ইতিহাস

হরিবংশ রাই বচ্চন

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে  হিন্দী সাহিত্য জগতে বিপ্লব এনেছিল আবেগধর্মী কবিতার আতিশয্য। সম্পূর্ণ নতুন ধারার এই কাব্য সাহিত্য বিপ্লবের অন্যতম মুখ ছিলেন এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের  অধ্যাপক হরিবংশ রাই বচ্চন (Harivansh Rai Bachchan)। তাছাড়া তিনি ‘হিন্দী কবি সম্মেলনে’রও সদস্য ছিলেন। ‘মধুশালা’, ‘মধুবালা’, ‘মধুকলস’ -এই কাব্যগ্রন্থত্রয়কে তাঁর সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি বলে গণ্য করা যায়। কবি হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন অনুবাদক। এছাড়াও তিনি কিছু আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি ইংরেজি ও হিন্দী ছাড়াও উর্দু ও আউধি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। ১৯৬৬ সালে হরিবংশ রাই বচ্চন রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হন। হিন্দী সাহিত্য জগতে তাঁর অপরিসীম অবদানের জন্য ১৯৭৬ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণে ভূষিত করে সম্মান প্রদর্শন করে।

১৯০৭ সালের  ২৭ নভেম্বর ব্রিটিশ  শাসিত ভারতের  ভারতের আগ্রা ও আউধ সংযুক্ত প্রদেশের প্রতাপনগর জেলার বাবুপট্টি গ্রামে (বর্তমানে উত্তর প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত) এক আউধি, হিন্দু কায়স্থ পরিবারে হরিবংশ রাই বচ্চনের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম প্রতাপ নারায়ণ শ্রীবাস্তব এবং মায়ের নাম সরস্বতী দেবী  শ্রীবাস্তব। পরবর্তীকালে কবিতা লেখার সময় হরিবংশ রাই ‘ শ্রীবাস্তব’ এর বদলে ‘বচ্চন’ শব্দটি ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন।  ১৯২৬ সালে তিনি শ্যামা দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৩৬ সালে শ্যামাদেবীর মৃত্যু হয়। এরপর অবিভক্ত ভারতের পঞ্জাব প্রদেশে (অধুনা পাকিস্তানের ফয়জলাবাদে) জন্মানো তেজবন্ত কৌরী সুরির(ওরফে তেজী) সাথে হরিবংশ রাইয়ের আলাপ হয়। লাহৌরের কলেজে মনোবিজ্ঞান পড়াতেন তেজবন্ত। অন্যদিকে ইলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক  হরিবংশ রাই বচ্চন।   ১৯৪১ সালে দু’জনের দাম্পত্য জীবনের সূচনা হয়। বিয়ের পরে অধ্যাপনার বদলে সংসারের পাশাপাশি তেজী নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন থিয়েটারে। শেক্সপীয়রের ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের হিন্দী অনুবাদ করেছিলেন হরিবংশ। সেখানে লেডি ম্যাকবেথের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। সংসার, থিয়েটারের পাশাপাশি সামাজিক কর্মী হিসেবেও তাঁর ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল। তিনি ১৯৭৩ সালে ‘ফিল্ম ফাইনান্স কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া’র একজন ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। তাঁদের জ্যেষ্ঠ সন্তান অমিতাভ বচ্চন একজন প্রথিতযশা অভিনেতা এবং কনিষ্ঠ পুত্র অজিতাভ বচ্চন একজন সফল ব্যবসায়ী। সন্তানদের নামকরণ করার সময় থেকেই নিজের ছদ্মনাম ‘বচ্চন’কে তিনি পাকাপাকিভাবে পদবী হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেন।  তাঁদের ছয় নাতি নাতনি অমিতাভের দুই সন্তান অভিষেক, শ্বেতা এবং অজিতাভের চার সন্তান নিলীমা, নয়না, নম্রতা ও ভীমের মধ্যে অভিষেক বচ্চন বর্তমানে একজন সর্বজনবিদিত অভিনেতা। 

