ইতিহাস

রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যের বীরযুগের প্রথম কবি হিসেবে পরিচিত রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (Rangalal Bandyopadhyay)। তাঁকে অনেকে মহাকবি বলেও সম্বোধন করে থাকেন। রঙ্গলাল ছিলেন মূলত তাঁর পূর্বজ কবি ঈশ্বর গুপ্তের ভাবশিষ্য। তাঁর কাব্যে প্রাধান্য পেয়েছে দেশাত্মবোধ তথা দেশপ্রেমের আদর্শ। তাঁর লেখা অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’, এছাড়া রঙ্গলালের অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘কর্মদেবী’, ‘শূরসুন্দরী’, ‘ভেক-মূষিকের যুদ্ধ’ ইত্যাদি। তাঁর কাব্যে একাধারে শেক্সপিয়র, স্কট, বায়রন,ম্যুর প্রমুখ বিখ্যাত ইংরেজ কবিদের রচনার প্রভাব পাওয়া যায়।

১৮২৭ সালের ২১ ডিসেম্বর হুগলির বাকুলিয়া গ্রামে মামারবাড়িতে জন্ম হয় রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের৷ তবে তাঁদের আদি নিবাস ছিল বর্তমান হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার কাছে রামেশ্বরপুরে। তাঁর বাবার নাম রামনারায়ণ এবং মায়ের নাম হরসুন্দরী দেবী। তাঁদের গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে যেত বেহুলা নদী। মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। নয় বছর বয়সে তাঁর মামা রামকমলের সঙ্গে রঙ্গলাল কলকাতার খিদিরপুরে এসে ওঠেন। রামকমল ছিলেন পেশায় ফোর্ট উইলিয়ামের দেওয়ান। মাত্র ১৪ বছর বয়সে হুগলির ফুলিয়া গ্রামে তাঁর বিবাহ হয়। বিবাহের দুই বছর পরেই তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। মাকে হারানোর শোকের বিহ্বল হয়ে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় কাশীযাত্রা করেন। পরবর্তীকালে কাশী ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে তিনি লেখেন ‘কাশীযাত্রা’ কাব্যটি।

রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় বাকুলিয়ার স্থানীয় পাঠশালা ও মিশনারী স্কুলে । এরপর তিনি  হুগলি মহসিন কলেজে কিছুদিন পড়াশোনা করেন। কলকাতাতেও বেশ কিছুদিন পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। ইংরেজি, সংস্কৃত এবং প্রাচীন ওড়িয়া কাব্য ও সাহিত্যে তাঁর প্রভূত জ্ঞান ছিল।

রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায়ের কাব্য রচনা শুরু হয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায়। ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত ‘এডুকেশন গেজেট’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক রূপে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে । সেই সময়ের ‘এডুকেশন গেজেট’-এ তাঁর গদ্য এবং পদ্য দুই রকম রচনাই প্রকাশিত হত। এরপর ১৮৫২ সালে প্রকাশিত ‘মাসিক সংবাদসাগর’ ও ১৮৫৬ সালে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘বার্তাবহ’ পত্রিকা দুটিতে তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৬০ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রায় ছয় মাসের জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হলেও কিছু দিনের মধ্যেই সেই চাকরি ছেড়ে আয়কর নির্ধারক এবং ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে কাজে যোগদান করেন রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েও সুনামের সঙ্গে রঙ্গলাল কিছুদিন চাকরি করে অবশেষে ১৮৮৪ সালের ১১ এপ্রিল তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। 

তবে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর কাব্য প্রতিভার জন্য৷ ঈশ্বর গুপ্তের ভাবশিষ্য ছিলেন রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম জীবনে তিনি কবিগানের বাঁধনদার হয়েও পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ভাবধারায় ভাবিত হয়ে বাংলা কাব্যে নতুন একটি ধারার প্রবর্তন করেন রঙ্গলাল। বাংলা কাব্যের পুরাতন রীতি অনুসরণ করলেও ঐতিহাসিক কাহিনীর মধ্য দিয়ে স্বদেশপ্রেমের আবেগকে তিনি বাংলা কাব্যে সঞ্চারিত করেন। তাঁর কাব্য রচনার মূল প্রেরণা দেশাত্মবোধ। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পরাধীনতার যন্ত্রণাকে কেন্দ্র করে তিনি অনেক কাব্য রচনা করেছেন৷ রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা শ্রেষ্ঠ কাব্য ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’ প্রকাশিত হয় ১৮৫৮ সালে। এই আখ্যানকাব্যের বিষয়বস্তু টডের রাজস্থানের (Annals and Antiquities of Rajasthan) কাহিনী অবলম্বনে রচিত। আলাউদ্দিনের চিতোর আক্রমণ এবং জহর ব্রতের আগুন জ্বালিয়ে পদ্মিনীর আত্মাহুতি এই কাব্যের প্রধান বিষয়বস্তু। এই কাহিনী পুরোপুরি ঐতিহাসিক নয়, রাণা ভীমসিংহের পত্নী পদ্মিনীর অলৌকিক সৌন্দর্যই চিতোর ধ্বংসের কারণ, সে কথাই রঙ্গলাল তাঁর গ্রন্থে ব্যক্ত করেছেন৷ রাজপুত জাতির শৌর্য, বীর্য ও স্বদেশপ্রেম কবি এখানে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন ভীমসিংহ ও পদ্মিনীর মধ্যে। পদ্মিনী চরিত্রের মধ্য দিয়ে নারীর দুঃসাহসিক আত্মত্যাগের মহিমা, সতীত্বের মর্যাদা ও রাজপুত রমণীর সম্ভ্রম ফুটিয়ে তুলেছেন রঙ্গলাল। এই কাব্যেই প্রথম শোনা যায় চিরকালীন সেই স্বাজাত্যবোধের বাণী – ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়। / দাসত্ব-শৃঙ্খল বলো, কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়?’। তাঁর লেখা ‘কর্মদেবী’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮৬২ সালে। এই কাব্যের বিষয়বস্তুও রাজপুত কাহিনী থেকে নেওয়া। এই কাব্যটি চারটি সর্গে বিন্যস্ত। নায়ক – নায়িকার আত্মত্যাগ, সতীত্ব মহিমা এবং নারী প্রেমের রোমান্টিক মাধুর্য এই কাব্যে বর্ণনা করা হয়েছে। এই কাব্যে কবি যেন বাঙালিকে পুরুষত্বহীনতা থেকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন। রঙ্গলালের তৃতীয় কাব্য ‘শূরসুন্দরী’ ১৮৬৮ সালে প্রকাশিত হয়। রাজপুত নারীর সতীত্ব রক্ষা এই কাব্যের মূল বিষয়। আকবরের সুন্দরী নারীর প্রতি কামনা এই কাব্যে বর্ণনা করা হয়েছে। নারীর সতীত্ব রক্ষার কাহিনী ছাড়া কাব্য হিসাবে ‘শূরসুন্দরী’ দুর্বল। তবে এই আখ্যানকাব্যের বর্ণনা মনোরম।

রঙ্গলালের লেখা সর্বশেষ আখ্যানকাব্য ‘কাঞ্চীকাবেরী’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৯ সালে। এই কাব্যের বিষয় উড়িষ্যার ইতিহাসের এক রোমান্টিক কাহিনী৷ এই কাব্যের বিষয়বস্তু রঙ্গলাল পুরুষোত্তম দাসের প্রাচীন উড়িয়া কাব্যের অনুকরণে রচনা করেছেন। কাব্যটি সাতটি সর্গে ভাগ করা হয়েছে৷ আখ্যানকাব্য ছাড়াও রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যের অনুবাদ করেছিলেন । তিনি যে সংস্কৃত সাহিত্যে সুপন্ডিত ছিলেন, এই অনুবাদ তার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। অনুবাদের ক্ষেত্রে তিনি আক্ষরিক অনুবাদই করেছেন। রঙ্গলাল টমাস গারনেলের ‘The Battle of Frogs and Mice’ কাব্য অবলম্বনে ‘ভেক মুষিকের যুদ্ধ’ নামে একটি কাব্য রচনা করেন যা প্রকাশিত হয় ১৮৫৮ সালে। একে সাহিত্যের ইতিহাসে ‘ছদ্ম-মহাকাব্য’ বলা হয়ে থাকে। এছাড়া রঙ্গলাল সংস্কৃত থেকে হিতোপদেশপূর্ণ কুড়িটি শ্লোকের পয়ার ত্রিপদী ছন্দে অনুবাদ করে ‘নীতিকুসুমাঞ্জলি’ নামক নীতিমূলক কবিতা রচনা করেন। এই ধরনের কবিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘গ্রন্থগত বিদ্যা, পরহস্তগত ধন / নহে বিদ্যা নহে ধন, হলে প্রয়োজন।’ ইত্যাদি। 

ওড়িয়া সাহিত্যেও রঙ্গলাল তাঁর অবদান রেখেছেন। দীন কৃষ্ণদাসের ‘রসকল্লোল’ থেকে তিনি অনুবাদ করেন ‘বর্ষাযাপন’। এছাড়া তিনি ওমর খৈয়ামের কতগুলি রুবাইয়াত বাংলা পয়ারে অনুবাদ করেছিলেন। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘কলিকাতা কল্পলতা’ কলকাতা সম্পর্কে প্রথম ঐতিহাসিক রচনা হিসাবে বিবেচিত হয়। ১৮৮২ সালে তিনি মুকুন্দরামের ‘কবিকঙ্কন চণ্ডী’ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন৷ রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ঈশ্বরগুপ্তের উত্তরসূরি ও মধুসূদনের পূর্বসূরী। দেশপ্রেম, রোমান্স প্রকৃতির বর্ণনা সবেতেই তিনি পারদর্শিতার ছাপ রেখেছেন। সংস্কৃত, ইংরেজি, ওড়িয়া, পারসি কবিতার অনুবাদে তাঁর কৃতিত্ব ধরা পড়ে। বিদেশি কবিদের তিনি অনুসরণ করলেও পাশ্চাত্য ধারা তিনি বাংলা কাব্যে আনেননি। 

১৮৮৭ সালের ১৩ মে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। 


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তথ্যসূত্র


  1. তারাপদ মুখোপাধ্যায়, 'আধুনিক বাংলা কাব্য'(প্রথম পর্ব), মিত্র ও ঘোষ, এপ্রিল ২০১৪, পৃ ৪৭-৫৫ 
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://www.bongodorshon.com/
  4. https://arts.bdnews24.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়