হেনরি বেকারেল

হেনরি বেকারেল

বিশ্বে প্রথম তেজস্ক্রিয়তার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হন ফরাসি ইঞ্জিনিয়ার এবং পদার্থবিদ হেনরি বেকারেল (Henri Becquerel)। তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯০৩ সালে মারি কুরি এবং পিয়ের কুরির সঙ্গে একত্রে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। তেজস্ক্রিয়তার পরিমাপক এস.আই (S.I) এককটি তাঁর নামানুসারেই রাখা হয়েছে ‘বেকারেল’ (Bq)। ‘অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এর সদস্য ছিলেন হেনরি বেকারেল এবং পরবর্তীকালে এই সংস্থার সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। প্যারিসে ‘মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি’, ‘কোল পলিটেকনিক’ এবং ‘দ্য কনসার্ভেটোয়্যার ন্যাশনাল ডেস আর্টস এট মেসার্টিয়ার্স’ (Conservatoire National des Arts et Méésartiers’)-এ ‘চেয়ার অফ ফিজিক্স’ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। এছাড়াও ন্যাশনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ ব্রিজ অ্যান্ড হাইওয়েতে একজন প্রকৌশলী হিসেবে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হন হেনরি বেকারেল।

১৮৫২ সালের ১৫ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে এক অভিজাত প্রতিপত্তিশালী পরিবারে হেনরি বেকারেলের জন্ম হয়। তাঁর বাবা আলেকজান্ডার এডমন্ড বেকারেল, তাঁর ঠাকুরদাদা অ্যান্টনি সিজার বেকারেল এবং তাঁর নিজের বড় দাদা জ্যঁ বেকারেল তিনজনই পদার্থবিদ্যার জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং বিজ্ঞানের নানাবিধ আবিষ্কারে ও গবেষণায় তাঁদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তাঁরা প্রত্যেকেই অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর সদস্য ছিলেন এবং মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি-তে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপনা করতেন। পরবর্তীকালে পলিটেকনিক কলেজে পড়াশোনা শেষ করে প্যারিসের বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষাবিদ এবং পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক জেসি জামিনের কন্যা লুসি-জো-মারি জামিনকে বিবাহ করেন হেনরি বেকারেল। ১৮৭৮ সালের মার্চ মাসে তাঁদের সন্তান জিনের জন্মের কয়েক সপ্তাহ পরেই হেনরি বেকারেলের স্ত্রী মারা যান।

১৮৭২ থেকে ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত হেনরি বেকারেল লিসি-লুই-লে গ্র্যান্ড স্কুল এবং ‘ইকোলেসার পলিটেকনিক’ কলেজে অধ্যয়ন করেন। পরে ১৮৭৪ থেকে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত ‘ইকোলেসার ডেস পন্টস এট চৌসিস’-এ পড়াশোনা করেন। এই প্রতিষ্ঠানেই তিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন।

স্কুলের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই হেনরি ব্যক্তিগত গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষকতাও শুরু করেছিলেন। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে তাঁর বাবার সমপদে উন্নীত হন হেনরি। সেই সময় থেকেই ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, দ্য পলিটেকনিক এবং পন্টস এট চৌসেস (Ponts et Chaussees) সংস্থার সঙ্গে পেশাগত জীবন শুরু হয় হেনরি বেকারেলের। শুরুর দিকে মূলত আলোকবিদ্যা বিষয়েই গবেষণা করেছিলেন তিনি। ১৮৭৫ থেকে ১৮৮২ সালের মধ্যে চৌম্বকীয় ক্ষেত্র দ্বারা সমতল মেরু-বিভাজিত আলোর ঘূর্ণন বিষয়ে তিনি প্রথম বিস্তৃত আকারে গবেষণা করেন। এটিই তাঁর প্রথম গবেষণা-সন্দর্ভ (Theses) ছিল। একইসঙ্গে স্ফটিকের দ্বারা আলোর শোষণ ও উজ্জ্বল আভা সৃষ্টি (Phosphorescence) বিষয়েও গবেষণা করেছিলেন তিনি। তাঁর কর্মজীবনের একেবারে শুরুর দিকে পৃথিবীর নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্র বিষয়েও বিস্তৃত অধ্যয়ন করেছিলেন হেনরি বেকারেল। পরবর্তীকালে অবলোহিত আলোর তরঙ্গ নিয়েও বিস্তর অনুসন্ধান চালিয়েছেন হেনরি। ১৮৮৮ সালে প্যারিসের বিজ্ঞান অনুষদ থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন হেনরি বেকারেল এবং ১৮৮৯ সালে অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। ১৮৯০ সালে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন এবং ১৮৯১ সালে তাঁর বাবার মৃত্যুর পরে ‘ন্যাশনাল ডেস আর্টস এট মেটিয়ার্স’ সংস্থায় তাঁর বাবার পদেই উন্নীত হন হেনরি। ১৮৯৬ সালের শুরুতে তেতাল্লিশ বছর বয়সে হেনরি বেকারেল স্থাপন করেন ‘বেকারেলি’ নামের নতুন এক সংস্থা।

স্বতঃস্ফূর্ত তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার হেনরি বেকারেলের জীবনের অন্যতম মোড়-বদলকারী ঘটনা। একটি নির্দিষ্ট বর্ণের আলোকের সামনে আমাদের শরীরকে উন্মুক্ত করে যে অন্য আরেক বর্ণের আলোর নির্গমন ঘটে সেই ফসফোরেন্সের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছিলেন হেনরি। ১৮৯৬ সালের শুরুর দিকে ভিলহেল্ম কনরাড রন্টজেন যখন এক্স-রে আবিষ্কার করেন, সেই ঘটনায় অত্যন্ত উত্তেজিত হয়েছিলেন হেনরি বেকারেল। তাঁর এই রশ্মি আবিষ্কার করতে গিয়ে রন্টজেন দেখেছিলেন যে ক্রুকস টিউবের মধ্যে দিয়ে ক্যাথোড রশ্মি প্রবাহের সময় এক নতুন ধরনের অদৃশ্য রশ্মি উদ্ভূত হয় যা কিনা কালো কাগজের মধ্য দিয়েও প্রবাহিত হতে পারে। রন্টজেনের এই অভিজ্ঞতার কথা জেনে হেনরি বেকারেল তৎক্ষণাৎ তাঁর আবিষ্কৃত ফসফোরেসেন্স এবং এক্স-রশ্মির মধ্যে কোনও সুপ্ত সম্পর্ক আছে কিনা তা নিয়ে অনুসন্ধানে রত হন। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন যে ইউরেনিয়াম লবণকে এভাবে সূর্যালোকে ফেলে রাখলে সম্ভবত এক্স রশ্মির মত কোনও অদৃশ্য রশ্মি নির্গত হবে। ১৮৯৬ সালের মে মাস নাগাদ ফসফোরেন্সেন্ট নয় এমন ইউরেনিয়াম লবণের সঙ্গে অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে হেনরি বেকারেল বুঝতে পারেন যে বাহ্যিক কোনও উত্তেজনা ছাড়াই ইউরেনিয়াম থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি অদৃশ্য অনুপ্রবেশকারী রশ্মি বিকিরিত হয়েছে। তেজস্ক্রিয়তা বিষয়ে আরও গভীর গবেষণার ফলে থোরিয়াম মৌলটির তেজস্ক্রিয়তার কথাও জানতে পারেন হেনরি। তাছাড়া ঐ সময়েই মেরি কুরি এবং পিয়ের কুরি অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয় মৌল হিসেবে পোলোনিয়াম এবং রেডিয়াম আবিষ্কার করে ফেলেন। ঐ বছরই তেজস্ক্রিয়তার বিষয়ে সাতটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন হেনরি বেকারেল। চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে যখন তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঘটে তখন চৌম্বকক্ষেত্রের চরিত্র কীরূপে বদলে যায় তাও নির্ণয় করার চেষ্টা করেছিলেন বেকারেল। এই বিষয়ে গভীর গবেষণার ফলে হেনরি বেকারেল পর্যবেক্ষণ করেন যে চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের সময় তিন ধরনের পৃথক রশ্মি বিকিরিত হয় এবং সেই রশ্মিগুলি তিনটি পৃথক দিকে প্রবাহিত হয়। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে মূলত তিন ধরনের তেজস্ক্রিয়তা রয়েছে – ধনাত্মক, ঋণাত্মক এবং তড়িত-নিরপেক্ষ। এই ঘটনার ঠিক ৪০ বছর আগে ১৮৫৭ সালে অ্যাবেল নিপ্স ডি সেইন্ট ভিক্টর নামে এক চিত্রগ্রাহক ছবি নিয়ে গবেষণা করার সময় আবিষ্কার করেছিলেন যে ইউরেনিয়াম লবণ থেকে বিকিরিত তেজস্ক্রিয়তা ফটোগ্রাফিক দ্রবণকে কালো করে দিতে পারে। এই আবিষ্কারের কথা হেনরি বেকারেলের বাবাও জেনেছিলেন এবং সেই বিষয়ে তাঁর নিজের বইতে একটি পাতায় সামান্য সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশও করেছিলেন।

১৮৯৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এর একটি বক্তৃতায় হেনরি বেকারেল ফটোগ্রাফিক দ্রবণের ক্ষেত্রে এই তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করেন। এমনকি তিনি এও দেখান যে এই ইউরেনিয়াম লবণ থেকে বিকিরিত অদৃশ্য রশ্মির সঙ্গে আলোকরশ্মি কিংবা বিদ্যুৎ তরঙ্গের কোনও সাদৃশ্য নেই। এই অদৃশ্য রশ্মিগুলি গ্যাসকে আয়নিত করার ক্ষমতা রাখে। পরবর্তীকালে ১৯০০ সালে বিটা কণার বৈশিষ্ট্যগুলি নির্ধারণ করেছিলেন হেনরি বেকারেল। তিনি অনুসন্ধান ও গভীর গবেষণার মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে নিউক্লিয়াস ছেড়ে বেরিয়ে আসা উচ্চ গতিসম্পন্ন ইলেকট্রনগুলির সঙ্গে এই বিটা কণাগুলির সাদৃশ্য রয়েছে। ১৯০১ সালে হেনরি বেকারেল আবিষ্কার করেন ঔষধ হিসেবে চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এই তেজস্ক্রিয়তাকে ব্যবহার করা যেতে পারে। এইভাবেই আধুনিক কালের রেডিওথেরাপির জন্ম হয় যা কিনা ক্যান্সারের চিকিৎসায় কাজে লাগে। তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের পর খুব বেশিদিন বাঁচেননি হেনরি বেকারেল। চিকিৎসকের অধিকাংশের মতে দীর্ঘদিন যাবৎ তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে নাড়া-ঘাঁটা করার কারণে তাঁর ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

১৮৮৯ সালে হেনরি বেকারেল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর সদস্য হন এবং ১৯০০ সালে ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের জন্য রামফোর্ড পদক জেতেন তিনি। তাছাড়া ঐ বছরই তাঁকে লিজিয়ন অফ অনার সম্মানে ভূষিত অন্যতম একজন অফিসারের পদে অভিষিক্ত করা হয়। ১৯০১ সালে দ্য বার্লিন ব্র্যাণ্ডেনবার্গ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ সংস্থা তাঁকে হেল্মহোলৎজ পুরস্কারে ভূষিত করেন। আমেরিকান ফিলোজফিক্যাল সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন হেনরি বেকারেল ১৯০২ সালে। ঠিক তার পরের বছরই ১৯০৩ সালে মেরি কুরি এবং পিয়ের কুরির সঙ্গে একত্রে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন হেনরি বেকারেল। ইউ.এস ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস ১৯০৫ সালে তাঁকে বার্নার্ড পদকে সম্মানিত করে। এর পরের বছরই অ্যাকাডেমির ভাইস-চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হন হেনরি বেকারেল। ১৯০৮ সালে রয়্যাল সোসাইটির একজন বৈদেশিক সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর নামানুসারেই তেজস্ক্রিয়তার এস.আই (S.I) এককের নামকরণ করা হয় বেকারেল (Bq)। চাঁদে ও মঙ্গলে দুটি গহ্বরের নামকরণ করা হয়েছে হেনরি বেকারেলকে উৎসর্গ করে।   

১৯০৮ সালের ২৫ আগস্ট ৫৫ বছর বয়সে ফ্রান্সের লে ক্রোইসিকে হেনরি বেকারেলের মৃত্যু হয়।   

One comment

আপনার মতামত জানান