেছে নিয়েছিলেন তিনি৷ যুগলচন্দ্র ঘোষ, কুস্তিগীর বসন্ত, বিজয় সিং নাহার ইত্যাদি কয়েকজন বাঙালি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, বিহারী হিন্দুকে নিয়ে হিন্দুদের রক্ষার্থে গোপাল তৈরি করেছিলেন ভারতীয় জাতীয় বাহিনী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কলকাতা শহরে বেআইনি পিস্তল ঘুরছে তখন। গোপাল পাঁঠারা সেইসব পিস্তল তো সংগ্রহ করেছিলেনই সেই সঙ্গে তাঁরা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন লাঠি, বর্শা, ছুরি, তলোয়ার এমনকি অ্যাসিড বোম পর্যন্ত। কলকাতার বিভিন্ন ব্যায়াম সমিতি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলি থেকে অনেক হিন্দু তাঁদের দলে যোগ দিতে এসেছিল৷ গোপাল পাঁঠার নেতৃত্বে হিন্দুদের প্রতিরোধ গড়ে উঠলে মুসলমানদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৮ থেকে ২০ আগস্ট হিন্দুদের হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত মুসলমানদের চিহ্নিত করে হত্যা করতে থাকেন গোপাল পাঁঠা ও তাঁর সাগরেদরা। সেই সময় ছড়িয়েছিল কলকাতাকে পাকিস্তানের অংশ করে নেওয়ার এক পরিকল্পনা চলেছিল। তা যদি সত্যি হয়, তবে গোপাল পাঁঠাদের প্রতিরোধ সেই পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছিল। অনেকেই মুসলিম বিদ্বেষী এবং মুসলিম হত্যাকারী বলে গোপাল পাঁঠাকে অভিহিত করে থাকেন, কিন্তু গোপাল পাঁঠার পরিবারের তরফ থেকে জানানো হয় যে, তিনি নিরপরাধ মুসলমানদের আক্রমণ করেননি এবং মুসলিম নারী, শিশু ও বয়স্কদের স্পর্শ করেননি। ঐতিহাসিক সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন যে, ব্যবসা-সূত্রে মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হত গোপালকে। তিনি কেবল মুসলিম দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় গোপাল পাঁঠাকে সাম্প্রদায়িক মনে করেন না। গোপালচন্দ্রের নাতি শান্তনু মুখোপাধ্যায় এও জানান যে, অনেক মুসলিম পরিবারকে বাড়িতে ঠাঁই দিয়ে দাঙ্গার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন তিনি। তবুও একদল গোপাল পাঁঠাকে ৪৬-এর হত্যালীলার বাড়াবাড়ির জন্য দায়ী করলেও অনেকে তা মানেন না।

সোহরাবর্দি অবশেষে জিজি আজমিরী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একযোগে গোপাল পাঁঠার কাছে এই হত্যাকান্ড বন্ধের আবেদন জানান। গোপাল শর্ত দেন প্রথমে মুসলিম লীগ অস্ত্র ত্যাগ করবে এবং হিন্দুদের হত্যা বন্ধ হবে, তবেই তিনি থামবেন। ২১ আগস্ট বাংলা সরাসরি ভাইসরয় শাসনের অধীনে আসেন এবং শহরে সেনা মোতায়েন করা হয়। ব্রিটিশ ভাইসরয় সোহরাবর্দি ও মুসলিম লীগ সরকারকে বরখাস্ত করে। গান্ধিজীর আহ্বানে তাঁর কাছে গোপাল পাঁঠা অস্ত্র সমর্পন করেননি, হয়তো দাঙ্গার সময় গান্ধিজী কোন ভূমিকাই নেননি সেই কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।

৪৬-এর দাঙ্গার পর নাকি গোপাল পাঁঠা আর অস্ত্র ধরেননি, কিন্তু তাঁর সাগরেদরা এই অপরাধ জগত থেকে সরে আসতে পারেনি বলেই অনেকের মত। এমনকি সমস্ত অপকর্মের সঙ্গে গোপাল পাঁঠার নামও জড়িত থাকতে দেখা গিয়েছিল। অপহরণ, ব্যাঙ্ক ডাকাতি, অয়েল মিলে ডাকাতি ইত্যাদি সমস্ত অপরাধের সঙ্গেই নাম জড়িয়েছিল গোপাল পাঁঠার। তবে প্রমাণের অভাবে তেমন শাস্তি হয়নি তাঁর। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে গোপাল পাঁঠার যোগোযোগ তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। গোপাল বিধান রায়ের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর মাথা ছিল বলেও মনে করেন অনেকে। কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষের সঙ্গেও নাকি তাঁকে দেখা গেছে বহুবার৷ বিধান রায়ের হয়ে ভোট কারচুপির ঘটনাতেও নাম জড়িয়েছে গোাপাল পাঁঠার।

সব মিলিয়ে পুলিশের খাতায় অপরাধ জগতের শিরোমণি হিসেবেই ছিল তাঁর অবস্থান। ষাটের দশকের মাঝামাঝি গোপাল পাঁঠাকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে দেখা যায়। একটি দাতব্য সংস্থাও চালাতেন তিনি।

২০০৫ সালে এই কুখ্যাত ও বিতর্কিত চরিত্র গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ওরফে গোপাল পাঁঠার মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading