হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা মৃত্যু রহস্য

হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা মৃত্যু রহস্য

ভারতের সমাজ-রাজনৈতিক ইতিহাসে বেশ কিছু বিখ্যাত মানুষের মৃত্যু আজও রহস্যের অতল অন্ধকারে ডুবে আছে, সেই রহস্যের জট আজও খোলেনি। নেতাজীর মৃত্যু রহস্য নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি, পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু রহস্যও ভারতের ইতিহাসে এক সমাধানহীন অধ্যায় হয়ে রয়ে গিয়েছে। আরও বিস্ময়ের ঘটনা হল লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যুর মাত্র ১৩ দিন পরেই মারা গিয়েছিলেন ভারতের পরমাণু-বিজ্ঞানের গবেষণার পথিকৃৎ বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। ভিয়েনা সম্মেলনে যাওয়ার সময়েই মঁ ব্লাঁ পর্বতের উপর বিমান দুর্ঘটনায় সম্ভবত তাঁর মৃত্যু হয়। অথচ পরবর্তীকালে নানা সূত্র সামনে আসে যা থেকে ধারণা করা যায় দুর্ঘটনাজনিত কারণে নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্তের কারণে হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার মৃত্যু হয়েছিল। কোন চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন তিনি? কেনই বা তাঁকে মারার জন্য এমন চক্রান্ত করা হল এই সব প্রশ্নের আবছা কিন্তু আজও অধরাই থেকে গিয়েছে হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা মৃত্যু রহস্য (Homi Jehangir Bhaba Death Mystery)।

ভারতের একজন বিখ্যাত পরমাণুবিজ্ঞানী এবং ভারতীয় পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচির পথপ্রদর্শক ছিলেন হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং সেখানে মহাজাগতিক রশ্মির বিষয়ে গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করেন। সেই সময়কার বিখ্যাত ক্যাভেন্ডিশ গবেষণাগারেও কাজ করেছিলেন ড. ভাবা। টাটা গোষ্ঠীর স্যার দোরাবজী টাটার সঙ্গেও তাঁর গভীর ঘনিষ্ঠতা ছিল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে সিনিয়র কেমব্রিজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা, কিন্তু সেই সময় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ন্যূনতম বয়স ছিল ১৮ বছর। ফলে এর মাঝে বসে না থেকে প্রথম বছর বি.এ এবং পরের বছর বি.এস.সি কোর্স করে ১৯২৭ সালে কেমব্রিজে পাড়ি দেন তিনি। সেখানেও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন তিনি, কিন্তু তার পরেই পল ডিরাককে শিক্ষক হিসেবে পেয়ে গণিত ও পদার্থবিদ্যার গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করেন হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। গবেষণার জগতে অনেক বড় বড় বিজ্ঞানীদের সংস্পর্শে আসেন তিনি। ইতিমধ্যে ১৯৩৯ সালে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী প্যাট্রিক ব্ল্যাকেটের গবেষণাগারে কাজ করার আমন্ত্রণ পান ড. ভাবা। এই সময়েই ড. ভাবা ভাবলেন যে কাজে যোগ দেওয়ার আগে একবার দেশে ফিরে কিছুদিন সময় কাটাবেন। দেশে ফিরে আসা মাত্রই সমগ্র বিশ্ব জুড়ে শুরু হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কেমব্রিজের গবেষণার পাঠ অসমাপ্তই থেকে গেল। অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতে থেকে যেতে হল তাঁকে। ভারতে থাকাকালীন ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের অধ্যাপক সি ভি রামনের অধীনে কাজে যোগ দেন ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। সি ভি রামনের সুপারিশেই ১৯৪১ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে রয়্যাল সোসাইটি অফ লন্ডনের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এর পর থেকেই ভারতে সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে উন্নতমানের গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা তাঁকে গ্রাস করল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিলই। তাঁরই অনুপ্রেরণায় ও কর্মোদ্যোগে মুম্বাইতে ১৯৪৫ সালের ১ জুন গড়ে ওঠে ‘টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ’। এই পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিল সমগ্র বিশ্ব। ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা এই পরমাণু বোমার শক্তি অনুভব করে স্বাধীন ভারতে পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা জওহরলাল নেহেরুকে জানান। তাঁর উদ্যোগে ১৯৪৮ সালে গড়ে উঠলো স্বাধীন ভারতের প্রথম অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন। সমগ্র দেশে থোরিয়াম ও ইউরেনিয়ামের উৎস খুঁজে বের করার জন্য জরিপকার্য চলতে লাগল। ১৯৫৪ সালে হোমি জাহাঙ্গীর ভাবারই পরিকল্পনায় ও উদ্যোগে স্থাপিত হল অ্যাটমিক এনার্জি এস্টাব্লিশমেন্ট, ট্রম্বে’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ঠাণ্ডা লড়াই পর্বে তখন বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া। ভারত থেকে ব্রিটিশদের উপনিবেশ অপসৃত হয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তখন বেশ ঘনিষ্ঠ। একের পর এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার। এই ঘটনা আমেরিকার নজর এড়ায়নি। ভারতের পরমাণু শক্তির গবেষণায় এতটা সাফল্যই হয়তো হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছিল। পরমাণু শক্তিতে আমেরিকার ক্ষমতার মদমত্ততা পুরো বিশ্ব দেখে ফেলেছে ততদিনে আর এরই মধ্যে সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতের এক নগণ্য বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর পরমাণু শক্তির প্রতিযোগিতায় আমেরিকার ঠিক পাশে উঠে আসতে চাইছে, এই বার্তা আমেরিকা খুব সহজে মেনে নিয়েছিল এমনটা সম্ভব কী! পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার প্রাপকের তালিকায় বহুবার হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার নাম মনোনীত হলেও, কোনও এক অদৃশ্য সুতোর টানে সেটা সম্ভব হয়নি।

১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসের ২৪ তারিখে মুম্বাই থেকে নিউইয়র্কগামী ফ্লাইট ১০১ বোয়িং ৭০৭ বিমানে চড়ে ভিয়েনার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। ইতিমধ্যে ভারতের সঙ্গে ফ্রান্সের বেশ কিছু চুক্তি হয়েছে, ভিয়েনাতে সেই সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু সম্মেলনে ভারতের পক্ষ থেকে হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার যোগ দেওয়ার কথা। তাঁর বিমানে আরও ১০৫ জন যাত্রী ছিলেন, আর ছিলেন ১১ জন বিমানকর্মী। সকলেই ভারতীয়। বিমানের পোশাকি নাম ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা। সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মঁ ব্লাঁর উপর দিয়ে উড়ে চলছিল সেই বিমানটি। আর কিছুক্ষণ পরেই জেনেভায় অবতরণ করার কথা বিমানের। কিন্তু তারই মাঝে হঠাৎই কেঁপে ওঠে ফ্লাইট ১০১ বোয়িং ৭০৭। সকল যাত্রীদের চোখের ভয় আর আতঙ্কের মেঘ ঘন হয়ে এল। তারপরেই যবনিকা পতন। পর্বতশৃঙ্গের বুঁসো হিমবাহের উপর আছড়ে পড়ে বিমানটি। মারা যান সকলেই। এই মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত যাত্রীদের তালিকাতেই উজ্জ্বল ছিল পরমাণুবিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার নাম। কোন গোপন সত্য লুকিয়ে রেখেছে হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা মৃত্যু রহস্য!

কী এমন ঘটেছিল সেদিন বিমানে? বিমানে কোনওরকম যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না, জেনেভায় অবতরণের আগেও যান্ত্রিক ত্রুটি নেই বলেই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল বিমানচালকদের তরফ থেকে। অনেকে বলে থাকেন জেনেভা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে বিমানচালকের ভুল বোঝাবুঝির কারণেই এই দুর্ঘটনা হয়। কিন্তু তবু সন্দেহের প্রশ্নচিহ্ন অপসৃত হয় না। তদন্ত শুরু হল। জানা গেল বিমানে ওঠার আগের বছরই ১৯৬৫ সালের অক্টোবর মাসে অল ইন্ডিয়া রেডিও-র একটি অনুষ্ঠানে ড. ভাবা ঘোষণা করেছিলেন যে ভারতে পরমাণু গবেষণার কাজ শেষের পথে, দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত পাওয়া মাত্রই মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই পরমাণু বোমা তৈরি করে ফেলতে পারবে ভারতবর্ষ। ঘোষণার তিন মাসের মধ্যেই ড. ভাবার মৃত্যু রহস্যের গন্ধ আরও তীব্র করে তুলল। তার উপর যে সময় এই ঘোষণা করেন ড. ভাবা, দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। ১৯৬৬ সালের ১১ জানুয়ারি হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার মৃত্যুর মাত্র ১৩ দিন আগে তিনিও রহস্যজনকভাবে মারা যান। ফলে এই ঘটনাক্রম থেকে আন্দাজ করা যায় যে পরমাণু শক্তির নিরিখে ভারতের এই দ্রুত উত্থান হয়তো কোনও রাষ্ট্রীয় শক্তির চোখের বালি হয়ে উঠেছিল। বিশ্বের দরবারে ভারত দ্বিতীয় পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে উঠুক তা হয়তো কেউ চাইছিল না। এই না চাওয়ার সন্দেহের তালিকায় প্রথমেই চলে আসে আমেরিকার নাম।

এরই মধ্যে ২০০৮ সালে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে বিশ্ববাসীর সামনে। ‘টিবিআরনিউজ ডট ওআরজি’ (tbrnews.org) ওয়েবসাইটের দক্ষ সাংবাদিক গ্রেগরি ডগলাসের প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সি আই এ (CIA)-র জনৈক উচ্চপদস্থ অফিসার রবার্ট টি ক্রাওলি এক স্পর্শকাতর মন্তব্য করে বসেন। ক্রাওলির কথা থেকেই জানা যায় যে হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা মার্কিন সরকারের পক্ষে এক অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন এবং আমেরিকার চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে তুলেছিল ভিয়েনায় পরমাণু সম্মেলনে ড. ভাবার যোগদানের সংবাদ। ফলে আগে থেকেই তাঁর বিমানে সি আই এ একটি বোমা রেখে দিয়েছিল এবং এমনভাবে এই চক্রান্ত করা হয় যাতে সমগ্র ঘটনাটিকেই একটি দুর্ঘটনা বলেই মনে হয়। ২০০৮ সালের ১১ জুলাই এই কথোপকথন রেকর্ড করা হয়। ফলে এই কথোকথনের ভিত্তিতে ভারতের বিরুদ্ধে পরমাণু শক্তিধর আমেরিকার এই ঘৃণ্য চক্রান্তকে সত্য বলেই মেনে নেওয়া যায়। পরবর্তীকালে জনৈক অভিযাত্রী ড্যানিয়েল রোচে দুর্ঘটনা স্থলে পৌঁছে যান এবং সেখানে চিরুনি তল্লাশি চালানোর পরে মার্কিন সামরিক ফৌজের নানাবিধ নমুনা খুঁজে পান তিনি। এমনকি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ঐ অঞ্চলে গবেষণা করেছেন ড্যানিয়েল রোচে। মার্কিন যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ, যাত্রী বা চালকের ছিন্নভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। রোচে এও জানান যে যদি সত্যই ফ্লাইট ১০১ বোয়িং ৭০৭ বিমানটি পর্বতে আছড়ে পড়তো, তাহলে বিমানের মধ্যে থাকা ৪১ হাজার টন জ্বালানির কারণে সমগ্র বিমানটি বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হত আর সেই বিস্ফোরণের আগুন দেখাও যেত। রোচের ধারণা অন্য একটি বিমানের সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘার সংঘর্ষ হয়েছিল আর যেহেতু অত উচ্চতায় অক্সিজেনের ঘাটতি ছিল, তাই বিস্ফোরণ মারাত্মক আকার নেয়নি। এতগুলি সূত্র পাওয়ার কারণে হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার মৃত্যুর পিছনে বা সেদিনের বিমান দুর্ঘটনার পিছনে মার্কিন সি আই এ সংস্থার সংযোগের দিকেই সন্দেহ বেশি দানা বাঁধে।

এতদিন পরেও হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা মৃত্যু রহস্য আজও এক ঘনীভূত সন্দেহ আর সূত্রের সম্ভার নিয়ে ইতিহাসে লেখা আছে যার কোনও স্পষ্ট সমাধান আজও হয়নি। বিমান দুর্ঘটনায় হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার মৃত্যু না হলে হয়তো অনেক আগেই ভারত পরমাণু বোমা আবিষ্কারে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে পারত।

আপনার মতামত জানান