এলাহাবাদের কায়স্থ পাঠশালা এবং পুর-বিদ্যালয় থেকে বিদ্যালয়শিক্ষা সম্পূর্ণ করার পর হরিবংশ রাই বচ্চন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। এরপর ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ সেন্ট ক্যাথরিন’স কলেজ থেকে প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইংরেজি সাহিত্যে ডব্ল্যু.বি ইয়েটসকে নিয়ে গবেষণা করে  পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। 

পেশাগত জীবনে ১৯৪১-১৯৫২ সাল পর্যন্ত হরিবংশ এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। এরপর কেমব্রিজের গবেষণা সমাপ্ত হলে তিনি পুনরায় এক বছরের জন্য অধ্যাপনার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এরপর তিনি বেশ কিছুদিন এলাহাবাদের ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’তে প্রযোজকরূপে নিযুক্ত ছিলেন। এলাহাবাদে থাকার সময় থেকেই তাঁর সঙ্গে জওহরলাল নেহরুর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁরই আনুকূল্যে ১৯৫৫ সাল থেকে দীর্ঘ দশ বছর তিনি ভারতবর্ষের বিদেশ মন্ত্রকে (Ministry of External affairs, Govt of India) বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারূপে (as an Officer on special duty) কাজ করেছেন। এই দপ্তরে তিনি নানা গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজি নথিপত্র হিন্দীতে অনুবাদ করার দায়িত্ব পালন করতেন। এইসময়ে হিন্দীকে ভারতবর্ষের সরকারী ভাষায় (Official Language) উত্তীর্ণ করে তোলার প্রক্রিয়াতে  তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে ছিলেন। তবে পেশাগতভাবে বিভিন্ন ধরনের কাজের দায়িত্ব পালন করেও হরিবংশ রাই বচ্চন মূলত তাঁর রচিত কবিতার জন্যই অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।

তাঁর ব্যাক্তিগতজীবনের সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, শোকসন্তাপ, দারিদ্র্য ইত্যাদি নানা রঙের অনুভূতি বারবার প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর বিভিন্ন কবিতায়। গভীর আবেগ, স্পর্শকাতর অনুভূতিকে কৃত্রিম অলংকারবর্জিত সহজবোধ্য, সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করতে পারার ক্ষমতার জন্য তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর লেখা হিন্দী সাহিত্যের প্রচলিত রোম্যান্টিসিজমকে (Chhayavad) উপেক্ষা করে এক নতুন ধারার জন্ম দেয়। পুরনো ধারার পৌরাণিক কল্পনার আশ্রয় না নিয়ে, কৃত্রিমতার অলংকারে সাজানো দুর্বোধ্য ভাষার আবরণ সরিয়ে তিনি জীবনের প্রকৃতির চেনা উপমায় সাজিয়েছিলেন নিজের কবিতাদের। তাঁর লেখা ‘মধুশালা’ তাই ইংরেজি, বাংলা, মারাঠী ও মালয়ালম ভাষায় অনূদিত হয়েছে, কাব্যনৃত্যরূপে বারবার মঞ্চস্থ হয়েছে সমান আবেদনে। দেবনাগরি হরফে হিন্দী শব্দ ব্যবহার করে তিনি লিখতেন। নানা ছায়াছবির চিত্রনাট্যে ও সঙ্গীতে তাঁর বিভিন্ন লেখা ব্যবহার করা হয়েছে। এরমধ্যে তাঁর পুত্র অমিতাভ বচ্চনের ১৯৯০ সালের ছায়াছবি ‘অগ্নিপথ’ ও ২০১২ সালে ঐ ছবির পুনর্নির্মাণে তাঁর লেখা ‘অগ্নিপথ’ কবিতার ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ ব্যতীত হরিবংশ রাই বচ্চন  ‘ক্যায়া ভুলু, ক্যায়া ইয়াদ করু’(১৯৬৯), ‘নীড় কা নির্মাণ ফির্’(১৯৭০), ‘বাসেরে সে দূর’(১৯৭৭), ‘দশদ্বার সে সোপান তক-ইন দ্য আফটারনুন টাইমস্’(১৯৮৫) শীর্ষক চারটি খণ্ডে বিভক্ত আত্মজীবনীতে গদ্যসাহিত্যে তাঁর সাবলীলতার সাক্ষর রেখে গেছেন। অনুবাদক রূপেও হরিবংশ রাই বচ্চন হিন্দী সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র, গবেষক ও অধ্যাপক হিসেবে তিনি ডব্ল্যু বি ইয়েটসের নানা সৃষ্টি এবং শেক্সপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’ এবং ‘ওথেলো’-এর হিন্দী অনুবাদ করেছিলেন। অন্যদিকে বিখ্যাত উর্দু কবি ওমর খৈয়ামের সৃষ্টি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন হরিবংশ রাই বচ্চন। খৈয়াম সাহেবের ‘রুবাইয়্যাত’ (Rubaiyat)-এর হিন্দী অনুবাদ করেন। এছাড়া তিনি ‘ভাগবতগীতা’রও অনুবাদ করেছিলেন।হিন্দী ভাষা ও সাহিত্য জগতে তাঁর অপরিসীম অবদানের জন্য তিনি ১৯৬৬ সালে  রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হন।

হরিবংশ রাই বচ্চন তাঁর পঞ্চাশ বছর দীর্ঘ কবিজীবনে প্রায় তিরিশটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করে গেছেন। তার মধ্যে ১৯৩৫-১৯৩৭ সাল পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত ‘মধুশালা’, ‘মধুবালা’, ‘মধুকলস’ তাঁর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি বলে বিবেচিত হয়। এছাড়াও ‘নিশা নিমন্ত্রণ’(১৯৩৮), ‘মিলন যামিনী’(১৯৫০), ‘প্রণয় পত্রিকা’ও(১৯৫৫) তাঁর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত ‘দো চট্টানে’র জন্য তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমী পুরস্কার পেয়েছিলেন।  

হরিবংশ রাই বচ্চন ১৯৬৮ সালে তাঁর ‘দো চট্টানে’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অ্যাকাডেমী পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ১৯৭৬ সালে ভারত সরকার কর্তৃক দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ সম্মান পদ্মভূষণে সম্মানিত হন। এছাড়া তিনি তাঁর চার খণ্ডে বিভক্ত আত্মজীবনীর জন্য কে.কে.বিড়লা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে (K.K.Birla Foundation) প্রথম ‘সরস্বতী সম্মানে’ ভূষিত হন। ওয়ার্ল্ড অব লেটারস্-এ(world of letters) অনন্য অবদানের জন্য ‘সোভিয়েতল্যাণ্ড নেহেরু পুরস্কার’ ও আফ্রো-এশিয়ান কনফারেন্সে ‘পদ্ম পুরস্কার’ লাভ  করেন।২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পোল্যান্ড তথা ইউরোপের যথেষ্ট প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী এক গির্জায় প্রয়াত হরিবংশ রাই বচ্চনের জন্য প্রার্থনাসভার আয়োজন হয়েছিল। সারা বিশ্বের সাহিত্য এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণের জন্য ইউনিসেফের তরফ থেকে ‘সাহিত্যের শহর’-এর তকমাপ্রাপ্ত পোল্যান্ডের রোক্লও (City of Wroclaw, Poland) শহরের একটি চত্বর তাদের সিটি কাউন্সিলের উদ্যোগে সেজে উঠেছে হরিবংশ রাই বচ্চনের নামে। 

দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসযন্ত্রের অসুখে ভোগার পর ২০০৩ সালের ১৮ জানুয়ারি  ৯৫ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের জুহুতে বচ্চনপরিবারের  বাসভবন ‘প্রতীক্ষা’তে  হরিবংশ রাই বচ্চনের মৃত্যু হয়।  

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন