কলকাতা শহরের বুকে বহু প্রাচীন মন্দির যেমন রয়েছে, চার্চ রয়েছে, তেমনই ঐতিহ্যবাহী কিছু মসজিদও চোখে পড়ে। কলকাতার বিখ্যাত মসজিদগুলির মধ্যে অন্যতম নাখোদা মসজিদ (Nakhoda Mosque)। জাকারিয়া স্ট্রীট এবং রবীন্দ্র সরণীর সংযোগস্থলে মধ্য কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলের চিৎপুর এলাকায় এই বিখ্যাত নাখোদা মসজিদ অবস্থিত। প্রায় শতবর্ষ প্রাচীন এই মসজিদ সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি ছোট শাখা কুচ্চি মেমন জামাতদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। আকবরের সমাধির অনুকরণে তৈরি হয়েছিল এই মসজিদ। উল্লেখ্য যে, এই নাখোদা মসজিদ পশ্চিমবঙ্গ তথা পূর্ব ভারতের বৃহত্তম মসজিদ। এই মসজিদ নির্মাণের যেমন দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তেমনই এই মসজিদকে ঘিরে রয়েছে একটি বিবাদেরও ইতিহাস। তবে সেইসব পেরিয়ে আজও নাখোদা মসজিদ ব্যস্ত কলকাতার বুকে স্বমহিমায় বিরাজ করছে।
নাখোদা মসজিদের ইতিহাস জানতে হলে সেই মসজিদ যাদের হাতে নির্মিত হয়েছিল, সেই কুচ্চি মেমন জামাত সম্প্রদায়ের কথা জানতে হবে। সিন্ধ ও কাঠিয়াওয়াড় অঞ্চলের একটি বণিক সম্প্রদায় লোহানা নামে পরিচিত ছিল এবং হিন্দু বর্ণ ব্যবস্থার একটি অংশ ছিল। লোহানারা তিনটি পৃথক সাংস্কৃতিক দলে বিভক্ত ছিল, যথা, গুজরাটি লোহানা, সিন্ধি লোহানা এবং কুচ্চি লোহানা। এই লোহানা সম্প্রদায়ের প্রায় ৭০০টি পরিবারের ৬১৭৮ জন মানুষ মুসলিম সাধক সৈয়দ আহমেদ শাহাবুদ্দিন জিলানী কাদরির নেতৃত্বে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। ইতিহাস অনুসারে সেই সাধক সদ্য এই ধর্মান্তরিতদের ‘মোমিন’ বলে অভিহিত করেন৷ এই ‘মোমিন’ শব্দটিই কালে কালে সামান্য বিকৃত হয়ে ‘মেমন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শব্দটির অর্থ হল বিশ্বাসী বা ধার্মিক ব্যাক্তি। এই মেমনরা ছিলেন মূলত একটি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। ১৬ শতকে ভূজের শাসক রাও খেঙ্গারজি জাদেজা এই ইসলামে দীক্ষিত লোহান বা মেমনদের ভূজে বসতি স্থাপনের জন্য আহ্বান করেন। ১৫৮০ থেকে ১৬৮০ সাল পর্যন্ত মেমনরা সুরাটে তাদের বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি সফল এবং ধনী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছিল। যেহেতু তাদের বাণিজ্যের জন্য নৌযানের প্রয়োজন পড়ত সেই কারণে তারা উপকূলীয় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করত। কুচ্চি মেমনরা ছিল সুন্নি মুসলমান সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। তারা মানবকল্যাণমূলক অনেক কাজ করেছিল। জনহিতৈষী সম্প্রদায় বলে এদের পরিচিতি রয়েছে।
কুচ্চি মেমনরা আঠারো শতকের ত্রিশের দশকের প্রথম দিকে বার্মা, জাভা, সিঙ্গাপুর, সিলন (শ্রীলঙ্কা) এবং মরিশাসের মতো পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করে। তাদের ব্যবসা বজায় রাখার জন্য তারা ১৮২০ সাল থেকে কলকাতায় এসে বসতি স্থাপন করেছিল। চাল ও চিনির ব্যবসায় তারা ‘রাজা’ হিসেবে বিবেচিত হত।
এই কুচ্চি মেমনরা ‘নাখোদা’ (ফার্সি শব্দ) হিসেবেও পরিচিত ছিল, যার অর্থ হল নাবিক। এই নামটির পিছনেও একটি মজাদার জনশ্রুতি রয়েছে। গল্পটি এক কুচ্চি মেমন নাবিক ও তার পালতোলা জাহাজের গল্প। জাহাজটি হজযাত্রীতে ছিল পরিপূর্ণ এবং সেটি যাচ্ছিল জেদ্দাতে। যাত্রাপথে সাগরে ভয়ঙ্কর ঝড়ের প্রাদুর্ভাব ঘটে, ফলে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছে যাত্রীরা তাদের প্রাণ বাঁচানোর অনুরোধ করে। ক্যাপ্টেন তখন উত্তরে বলেছিলেন তিনি ‘না-খুদা’ অর্থাৎ তিনি ঈশ্বর নন এবং সাহায্যের জন্য তিনি তাদের আল্লাহের কাছে প্রার্থনা করতে বলেছিলেন। সেই সময় থেকেই নাকি কুচ্চি মেমন জাহাজ ব্যবসায়ীরা ‘নাখোদা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন৷
এই কুচ্চি মেমন সম্প্রদায়ই কলকাতার বুকে চিৎপুর এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিল বলেই মসজিদটি নাখোদা মসজিদ নামে পরিচিত হয়৷ গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলেরই এক ধর্মপ্রাণ মুসলিম অর্থাৎ এক কুচ্চি মেমন আবদুর রহিম ওসমান এই নাখোদা মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব পেশ করেছিলেন৷ তিনি নিজেও ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ নাবিক। ওসমানের সেই প্রস্তাব সমর্থিত হলে ১৯২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। তবে বর্তমান এই মসজিদের জায়গাতে অনেক আগে থেকেই কিন্তু দুটি ছোট মসজিদ ছিল। এই নাখোদা মসজিদ নির্মাণের জন্য তখন প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছিল। মন্দির নির্মাণের জন্য লাল গ্রাণাইট পাথর আমদানি করা হয়েছিল বিহারের টোলপুর থেকে। ১৯৪২ সালে এই বর্তমান মসজিদ নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছিল। এই মসজিদের প্রথম মুত্তাওয়ালি ছিলেন হাজি নূর মহম্মদ জাকারিয়া, যাঁর নামেই সামনের রাস্তার নাম হয়েছে জাকারিয়া স্ট্রীট।
নাখোদা মসজিদের স্থাপত্যশৈলীটিও খুবই আকর্ষণীয়। এই মসজিদটি আগ্রার কাছে সিকান্দ্রায় অবস্থিত মুঘল সম্রাট আকবরের সমাধিটির অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে। তবে লালকেল্লার স্থাপত্যশৈলীও লক্ষ করা যায় এখানে। এই মসজিদের প্রবেশদ্বারটি ফতেপুর-সিক্রির বিখ্যাত বুলন্দ-দরওয়াজার প্রায় প্রতিলিপি বলেই মনে হয়। মসজিদটিতে মোট তিনটি বৃহৎ গম্বুজ রয়েছে এবং ১৫১ ফুট উচ্চতার দুটি সুউচ্চ মিনারও দেখা যায়। সেই মিনারদুটি ছাড়াও গোটা মসজিদ জুড়ে আরও ২৫টি মিনার চোখে পড়ে যেগুলির উচ্চতা প্রায় ১০০ থেকে ১১৭ ফুট। ভিতরে তাজমহলের মতো শ্বেতপাথরের ওপর সূক্ষ্ম নকশা দেখা যায়। সাদা মার্বেলের দেওয়াল ছাড়াও রয়েছে বেলজিয়ান কাচ, পুরোনো কাঠের ঘড়ি প্রভৃতি। মসজিদের ভিতরে রয়েছে একটি ছোট জলাধার, যেখানে নামাজের পূর্বে অজু করে নেওয়া হয়। মসজিদের অভ্যন্তরে যে বিরাট প্রার্থনার কক্ষ আছে সেখানে একত্রে প্রায় ১০ হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারেন। এই নাখোদা মসজিদ ইন্দো-সেরাসিনিক রীতির স্থাপত্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে আছে। খুব সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে কারিগর নিয়োগ করে মসজিদের কিছু কিছু সংস্কার সাধনও করা হয়েছে।
বছরের বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরব ধুমধাম করে পালিত হয়ে থাকে এই নাখোদা মসজিদে।
প্রথমেই আসে রমজানের প্রসঙ্গ। এই সময়ে মসজিদের চূড়ায় সবুজ একটি আলো দ্বারাই রমজানের সূচনা এবং সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। মসজিদকে কেন্দ্র করে চারপাশে, বিশেষত জাকারিয়া স্ট্রীট জুড়ে এসময় হরেককিসিমের খাবারের দোকান, বিশেষত কাবাব, হালিম, ফালুদা ইত্যাদির পসরা বসে। রঙিন আলোয় চতুর্দিক সাজিয়ে তোলা হয়, সকলে নতুন জামাকাপড় পরে পথে বেরিয়ে পড়েন এই পবিত্র আনন্দের দিনটি উপভোগ করতে।
এছাড়াও মহরমের সময়তেও নাখোদা মসজিদে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে। এইসময় দারুণভাবে সুসজ্জিত দুলদুল-সহ মিছিল বেরোয়। সঙ্গে চলে অস্ত্র ও লাঠি খেলার প্রদর্শনী। এই সময়তেও নাখোদা মসজিদের চারপাশটা ঘিরে প্রচুর কাপড়জামা এবং খাবারের দোকান ছেয়ে যায়।
ইদুল ফিতর ও ইদুজ্জোহা দুটি ইদেই নাখোদা মসজিদে একত্রে প্রায় ১০ হাজার মানুষের নামাজ পড়ার দৃশ্যটি সত্যিই অসাধারণ।
এইভাবে মহরম, রমজান, ইদ ইত্যাদি বিভিন্ন ইসলামীয় পরবের সময় নাখোদা মসজিদ যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
২০০৮ সালে এই নাখোদা মসজিদকে রাজ্য সরকার হেরিটেজ বিল্ডিংয়ের তকমা দিয়েছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান