ইতিহাস

রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (Rangalal Bandyopadhyay ) একজন ভারতীয় বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং প্রবন্ধকার যিনি তাঁর দেশাত্মবোধক কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত হয়ে আছেন। “স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়/ দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায়” বিখ্যাত এই লাইনটি তাঁর অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’এর অংশ।

১৮২৭ সালের ২১ ডিসেম্বর হুগলীর বাকুলিয়া গ্রামে মামারবাড়িতে জন্ম হয় রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের৷ তবে তাঁদের আদি নিবাস ছিল বর্তমান হুগলী জেলার গুপ্তিপাড়ার কাছে রামেশ্বরপুরে। তাঁর বাবার নাম রামনারায়ণ এবং মায়ের নাম হরসুন্দরী দেবী। 

রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় বাকুলিয়ার স্থানীয় পাঠশালা ও মিশনারী স্কুলে । এরপর তিনি  হুগলী মহসিন কলেজে কিছুদিন পড়াশোনা করেন। ইংরেজি, সংস্কৃত এবং প্রাচীন ওড়িয়া কাব্য ও সাহিত্যে তাঁর প্রভূত জ্ঞান ছিল।

রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায়ের কাব্য রচনা শুরু হয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের  “সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকায়।  ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত এডুকেশন গেজেট পত্রিকার সহসম্পাদক রূপে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে । সেই সময়ের এডুকেশন গেজেটে তাঁর গদ্য এবং পদ্য দুই রকম রচনাই প্রকাশিত হত। এরপর ১৮৫২ সালে প্রকাশিত ‘মাসিক সংবাদসাগর’ ও ১৮৫৬ সালে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘বার্তাবহ’ পত্রিকা দুটিতে তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৬০ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রায় ছয় মাসের জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হলেও কিছু দিনের মধ্যেই সেই চাকরী ছেড়ে আয়কর নির্ধারক এবং ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে কাজে যোগ দান করেন। এরপর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েও সুনামের সাথে রঙ্গলাল কিছুদিন চাকরি করে অবশেষে ১৮৮৪ সালের ১১ এপ্রিল তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। 

তবে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় স্মরনীয় হয়ে আছেন তাঁর কাব্য প্রতিভার জন্য৷ ঈশ্বর গুপ্তের শিষ্য ছিলেন রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম জীবনে তিনি কবিগানের বাঁধনদার হয়েও পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ভাবধারায় ভাবিত বাংলা কাব্যে নতুন একটি ধারার প্রবর্তন করেন রঙ্গলাল। বাংলা কাব্যের পুরাতন রীতি অনুসরণ করলেও ঐতিহাসিক কাহিনীর মধ্য দিয়ে স্বদেশপ্রেমের আবেগকে তিনি বাংলা কাব্যে সঞ্চার করেন। তাঁর কাব্য রচনার মূল প্রেরণা দেশাত্মবোধ। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পরাধীনতার যন্ত্রণাকে কেন্দ্র করে তিনি অনেক কাব্য রচনা করেছেন৷ রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা শ্রেষ্ঠ কাব্য  ‘পদ্মিনী উপাখ্যান'(১৮৫৮)। এই আখ্যান কাব্যের বিষয়বস্তু টডের রাজস্থান( Annals and Antiquities of Rajasthan) এর কাহিনী অবলম্বনে রচিত। আলাউদ্দিনের চিতোর আক্রমণ এবং আগুন জ্বালিয়ে পদ্মিনীর আত্মহুতি এই কাব্যের বিষয়বস্তু। কাব্যের ভূমিকায় রঙ্গলাল জানিয়েছেন, “পুরাণাতিহাসে বর্ণিত আখ্যান ভারতবর্ষীয় সর্বত্র সকল লোকের কণ্ঠস্থ বলিলেই হয়। বিশেষত ঐ সকল উপাখ্যানের মধ্যে অনেক অলৌকিক বর্ণনা থাকাতে অধুনাতন কৃতবিদ্য যুবকদিগের তত্ত্বাবৎ শ্রদ্ধাই নহে, … বীরত্ব ধীরত্ব, ধাম্মিকত্ব প্রভৃতি নানা সদগুনালংকারে রাজপুতেরা যেরূপ বিমন্ডিত ছিলেন তাঁহাদিগের পত্নীগণ সেইরূপ সতীত্ব সুধীপ্ত এবং সাহসীকত্ব গুণে প্রসিদ্ধ ছিলেন।… “। এই কাহিনী পুরোপুরি ঐতিহাসিক নয়, রাণা ভীম সিংহের পত্নী পদ্মিনীর অলৌকিক সৌন্দর্যই চিতোর ধ্বংসের কারণ সে কথাই রঙ্গলাল তাঁর গ্রন্থে ব্যক্ত করেছেন৷  রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কর্মদেবী’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮৬২ সালে। এই কাব্যের বিষয়বস্তুও রাজপুত কাহিনী থেকে নেওয়া। এই কাব্যটি চারটি সর্গে বিন্যস্ত। নায়ক – নায়িকার আত্মত্যাগ, সতীত্ব মহিমা এবং নারী প্রেমের রোমান্টিক মাধুর্য এই কাব্যে বর্ণনা করা হয়েছে। এই কাব্যে কবি যেন বাঙালিকে পুরুষত্বহীনতা থেকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন।  ডক্টর সুকুমার সেন এই কাব্যের আলোচনা সূত্রে লিখেছেন, “কর্মদেবী পদ্মিনী উপাখ্যান অপেক্ষা অনেক বেশি বর্ণনাময়। ভাষা পূর্বের মতোই তবে মধুসূদনের অনুকরণ ও অনুসরণ প্রচেষ্টা স্পষ্ট।” রঙ্গলালের তৃতীয় কাব্য ‘শূরসুন্দরী’ যেটি ১৮৬৮ সালে প্রকাশিত হয়। রাজপুত নারীর সতীত্ব রক্ষা এই কাব্যের মূল বিষয়। আকবরের সুন্দরী নারীর প্রতি কামনা এই কাব্যে বর্ণনা করা হয়েছে। নারীর সতীত্ব রক্ষার কাহিনী ছাড়া কাব্য হিসাবে ‘শূরসুন্দরী’ দুর্বল।  তবে এই আখ্যানকাব্যের বর্ণনা মনোরম।

রঙ্গলালের লেখা সর্বশেষ আখ্যান ‘কাঞ্চীকাবেরী’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৯ সালে। এই কাব্যের বিষয় উড়িষ্যার ইতিহাসের এক রোমান্টিক কাহিনী৷ এই কাব্যের বিষয়বস্তু রঙ্গলাল পুরুষোত্তম দাসের প্রাচীন উড়িয়া কাব্যের অনুকরণে রচনা করেছেন। কাব্যটি সাতটি সর্গে ভাগ করা হয়েছে৷ সুকুমার সেন এই কাব্যের আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছেন, “কাঞ্চীকাবেরীর বিষয় বেশ রোমান্টিক। তাহার উপরে ভক্তিরসের প্রবাহ থাকায় অধিকতর হৃদয়গ্রাহী। ভাষা সরলতর এবং ছন্দ প্রবাহ সুললিত।” আখ্যানকাব্য ছাড়া রঙ্গলাল কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যের অনুবাদ করেছিলেন । তিনি যে সংস্কৃত সাহিত্যে সুপন্ডিত ছিলেন এই অনুবাদ তার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। অনুবাদের ক্ষেত্রে তিনি আক্ষরিক অনুবাদই করেছেন। রঙ্গলাল টমাস গারনেলের ‘The Battle of Frogs and Mice’ কাব্য অবলম্বনে ‘ভেক মুষিকের যুদ্ধ’ নামে একটি কাব্য রচনা করেন যা প্রকাশিত হয় ১৮৫৮ সালে। এছাড়া রঙ্গলাল সংস্কৃত থেকে হিতোপদেশপূর্ণ কুড়িটি শ্লোকের পয়ার ত্রিপদী ছন্দে অনুবাদ করে, ‘নীতিকুসুমাঞ্জলি’ নামক নীতিমূলক কবিতা রচনা করেন। এই ধরনের কবিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ‘গ্রন্থগত বিদ্যা’, ‘পরহস্তগত ধন / নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন।’ ইত্যাদি। 

উড়িয়া সাহিত্যেও রঙ্গলাল তাঁর অবদান রেখেছেন। দীন কৃষ্ণদাসের ‘রসকল্লোল’ থেকে তিনি অনুবাদ করেন ‘বর্ষাযাপন’। এছাড়া তিনি ওমর খৈয়ামের কতগুলি রুবাই বাংলা পয়ারে অনুবাদ করেছিলেন। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘কলিকাতা কল্পলতা’ কলকাতা সম্পর্কে প্রথম ঐতিহাসিক রচনা হিসাবে বিবেচিত হয়। ১৮৮২ সালে তিনি মুকুন্দরামের ‘কবিকঙ্কন চণ্ডী’ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন৷ রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ঈশ্বরগুপ্তের উত্তরসূরি ও মধুসূদনের পূর্বসূরী। দেশপ্রেম রোমান্স প্রকৃতির বর্ণনা সবেতেই তিনি পারদর্শিতার ছাপ রেখেছেন। সংস্কৃত ইংরেজি ওড়িয়া পারসি কবিতা অনুবাদে তাঁর কৃতিত্ব ধরা পড়ে। বিদেশি কবিদের তিনি অনুসরণ করলেও পাশ্চাত্য ধারা তিনি বাংলা কাব্যে আনেননি। 

১৮৮৭ সালের ১৩ মে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। 

তথ্যসূত্র


  1. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস - ডঃ দেবেশ কুমার আচার্য্য, ১৫৩পৃঃ
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://www.bongodorshon.com/
  4. https://arts.bdnews24.com/
  5. https://library.isical.ac.in/
  6. https://www.thecho.in/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন