সববাংলায়

নগেন্দ্রনাথ বসু

উনিশ শতকে প্রাচীন সাহিত্য উদ্ধার ও ইতিহাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে যে জ্ঞান চর্চার ধারা প্রবর্তিত হয়েছিল নগেন্দ্রনাথ বসু (Nagendranath Basu) ছিলেন সেই ধারার একজন পথিকৃৎ। বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম বিশ্বকোষের রচয়িতা হিসেবে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তিনি একাধারে একজন ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক ছিলেন। পুরাতত্ত্বেও তাঁর অসাধারণ বুৎপত্তি ছিল। প্রাচ্য সম্পর্কে তাঁর অসাধারণ জ্ঞানের কারণে তিনি “প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব” শিরোনামে ভূষিত হন। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা মাথায় রেখে সম্প্রতি  কলকাতা পৌরসংস্থা “বিশ্বকোষ লেন” নামে কলকাতার একটি রাস্তার নামকরণ করেছে। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সংগ্রহশালার প্রথম কিউরেটর ছিলেন।

১৮৬৬ সালের ৬ জুলাই হুগলী জেলার মাহেশে এক অভিজাত পরিবারে নগেন্দ্রনাথ বসুর জন্ম হয়। সম্পর্কে তিনি ছিলেন বাংলা অভিধান প্রণেতা আশুতোষ দেব(এ.টি.দেব) যিনি ছাতুবাবু নামেই সমধিক পরিচিত, তাঁর বোন তারিণীর দৌহিত্র। ছোট থেকেই সাহিত্য ও ইতিহাসের প্রতি নগেন্দ্রনাথের প্রবল আগ্রহ ছিল।

নগেন্দ্রনাথ বসু প্রথম জীবনে কবিতা ও উপন্যাস লেখার পাশাপাশি ‘ভারত’ ও ‘তপস্বীনি’ নামে দুটি পত্রিকা সম্পাদনাও করতেন তিনি। এই সময়ে তিনি মূলত ছদ্মনামে বেশ কিছু কাব্যনাট্য ও নাটক রচনা করেন। নগেন্দ্রনাথ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সাথেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। এখান থেকে প্রকাশিত কায়স্হ পত্রিকা, বঙ্গীয় সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পত্রিকা সম্পাদনা ছাড়াও কিছু প্রাচীন গ্রন্থ যেমন পীতাম্বর দাসের ‘রসমঞ্জরী’, জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ ও ‘কাশী পরিক্রমা’, চন্ডিদাসের অপ্রকাশিত রচনাবলী, ভাগবতাচার্যের ‘কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিনী’ প্রভৃতি সম্পাদনা করেন তিনি। সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি ‘শঙ্করাচার্য’,’পাশ্বনার্থ’,’হরিরাজ’,’লাউসেন’ প্রভৃতি গদ্যময় নাটক রচনা করেন এবং শেক্সপীয়ারের ‘হ্যামলেট’ ও ‘ম্যাকবেথ’এর বঙ্গানুবাদ করেন।

নগেন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে উড়িষ্যা সরকারের হয়ে ময়ূরভঞ্জ জেলায় জরিপের কাজে নিযুক্ত হন। সেই সময় তিনি উড়িষ্যার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিভিন্ন পান্ডুলিপি সংগ্রহ করেন এবং সেই পান্ডুলিপিগুলিকে তামা ও শিলার উপরে লিপিবদ্ধ করেন। এই সমস্তই তিনি নিজ উদ্যোগে করেন এবং তাঁর সমস্ত সংগ্রহ তিনি মৃত্যুর আগে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে দান করে যান।

নগেন্দ্রনাথ বসুর সবথেকে বড় কৃতিত্ব হল বাংলা ভাষার প্রথম বিশ্বকোষের সংকলন। রঙ্গলাল মুখোপাধ্যায় ও ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় বাংলা বিশ্বকোষের প্রথম পর্ব ১৮৮৭ সালে সম্পাদিত করেন। দ্বিতীয় পর্বটি ১৮৮৮ সালে নগেন্দ্রনাথ নিজে সম্পাদনা করার পরের বাইশটি পর্ব তিনি দীর্ঘ বাইশ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিজে প্রকাশ করেন। এই বাইশটি খণ্ডে তিনি প্রাচ্যবিদ্যার প্রায় সমস্ত বিষয়ই আলোচনা করেছেন। রামধন লেনের ৫নং বাড়ী থেকেই তিনি বিশ্বকোষের কাজ শুরু করেন ১৯০২ সালে যা ১৯৩১ সালে শেষ হয়। রামধন লেনের থেকেই বিশ্বকোষের প্রথম পাঁচটি খন্ড প্রকাশিত হয়। তাঁর রচিত বাইশ খন্ডের বিশ্বকোষটি মোট সতেরো হাজার পৃষ্ঠার ছিল।

‘শব্দকল্পদ্রুম’ রচনার সময় নগেন্দ্রনাথের আর্থিক সংকট দেখা যায়। হরিচরণ বসুর পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি এই অবস্থা থেকে মুক্তি পান। নগেন্দ্রনাথ প্রাচীন বাংলার ইতিহাস জানার জন্য বাংলা, উড়িষ্যার বিভিন্ন দুর্গম স্হানে ভ্রমণ করেন এবং এখান থেকে বেশ কিছু বাংলা, সংস্কৃত ও উড়িয়া পান্ডুলিপি উদ্ধার করেন যার মধ্যে ‘শুশুনিয়া প্রত্নলিপি’, ‘মদনপালের অনুশাসন’ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু তাঁর আবিষ্কৃত পান্ডুলিপি ও শিলালেখগুলিকে তৎকালীন ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্র, রামপ্রসাদ চন্দ্রা, রমেশচন্দ্র মজুমদার, আর ডি ব্যানার্জী প্রমুখরা মর্যাদা দিতে চাননি। কিন্তু তাঁর আবিষ্কার করা তথ্যগুলি ছিল দেশীয় কালপঞ্জি। এই কারণেই সেগুলি সমাদৃত হয়। এই পান্ডুলিপিগুলির তথ্য নিয়ে তিনি ‘নাগরাক্ষর উৎপত্তি’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। বাঙালি জাতির ইতিহাস সম্বন্ধে গবেষণা করেন। তিনি জাতিতত্ত্বের সংকলন করতে গিয়ে কুলপঞ্জিকা সংগ্রহ করেন সারা ভারতবর্ষ ঘুরে। তিনি এই কুলপঞ্জিকাগুলি ঘটক ও পান্ডাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন। এইগুলি থেকে বাঙালি জাতির সামাজিক বিন্যা‌সের অবস্থান বোঝা যায়। তাঁর গবেষণা মূলক গ্রন্থ গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘বাঙালি জাতির ইতিহাস’, ‘কায়স্হের বর্ণপরিচয়’, ও ‘শব্দপুরাণ’।

নগেন্দ্রনাথ অবশিষ্টাংশ প্রত্নরত্ন আবিষ্কারের কাজেও মনোনিবেশ করেন। বেশ কিছু প্রাচীন মুদ্রা ও পুঁথি তিনি আবিষ্কার করেন। এই সবকিছুই তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে দান করেন। আনন্দকৃষ্ণ বসু ও হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর আগ্রহেই তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য হন। মূলত ইতিহাসের প্রতি টান থেকেই তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য হন। সেখান থেকেই তিনি শুরু করেন বাংলা থেকে ইংরেজি অভিধান সম্পদনার কাজ। ১৮১৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির সভায় তিনি তাঁর সংগ্রহিত ঐতিহাসিক তথ্য সম্বন্ধে প্রবন্ধাবলী পাঠ করেন। বাঙালিদের নতুন নতুন শব্দের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়াসে তিনি ১৮৮৪ সালে ‘শব্দেন্দু মহাকোষ’ নামে বাংলা থেকে ইংরেজি একটি অভিধান রচনা করেন। তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্হানের অনাবিষ্কৃত ইতিহাসকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন। সেইগুলিকে লিপিবদ্ধ করে গেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। তাঁর ঐতিহাসিক রচনাগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘ ময়ূরভঞ্জের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ’, ‘আধুনিক বৌদ্ধধর্ম এবং ‘উড়িষ্যার অনুসারী,’ ‘কামরূপের সামাজিক ইতিহাস’ ইত্যাদি । তাঁর সংগ্রহ করা পান্ডুলিপি দিয়েই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ খোলা হয়। নতুন প্রজন্ম বহুলভাবে ঋণী নগেন্দ্র নাথ বসুর কাছে। তাঁর আবিষ্কৃত পান্ডুলিপি ও শিলালিপিগুলি প্রাচীন ভারতের ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। তিনি যে বাড়ীটিতে থাকতেন সেই বাড়ীটি ছিল সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের আড্ডাস্হল। এখানে দাদাঠাকুর, রসিকমোহন বিদ্যাভূষণ, শিশির কুমার ঘোষ প্রমুখের যাতায়াত ছিল। এই বাড়ীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরনজরুল ইসলামও এসেছেন। ১৯২৯ সালের ২রা জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী তাঁর এই বাড়িতে এসেছিলেন।

এই বাড়ীটি কলকাতা কর্পোরেশন ‘হেরিটেজ’ তকমা দিয়ে তাঁর বাড়ীর পাশের রাস্তাটিকে “বিশ্বকোষ লেন’ নামকরণ করে। কোন বইয়ের নামে এই রাজ্যে প্রথম একমাত্র রাস্তার নাম এটি। পুরাতত্ত্বে অসাধারণ জ্ঞানের জন্য তাঁকে ১৯১৫ সালে ‘প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব’ উপাধি দেওয়া হয়। ১৯১২ সালে বিশ্বকোষ শেষ হওয়ার পরে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ তাঁকে ‘সিদ্ধান্তবাধিধি’ উপাধি প্রদান করে। কেবলমাত্র তাঁর সারা জীবনের ব্যক্তিগত পুঁথি সংগ্রহের ওপর নির্ভর করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ চালু হয়।

১৯৩৮ সালের ১১ অক্টোবর কাঁটাপুকুরের বাসভবনে নগেন্দ্রনাথ বসুর মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান, সম্পাদকঃ শ্রী সুবোধ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও শ্রীঅঞ্জলি বসু, পৃঃ ৪৩৭-৪৩৮  
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://explorebengalheritage.com/
  4. https://banglaamarpran.in/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading