সববাংলায়

জ্যোতি বসু

জ্যোতি বসু (Jyoti Basu) ছিলেন ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৭৭-২০০০ সাল অবধি টানা ২৪ বছর তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

১৯১৪ সালের ৮ জুলাই কলকাতার এক অভিজাত পরিবারে জন্ম হয় জ্যোতি বসু্র। তাঁর পুরো নাম জ্যোতিরিন্দ্র বসু।  তাঁর বাবা নিশিকান্ত বসু ছিলেন পেশায় ডাক্তার। তাঁর মায়ের নাম হেমলতা বসু। বড় জেঠা নিলীনকান্ত বসু ছিলেন পেশায় হাইকোটের বিচারক। জ্যোতি বসুর পৈতৃক ভিটে বা আদি বাড়ি বাংলাদেশের বারদী গ্রামে। জ্যোতি বসু বাংলাদেশে’র পৈতৃক গ্রামে যৌথ পরিবারে সবার সান্নিধ্যেই ছোট্ট বেলা কাটিয়েছেন। বাবা মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠ সন্তান।

অভিজাত স্কুলে জ্যোতিকে ভর্তি করাতে তাঁর বাবা পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। প্রথমে জ্যোতি বসু’র নাম দেওয়া হয়েছিল জ্যোতিরিন্দ্র বসু। স্কুলে ভর্তি করার সময় তাঁর বাবা এই নামটি ছোট করে স্কুলে জ্যোতি বসু নাম লিখিয়ে দেন।

১৯২০ সালে ছয় বছর বয়সে জ্যোতি বসুকে কলকাতা ধর্মতলার লরেটো কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এই স্কুলে তিন বছর পড়াশোনার পর তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ভর্তি হন। উল্লেখ্য এই লরেটো স্কুলে জ্যোতি বসু একমাত্র ‘ছাত্র’ ছিলেন বাকি অন্য সহপাঠীরা ছিল সবাই ‘ছাত্রী’।
সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে তিনি ১৯৩২ সাল অবধি পড়াশোনা করেন। এরপরে কলকাতা ‘হিন্দু কলেজে’ ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন। হিন্দু কলেজ থেকে ১৯৩৫ সালে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ইংরেজি সাহিত্যে বি.এ পাস করার পর তিনি লন্ডন পাড়ি দেন আইন পড়ার উদ্দেশ্যে। লন্ডনে ‘আইন’ পড়তে যান এবং ১৯৪০ সালে লন্ডনের মিডল টেম্পল থেকে ব্যারিস্টার হন।

লন্ডনে পড়াশোনার সময়েই জ্যোতি বসুর মধ্যে রাজনৈতিক বীজ রোপণ হয়ে গিয়েছিল। লন্ডনে আইন পড়ার পাশাপাশি লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্সে গিয়ে তিনি নানা বিষয়ের উপর ভাষণ শুনতেন যেমন: সাংবিধানিক আইন সংক্রান্ত নানা ভাষণ, আন্তর্জাতিক আইন সংক্রান্ত নানা ভাষণ, এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক সংগঠনের বক্তৃতা মন দিয়ে শুনতেন। লন্ডনের লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্সে ‘হ্যারল্ড লাস্কির’ বক্তৃতা শুনে জ্যোতি বসু বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন। সম্ভবত এই সময়েই তিনি ঠিক করে নিয়েছিলেন রাজনীতির সাথে যুক্ত হবেন। ১৯৩৭ সালে লন্ডনে পড়াশোনা’র সময় তিনি ইন্ডিয়ান লিগ ছাত্র সংগঠন ও বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে নিজেকে নিযুক্ত করেন এবং একজন ভারতীয় যুব কমিউনিস্ট হিসাবে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন। মার্ক্সবাদের সক্রিয়কর্মী ভূপেশ গুপ্ত ও স্নেহাংশু আচার্য’র মতো জ্যোতি বসুও মার্ক্সবাদী নীতিতে নিজেকে দীক্ষিত করে তোলেন এবং এই দুই মহারথীর মাধ্যমে জ্যোতি বসু গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি’র সাথে পরিচিত হন।

১৯৩৮ সালে জ্যোতি বসু লন্ডনের মজলিশে’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে মজলিশে’র সম্পাদক নিযুক্ত হয়ে অনেক দায়িত্ব সামলেছেন। মজলিশে’র পক্ষ থেকে ভারতীয় নেতাদের অভ্যর্থনা দেওয়ার সময় তিনি এই নেতাদের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পান- যেমন নেহেরু, নেতাজি, বিজয় লক্ষ্মী পণ্ডিত প্রভৃতি। মজলিশে’র সম্পাদক হিসাবে তিনি এই ব্যক্তিত্বদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন এবং এঁদের প্রত্যেকের বক্তৃতা, জ্যোতি বাবুকে ভারতীয় রাজনীতিতে যোগ দেবার জন্য যথেষ্ট উৎসাহিত করেছিল।

১৯৪০ সালে লন্ডন থেকে ভারতে ফিরে জ্যোতি বসু কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসাবে নিজের নাম নথিভুক্ত করেন। ব্যারিস্টারি করবেন বলে কোর্টে গেলেও সেই কাজে তাঁর মন সায় দেয়নি। তিনি রাজনৈতিক কাজেই নিজেকে যুক্ত করেন এবং সিপিআই দলে সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে নিজেকে নিযুক্ত করেন। এই বছরেই তিনি বিয়ে করেন। পরিবারের সায় ছাড়াই তিনি সাম্যবাদী আন্দোলনে যোগ দেন। কমিউনিস্ট পার্টিকে ব্রিটিশ সরকার অবৈধ ঘোষণা করলে জ্যোতি বসু অনেক কমিউনিস্ট নেতাদের ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করেন ও তাঁদের গুপ্ত স্থানে লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেন। ভারতে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কাজ শুরু করেছিলেন শ্রমিক আন্দোলনে’র সাথে যুক্ত হয়ে।

১৯৪১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনের  সময়ে তিনি রেলের শ্রমিকদের হয়ে কাজ করা শুরু করেন। পরের বছর জ্যোতি বসুকে বাংলা আসাম রেল শ্রমিকদের সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়। তিনি শ্রমিকদের প্রাপ্য আদায়ের জন্য ইউনিয়নের পক্ষে কাজ করতে থাকেন। এই সময়ে শ্রমিকদের সাথে কথা বলা, তাঁদের বস্তিতে ঘুরে বেড়ানো, তাঁদের কষ্ট উপলদ্ধি করা এই কাজগুলো তিনি করতেন।

১৯৪৩ সালে শ্রমিকদের খাদ্য সঙ্কট দেখা দিলে এই দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি দিতে তিনি খাদ্য আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা থেকে জ্যোতি বসুকে অভিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত করা হয়।

১৯৪৫-৪৭ সালে তেভাগা আন্দোলনেও জ্যোতি বসুর অবদান যথেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ। এই আন্দোলনের পর শ্রমিকদের খাদ্য সঙ্কটকে রেল ইউনিয়নের সাহায্যে বাংলা থেকে মুছে ফেলতে জ্যোতি বসু সার্থক হয়েছিলেন।

জ্যোতি বসু স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার সদস্য হন। কংগ্রেস এই সময় পশ্চিমবঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৪৭ বলবৎ করলে তিনি এই আইনের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর কমিউনিস্টদের উপর জোরজুলুম চালু করে এবং ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিধিদ্ধ জারি করে। ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ জ্যোতি বসুকে গ্রেপ্তার করে তিন মাস কারারুদ্ধ করা হয়। কারাগার মুক্ত হয়ে জ্যোতি বসু আবার শ্রমিকদের হয়ে কাজ শুরু করেন। প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পর জ্যোতি বসু এই বছরেই  দ্বিতীয় বিয়ে করেন।

এই সময়ে জ্যোতিবাবুকে অনেক বার গ্রেপ্তার করা হয়। বেশ কয়েক বার জেলবন্দি হবার পর জ্যোতিবাবু রাস্তায়  ছদ্মবেশে বের হতেন। নানা ঘটনার পর ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হলে কমিউনিস্টদের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। ১৯৫২ সালের বিধানসভা ভোটে বরানগর থেকে জ্যোতি বসু জয়ী হন এবং বিধানসভায়  বিধানচন্দ্র রায়ের বিরোধী নেতা হন।

ব্যারিস্টার জ্যোতি বসু থেকে কমরেড জ্যোতি বসু দলের জন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন। প্রথম দিকে তাঁর স্বল্প বেতনের অর্ধেক টাকা পার্টি ফান্ডে দান করতেন। দলের হয়ে তিনি সারাজীবন কাজ করে গেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে ১৯৭৭ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং পরবর্তী ২৪ বছর তিনি এই পদে দায়িত্ব সামলে গিয়েছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে পরবর্তীকালে মুখ্যমন্ত্রীত্বের দায়িত্ব তিনি  বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাতে তুলে দেন।

১৯৬৪ থেকে২০০৮ সাল অবধি তিনি কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ছিলেন। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি দু’ভাগে ভাগ হলে তিনি যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টির মার্সকবাদী দলে(CPIM)। ১৯৯৬ সালে জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী পদে মনোনীত করা হলেও পার্টির সিদ্ধান্তে জ্যোতি বসু এই পদ প্রত্যাখ্যান করেন।

২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারি ৯৫ বছর বয়সে জ্যোতি বসুর মৃত্যু হয়। মৃত্যু’র পর তিনি তাঁর দেহ দান করে যান। বর্তমানে তাঁর বাংলাদেশের পৈতৃক বাড়িটিকে লাইব্রেরিতে পরিণত করা হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading