সববাংলায়

কেশব চন্দ্র নাগ

কেশব চন্দ্র নাগ (Keshab Chandra Nag) তথা কে সি নাগ একজন ভারতীয় বাঙালি গণিতবিদ যিনি ‘নব পাটীগণিত’ নামক স্কুল পাঠ্য বইটি রচনার কারণে বাঙালী ছাত্র সমাজে অমর হয়ে আছেন। বিদ্যালয়জীবনে অঙ্কের বই বলতেই কেশব চন্দ্র নাগের ‘নবগণিত’-এর কথা সকলের মনে পড়ে। বাঁশগাছ বেয়ে বাঁদরের ওঠা-নামা আর পিতা-পুত্রের বয়স নির্ণয় করতে করতে কখন যে অঙ্ক সম্পর্কে জাগতিক ভীতি দূর করতে চেষ্টা করেছিলেন কেশব চন্দ্র নাগ, বাঙালি পড়ুয়ারা তা মনে রাখেনি। মিত্র ইন্সটিটিউশনের গণিতের শিক্ষক কেশব চন্দ্র নাগ মহাত্মা গান্ধীর ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও যোগ দিয়েছিলেন। অসম্ভব জনপ্রিয় গণিতের বই লিখতে লিখতে তিনি নিজেই একটি প্রকাশনা সংস্থা খোলেন ‘নাগ পাবলিশিং হাউস’ নামে আর বইয়ের রয়্যালটির টাকা ভাগ করে দেন দুটি চ্যারিটি ফাণ্ডে। একদা লোকসভার অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অভিনেতা বিকাশ রায়, রঞ্জিত মল্লিক সকলেই কেশব নাগের গণিতের ছাত্র। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁকে ‘গণিতশিল্পী’ আখ্যা দিয়েছেন। একদিকে উত্তমসুচিত্রার চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেম, অন্যদিকে ফুটবলে মোহনবাগান-প্রীতি, সর্বোপরি মা সারদার ভক্ত কেশব চন্দ্র নাগের জীবন ছিল সত্যিই বর্ণময়।

১৮৯৩ সালের ১০ জুলাই হুগলীর গুড়াপের নাগপাড়ায় রথযাত্রার শুভদিনে কেশব চন্দ্র নাগের জন্ম হয়। তাঁর বাবা রঘুনাথ নাগ এবং মায়ের নাম ক্ষীরোদাসুন্দরী দেবী। জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই পিতৃহারা হন কেশব। তারপর মায়ের তত্ত্বাবধানে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে দিয়ে তাঁর বড় হওয়া।

গুড়াপের স্থানীয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছিল কেশব চন্দ্র নাগের। পরে সপ্তম শ্রেণিতে ভস্তারা যজ্ঞেশ্বর হাই স্কুলে তিনি ভর্তি হন। এই সময় প্রায় সাত কিমি. পথ হেঁটে স্কুলে আসতে হত কেশব চন্দ্রকে। ফলে স্কুলে পৌঁছনোর জন্য ভোররাত থেকে রওনা হয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যেত রোজই। এই স্কুল ছেড়ে এরপরে কিষেণগঞ্জ হাই স্কুল থেকে নবম ও দশম শ্রেণি পাশ করেন তিনি। তাঁর দাদাদের চাকরির বদলির কারণেই বারবার তাঁকে স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছে। ১৯১২ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করেন কেশবচন্দ্র নাগ এবং এর দুই বছর পরেই ১৯১৪ সালে তিনি আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন প্রথম বিভাগে। রিপন কলেজ থেকেই অঙ্ক আর সংস্কৃত বিষয়ে স্নাতক উত্তীর্ণ হন কেশব চন্দ্র নাগ।

বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলে গণিত শিক্ষক হিসেবেই কেশব চন্দ্র নাগের কর্মজীবন শুরু হয়। যদিও এর আগে ভস্তারা যজ্ঞেশ্বর হাই স্কুল এবং কিষেণগঞ্জ হাই স্কুলে কিছুকাল শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি। বড়দা এবং মেজদার মৃত্যুর পরে অভাবিতভাবেই সংসারের দায়ভার সামলাতে খুব অল্প বয়সেই শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন কেশব চন্দ্র নাগ। বহরমপুরের সেই বিখ্যাত স্কুলে চাকরির আগে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের কাছে কলকাতার গ্র্যাণ্ড হোটেলে ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন তিনি। আর এই স্কুলে শিক্ষকতা করতে করতেই গণিতের শিক্ষক হিসেবে তাঁর খ্যাতি বিস্তৃত হতে শুরু করে। এরপরে মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর বাড়িতে গণিতের গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন কেশব চন্দ্র নাগ আর সেই সঙ্গে রাজবাড়ির বিশাল লাইব্রেরিতে দেশ-বিদেশের বই ঘাঁটার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে গণিতের বই লেখার সময় তাঁর কাজে লেগেছে। ১৯২৪ সালে কেশব চন্দ্র নাগ যোগ দেন কলকাতার ভবানীপুরের ‘মিত্র ইন্সটিটিউশন’-এ। দীর্ঘ ৩৬ বছর এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। স্কুলের গণিতশিক্ষক থেকে পরে প্রধান শিক্ষকের পদেও বহাল ছিলেন কেশব চন্দ্র নাগ। ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত সহজবোধ্য ভাষায় অঙ্ককে বোঝাতেন তিনি এবং প্রত্যেক ছাত্র যাতে নিজে থেকেই তাঁদের ভুল বুঝতে পেরে একইরকমের অঙ্কগুলি করতে পারে সেই জন্য তিনি বোর্ডে অঙ্ক কষতে দিতেন। শোনা যায়, তাঁর শিক্ষকতার খ্যাতি এতদূর ছড়িয়েছিল যে স্বয়ং আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সেই সংবাদ পেয়ে তাঁকে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুল থেকে কলকাতার মিত্র ইন্সটিটিউশনে স্থানান্তরিত করেছিলেন। মিত্র ইন্সটিটিউশনে কেশব চন্দ্র নাগ সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন কবিশেখর কালিদাস রায়, সংস্কৃত পণ্ডিত জানকীনাথ শাস্ত্রী, ভূগোল বিশেষজ্ঞ যতীন্দ্রকৃষ্ণ মিত্র প্রমুখকে। কবিশেখর কালিদাস রায়ের বাড়িতে প্রায়দিনের সাহিত্য আড্ডায় উপস্থিত থাকতেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এত ভাল অঙ্ক বোঝানোর দক্ষতা এবং ছাত্রদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা লক্ষ করে কালিদাস রায়ই প্রথম কেশব চন্দ্র নাগকে বই লেখার পরামর্শ দেন। তাঁর বই প্রকাশ হওয়ার বেশ কিছুদিন পরে শোনা যায়, শ্রেণিকক্ষে একদিন তিনি নিজের বই দেখিয়ে ছাত্রদের জিজ্ঞেস করেন যে এই বই পাঁচ টাকায় বিক্রি করলে তাঁর লাভ কত হবে! বইয়ের দাম তিন টাকা সেসময় প্রায় সকলেই জানত আর তারা সকলেই যখন উত্তর দিল যে দু টাকা লাভ হবে, কেশব নাগ সহাস্যে বলেছিলেন যে পুরো পাঁচ টাকাই লাভ হবে কারণ তিনি তো কেনেননি বইটি।

ভবানীপুরের মিত্র ইন্সটিটিউশনে শিক্ষকতা করার সময় তিনি থাকতেন ভবানীপুরের ১২ নং রসা রোডের মেসবাড়িতে আর এখান থেকেই তিনি প্রথম পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির উপযোগী বাঙালি গণিত-ভীরু পড়ুয়াদের জন্য লিখে ফেলেন ‘নব পাটীগণিত’ যা আজও সমানভাবে জনপ্রিয়। আজ গণিত বইয়ের জগতে কেশব চন্দ্র নাগ একটি ‘ব্র্যান্ড’-এ পরিণত হয়েছে। ‘নব পাটীগণিত’ বইটি প্রকাশ পেয়েছিল ইউ অ্যাণ্ড ধর পাবলিশিং থেকে আর এর পরে ক্যালকাটা বুক হাউসের কর্ণধার পরেশচন্দ্র ভাওয়ালের অনুরোধে ১৯৪২ সালে প্রকাশ পায় ‘ম্যাট্রিক্স ম্যাথমেটিক্স’ নামে তাঁর দ্বিতীয় বই। এই বই প্রকাশ নিয়ে একটি লোকপ্রিয় গল্প চালু আছে যে, পরেশচন্দ্র ভাওয়াল একদিন কেশব নাগের মেসবাড়িতে এসে টেবিলের উপর রাখা তাঁর বাঁধানো মোটা অঙ্কের খাতা দেখেই সেটি গণিতের শিক্ষকদের গাইডবুক হিসেবে প্রকাশ করতে চান। আবার এই বই এতই জনপ্রিয় হয় যে ইংরেজি, হিন্দি, নেপালি ও উর্দু ভাষায় পরপর অনূদিত হতে থাকে বাঙালি গণিতশিক্ষক কেশবচন্দ্র নাগের বই। চতুর্থ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব মিলিয়ে তাঁর লেখা মোট বইয়ের সংখ্যা ৪২। পাকিস্তান বোর্ডের সিলেবাস অনুযায়ী ‘পাক ম্যাথমেটিক্স’ নামে একটি বইও তাঁরই লেখা।

ব্যক্তিজীবনে মা সারদার দীক্ষিত ছিলেন কেশব চন্দ্র নাগ। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের গুড়াপ শাখার অধ্যক্ষ স্বামী বিশুদ্ধানন্দ তাঁর বন্ধুস্থানীয় এবং একইসঙ্গে তাঁর জীবনের পথপ্রদর্শক ছিলেন। অন্যদিকে স্বামী বিবেকানন্দের গুরুভাই স্বামী অভেদানন্দের সান্নিধ্যেও এসেছেন কেশব চন্দ্র নাগ। গণিত শিক্ষকের পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে কখনও ভগিনী নিবেদিতার ‘শিব ও বুদ্ধ’ রচনার অনুবাদ, কখনও নিজের ডায়েরিতে সারদা মাকে নিয়ে ‘টু মাদার্স ফিট’ নামের কবিতা লিখেছেন তিনি। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ এবং অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ আন্দোলনেও যোগ দিয়েছিলেন কেশব চন্দ্র নাগ। সক্রিয় কংগ্রেসি রাজনীতিতে ধনেখালি থানা কংগ্রেসের সভাপতির পদে আসীন কেশব চন্দ্র নাগকেও কারাবাস করতে হয়েছে আন্দোলন করার সুবাদে। আবার এই কঠোরচিত্তের মানুষটি খেলায় মোহনবাগান হারলে শিশুসুলভ অভিমানে উপোস করে থাকতেন। বলা যায় চলচ্চিত্রের উত্তম-সুচিত্রা জুটির ছবি আর ফুটবলের মোহনবাগানের ম্যাচ এ দুই ছিল তাঁর প্রাণ। মোহনবাগান ক্লাবের আজীবন সদস্যপদও ছিল তাঁর।

পরবর্তীকালে তাঁর লেখা গণিত বইয়ের বিপুল জনপ্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করে ১৯৫৫ সালে তিনি ‘নাগ পাবলিশিং হাউস’ তৈরি করেন যার বর্তমান মালিকানা রয়েছে তাঁর প্রপৌত্র ত্রিদিবেশ নাগের হাতে। বই বিক্রির রয়্যালটির টাকার সিংহভাগটাই কেশব চন্দ্র নাগ দান করেন দুটি চ্যারিটি ফাণ্ডে যার একটি তাঁর নিজের নামে, আর অপরটি তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীমণির নামে। এই চ্যারিটি ফাণ্ডের অর্থানুকুল্যে তাঁর জন্মস্থান গুড়াপে তৈরি হয়েছে রাস্তা, স্কুল, লাইব্রেরি ইত্যাদি। ১৯৩২ সালে গুড়াপ রমণীকান্ত ইন্সটিটিউশন প্রতিষ্ঠা করেন শ্রী কেশব চন্দ্র নাগ। নাগপাড়ায় স্বামী বিশুদ্ধানন্দের জন্মভিটেতে আশ্রম তৈরি করে দাতব্য চিকিৎসালয় চালাতেন তিনি যা পরে রামকৃষ্ণ মিশনের অধীনস্থ হয়।  

কালজয়ী সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁকে ‘গণিতশিল্পী’ আখ্যায় ভূষিত করেন। আমৃত্যু সেটাই সবথেকে বড় পুরস্কার ছিল কেশব চন্দ্র নাগের কাছে। আর পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্তিযোগ তাঁর কৃতী ছাত্ররা। প্রাক্তন লোকসভার অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সঙ্গীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, অভিনেতা বিকাশ রায় কিংবা রঞ্জিত মল্লিক প্রত্যেকেরই গণিত শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং কে. সি. নাগ।

১৯৮৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কেশব চন্দ্র নাগের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading