যেসব প্রতিভাবান বাঙালি বৈজ্ঞানিক তাঁদের অসামান্য মেধা, গবেষণা ও একনিষ্ঠ বিজ্ঞানসাধনার দ্বারা বিজ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ (Jnan Chandra Ghosh)। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রায় নিজ হাতে যেসব বৈজ্ঞানিক প্রতিভার জন্ম দিয়েছিলেন, এই জ্ঞানচন্দ্র তাঁদেরই একজন। মূলত একজন রসায়নবিদ হিসেবেই তিনি পরিচিত, তবে শিল্পোন্নয়ন এবং প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতিতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। খড়গপুর আইআইটির প্রথম ডিরেক্টর ছিলেন তিনি। বিদেশে গবেষণা করতে যাওয়ারও সুযোগ পেয়েছিলেন। পরে ব্যাঙ্গালোররের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সেরও ডিরেক্টর হয়েছিলেন। লবণাক্ত জলের প্রকৃতি নিয়ে মূল্যবান গবেষণা করেছিলেন তিনি। ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করেছিল।
১৮৯৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে পুরুলিয়া জেলার গিরিডিতে (বর্তমান ঝাড়খন্ড) জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের জন্ম হয়। যদিও তাঁদের আদি বাসস্থান ছিল হুগলী জেলার আলমবাটি গ্রামে। তাঁর পিতা রামচন্দ্র ঘোষ ছিলেন একজন কন্ট্রাকটর এবং অভ্র খনির মালিক। এই কাজের সূত্রেই রামচন্দ্র ঘোষকে তাঁর নিজস্ব পরিবার নিয়ে ছোটনাগপুরের অভ্র খনি অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে হত। অভ্র-ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে জ্ঞানচন্দ্র অল্প বয়স থেকেই দারুণ মেধাবী এক ছাত্র ছিলেন।
গিরিডি হাইস্কুল থেকে জ্ঞানচন্দ্রের প্রাথমিক শিক্ষার সূত্রপাত হয়েছিল। স্কুলে মেধাবী ছাত্র হিসেবে তাঁর একটু খ্যাতিও ছিল। ১৯০৯ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ছোটনাগপুর বিভাগ থেকে প্রথম হয়েছিলেন। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পরে কলকাতা শহরে চলে এসেছিলেন তিনি। সেই সময় উন্নতমানের এবং উচ্চশিক্ষালাভের সবচেয়ে ভাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি কলকাতা শহরেই অবস্থিত ছিল। কলকাতায় এসে প্রেসিডেন্সি কলেজে আই.এস-সি ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন জ্ঞানচন্দ্র। ১৯১১ সালে তিনি আই.এস-সি পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান লাভ করেছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, সেই পরীক্ষায় প্রথম স্থানাধিকারী ছিলেন পরবর্তীকালের বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং তৃতীয় স্থান পেয়েছিলেন ভবিষ্যতের আরেক খ্যাতনামা বাঙালি বৈজ্ঞানিক মেঘনাদ সাহা। প্রেসিডেন্সিতে এমনই সব গুণী মানুষদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন জ্ঞানচন্দ্র। ১৯১৩ সালে রসায়ন অনার্সে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করেছিলেন তিনি। মূলত এই সময় থেকেই কিংবদন্তি রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সাহচর্য লাভ করেছিলেন। যেহেতু তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন তাই ক্রমেই প্রফুল্লচন্দ্রের প্রিয় ছাত্র হয়ে উঠেছিলেন। এতই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন যে, অধ্যাপক রায়ের সঙ্গে জ্ঞানচন্দ্র প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় গড়ের মাঠে বেড়াতে যেতেন। প্রফুল্লচন্দ্রের সেই মূল্যবান সাহচর্য জ্ঞানচন্দ্রের ভবিষ্যৎ পথনির্মাণে প্রভূত সহায়তা করেছিল। ১৯১৫ সালে এম.এসসি পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। এই প্রেসিডেন্সিতে পড়বার সময়টি নিঃসন্দেহেই তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল।
প্রেসিডেন্সিতে অধ্যয়নকালেই জ্ঞানচন্দ্রের পিতার মৃত্যু হলে আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়েছিলেন তিনি। ১৯১৫ সালে এম.এসসি পরীক্ষার ফলপ্রকাশের আগেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উদারহৃদয় স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় নবগঠিত রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে রসায়ন বিভাগে লেকচারার পদে যোগদানের জন্য জ্ঞানচন্দ্রকে আহ্বান জানান। প্রায় সাড়ে তিনবছর সেখানে অধ্যাপনা করেছিলেন তিনি।
পিএইচডি শুরু করারও আগে জগৎখ্যাত পত্রিকা লন্ডন কেমিক্যাল সোসাইটির পত্রিকায় গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর। জ্ঞানচন্দ্রের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের ফিলিপ হার্টগের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। জ্ঞানচন্দ্রের মৌলিক গবেষণায় মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। হার্টগের অনুরোধে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহায়তায় গবেষণার জন্য বিলেতে গিয়েছিলেন জ্ঞানচন্দ্র। ইংল্যান্ডে চলে যান তিনি এবং সেখানে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ অব সায়েন্সে ডক্টরেট উপাধির জন্য গবেষণা শুরু করেন। সেখানে তিনি আলোক রসায়নের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গবেষণা করেন এবং স্ট্রং ইলেক্ট্রোলাইটের অসঙ্গতির তত্ত্ব ও আয়নাইজেসন তত্ত্বের বিকাশ ঘটান। গাঢ় দ্রবণের ভিতরে লবণের অনুগুলি কীভাবে আয়নিত হয়ে বিদ্যুৎ পরিবহন করে এটি জ্ঞানচন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। স্ট্রং ইলেক্ট্রোলাইট নিয়ে এই গবেষণা করে ১৯১৮ সালে ডি.এসসি ডিগ্রি লাভে সক্ষম হন তিনি এবং এই কৃতিত্বের জন্য প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তিও পেয়েছিলেন। তাঁর গবেষণালব্ধ উক্ত তত্ত্বটি ‘ঘোষের আয়নবাদ’ (Ghosh’s theory of ionization) নামে পরিচিতি লাভ করে। তাঁর এই অসাধারণ গবেষণাটি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, উইলিয়াম ব্র্যাগ, ওয়ালদার নার্নস্ট-এর মতো বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল। অধ্যাপক হেবার জ্ঞানচন্দ্রের প্রবন্ধগুলি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন।
১৯২১ সালে ভারতে ফিরে আসেন জ্ঞানচন্দ্র এবং নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। প্রায় কুড়ি বছর তিনি এখানে অধ্যাপনা করেছিলেন এবং তাঁর গবেষণার সাফল্য দিয়ে ভৌত রসায়ন চর্চার এক নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তিনি পদার্থের ওপর আলোকরশ্মির প্রভাব সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছিলেন। ১৯২৪ সালে তিনি বিজ্ঞান বিভাগের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯২৫ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যতদিন ছিলেন ততদিন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের প্রভোস্ট হিসেবেও গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন। বহু ছাত্রকে তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আকৃষ্ট করেছিলেন। বিজ্ঞানশিক্ষাকে রূপ দেওয়ার পিছনে তাঁর কর্মজীবনের এই সময়কালটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯৩৯ সালে সি ভি রামনের পরে জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স-এর ডিরেক্টরের পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। সেই আইআইএসসি-তে তিনি অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইন্টারনাল কমবাশন ইঞ্জিনিয়ারিং, মেটালার্জি এবং পাওয়ার ও হাই ভোল্টেজ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রবর্তন করে প্রতিষ্ঠানটির দ্রুত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। আইআইএসসি-তে থাকার সময়তেই ১৯৪৩ সালে মূলত যুদ্ধ পরিষেবার জন্য নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল তাঁকে। সেই কারণে তিনি স্যার জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ নামেও পরিচিত। তিনি ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটিরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
যেহেতু তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ছিলেন সেই কারণে দেশের শিল্পোন্নয়নের দিকটিকেও ভীষণ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সেই কারণেই তিনি ফসফেটিক সার, অ্যামোনিয়াম সালফেট, ফর্মালডিহাইড এবং পটাসিয়াম ক্লোরেটের কাঁচামাল থেকে উৎপাদন সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলির উপর গবেষণার কাজে নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সাপ্লাই-এর ডিরেক্টর-জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও সহযোগিতা করেন, যা ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম, মেশিন টুলস ইত্যাদি ভারী শিল্পের ভিত্তি স্থাপনে সহায়তা করে। এই সময়কালে তিনি অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল অফ টেকনিক্যাল এডুকেশন-এর সদস্য হিসেবেও কাজ করেছিলেন। কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা থেকেই যখন খড়গপুরে বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি বা আইআইটি গড়ে ওঠে, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ তার প্রথম ডিরেক্টর হয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানের একটি শক্তিশালী ভিত্তি রচনা করে দিয়েছিলেন এবং সারা বিশ্ব থেকে সুযোগ্য মানুষদেরও এখানে নিয়ে আসতেন তিনি। ১৯৪৯ সালে ইউনেস্কোতে জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ ভারতের প্রতিনিধি হিসেবেও উপস্থিত ছিলেন।
যখন তিনি খড়গপুর আইআইটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, ঠিক তখনই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আহ্বান করা হয় তাঁকে। জ্ঞানচন্দ্রের চলে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ছাত্ররা গণধর্মঘট শুরু করে দিয়েছিল। চলে যাওয়ার আগে জ্ঞানচন্দ্র একটি মর্মস্পর্শী ভাষণ দিয়েছিলেন, এমনকি বক্তৃতার মাঝে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। ১৯৫৪ সালে আইআইটি ছেড়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেন তিনি। ছাত্রদের শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের দিকে তাঁর গভীর মনোযোগ ছিল। সেই ১৯৫৪ সালেই ভারত সরকার জ্ঞানচন্দ্র ঘোষকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করেছিল। ১৯৫৪ সালের ১২ মার্চ থেকে ১৯৫৫ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন ছিলেন।
একবছর পরে তিনি পরিকল্পনা কমিশনের অন্তর্ভুক্ত হন এবং শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং স্বাস্থ্যের দায়িত্বে নিযুক্ত হন। ১৯৫৫ সাল থেকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি৷ দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রস্তুতির সমস্ত পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। বরাবরই প্রযুক্তিগত সুবিধা সম্প্রসারণের ব্যাপারে সজাগ ছিলেন।
জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের বহু গবেষণা দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল। যেমন সাধারণ গ্যাস থেকে ফিসারট্রপস পদ্ধতিতে অনুঘটকের সাহায্যে তরল জ্বালানির উৎপাদন বিষয়ে তাঁর গবেষণা দেশ-বিদেশের বৈজ্ঞানিক মহলে দারুণ সাড়া ফেলে দিয়েছিল। এই গবেষণা নিয়ে রচিত তাঁর গ্রন্থটির নাম হল, ‘সাম ক্যাটালিটিক রিয়্যাকশনস অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইমপ্যারট্যান্স’। এছাড়াও কঠিন অনুঘটকগুলির পদ্ধতিগত অধ্যয়নের একটি টুল (Tool) হিসেবে ডিফারেন্সিয়াল থার্মাল অ্যাপ্লিকেশন প্রয়োগের ক্ষেত্রে জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।
মাত্র ৬৪ বছর বয়সে ১৯৫৯ সালের ২১ জানুয়ারি কলকাতা শহরে এই প্রতিভাবান বাঙালি বৈজ্ঞানিক জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ভারতীয় বৈজ্ঞানিক, নৃপেন্দ্রনাথ সিংহ, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, ১৯৫৬, পৃষ্ঠা :- ৮৫-৮৭
- সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট ২০১৬ পৃষ্ঠা :- ১৭৮
- https://en.m.wikipedia.org/
- https://erp.iitkgp.ac.in/


আপনার মতামত জানান