সববাংলায়

খিলাফত আন্দোলন

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এমন কিছু অধ্যায় আছে, যা সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীন সমস্যার নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি। খিলাফত আন্দোলন (Khilafat Movement) তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভারতবর্ষের আন্তর্জাতিক সীমা থেকে বহুদূরে অবস্থিত তুরস্কের সমস্যা নিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। এই আন্দোলনের সমসাময়িক কালেই মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। খিলাফত আন্দোলনের সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলন সংযুক্ত হয়ে তা এক সর্বভারতীয় রূপ ধারণ করে আর তার ফলে ভারতবাসী ও ব্রিটিশ শাসক উপলব্ধি করে হিন্দু-মুসলিমের সংঘবদ্ধ শক্তির ক্ষমতা।

১৯১৯ সালে ভারতীয় মুসলিমরা তুরস্কের খলিফার ক্ষমতা রক্ষার জন্য খিলাফত আন্দোলনের ডাক দেয়। এই আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন মহম্মদ আলী জওহর, সওকত আলী, হসরৎ মোহানি, হাকিম আজমাল খান, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ ব্যক্তি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির প্রধান দেশ ছিল অটোমান সাম্রাজ্য (বর্তমানে অটোমান সাম্রাজ্য বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের মূল ভূখণ্ডের নাম তুরস্ক প্রজাতন্ত্র), জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, ও বুলগেরিয়া। অন্যদিকে মিত্রপক্ষে ছিল ইতালি, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং জাপান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সাই চুক্তির (১৯১৯ সাল) মাধ্যমে পরাজিত অটোমান সাম্রাজ্যেকে বিভক্ত করা হয়।

ইসলামীয় রাষ্ট্রের শাসককে সাধারণত খলিফা বলা হত। তবে খলিফা শব্দের অর্থ হল ‘নেতা’, ‘শাসক’ বা ‘উত্তরাধিকারী’। আর খিলাফত বলতে ইসলামীয় শাসন ব্যবস্থাকে বোঝায়। অটোমান সাম্রাজ্যের শাসক বা খলিফা শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন ইসলাম জগতের বিখ্যাত এক ধর্মগুরু। ১৫১৭ সাল থেকে ১৯২৪ সালে খলিফা পদের বিলুপ্তি পর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্যের প্রধান খলিফাপদ অলংকৃত করতেন। সারা বিশ্বের মুসলিমরা বিশেষত ভারতীয় মুসলিমরা বর্তমান তুরস্কের শাসকদের খলিফা বা ধর্মীয় নেতা হিসাবে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত। ভার্সাই চুক্তির ফলে অটোমান সাম্রাজ্য ও খলিফার ক্ষমতা তো কমে ছিলই সেই সঙ্গে কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্কে সংঘটিত স্বাধীনতার যুদ্ধের (১৯১৯ সাল – ১৯২৩ সাল) ফলে খলিফাপদের অস্তিত্ব নিয়েও সংশয় দেখা দেয়।

সারা বিশ্বের মুসলিমরা খলিফাকে সমর্থন করলেও ভারতবর্ষে তুরস্কের খলিফার মর্যাদা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ইসলাম সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও ইসলাম ধর্মের উন্নতি সাধন করার জন্য ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং তা ক্রমেই একটি আন্দোলনে পর্যবসিত হয়। ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে ভারতীয় মুসলিম নেতারা খিলাফত কমিটি গঠন করে। এই কমিটিতে ছিলেন মহম্মদ আলী, তাঁর ভাই মৌলানা সৌকত আলী, হাসরাত মোহানি, ড. মুকতার আহমেদ আনসারি, সৈয়দ আতাউল্লাহ শাহ বুখারি, ড. হাকিম আজমাল খান, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ। এছাড়া বাংলার খিলাফত কমিটিতে ছিলেন মহম্মদ আক্রম খান, মুজিবর রহমান খান, চিত্তরঞ্জন দাশ প্রমুখ ব্যক্তি। এই কমিটির উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলির উপর খলিফার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা, তুর্কি মুসলিমদের সাহায্য করা এবং খলিফার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা। খিলাফত কমিটি ইংরেজদের বিরুদ্ধে খিলাফত ইস্তেহার প্রকাশ করে, যাতে অটোমান সাম্রাজ্যের বিভাজনের পিছনে একমাত্র ব্রিটিশ সরকারকে দায়ী করা হয় এবং ব্রিটিশদের থেকে খলিফা ও ইসলামের সংস্কৃতি রক্ষার জন্য ভারতীয় মুসলিমদের সংগঠিত আন্দোলনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

খিলাফত আন্দোলন প্রধানত দুটি অংশে পরিচালিত হয়েছিল। এই আন্দোলনের একটি অংশ ইংরেজ ভাইসরয়ের কাছে যায় এবং প্যারিস শান্তি সম্মেলনে (১৯১৯ সাল) নিজেদের প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ করে। আর অন্যদিকে কিছু তরুণ নেতৃবৃন্দ ভারতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত আন্দোলনের সূচনা করে। খিলাফত কমিটির সদস্যরা বিশেষত মহম্মদ আলী ও মৌলানা সৌকত আলী দিল্লি, লখনউ, এলাহাবাদ, বোম্বাইয়ে গিয়ে ইসলামের ঐক্য ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য প্রচার শুরু করেন। তেজদীপ্ত কণ্ঠে ধর্মীয় ভাষণ দিয়ে তাঁরা এক বিশাল জনমত গঠন করার চেষ্টায় লিপ্ত হন।

খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষিতে মহাত্মা গান্ধী ইংরেজ সরকারের ধর্মীয় বিভেদ নীতির বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যসাধন ও ভারতীয় মুসলিমদের জাতীয়তাবাদী ভাবধারা দ্বারা উদ্বুদ্ধ করার একটা সুযোগ পান। ভারতীয় মুসলিমরা এতদিন এ দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকলেও এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তাঁরা ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সমগ্র ভারতবাসীর সাথে একাত্ম হয়। গান্ধীজী এই পরিস্থিতির সাহায্যে ব্রিটিশদের উপর চাপ সৃষ্টি করে ‘স্বরাজ’ অর্জন করতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন এমনকি তাঁর সভাপতিত্বে ১৯১৯ সালে দিল্লিতে সর্বভারতীয় খিলাফত সম্মেলনের অধিবেশনও আয়োজিত হয়। এইভাবে ক্রমেই তিনি ভারতীয় মুসলিমদের বিশ্বাস অর্জন করে তাদের নেতা হয়ে ওঠেন। পরের বছর ১৯২০ সালে খিলাফত কমিটির সদস্যরা একটা অহিংস অসহযোগ কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেন। যেখানে সরকারী খেতাব, পুরস্কার, অবৈতনিক পদ, পুলিশ ও সেনার পাশাপাশি সরকারের বেসামরিক পদগুলি ভারতীয়দের বর্জন করতে বলা হয়। এরপর ১৯২০ সালে ১ আগস্ট গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করলে হিন্দু ও মুসলিম একত্রিত হয়ে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। এমনকি বল্লভভাই প্যাটেল, বাল গঙ্গাধর তিলকের মতো নেতারাও খিলাফত আন্দোলন সমর্থন করেন। আর ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় কংগ্রেসও কলকাতার অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করে। কংগ্রেসের তরফ থেকে ঘোষণা করা হয় যে, খিলাফত ও পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিকার না হলে ভারত শান্ত হবে না। পাঞ্জাব ও খিলাফত আন্দোলনকে মিলিয়ে দিয়ে কংগ্রেস হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে মৈত্রীবন্ধন সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। অন্যদিকে আবার মুসলিম লীগের একাংশ এই আন্দোলনকে সমর্থন করে। ফলে মুসলিম রাজনীতিতে এই দল আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তবে পুরো সংগঠন খিলাফত আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল না। এই আন্দোলনই ভারতের মুসলিম জনগণকে ধর্মীয় পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করে, যার ফলে পরবর্তীকালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তাছাড়া খিলাফত আন্দোলন আমানুল্লাহ খানের নেতৃত্বে ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের ফলে সারা ভারতজুড়ে ব্যাপক ধর্মঘট, পিকেটিং, বিক্ষোভ ও আইন অমান্যের ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া বহু মানুষ সরকারি চাকরি ও সরকার প্রদত্ত সম্মান ত্যাগ করে। হিন্দু ও মুসলিমরা শান্তিপূর্ণভাবে এই আন্দোলনে যোগদান করে ও ক্রমশ এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এমনকি গ্রামের মানুষ, কৃষক, শিক্ষিত যুবকরাও এই আন্দোলনে যোগ দেয়। তাছাড়া ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এই প্রথম সিন্ধি পীররা পর্যন্ত আন্দোলনে সামিল হয়।

ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দু ও মুসলিম ঐক্য এবং পীরদের রাজনৈতিক আঙ্গিনায় প্রবেশ ব্রিটিশ সরকারের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। এই কারণে তারা আন্দোলনের গতি স্তিমিত করার জন্য গান্ধীজী, মহম্মদ আলী, মৌলানা সৌকত আলীকে দ্রুত গ্রেফতার করে। এরপর উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে আন্দোলনের ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে কিছুদিন পরে খিলাফতের নেতৃবৃন্দ আলাদা আলাদা দলে যোগ দেন, যেমন – চৌধুরী আফজল হকের সঙ্গে সৈয়দ আতাউল্লাহ শাহ বুখারি ‘মাজলিস-ই-আহরার-ই-ইসলাম’ নামক নতুন দল তৈরি করেন। ডঃ আনসারি, মৌলানা আজাদ, হাকিম আজমাল খান কংগ্রেসকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে মহম্মদ আলী জওহর ও মৌলানা সৌকত আলী আবার মুসলিম লীগের কাজে মন দেন। এছাড়া কেরালার মোপলা বিদ্রোহে (১৯২১ সাল) হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে মুসলিম কৃষক সম্প্রদায়ের সশস্ত্র বিদ্রোহ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছিল। ১৯২২ সালে উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরার ঘটনার ফলে গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করলেও খিলাফত আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। তারপর ১৯২৪ সালে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দ্বারা অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ক’রে সেখানকার খলিফার পদ বাতিল করলে ভারতবর্ষে খিলাফত আন্দোলন একেবারে ভেঙে পড়ে।

ভারতের খিলাফত আন্দোলন অটোমান সাম্রাজের পতনকে আটকাতে না পারলেও ভারতীয় রাজনীতিতে এই আন্দোলনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এই আন্দোলনের ফলে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের শক্তি আরও বৃদ্ধি পায়। তবে কংগ্রেসে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মতো খিলাফত আন্দোলনের নেতাদের সম্মান যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছিল। অন্যদিকে এই আন্দোলনের ফলে ১৯২০ সালে মহম্মদ আলী জিন্নাহ কংগ্রেসের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করেন। তাঁর মতে কংগ্রেস কর্তৃক খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনকে একত্রিত করলেও প্রকৃতপক্ষে অসহযোগ আন্দোলনকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ দেওয়া হয়েছিল। খিলাফত আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গান্ধীজী হিন্দু ও মুসলিমদের যে ভ্রাতৃত্ববোধ দ্বারা আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এছাড়া এই আন্দোলনের পর মহাত্মা গান্ধী ও মুসলিম লীগের সম্পর্কের যথেষ্ট অবনতি হয়।

খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গান্ধীজী ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতাকে উপেক্ষা করে একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর প্রধান উদ্দেশ ছিল ইংরেজদের থেকে ‘স্বরাজ’ অর্জন। কিন্তু খিলাফত আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের লক্ষ্য ছিল অটোমান সাম্রাজ্য বা তুরস্কের সমস্যার সমাধান করা। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে সামিল হওয়ার কোনও ইচ্ছাই তাঁদের ছিল না। তাই বলা যায় যে, খিলাফত আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলন হতে পারেনি।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘স্বদেশ, সভ্যতা ও বিশ্ব’, জীবন মুখোপাধ্যায়, শ্রীধর পাবলিকেশন, পৃষ্ঠা:- ৫১৪-৫১৫
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://www.nextias.com/
  4. https://www.cheggindia.com/
  5. https://nustudy.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading