ইতিহাস

কাঙাল হরিনাথ

কাঙাল হরিনাথ

বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে স্বতন্ত্র এক সাংবাদিকতার ধারা সৃষ্টি করতে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনার কারণে বিখ্যাত হয়েছিলেন কাঙাল হরিনাথ (Kangal Harinath)। তাঁর আসল নাম ছিল হরিনাথ মজুমদার। কুমারখালি গ্রামে প্রথম বাংলা পাঠশালা এবং বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন তিনি। সমাজসেবা আর লোকশিক্ষার প্রতিই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদপ্রভাকর’ পত্রিকায় প্রতিবেদন লেখার মধ্য দিয়েই তাঁর সাংবাদিকতার শুরু। বাউল সাধক লালন ফকিরের অন্যতম অনুরাগী হরিনাথ নিজের একটি বাউল গানের দলও খুলেছিলেন। তিনি নিজেও কিছু বাউল গান লিখেছিলেন। পত্রিকা প্রকাশের জন্য কপর্দকশূন্য হয়েও বহুকাল পর্যন্ত তিনি সমাদর পাননি বাংলার বিদ্বৎসমাজে।

১৮৩৩ সালের ২২ জুলাই মাসে অধুনা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালির গ্রামের অন্তর্গত কুণ্ডুপাড়া অঞ্চলে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার বংশের তিলি পরিবারে কাঙাল হরিনাথের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম হরিনাথ মজুমদার। তাঁর বাবার নাম হলধর মজুমদার এবং মায়ের নাম কমলিনী দেবী। মাত্র এক বছর বয়সেই তাঁর মাতৃবিয়োগ হয়। মায়ের মৃত্যুর পরে তাঁর বাবা আর কোন বিবাহ করেননি। স্ত্রী বিয়োগের শোকে সাংসারিক দিক থেকে ক্রমেই উদাসীন হয়ে পড়েন তিনি, ফলে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তিও নষ্ট হয়ে যায়। এর কয়েক বছর পরেই হরিনাথের বাবাও মারা যান। ফলে শৈশবেই প্রবল দারিদ্র্যের মুখোমুখি হন তিনি। এক দূরসম্পর্কের ঠাকুমার কাছে মানুষ হন হরিনাথ। তাঁকে হরিনাথ ‘দুধ-মা’ বলে ডাকতেন। ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত দুরন্ত হরিনাথের প্রধান নেশা ছিল ঘুড়ি ওড়ানো। বাবার মৃত্যুর ফলে পারিবারিক সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত হয়েছিলেন তিনি আর তাই প্রবল অভাব-দারিদ্র্য তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে যায়।

কুমারখালিতে কৃষ্ণধন মজুমদার স্থাপিত ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু হয় হরিনাথের। পড়াশোনা ও বই কেনার খরচের সব ভার নিয়েছিলেন তাঁর কাকা নীলকমল মজুমদার। নীলকমলের চাকরি চলে গেলে আবার সঙ্কটে পড়েন হরিনাথ। ঐ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণধন মজুমদারও কিছুদিন তাঁকে সম্পূর্ণ অবৈতনিকভাবে পড়িয়েছিলেন। একদিকে প্রবল অর্থাভাব, অন্নসংস্থানের অসুবিধে আর বইপত্র কেনা-বিদ্যালয়ের খরচ যোগানোর সমস্যার কারণে প্রাথমিক শিক্ষা ছাড়া উচ্চতর শিক্ষালাভ আর তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সেকালে শিক্ষক, গুরুমশাইয়রা ছাত্রদের প্রহার করতেন খুব। আর এমনই এক গুরুমশাইয়ের প্রহারের ভয়ে বালক হরিনাথ টানা একদিন একটি কুয়োর মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন।

পড়াশোনা বেশিদূর করতে না পারায় তাঁর বন্ধুদের পরামর্শে ও উদ্যোগে একটি নীলকুঠিতে কাজে যোগ দেন হরিনাথ মজুমদার। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নীলকুঠির সাহেবদের অসততা, স্বার্থপরতা এবং প্রজাপীড়ক, উৎকোচগ্রাহী মনোভাব দেখে সেই কাজ ছেড়ে দেন তিনি। এরপরে এক মহাজনের গোমস্তা হিসেবে কাজে যোগ দেন তিনি। কিন্তু এখানেও মহাজনের অন্যায় ইচ্ছাপূরণ করতে না চাওয়ায় কাজ ছেড়ে চলে আসেন হরিনাথ। তাঁর জ্যাঠামশাই এতদিন দুবেলা অন্নসংস্থান দিয়েছিলেন, সে পাটও চুকে গেল এরপরে। কোন কোন দিন ঠাকুরমন্দিরের দালানে কাঙালভোজনের পাতে বসে খেতেন হরিনাথ। সারাদিন মাঠে মাঠে খেলে বেড়িয়েই দিন কাটতে লাগলো তাঁর। তবে শারীরিক সক্ষমতার জন্য অসহায় দুর্বল মানুষদেরকে তিনি সেই সময় থেকেই দুর্বৃত্তদের হাত থেকে বাঁচাতেন। বন্ধুরা তাঁকে মাঝে মধ্যে যে বাংলা বইগুলি দিত, তা গোগ্রাসে পড়ে ফেলতেন হরিনাথ। পরনের কাপড় সংগ্রহের জন্য ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় প্রকাশিত রামমোহন রায়ের একটি বক্তব্যের চূর্ণক-এর অনুকরণ করতে হয়েছিল হরিনাথকে। সেকালের প্রজাদের উপর জমিদারদের অত্যাচার-নিপীড়ন প্রত্যক্ষ করে হরিনাথ তা থেকে প্রজাদের নিষ্কৃতির জন্য চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু এই জন্য প্রয়োজন ছিল সার্বিক শিক্ষাবিস্তারের। এই সময় নিজের উদ্যোগেই প্রথাগত শিক্ষার বাইরে পড়াশোনা করতে শুরু করেন তিনি। কুমারখালির ব্রাহ্ম ধর্মপ্রচারক দয়ালচাঁদ শিরোমণির কাছে তিনি ব্যাকরণ শেখেন, তাঁর কাছ থেকে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার সবকটি খণ্ড সংগ্রহ করে পড়ে ফেলেন হরিনাথ। তাছাড়া এই সময় থেকেই ঈশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত ‘সংবাদপ্রভাকর’ পত্রিকাটিও পড়তে থাকেন তিনি। এই পত্রিকায় গ্রামের নানাবিধ সমস্যা বিষয়ে ছোট ছোট প্রতিবেদন পাঠাতে থাকেন হরিনাথ, সেই থেকেই শুরু হয় তাঁর কাব্যচর্চাও। তাঁর জীবনের অন্যতম ব্রতই ছিল সমাজসেবা।

১৮৫৪ সালে কুমারখালি গ্রামে কাঙাল হরিনাথ একটি বাংলা পাঠশালা স্থাপন করে বিনা বেতনে ছাত্রদের পড়াতে থাকেন। কিন্তু পড়ানোর পাশাপাশি মথুরানাথ মৈত্রেয়র কাছে ক্ষেত্রতত্ত্ব, অঙ্ক ও অন্যান্য বিষয় শিখতে থাকেন তিনি। ক্রমে তাঁর স্থাপিত অবৈতনিক বিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য সরকারের তরফ থেকে মাসিক ১১ টাকা সাহায্য পেতে থাকেন কাঙাল হরিনাথ। স্ত্রীশিক্ষার অনুরাগী হরিনাথ ১৮৬০ সালে নিজের বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে প্রথম একটি বালিকা বিদ্যালয় চালু করেন। তাঁর বাংলা পাঠশালায় ইংরেজি শিক্ষার ধাঁচে ব্যাকরণ, ভূগোল, ইতিহাস, সাহিত্য, অঙ্ক ইত্যাদি পড়ানো হত আর বালিকা বিদ্যালয়ে বই পড়ার পাশাপাশি সূচিশিল্প, হিসাবরক্ষার বিষয়েও শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করতেন হরিনাথ। ১৮৫৮ সালে এই বালিকা বিদ্যালয়ের দ্বারোদ্‌ঘাটন করেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। মথুরানাথ মৈত্রেয়র সহায়তায় নিজের বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপেই একটি পঠন সমিতি ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন কাঙাল হরিনাথ। এই বিদ্যালয়ে তৎকালীন সমাজের বখে যাওয়া ছেলেদের সুশিক্ষিত করে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হত। পঠন সমিতিতে প্রতি শনিবার বেলা চারটের পর ‘এডুকেশন গেজেট’, ‘সংবাদপ্রভাকর’ ইত্যাদি পত্র-পত্রিকা থেকে অংশ বিশেষ পাঠ করা হত। মথুরানাথ মৈত্রেয়, গোপালচন্দ্র সান্যাল তাঁর নৈশ বিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়াতেন আর হরিনাথ নিজে সেখানে বাংলা পড়াতেন। ‘সংবাদপ্রভাকর’ পত্রিকার মাধ্যমেই সাংবাদিকতার শুরু হরিনাথের আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ১৮৬৩ সালে নিজের উদ্যোগে তিনি শুরু করেন ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা। পরে যদিও এটি পাক্ষিক পত্রিকার রূপ নেয় এবং আরও পরে তা সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকে। দীর্ঘ বাইশ বছর এই পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন হরিনাথ। নিজের সব সঞ্চিত সম্পত্তি, সামর্থ্য উজাড় করে দিয়েছিলেন তিনি এই পত্রিকার জন্য। এমনকি পূর্ণ সময়ের জন্য এই পত্রিকার কাজ করার জন্য শিক্ষকতার চাকরিটিও ছেড়ে দিয়েছিলেন কাঙাল হরিনাথ। কলকাতার গীতিরত্ন প্রেস থেকে প্রথমে এই পত্রিকাটি প্রকাশ পেত। এরপরে ১৮৬৪ সালে হরিনাথের বন্ধু মথুরানাথ মৈত্রেয় কুমারখালিতে স্থাপন করেন মথুরানাথ যন্ত্র। ১৮৭৩ সাল থেকে এই যন্ত্রেই ছাপা হতে থাকে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকা। গণসঙ্গীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতে শিলাইদহে জমিদারির দায়িত্বে আসা ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের প্রজা নিপীড়নের কথা কাঙাল হরিনাথ তাঁর এই পত্রিকায় প্রকাশ করতেন। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান এবং নীলকর ও জমিদারদের প্রজাপীড়নের কথা খুব গুরুত্বসহকারে প্রকাশ পেতো গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায়। এমনকি এই জন্য জমিদাররা তাঁর বাড়িতে হামলাও চালিয়েছিলেন লাঠিয়াল নিয়ে। নিজের প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও লোকশিক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট তৎপর ছিলেন তিনি। তাই কলকাতা থেকে অনেক দূরে একটি পৃথক ও স্বতন্ত্র শিক্ষা-সংস্কৃতির পরিবেশ তৈরি করেছিলেন হরিনাথ। গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা প্রকাশের জন্য এত ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি যে প্রকৃতই কাঙালে পরিণত হন হরিনাথ মজুমদার। যদিও জানা যায় রাজশাহীর রানি স্বর্ণকুমারী দেবী এই পত্রিকা প্রকাশের জন্য অর্থসাহায্য করেছিলেন। লালন ফকিরের সঙ্গেও তাঁর বেশ সখ্যতা ছিল। তাছাড়া মীর মোশারফ হোসেন, সাংবাদিক জলধর সেন, অক্ষয় কুমার মৈত্র, দীনেন্দ্র কুমার রায় প্রমুখরাও হরিনাথের বন্ধুস্থানীয় ছিলেন। বাউল সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ছিল অমোঘ আকর্ষণ, অনেকে তাঁকে ‘কাঙাল ফকির চাঁদ বাউল’ নামেও ডাকতেন।  

তাঁর লেখা তিনটি মৌলিক উপন্যাসের কথা জানা যায় – ‘বিজয়বসন্ত’, ‘চিত্তচপলা’ এবং ‘প্রেমপ্রমীলা’। ‘বিজয়বসন্ত’ উপন্যাসকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস লক্ষণাক্রান্ত রচনা বলা হয়। ১৮৭৬ সালের মাঝামাঝি প্রকাশ পেয়েছিল ‘চিত্তচপলা’ উপন্যাসটির প্রথম ভাগ যাকে আবুল আহসান চৌধুরী জ্ঞাতি বিরোধীয় অপূর্ব উপন্যাস বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ‘প্রেমপ্রমীলা’ উপন্যাসের মূল বিষয় প্রেম ও প্রমীলা নামের দুই রাজকুমার ও রাজকুমারীর কাহিনী। তবে ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হরিনাথের ‘বিজয়বসন্ত’ উপন্যাসটি সবথেকে জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৮৬২ সালে এই উপন্যাসের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে এই উপন্যাস অবলম্বনে মতিলাল রায়ের ‘বিজয়চণ্ডী’ গীতাভিনয় রচিত ও মঞ্চস্থ হয়। মূলত ছাত্রদের পাঠ্য বইয়ের বাইরে সাহিত্যের রসাস্বাদনের জন্য এই উপন্যাস লিখেছিলেন হরিনাথ, কিন্তু শুধু ছাত্রদের মধ্যেই নয় সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই উপন্যাস যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছিল।

মোট আঠারোটি বই লিখেছিলেন কাঙাল হরিনাথ যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘চারু চরিত্র’, ‘কবি কৌমুদী’, ‘অক্রূর সংবাদ’, ‘কাঙাল ফকির চাঁদ ফকিরের গীতাবলী’ ইত্যাদি।

১৮৮০ সালে লালন ফকিরের অধ্যাত্ম-চেতনা প্রচারের জন্য তিনি নিজে একটি বাউল গানের দল খোলেন। তাছাড়া নিজেও তিনি বেশ অনেকগুলি বাউল গান লিখেছিলেন। তাঁর গানের কাঙাল ভণিতার ব্যবহার খুবই সমাদর পেতো যেগুলি পরে কাঙাল ফকির চাঁদের গান নামে পরিচিত হয়। ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যে হল পার করো আমারে’ এই গানটি তাঁর লেখা অন্যতম জনপ্রিয় একটি গান।

১৮৯৬ সালে ১৬ এপ্রিল কাঙাল হরিনাথের মৃত্যু হয়।               


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তথ্যসূত্র


  1. শ্রীসুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, 'সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান', সাহিত্য সংসদ, মে ১৯৬০, কলকাতা, পৃ ৭২ 
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://www.bongodorshon.com/
  4. https://shodhganga.inflibnet.ac.in/
  5. https://www.thedailystar.net/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়